ভাণ পত্রিকা BHAAN MAGAZINE
৫১ তম ই-সংস্করণ ।। ৬২ - ৬৩ তম সংখ্যা ।। নভেম্বর ও ডিসেম্বর , ২০২৫
গৌরাঙ্গ দণ্ডপাট
সম্পাদক
- Phone:+1 (859)00000
- Email:info@example.com
পার্থ হালদার
সম্পাদনা সহযোগী
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
সোময়েত্রী চ্যাটার্জি
প্রচ্ছদ
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
পল্লব মিশ্র
প্রচ্ছদ অলংকরণ
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
দেবহূতি সরকার
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
সুচরিতা রায়
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
পূর্ণতা নন্দী
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
মৌলিকা সাজোয়াল
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
অয়ন্তিকা নাথ
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
কর্তৃক
৮৬, সুবোধ গার্ডেন, বাঁশদ্রোণী, কলকাতা: ৭০০০৭০ থেকে প্রকাশিত।
- যোগাযোগ : ৯৬৪৭৪৭৯২৫৬
৮৩৩৫০৩১৯৩৪ (কথা /হোয়াটসঅ্যাপ)
৮৭৭৭৪২৪৯২৮ (কথা)
- Email : bhaan.kolkata@gmail.com
Reg. No: S/2L/28241 548
সূচিপত্র :
সম্পাদকের কথা
সইতে সইতে বইতে বইতে মানুষ যে কী অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারে এদেশের ‘এখন’ তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ। কিছুদিন আগে গার্ডেনরিচে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে শেষ খবর পর্যন্ত ৮ ঘণ্টায় ইডি ১২ কোটি টাকা গুনতে পেরেছে। এই দিন কতক আগে পানশালায় কয়েক কোটি উদ্ধার হল। সেখানে নাকি পানের আড়ালে নারী পাচার চক্র চলছিল। বান্ধবীর বাড়িতে রগরগে ৫০ কোটিতে ভির্মি খাওয়া বাঙালিকে মোটের ওপর কোটি কোটি বেআইনি টাকা উদ্ধারের গল্পটা সইয়ে নেওয়া গেছে, এত সহনের ক্ষমতা একমাত্র অঞ্জন চৌধুরীর ছবির সন্ধ্যা রায়ের সঙ্গে তুলনীয়।
গ্রাম বাংলার ইতিউতি বিস্ফোরণ, গরিব মানুষের ঝলসে যাওয়া শতছিন্ন শরীর সইয়ে নেওয়া গেছে। বল ভেবে বোমাতুলে শিশুমৃত্যু, আর কি আঘাত করছে? চাকরি চুরি, কয়লা চুরি, গরু চুরি, সোনা চুরি, নিয়োগ চুরি, আবাস চুরি সব এখন চাঁদ সূর্যের মতো বাস্তব। যেন জীবন থাকবে যখন তখন বাতাস বইবে, মৃদুল হাওয়ার বাহাদুরিতে বাঁশের বনে যেমন পাতা নড়বে তেমনি গরু থাকলে চুরিই ‘ব্রত’ হবে, চাকরি থাকলে চাকরি চুরিকেও ‘ব্রাত্য’ রাখা যাবে না।
চোরেদের বড় গলা সইয়ে নেওয়া গেছে। রাজনীতির নামে জোকারি-মকারি সইয়ে নেওয়া গেছে। চাকরি চুরির হিসেব নিতে গেলে সেক্সটয় জনিত সুড়সুড়ি আড়াল হয়ে উঠছে। বুড়োর ছুঁড়ি লাভ আর ছুঁড়ির সুগার ড্যাডির ফ্রয়েডরসের আতিশয্যে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে রুজিরুটির বেসিক প্রশ্নগুলি। সুড়সুড়ির দমকা হাওয়ায় অসাড় করে তোলা যাচ্ছে বাঙালির স্নায়ু। সে তার নব্য দেবতা গনেশ-হনু-গো ভক্তির কিছু অংশ তার গাড়োল গাড়োয়ানদের (নেতাদের) জন্য বাঁচিয়ে রাখছে। বাঙলা ও বাঙালি জাতের ভেতরে ঘুন লাগানো লালসাজীবীদের দোরে দোরে সুসজ্জিত ভদ্রলোক ভদ্রমহিলারদের ভিড়—এই সব সার্কাসকে জীবন বলে সয়ে নিচ্ছে বাঙালি। ঘৃণায় উত্থিত থুতু গিলে গিলে উমেদারী মুখাবয়বে বাঙালি বাবু বিবিরা এখন নাম্বার ওয়ান চাটুকার। হে জ্বিহা তুমি আর কত খাবে, কত পুড়বে?
একদল বলবে চোর, অন্যদল বলবে তুই চোর। বিধানসভা, লোকসভা শুয়োরের খোঁয়াড় হয়ে উঠল আমাদের মেনে নিতে নিতে। প্রতিদিন রাষ্ট্র প্রধানরা মিথ্যে বলবেন, কুসংস্কারের নোংরা ছেটাবেন। কেউ বলবেন আমি ননবাওলোজিক্যাল, কেউ বলবেন আমি ৩৬টা ভাষা জানি, কেউ বলবেন রামমোহন ব্রিটিশের দালাল। আবার কেউ বলবেন রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে দেব না। কেউ বলবেন দেড়কোটি রোহিঙ্গা পশ্চিমবঙ্গে। এইসব বাচাল বালখিল্য বদমাইশি আমরা মেনে নিয়ে ভালো আছি। সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আমরা মেনে নিয়েছি। কলেজগুলো ছাত্র-শূন্য আমাদের মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আমাদের হকের টাকা চোর গুণ্ডাদের বাঁচাতে সুপ্রিম কোর্টে শুনানির মোচ্ছব চলেছে–আমরা মেনে নিচ্ছি। ধর্ষক, চাকরিচোর, লম্পটদের সম্বর্ধনার আতিশয্যে আমরা আজ অভ্যস্ত। বিজেপি বিরোধী বলে নাগাড়ে জনতা ক্ষেপানো একটা দল ২০১৪ থেকে ৫০-এর বেশি কেন্দ্রীয় বিল পার্লামেন্টে পাশ করতে সরাসরি সাহায্য করেছে, এইসব ভন্ডামি কে আমরা স্বাভাবিক মনে করছি। সিবিআই নির্লজ্জ বলছেন অভয়ার মা। সিবিআই তদন্ত স্যাটিসফেক্টরি নয় বলছে বঙ্গ বিজেপি। তবু সিবিআই তবু ইডি আমরা মেনে নিয়েছি। আমি জিততে চাই তাই “আমার নির্বাচন কমিশন” তামিলনাড়ুতে এক নিদান দেবে, বিহারের বেলায় ভোটের হপ্তা পূর্বে সরকারি টাকা বিলানোর অনুমতি দেবে—বৃহত্তর গণতন্ত্রের নামে আমরা এসব মেনে নিয়েছি। রাম-রহিমের মতো অপরাধী বছরে দু-তিনবার করে প্যারোলে ছুটি কাটাচ্ছে। চাকরি চোর জেলের বদলে বেসরকারি হাসপাতালের বেডে আরাম করছে অথচ পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত এক অশীতিপর অ্যাক্টিভিস্ট যিনি রাষ্ট্রকে সঙ্গত প্রশ্ন করার অপরাধে একটা স্ট্র থেকে বঞ্চিত হয়ে জল খেতে পারলেন না মৃত্যুর আগে। উফ্ এসব না মেনে নিলে কি আর জীবন উপভোগ্য হয়!? আমাদের হয়ে সাহস দেখাতে গিয়েছিলেন উনি, আমরা তাঁকে মনে রাখিনি এসব মেনে এবং দ্রুত ভুলে সুখে থাকছি, সেফ থাকছি।
একে আমরা সহনশীলতার বড়ো ক্যানভাসে কী ভাবে দেখব? এ-তো পাতি সুবিধাবাদ। নূন্যতম ঝুঁকি তো নেবই না, বরং যাঁরা নেবেন তাদের দ্রুত স্মৃতি থেকে ভ্যানিশ করে গ্লানির হাত থেকে বাঁচার জন্য তৎপর হয়ে উঠব। পৃথিবীর সবচাইতে বড়ো দুর্দিন এটা নয় যে সময়টা এখন নারকীয় হয়ে উঠেছে। নরককে জেনে বুঝে স্বর্গ বলে ভাণ করে এবং নারকীয়দের জয়গানের আসুরিকতায় মত্ত হয়ে গেছি বলেই এটা প্রকাণ্ড দুঃসময়! আমরা দলে দলে সময়ের সত্যকে সুবিধামত ব্যাখ্যা করে কোনোক্রমে দাসত্বের ভেতরেই বাজার করি, মেলায় ঘুরি, বিজ্ঞোচিত ভাব-ভঙ্গিতে আসর গরম করি। তবু টের পাই, এই হাস্যকর লেজ গোটানো আমি পেছনের দরজা দিয়ে এইযে নতমুখ পলায়ন করছি, সে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি নেই কোথাও।
সময় তারমতো সবকিছু গড়ে নেয় এটি অর্ধসত্য। সময়কে নির্মাণও করতে হয়। সে মুরোদের ‘ম’ চোখে পড়ছে না। নরককে মেনে নিতে নিতে ইতিউতি মুক্তিযোদ্ধাদের মহড়ার যেটুকু সৎসাহস দেখছি, সেইসব নায়কদের কাছে দাঁড়ানোর মুরোদটুকু অন্তত জোগাড় করতে না পারলে আরো আরো রাক্ষুসে অসহায়তা আমাদের গিলে খাবে। মুমূর্ষু টিকে থাকার নাম ‘জীবন’ দেব নাকি জীবন পণ করে বাঁচার মতো বাঁচব—এই সিদ্ধান্ত আমাদের ভবিষ্যতের আলো অথবা অন্ধকার।
কলকাতার গালগপ্পোর ঊনবিংশ পর্ব - কিশলয় জানা

শক-হুণদল-পাঠান-মুঘল
কিশলয় জানা
এই সেদিন, ষোড়শ কিংবা সপ্তদশ শতকের দিকেও কলকাতা একখানি অখ্যাত বা স্বল্পজ্ঞাত জনপদ হিসেবে গণ্য হলেও, ধীরে-ধীরে মনে হয় তার গুরুত্ব বাড়ছিল এবং সেটি সম্ভবত তার অবস্থানগত কারণে। তখন গঙ্গার মূল ধারা হুগলী নদী দিয়েই প্রবাহিত হত বলে বণিকদের কাছে বাণিজ্যপথ হিসেবে এই নদীপথের গুরুত্ব ছিল। তার উপর নাব্যতা উপযুক্ত থাকায় কুমারী বন্দর হিসাবে বিদেশী বণিকেরা কলকাতা নিয়ে অন্যতর স্বপ্ন দেখছিলেন। শেঠ-বসাকেরা এই সময় কিংবা কাছাকাছি সময় থেকেই এখানে বসতি স্থাপন করেন মূলত ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার কথা ভেবেই। তাঁদের দূরদর্শিতা প্রশংসনীয়। পরবর্তীকালের বড়বাজার নামক অঞ্চলে তাঁরা সুতো বেচাকেনার হাট বসিয়েছিলেন, সেই থেকেই অঞ্চলটির সূতানুটি নাম হয়, এ-কথা কেউ-কেউ বলে থাকেন। এ-কথা সত্য হলে, হয় এই স্থানে আগে কোন জনপদ ছিল না, এটি গোবিন্দপুর কিংবা কলকাতা গ্রামেরই উপান্ত ছিল বলে ধরে নিতে হয়। পরে শেঠ-বসাকদের হাত ধরে বিশেষ একটি অঞ্চল ‘সূতানুটি’ নামে পরিচিত হয়। নচেৎ শেঠ-বসাকদের আসার আগে থেকেই স্থানটিতে তুলার কারবার ছিল, ছোট বিক্রয়কেন্দ্র হিসাবে সামান্য পরিচিতি ছিল, সেই কারণেই শেঠ-বসাকেরা এলে সূতানুটিতেই তাঁদের কারবার শুরু করেন। কিন্তু কলকাতাতে তো কেবল শেঠ-বসাকেরাই নয়, আরও অনেক জাতি-ধর্মের মানুষের যাতায়াত শুরু হয়েছিল এবং তা ইংরেজ আসার অনেক আগে থেকেই এই সত্যকে তো অস্বীকার করা চলে না। অতএব ধরে নিতে হয়, কোন-না-কোন কারণে কলকাতা তাঁদের সকলের কাছেই গুরুত্বপুর্ণ এলাকা বলে গৃহীত হয়েছিল, নতুবা তাঁরা আসতেন না। জলা-জঙ্গলপূর্ণ, হিংস্র শ্বাপদে ভর্তি, কলেরা-টাইফয়েডের মামাবাড়ি হিসাবে চিহ্নিত কলকাতার স্বাস্থ্য যে একেবারেই জীবনযাপনের অনুকূল ছিল না, সে-কথা তো আগেই জেনেছি আমরা। তার পরেও যে, এই বিভিন্ন জাতি-ধর্মের মানুষেরা এর পিছু ছাড়লেন না, তাতেই বোঝা যায়, আস্তে-আস্তে কলকাতা অনেকের কাছেই মান্যতা পাচ্ছিলো। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা যায়, কোন্-কোন্ জাতিধর্মের মানুষদের কাছে কলকাতা ‘বিশেষ’ হয়ে উঠেছিল, কারাই বা ইংরেজদের আগে কিংবা তাঁদের পিছু-পিছু এলেন, তাহলে আমাদের অসুবিধায় পড়তে হবে।
কলকাতার প্রথম সেন্সাস অর্থাৎ জনগণনার কাজ সরকারিভাবে শুরু হয় ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে। মূলত পুলিশ-বিভাগের উদ্যোগেই ( নগর কোতোয়াল ) এই কাজ শুরু হয়, কারণ ক্রমবর্দ্ধমান কলকাতার জনসংখ্যার হিসেব-নিকেশ না করলে আইনের সুশাসন ব্যাপারটি দেখভাল করা মুশকিল। যদিও সেকেলে কলকাতায় আইনের সুশাসনের সুফল একান্তভাবেই ছিল সাহেবসুবো এবং কতিপয় অভিজাত দেশীয়দের জন্যই সুরক্ষিত, সাধারণ মানুষ কালেভদ্রে তার সুযোগ-সুবিধা লাভ করতো। তাঁদের আগে যে আর কেউ এই শহরের জনসংখ্যা নিয়ে মাথা ঘামাননি, তা নয়। যেমন, কলকাতায় কুড়ি বছর কাটানো ( ১৭১০-১৭২৯ ) হ্যামিলটন কিংবা ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার বিখ্যাত কিংবা কুখ্যাত কালেক্টর হলওয়েল, যাঁর নামে মিথ্যে গালগপ্পো ফেঁদে পরবর্তীকালে হলওয়েল মনুমেন্ট তৈরি হয়েছিলো। এঁদের পাশাপাশি রয়েছেন গ্রাঁপি সাহেব কিংবা মার্টিন সাহেবের মতো গণনাকারীদের দল। মজার ব্যাপার এই এঁদের কারুর সঙ্গে কারুর মিল নেই। এ এক কথা বলে তো ও আর-এক কথা বলে। মোদ্দা কথা, এঁদের জনগণনার মধ্যে বিস্তর গোঁজামিল, ততোধিক জল-মেশানো, দুধের ভাগ নিতান্ত কম। সে-কথা অবশ্য আমাদের গাত্রদাহ থেকে আমরা বলছি না, খোদ সি. আর. উইলসন তাঁর ‘আর্লি অ্যানালস্ অব দ্য ইংলিশ ইন বেঙ্গল’ গ্রন্থে জানিয়েছেন, এঁরা অনেকেই নিজেদের ইচ্ছেমতো বাড়িয়ে-কমিয়ে জনসংখ্যা দেখিয়েছেন, কেউ সার্ভে করে জনসংখ্যার হিসেব দেননি। এই কারণেই এঁদের জনগণনার উল্লেখে একের সঙ্গে অন্যের আকাশ-পাতাল তফাৎ। যাই হোক, ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে পুলিশ-দপ্তর জনগণনার শেষে জানিয়ে দিল, কলকাতার জনসংখ্যা তখন মোট পাঁচ লক্ষ। যদিও এই হিসেবের ভিত্তি কী, আদৌ কীভাবে জনগণনা করা হয় সে-কথা অনুল্লিখিত থেকে গেছে বলেই ১৯০১-এ জনগণনা করতে বসে এ. কে. রায় পূর্বের সমস্ত হিসেবনিকেশকে ‘আকাশ-কুসুম’ বলে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন। যদিও পরবর্তীকালে তাঁর পরিসংখ্যানও ‘এখন সব অলীক’ হিসেবে নাকচ করেছেন অন্যন জনগণকেরা।
কলকাতার এই জনগণনায় জনসংখ্যা যেমনই হোক না কেন, একটি জিনিস সেকালের এইসমস্ত পরিসংখ্যান থেকে যেমন বোঝার উপায় নেই যে, নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এঁদের সংখ্যা কত, তেমনই বিভিন্ন জাতিধর্মের মানুষের সংখ্যা কার কতটা, সেটিও জানার উপায় নেই। অথচ শহরে তখন নানা জাতিধর্মের মানুষেরা উপস্থিত। নগর কলকাতায় তাঁদের কে কখন এসেছেন, তা সঠিকভাবে বলা কঠিন, তবে নানা সূত্র থেকে মোটামুটি একটা অনুমান করা যায় যে, যখন নগর হিসেবে কলকাতার কোন সম্ভাবনাই দেখা দেয়নি, তখন পর্তুগীজরাই সম্ভবত প্রথম ইয়োরোপীয়, যাঁরা ব্যবসাবাণিজ্য উপলক্ষ্যে কলকাতার মাটিতে প্রথম পা রাখেন। পর্তুগীজ ব্যবসায়ী অ্যাফেনসো ডি মেলো ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় প্রথম পা রাখেন। কলকাতার অধুনা গার্ডেনরিচেই ছিল তাঁদের বসবাস, এ-কথা কেউ-কেউ অনুমান করেন। তখন অবশ্য গার্ডেনরিচ নাম ছিল না, অঞ্চলটি মুচিখোলা নামেই অভিহিত হতো। সেকালের নিয়ম অনুযায়ী পেশাভিত্তিক নাম কোন অঞ্চলকে তখনই দেওয়া হয়, যখন সেখানে উক্ত পেশার মানুষজন কলোনী তৈরি করেন। সেক্ষেত্রে উক্ত অঞ্চলে মুচিরা বাস করত, সেই থেকেই ‘মুচিখোলা’ নাম হয়েছিলো। যাই হোক, মেলোর পরে তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আরও অনেক পর্তুগীজ বণিকেরা এসে কলকাতার বুকে ভিড় জমান এবং এঁদের অনেকেই পরবর্তীকালে ইংরেজদের অধীনে কেরানি, পাচক, টাভার্ণ প্রমুখের বেহালাবাদক, কেউ-কেউ সেনাবাহিনীতেও কাজ করতেন। কলকাতার প্রাচীনতম গির্জাটি পর্তুগীজদেরই তৈরি। পুরানো কেল্লার কাছেই ছিল সেই চ্যাপেলটি। সিরাজের প্রথম আক্রমণে বিপর্যস্ত ইংরেজরা নিজেদের চার্চ সিরাজ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ায়, পর্তুগীজদের চ্যাপেলটি কেড়ে নিয়ে কাজ চালিয়েছিল, যতদিন-না তাঁদের নিজেদের পছন্দসই গির্জা পান তাঁরা।
আরমানিরা পর্তুগীজদের আগে এখানে পা রাখেন, না-কি পরে তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। অনেকে অনুমান করেন, পর্তুগীজদের আগে থেকে নয়, বরং ইংরেজদের আগে থেকে বা তাদের কাছাকাছি সময় থেকেই আরমানিরাও এখানে বসতি স্থাপন করেন। ইস্ট-ইণ্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে তাঁদের ছিল অম্লমধুর সম্পর্ক, ক্ষণে দড়ি, ক্ষণে চাঁদের মতো ব্যাপারস্যাপার। তবে সংখার বিচারে তাঁরা খুব বেশি ছিলেন না, যদিও কলকাতার উন্নতির সঙ্গে তাঁরা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন। আঠারো শতকের গোড়ার দিকে ম্যানুয়েল হাজারমালিয়াঁর তৈরি আরমেনিয়ান ঘাট কিংবা সেকালের লাখপতি ব্যবসায়ী আগা নাজার অর্থে তৈরি আরমেনিয়ান চার্চ অব সেন্ট নাজারেথ, আরমেনিয়ান কলেজ ( ১৮২১ ) ইত্যাদি সে-কথার প্রমাণ দেয়।
গ্রীকদের মধ্যেও আলেক্সিওস্ আরগিরির মতো কেউ-কেউ আঠারো শতকের মাঝামাঝি থেকে কলকাতায় এসে থাকতে শুরু করেন, গ্রীক চার্চও তৈরি করেন ওয়ারেন হেস্টিংস-এর অনুমতি নিয়ে। এই নিয়ে একটি ‘কিস্সা’ প্রচলিত আছে। গালগপ্পের আসর যখন, তখন বলেই ফেলা যাক। আরগিরি জেরুজালেম গিয়েছিলেন তীর্থ করতে, সেখান থেকে কলিকাতায় ফেরার সময় ঝড়-বৃষ্টিতে মাঝসমুদ্রে জাহাজ ডুবু-ডুবু। আরগিরি ঈশ্বরের কাছে প্রতিজ্ঞা করেন যে, যদি বেঁচে ফেরেন, তাহলে ফিরেই কলকাতায় একখানি নিজেদের চার্চ অর্থাৎ গ্রীক চার্চ তৈরি করবেন। সেই মর্মে হেস্টিংস-এর কাছে তিনি অনুমতিও চান। সানন্দে কেবল অনুমতিই দেন নি, সি. আর. কটন জানিয়েছেন, অনুমতির পাশাপাশি খ্রিষ্টের মডেল, সেই পার্থেনিও না-কি এই চার্চের প্রথম যাজক ছিলেন। ভাবা যায় !
ইতালীর ভেনিস থেকে আসা এডওয়ার্ড টিরেটো ছিলেন মিউনিসিপালের অধীনে সুপারিন্টেন্ডেন্ট অফ স্ট্রিটস অ্যাণ্ড হাউসেস্। কেউ-কেউ বলেন, ভেনিস থেকে এলেও আদতে তিনি ছিলেন ফরাসী। সেই কারণেই তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হলে প্রপ্তহমে পর্তুগীজদের সমাধিক্ষেত্রে তাঁকে সমাহিত করা হলেও, পরে পার্ক স্ত্রিট আর ম্যাক্লিয়ড স্ট্রিটের মাঝামাঝি অবস্থিত সমাধিক্ষেত্র ‘ফেঞ্চ অর টিরেটাস্ ব্যারিয়াল গ্রাউণ্ডে’ মিসেস টিরেটার কফিনকে স্থানান্তরিত করা হয়। আজকের টেরিটি বাজার এডওয়ার্ড টিরেটার কথা ধরে রেখেছে। তবে পরবর্তীকালে ব্যবসায়িক শত্রুতার কারণে ফরাসীরা বেশিদিন এখানে থাকেন নি। তাঁরা সরে যান চুঁচুড়া-চন্দননগরের দিকে।
অধুনা কলকাতার ব্যাঙ্কশাল স্ট্রিট অন্যতম ব্যস্ত অঞ্চল। পুরানো কেল্লার দক্ষিণ দিকে ছিল এই অঞ্চল, যেখানে ব্যাঙ্কশাল ঘাট তৈরি করা হয়, যা ছিল সেকালে বাণিজ্যিক জাহাজ বা নৌকা ভিড়বার একটি উপযুক্ত ঘাট। ব্যাঙ্কশাল বললে যদি কেউ মনে করেন, এখানে তখন থেকেই ব্যাঙ্ক ইত্যাদি ছিল, সেই কারণেই এই নাম, তাহলে তাঁরা ভুল করবেন। আদতে নামটি কলকাতায় ডাচ্ তথা ওলন্দাজদের বসবাসের নিদর্শন। ‘ব্যাঙ্কশাল’ শব্দটি ওলন্দাজী শব্দ, যা আসলে ‘বঙ্কশাল’ শব্দের অপভ্রংশ। ওলন্দাজী এই শব্দটির অর্থ হল নদীতীরে মাশুল আদায় করার স্থান। মোগলদের সঙ্গে ব্যবসায়িক-চুক্তির সূত্রে এখানে ওলন্দাজেরা ভাগীরথীর কিছু অংশ কেটে প্রশস্ত করে দেন বলে দীর্ঘকাল পর্যন্ত এই স্থানের গঙ্গাকে ‘কাটিগঙ্গা’ বলা হতো। যাঁরা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যেয়ের ‘গঙ্গাধরের বিপদ’ গল্পটি পড়েছেন, তাঁরা দেখবেন বিভূতিভূষণ সেই উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়েই ‘কাটিগঙ্গা’ বলে উল্লেখ করছেন। চুক্তি-অনুযায়ী, যে-সব নৌকা জাহাজ কিংবা ভড় এই কাটিগঙ্গার উপর দিয়ে যেত, ওলন্দাজেরা কুঁতঘাটে বসে ট্যাক্স আদায় করতো। আজকের কলকাতার কুঁদঘাট অঞ্চল সম্বন্ধে অনুমান করতে দ্বিধা নেই যে, আদি গঙ্গা যখন সজীব ছিল, তখন এই অঞ্চলেও এইরকম কোন কর আদায়ের ঘাট ছিল বলেই জায়গাটির নাম ‘কুঁতঘাট’, অপভ্রংশে কুঁদঘাট হয়েছে। কাশিমবাজার, বরানগর এবং চুঁচুড়ায় ওলন্দাজদের কারখানা এবং বসতি ছিল বলে জানা যায়। ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে হল্যান্ড এবং ইংলন্ডের মধ্যে চুক্তির ফলে বরানগর ইংরেজদের দিয়ে ওলন্দাজেরা চুঁচুড়ার দিকে সরে যান।
চীনারা অবশ্য এখানে এসেছে ইংরেজদের আসার পরে। এ-নিয়ে একটি গালগপ্পো চালু আছে। য়্যুং আতচ্যু নামে তরুণ বয়সী এক চীনা ক্যাপ্টেন জাহাজ-বোঝাই চা নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্য করতে যাওয়ার পথে প্রবল ঝড়-ঝঞ্ঝার মুখে পড়েন। জাহাজের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই অবস্থায় জাহাজ কোনরকমে ভাসতে-ভাসতে এসে ভেড়ে বজবজের কাছে গঙ্গায়। এদেশের ভাষা জানা নেই, তবে সম্ভবত স্থানীয় লোকজন সেই বিপদের দিনে আতচ্যুকে সাহায্য করেছিল, ফলে অঞ্চলটি তার মনে ধরে গেলো। তৎকালীন গভর্ণর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এবং তাঁর সহযোগীদের আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে, চা খাইয়ে খুশি করে তার ইচ্ছের কথা জানালো আতচ্যু। চা খেয়ে খুশি ইংরেজরা একটি ঘোড়া দিয়ে তাকে বললেন, এক ঘন্টায় যতটা জায়গা বেড় দিয়ে আসতে পারবে ততটা অঞ্চল তোমার। এইভাবে তিনি থেকে গেলেন। অছিপুরে খামার বানালেন। চীন থেকে নিজের জ্ঞাতিগুষ্ঠিদের নিয়ে এলেন। পরে সেখান থেকে কলকাতায় এসে বসতি বানালেন টেরিটিবাজারে। গড়ে উঠল চায়না-টাউন।
আদতে গপ্পোটি সুন্দর হলেও ইংরেজ-আমলে চীনা-বসতি গড়া সহজ হয়েছিল কারণ, তাদের দিক থেকে ইংরেজরা এলাকা-দখলের কোন আশঙ্কা করেনি। যেখানে-যেখানে করেছে, সেখানে-সেখানে তারা কিন্তু রণং-দেহি মূর্তি ধরেছে। তবে চীনাদের বঙ্গমুখী হওয়ার স্রোত দীর্ঘজীবী হয় নি। কোন-কোন মতে য়্যুং-এর আমলে চীনে খাদ্যাভাব, জীবনযাপনের সঙ্কট, দাঙ্গা-হাঙ্গামা ইত্যাদি বেড়ে যাওয়ায় মানুষ তিতিবিরক্ত হয়ে উন্নত এবং শান্ত-জীবনের আকাঙ্ক্ষায় ভেসে পড়েছিলেন সমুদ্রে। সেই সূত্রেই তাঁদের বঙ্গদেশে অপিচ কলকাতায় আসা এবং দু’এক জায়গায় কলোনি গড়ে তোলা। ভাগ্যিস তুলেছিল, না-হলে আপনি-আমি চায়না-টাউনে গিয়ে বিশুদ্ধ চৈনিক-খাবারের স্বাদ নিতে পারতাম ?
রবীন্দ্রসঙ্গীতে স্বদেশচেতনা - ড. ইন্দ্রাণী গোস্বামী

রবীন্দ্রসঙ্গীতে স্বদেশচেতনা
ড. ইন্দ্রাণী গোস্বামী
ঊনিশ শতকের শেষার্ধে বাংলায় স্বদেশচেতনার যে ভাব ক্রমশঃ দীপ্ত হয়ে উঠেছিল তার অন্যতম কেন্দ্র ছিল জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। বিদেশী শাসকবর্গের অনুগ্রহপ্রত্যাশী স্বদেশী শিক্ষিতদের কোন অভাব ছিল না সেদিনও। এর মধ্যে এই পরিবারটি স্বদেশের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা দেখায়। ‘জীবনস্মৃতি’তে রবীন্দ্রনাথ লেখেন ‘স্বদেশের প্রতি পিতৃদেবের যে একটি আন্তরিক শ্রদ্ধা তাঁহার জীবনের সকল প্রকার বিপ্লবের মধ্যেও অক্ষুণ্ণ ছিল, তাহাই আমাদের পরিবারস্থ সকলের মধ্যে একটি প্রবল স্বদেশপ্রেম সঞ্চার করিয়া রাখিয়াছিল’। যে সময়টা স্বদেশপ্রেমের নয়, তখন থেকেই এই ভাব চলছিল। রাজপ্রভুদের অপ্রীতির ভাবনা এই পরিবারের দুই প্রজন্মের নারী-পুরুষদের স্বাদেশিকতার প্রতি বিমুখ করতে পারেনি কখনো।
রবীন্দ্রনাথের মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথের সহপাঠী, ‘ন্যাশানাল পেপার’ পত্রিকার সম্পাদক নবগোপাল মিত্রের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘হিন্দুমেলা’ বা ‘জাতীয়মেলা’(১৮৬৭)র পিছনে ছিল ঠাকুরপরিবার। অন্যদিকে রাজনারায়ণ বসু ও রবীন্দ্রনাথের নতুন দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের উৎসাহে স্থাপিত হয় ‘সঞ্জীবনী সভা’ নামক একটি গুপ্ত সমিতি। দুটিই ছিল সেকালের স্বদেশচর্চা কেন্দ্র। হিন্দুমেলা ও সঞ্জীবনী সভাকে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছিল স্বদেশানুরাগের অসংখ্য গান, কবিতা ও নাটক। নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)র ‘নানান দেশের নানান ভাষা/ বিনে স্বদেশী ভাষা পূরে কি আশা’–গানে ব্যক্তিক স্বদেশভাবনা ধ্বনিত হয়। রবীন্দ্রনাথও এতে যোগ দিয়েছিলেন। এই উপলক্ষ্যে সত্যেন্দ্রনাথ রচিত দেশপ্রেমোদ্দীপক গান ‘মিলে সবে ভারত সন্তান’ গাওয়া হয়। (১১ এপ্রিল, ১৮৬৮ তে মেলার দ্বিতীয় অধিবেশনে)। সত্যেন্দ্রনাথ রচিত গানটি ছিল প্রথম সম্মেলক গান। ‘জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুন দ্বিগুন’–এই গানটি ১৮৭৫ সালে রবীন্দ্রনাথ লেখেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সরোজিনী’ নাটকের জন্য। এই গানটিকে প্রথম স্বদেশী গান কেউ কেউ বললেও এটি যতটা জহর ব্রতে আত্মোৎসর্গের, ততটা স্বদেশের নয় বলে মনে করা হয়। রবীন্দ্রনাথ এই সময় চারটি গান লেখেন বলে জানা যায়।
১. তোমারি তরে মা সঁপিনু এ দেহ,
২. অয়ি বিষাদিনী বীণা
৩. ভারত রে, তোর কলঙ্কিত পরমাণুরাশি,
৪. ঢাকো রে মুখ চন্দ্রমা। সমকালীন সময়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় লিখছেন ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’, অতুলপ্রসাদ সেন লিখছেন ‘উঠ গো ভারত লক্ষ্মী’ র মতো গান।
স্বভাব ও সময়ের বিচারে রবীন্দ্রনাথের স্বদেশী গানগুলিকে তিন পর্বে ভাগ করা যায়।
১. হিন্দুমেলা থেকে প্রাক্ বঙ্গভঙ্গ পর্বের গান (১২৮৪-১৩০৯), ২৫টি
২. বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ পর্বের গান (১৩১২-১৩১৬) ২৭ টি
৩. উত্তর পর্বের গান (১৩১৬-১৩৪৪) ১৩ টি
প্রথম পর্বে সমকালীন গীতিকারদের মতো রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ চেতনার গানের আশ্রয়পট ভারতবর্ষ। ভারতের অতীত গৌরব, পরাধীনতার গ্লানি, বেদনা ও শৌর্য, দেশকে মাতৃরূপে কল্পনা এবং অখন্ড দেশভাবনা–এ সময়ের গানের বৈশিষ্ট্য। এ সময়ের গানে যত না উদ্দীপনা আছে, তার থেকেও আছে এক ধরণের বেদনা, এক ধরণের যন্ত্রনা। ‘কেন চেয়ে আছ, গো মা’, মুখপানে/ এরা চাহে না তোমারে চাহে না যে, আপন মায়েরে নাহি জানে।/ এরা তোমায় কিছু দেবে না, দেবে না, মিথ্যা কহে শুধু কত কী ভানে’(১২৯৩/১৮৮৬)। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ লিখছেন- ‘ইংরাজদের কাছে ভিক্ষা করিয়া আমরা আর সব পাইতে পারি, কিন্তু আত্মনির্ভর পাইতে পারিনা। আর তাহাই যদি না পাই তবে আসল জিনিসটাই পাইলাম না। কারণ ভিক্ষার ফল অস্থায়ী, আত্মনির্ভরের ফল স্থায়ী’। (সমাজ, রচনাবলী ৩০)
রবীন্দ্রনাথের স্বদেশী গানে আত্মবোধ প্রথম থেকেই সজাগ। পরবর্তী কালে তার পরিণত প্রকাশ বহুবিচিত্র রূপ ও স্তরে ঘটেছে। আত্মশক্তি আর আত্মনির্ভরতাই তাঁর স্বাদেশ ভাবনার মূলকথা। স্বদেশ বিষয়ে অগ্রজদের উৎসাহ ও উদ্দীপনায় অনুপ্রাণিত হলেও সত্যেন্দ্রনাথের ‘মিলে সবে ভারতসন্তান’ বা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ‘চল্ রে চল্ সবে ভারতসন্তান’ এর মত দৃপ্ত গান রচনা করলেন না রবীন্দ্রনাথ। একমাত্র ব্যতিক্রম ‘একসূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন’। গানটি পরে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পুরুবিক্রম’ নাটকের দ্বিতীয় সংস্করণে (১৮৭৯) ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও সে যুগের গীতিকারদের মত পাশ্চাত্য সুরের দেশাত্মবোধক গান রচনাতেও আগ্রহী হননি। রবীন্দ্রনাথের প্রথম পর্বের এই ধরণের গানে প্রধানত ভারতীয় রাগরাগিণী নির্ভরতা রয়েছে।
বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ পর্বের গানগুলিতে রয়েছে লোকসঙ্গীতের সুর। অবশ্য প্রথম যুগেও প্রচলিত রামপ্রসাদী সুরে বাঁধেন ‘আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে’। এই পর্বে বাঙ্গালী পেয়েছে নিজস্ব অনুভবের ভাষা।
রবীন্দ্রনাথের দেশময় গানে অনেক সময় জড়িয়ে রয়েছে ঈশ্বরবোধ। ভক্তি ও ভালবাসায় মেশানো এই গানগুলিতে, কখনো বা সংকট থেকে দেশ ও জাতির মুক্তি প্রার্থনায় রয়েছে এই ঈশ্বরচেতনা। ১৯১২ সালে র ২৫ জানুয়ারি ‘জনগনমন অধিনায়ক’ গানটি (মাঘোৎসব-এ গীত) তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় ‘ভারতবিধাতা’ নামে প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় পর্বের স্বদেশী গানেও বারে বারে ঈশ্বর প্রসঙ্গ এসেছে। ‘বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল/ পুণ্য হউক পুণ্য হউক পুণ্য হউক হে ভগবান’। ‘তোদের বাঁধন যতই শক্ত হবে ততই বাঁধন টুটবে’ এই গানে লিখছেন জেগে আছেন জগৎ প্রভু। ‘বিধির বাঁধন কাটবে তুমি’ গানে লিখলেন ‘হও না যতই বড় আছেন ভগবান’। তবে ধর্ম এখানে কোন বিশেষ জাতির নয়, ধর্ম মানুষের ধর্ম।
দ্বিতীয় পর্বে (১৯০৫) ২৭ টি গান লিখেছেন যার সূচনায় ‘আমার সোনার বাংলা’, শেষে ‘এখন আর দেরি নয়, ধর গো তোরা’। ‘বন্দেমাতরম্’(বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে ব্যবহৃত) গানটি সেকালের সব মানুষের মত রবীন্দ্রনাথকেও ভীষণ ভাবে প্রভাবিত করে। এই গান কবে কোথায় প্রথম গান রবীন্দ্রনাথ সে নিয়ে মতভেদ থাকলেও জাতীয় কংগ্রেসের ষষ্ঠ (১৮৯০) কিংবা দ্বাদশ অধিবেশনে (১৮৯৬-এর ২৮ ডিসেম্বর) এই গান নিজের সুরে গান রবীন্দ্রনাথ। বঙ্কিম যে দশভূজা মা এর কল্পনা করেছিলেন ‘আমার দুর্গোৎসব’ রচনায়, রবীন্দ্রনাথ সেখানে দ্বিভূজা মা এর কল্পনা করেন ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ গানে। লেখেন ‘ডান হাতে তোর খড়্গ জ্বলে/ বাঁ হাত করে শঙ্কাহরণ’। কিন্তু এই গানেও পুরোপুরি পূর্বসুরীর ভাবচ্ছায়া থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। ঘরের মা এখানেও দেবী, যাঁর চরণের দীপ্তিরাশি আকাশে ছড়িয়ে যাবার কথা বললেন গানে। এই পর্বে রবীন্দ্রনাথ লেখেন ‘আমার সোনার বাংলা’, ‘যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক’, ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘সার্থক জনম আমার’। এই সব গানই দেশমাতৃকাকে ভালবাসার গান। রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে দেশমাতা ‘সকল দেশের রানী’ না হলেও তাঁর ছায়াতেই অঙ্গ জুড়ায়। এই গানগুলিতে ব্যবহৃত চরণগুলো সহজ,সরল। অনেকটাই মুখের ভাষার কাছাকাছি। স্বদেশের গানকে সাধারণের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে দেশজ সুরের প্রয়োগ ঘটালেন এই সময়ের গানে। ‘এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে, জয় মা বলে ভাষা তরী’, ‘নিশিদিন ভরসা রাখিস হবেই হবে’ ইত্যাদি।
বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ পর্বের অধিকাংশ গান আত্মবোধনের, আত্মদীক্ষার। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে’, ‘তোমারি তরে মা সঁপিনু এ দেহ’, ‘আমি ভয় করব না’ ‘বুক বেঁধে তুই দাঁড়া দেখি’, ‘নিশিদিন ভরসা রাখিস’ ইত্যাদি সব গানেই রয়েছে আত্মপ্রত্যয়ী উচ্চারণ। বঙ্গভঙ্গ প্রতিবাদী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ দান রাখিবন্ধন উৎসবের পরিকল্পনা ও ‘রাখীসঙ্গীত’ রচনা। দর্পিত ইংরাজ শাসকের বঙ্গভূমি দ্বিখন্ডিত করার প্রস্তাবিত দিনটি (১৬ অক্টবর, ১৯০৫) ছিল এই দিন। ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে’, ‘বিধির বাঁধন কাটবে তুমি’ ভান্ডার পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘রাখীসঙ্গীত’ নামে। বঙ্গ-ব্যবচ্ছেদ রোধের দিনে শুধু বাংলার সংহতি নয়, সমগ্র ভারতের সঙ্গে বাংলার যোগ কাঙ্খিত ছিল। ‘মাতৃ-অভিষেক’ নামে প্রবাসীতে প্রকাশিত রচনা ‘হে মোর চিত্ত পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে’–১৯৪০ সালে গান হিসেবে গাওয়া হয় ৭ পৌষে। এই গানে ‘ভারতের মহামানবের সাগর তীরে’ মঙ্গলঘট স্থাপনার কথা বললেন রবীন্দ্রনাথ। এখানেই ভারতবোধের সঙ্গে বিশ্ববোধ জেগে উঠলো। ‘ও আমার দেশের মাটি’ গানেও কবি বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা দেখেছেন।
রবীন্দ্রনাথের স্বদেশচেতনা শুধু দেশবন্দনা বা দেশের প্রতি আবেগময় অভিব্যক্তিই নয়, আত্মপ্রত্যয়, আত্মশক্তির বিকাশ, ভীরুতা থেকে মুক্তি এবং দ্বিধা, সংশয় সরিয়ে দেশকে নিজের মতো করে পাবার আনন্দ।
পানু পাল: জনজাগরণের নৃত্য ও নাট্য - মধুমিতা পাল

পানু পাল: জনজাগরণের নৃত্য ও নাট্য
মধুমিতা পাল
আজ সবার সামনে তুলে ধরবো পূর্ণেন্দু শেখর পালচৌধুরী ওরফে পানু পাল সম্পর্কে কিছু কথা। উনার জন্মশতবার্ষিকীতে আমার প্রণাম আর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। উনি আমার শিক্ষক, আমার গুরু, আমার ঠাকুরদাকে জানাই গুরু প্রণাম, যাকে উৎপল দত্ত বারবার বলেছেন, ফাদার অফ পোস্টার ড্রামা। তিনি শুধু বাংলা পথনাটকের পথিকৃৎ নন, একইসাথে সারা ভারতের পথনাটকের পথপ্রদর্শক। উনার পরবর্তীকালে পথনাটক লিখেছেন ও করেছেন উৎপল দত্তসহ অসংখ্য গুণীজন। তবে, তারা পথনাটক করলেও পানু পাল ছিলেন এর পাইওনিয়ার। প্রোসেনিয়ামের বাধা অতিক্রম করে তিনি নাটককে নিয়ে আসেন খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত জায়গায়। মার্কসীয় আদর্শকে বুকে নিয়ে তিনি বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের কথা বলতেন তার নাটকের মধ্য দিয়ে।
কারখানার গেটে, বস্তিতে, শহীদ মিনারে অভিনীত হতে থাকে পানু পাল-এর মাইলস্টোন নাটক—‘ভোটের ভেট’, ‘কত ধানে কত চাল’, ‘হিন্দি চিনি ভাই ভাই’, ‘খেয়াতরী’। একটি মুখবন্ধ না বললেই নয়। আমি একটা বইতে পেয়েছি। শোভা সেন বলছেন পানু পাল সম্পর্কে, “আমাদের ইতিহাস চেতনার অভাব আমাদের অতীতকে চিরদিনের জন্য অস্পষ্ট করে তোলে। আর আবেগঘন পাঁচমিশালী ইতিহাস একটা জাতি, একটা দেশকে কতখানি পশ্চাতপদ করে তোলে তা আজকের ভারতবাসী যথেষ্ট মূল্য দিয়ে বুঝতে পারছে। বাংলা নাটকের দুশো বছরের যাত্রাপথে কয়েক হাজার নাট্যকর্মীর নিরলস পরিশ্রম ও আত্মত্যাগ তাকে গর্বিত প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। কিন্তু কোথায় সেইসব নাট্যকর্মীর জীবন কাহিনীভিত্তিক নাটক আর গৌরবময় ঘটনাবলীর পুক্সখানুপুক্সখ ইতিহাস। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ ৪০ ও ৫০-এর দশকে নাটকে, সঙ্গীতে, নৃত্যশিল্পের মাধ্যমে বাংলা তথা ভারতের সামাজিক, রাজনৈতিক পরিবর্তনের যে জোয়ার এনেছিল তার ইতিহাস আজও অসম্পূর্ণ। গণনাট্য সংঘের গৌরবোজ্জ্বল যে কজন টগবগে তরুণ নাট্যকর্মী পথনাটককে তীক্ষè হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন তাদের মধ্যে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পানু পাল, উৎপল দত্ত, উমানাথ ভট্টচার্য্য, মমতাজ আহমেদ। সময়ের প্রয়োজনে জনগণমানষে যে আঘাতের প্রয়োজনে স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টি পথনাটক ‘চার্জশিট’। সেইসময় জ্বলন্ত ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে লিখলেন নির্বাচনী পথনাটক ‘ভোটের ভেট’। বন্দী মুক্তি আন্দোলনের প্রয়োজনে লেখা হলো ‘চার্জশিট’। সেই সময়ের স্মৃতি আজও আমাদের রোমাঞ্চিত করে। উৎপলকে যখন গণনাট্য সংঘ থেকে বিতাড়ন করলো, সেসময় সমস্ত প্রতিরোধ উপেক্ষা করে তাকে তার পরিচালিত নাটকে অভিনয় করানোর দুঃসাহস দেখিয়েছিল। এমনই ছিল সহমর্মিতা। ভেবে ভালো লাগছে যে, দেরিতে হলেও পানু পালের জীবনী প্রকাশ পাচ্ছে। আজকের নাট্যকর্মী ও আগামী প্রজন্মের সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে আমার দৃঢ় বিস”।
আজ পানু পালকে আমি সবার সামনে উপস্থাপন করবো, যাতে আমার পরবর্তী জেনারেশন যারা পথনাটক বা নাটক নিয়ে কাজ করবেন তারা পানু পালকে জানেন, চেনেন। পথনাটক ও পোাস্টার ড্রামার জনককে। ঠিক এই বিষয়টির ওপরে একটা লেখার উল্লেখ না করলেই নয়—’সিগাল ফাউন্ডেশন ফর আর্টস’ ম্যাগাজিনের উল্লেখ করে বলি—the inexhaustible work of Criticism in action:- Street theatre of the left – Sudha Deshpande, she wrote—in fact the very idea of Street theatre comes from IPTA. whether IPTA did any street theatre in the 1940’s. I do not know. the accounts I have heard imprecise. but it was certainly done in the 1950’s. Utpal Dutt who spent very brief time in IPTA members, in the IPTA we introduced the street corner play during 1952 election and before that, in 1951 during the Bundi Mukti Andolan (Movement for the released of political Prisoners) we organised Street corner plays – that was the first time (1984:25). The play, Rustom Bharucha inform us (1983: 57) was “charge sheet “and the idea came from Panu Pal apparently one day Panu Pal interrupted an IPTA rehearsal and urged those present to do a quick short improvised play on the imprisonment by the robust rough theatrically of the Pathan natika (street plays) its immediacy and political sharpness.
চার্জশিট লিখেছিলেন উমানাথ ভট্টাচার্য্য, তাতে অভিনয় করেছিলেন পানু পাল, ঋত্বিক ঘটক, উৎপল দত্ত। এই লেখাটা উদ্ধৃতি হিসেবে দাখিল করলাম পানু পাল যখন কোন নাটক লিখতেন বা কোন নৃত্যনাট্য উপস্থাপনা করতেন তখন তিনি বর্তমান ব্যক্তিদের সাথে পলিটিকাল ভিউজটা খুব জোরালোভাবে থাকতো। সেই সময় কি ঘটছে কি হচ্ছে কি বলছে সমাজ কি বলছে, সেটাই সে বারবার তার লেখায় তুলে নিয়ে আসতেন। মহৎ ব্যক্তিরা যারা থিয়েটার নিয়ে কাজ করেছেন, করছেন, যারা থিয়েটার বা নাটক লেখেন তারা জানেন যে রিহার্সাল চলাকালীন ডায়লগ সাথেসাথে পাল্টে দেওয়া যায়। কিভাবে স্থান অনুযায়ী সেই সময় অনুযায়ী এখুনি একটা খবর পেলে, পানু পাল সঙ্গে সঙ্গে তাকে সেই নাটকের মধ্যে দিয়ে সমাজের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতেন। (ক্রমশঃ…)
এসকাইলাস: থিয়েটার ও রাজনীতির সম্মিলন - কুন্তল মুখোপাধ্যায়
এসকাইলাস: থিয়েটার ও রাজনীতির সম্মিলন
কুন্তল মুখোপাধ্যায়
থিয়েটার ও নাট্যকর্ম যাই হোক না কেন, কখনই সমাজপ্রেক্ষিত ভিন্ন তার আলোচনা চলে না। এসকাইলাসের নাট্যরচনায় তাই সমাজ ও তাঁর সমসাময়িক রাষ্ট্রীয় জীবন কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, এই নিবন্ধে এই হল আমাদের আলোচ্য বিষয়।
৫২৫ খ্রিস্টপূর্বে ক্যামবাইসিস ইজিপ্ট আক্রমণ করেন, সেই বছরেই ইউফোরিয়নের পুত্র গ্রিক ট্রাজেডির জন্মদাতা এসকাইলাসও জন্মগ্রহণ করেন।
আপাতদৃষ্টিতে এশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী বিস্তৃতির এই সামান্য ঘটনা এবং ট্রাজেডির জন্মদাতার আবির্ভাব হয়তো অনেকের কাছে কোনও যোগসূত্রের পরিচয় বহন করে না। কিন্তু সংস্কৃতির পথ বৃত্তাকারে ঘোরে। নির্দিষ্ট কারণেই পৃথিবীর প্রথম ট্র্যাজেডির রচয়িতার জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তাই রাজনৈতিক ঘটনার ঘূর্ণাবর্তের এক অচ্ছেদ্য সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বাস্তবিক পক্ষে, রাজনৈতিক ঘটনা ও সম্পর্কের যে মিথষ্ক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়েছে এসকাইলাসের জীবন ও নাট্যকর্মে, তা খুব কম নাট্যকারের জীবনেই ঘটেছে।
৫১২ খ্রিস্টপূর্বে দারিয়ুস যখন বলকান আক্রমণ করেন তখন থেকে পূর্ণ যৌবনপ্রাপ্তি অবধি এসকাইলাস বড় হয়ে উঠেছেন পারস্য আর গ্রিসের মধ্যে সম্পর্কের এক অনন্য উত্তেজনার মধ্য দিয়ে। আয়োনিয়ান উপনিবেশগুলি যখন এশীয় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তখন এসকাইলাসের বয়স ২৬ এবং তখন তিনি এই ঘটনার গুরুত্ব সবিশেষ উপলব্ধি করতে শিখেছেন। এর চারবছর পরে এশিয়া মাইনরে অবস্থিত গ্রিকদের পরাজয় এবং ইউরোপীয় গ্রিসে এশীয় আক্রমণ ও অব্যবহিত পরে এথেন্সের ওপর আক্রমণের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন এসকাইলাস। সুতরাং এটা বলা বোধহয় অত্যুক্তি হবে না যে, পৃথিবীর অন্যতম মহান ট্রাজেডির স্রষ্টা এক আগ্নেয়গিরির শীর্ষে উপবেশন করে প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রাপ্তমনস্ক হয়েছেন।
৪৯০ খ্রিস্টপূর্বে এসকাইলাস তাঁর প্রথম নাটক ‘দা সাপ্লিয়ান্টস’ প্রযোজনা করেন। বিশাল পারস্য সেনাবাহিনির বিরুদ্ধে ম্যারাথনের প্রাঙ্গনে সাহসী এথেনিয়ান সৈনিকদের মরণপণ সংগ্রাম তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল এই নাট্যরচনায়। এরও দশ বছর বাদে পারস্যবাহিনি যখন জেরেক্সাসের নেতৃত্বে থার্মোপলির মধ্য দিয়ে গ্রিস আক্রমণ করল, তখন গ্রিক সৈন্যবাহিনি বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেও নিছক সংখ্যার অনুপাতে শক্তিহীন হওয়ায় পরাজিত হয়। এরপরেই এথেন্সের লোকেরা বাধ্য হয়ে শহর ছেড়ে সমুদ্রে নৌকায় আশ্রয় নেয়। এই সময় সুমহান গ্রিক হেলেনীয় সভ্যতা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে পারস্য তথা প্রাচ্যের উপনিবেশে পরিণত হতে পারে, এই মানসিক যন্ত্রণার প্রত্যক্ষ ফলভোগী ছিলেন এসকাইলাস। কিন্তু স্যালামিসের যুদ্ধে থেমিস্তোক্লিসের নেতৃত্বে গ্রিকবাহিনী জেরেক্সাস নেতৃত্বাধীন পারস্যবাহিনিকে পরাজিত করল। ৪৫ বছর বয়স্ক এসকাইলাস তাঁর এথেনীয় সঙ্গীসাথীদের নিয়ে ফিরে এলেন- মন দিলেন এথেন্সের পুনর্গঠনে। এই প্রেক্ষাপটে রচিত ও প্রযোজিত হল এসকাইলাসের ভিন্ন ভিন্ন নাটক। এসকাইলাসের নাটক ও ট্রাজিক জগতের মূল বিষয়রূপে তাই স্থান পেল যুদ্ধ ও নীতিনিয়ম। এসকাইলাসের দৃষ্টিতে শহর হল প্রকৃতিগতভাবে দ্বন্দুমূলক। এই শহরের সৃষ্টি প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধের খাতিরে রক্ষা পায়- আবার তা সামরিক শক্তির ব্যবহারে ধ্বংস হয়। এথেন্সের পুনর্গঠনের সঙ্গে সঙ্গে এসকাইলাসের ট্রাজিক নাটকে এই শহর হয়ে উঠল মানবিক নীতিনিয়মের প্রতিষ্ঠার মাপকাঠি।
এশিয়ার দিগ্বিজয়ী সাম্রাজ্যের প্রচণ্ড আক্রমণকে বারবার ব্যাহত যারা করেছিল, সেই গ্রিকদের মধ্যে অনৈক্যের অভাব ছিল না। নিজেদের স্বতন্ত্র শক্তি নিয়ে পারস্যশক্তির সম্মুখীন হওয়া অসম্ভব জেনেও তারা যে সর্বদা একজোট হয়ে কাজ করতে পেরেছে, এমন কথাও সঠিক নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিছক আত্মরক্ষার দাবিতে এবং প্রধানত এথেন্সের আগ্রহে বিদেশি আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য বহুল পরিমাণে পরস্পরের প্রতি দ্বেষ ও সন্দেহ বর্জন করে তারা একত্র হয়েছিল। তাদের চোখে পারসিকরা ছিল ‘Barbarian’। পারস্যের অভূতপূর্ব যুদ্ধ গ্রিকদের কর্ম ও চিন্তায়, সাহিত্য-সংস্কৃতি-নাট্যকর্মে-ভাস্কর্যে এক বিপ্লব এনে দিল। এসকাইলাসের নাট্যকর্মই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
এই যে যুদ্ধ- এবং বিশাল এক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত এক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী- এই মানবিক সম্পর্কের জটিলতাকে সার্থক রূপ দিতেই বোধহয় এসকাইলাস রচনা করলেন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক ‘প্রমিথিউস বাউন্ড’। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের বিরুদ্ধে সেখানে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের কষ্ট বাত্ময় হয়ে উঠল প্রমিথিউসের গলায়। ঈশ্বর-বিরোধী সাধারণ মানুষের বান্ধব প্রমিথিউস। যদিও শেষ পর্যন্ত এসকাইলাস এই নাটকে প্রমিথিউস ও জিউসের সম্পর্কের মিলনান্তক পরিণতি দেখিয়েছেন। তবু ব্লেক যেমন মিলটন সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন যে নিজের অজান্তেও তিনি লুসিফারের সপক্ষে কলম ধরেছেন, তেমনই এসকাইলাসও তাঁর নাটকে নির্যাতিত মানবাত্মার সপক্ষে কলম ধরেছেন। প্রমিথিউস প্রথম মানবতাবাদী, থিয়েটারের ইতিহাসে প্রথম বিপ্লবী-এসকাইলাসের অমর সৃষ্টি শুধু নয়, বরং বলা যায়, প্রমিথিউসকে দিয়েই আমাদের থিয়েটারে উদারনীতির যুগের সূচনা ঘটল। সর্বশক্তিমান জিউসের বিরোধিতা করে প্রমিথিউস মানুষকে করে তুলেছিল ভয়ভীতিহীন। মৃত্যুর বিভীষিকাকে মানুষ যাতে নিজ হৃদয়ের শক্তি দিয়ে, আত্মশক্তিতে আত্মস্থ হয়ে জয় করতে পারে সেইজন্য প্রমিথিউস মানুষকে স্বর্গ থেকে চুরি করে এনে দিয়েছিল পাবকশক্তি যার মধ্য দিয়ে মানুষ পেয়েছিল ভয়কে জয় করে নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবনে সক্ষম হয়ে পৃথিবীকে এক নবযুগের দিকে সচল করতে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে এসকাইলাসের এই প্রচেষ্টা, নিয়তি তথা প্রকৃতি তথা সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের উত্থান, নিঃসন্দেহে এক নতুন যুগের সূচনাকাল। আবার নাটকীয়তার দিক থেকেও নাটকটি একটি মহৎ বিয়োগান্ত নাটক। নাটকের পরিণতিতে যখন প্রমিথিউসের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়- ‘হায়! এই আমি যে এযাবৎকাল সমস্ত জীবিত মানুষকে শিখিয়ে গেলাম বেঁচে থাকার কৌশল- সেই আমি নিজেকে নিয়তির বিধান থেকে রক্ষা করতে অপারগ’- তখন প্রমিথিউসের জন্য সমস্ত পৃথিবীর মানুষের প্রাণে বেজে ওঠে এক ব্যাকুল আকুতি, শোকে স্তব্ধ মানুষের অন্তরে বয়ে যায় করুণ সুরের মূর্ছনা।
‘পার্সিয়ান’ নাটকে আবার এসকাইলাস পারস্যের পরাজয়কে যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে, নিয়তিনির্দিষ্ট বিধান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। নাটকের শুরু হয় কোরাসের কণ্ঠে- পারস্যের যুদ্ধে ব্যর্থতার হতাশা দিয়ে।
কোরাসের ভূমিকায় দেখা যায় রাজসভার জ্ঞানী বয়োবৃদ্ধদের। তাঁরা রানিকে জেরেক্সাসের সন্ধানে ব্রতী হতে বলেন। রানি সন্ধানে উৎসুক হলে দূত এসে জানায় যে পারস্যবাহিনি গ্রিকদের কাছে স্যালামিসের নৌযুদ্ধে পরাজিত হয়েছে। তখন রানি তাঁর মৃত স্বামী দারিয়ুসকে আহ্বান করেন। মৃত দারিয়ুসের আত্মা জানায় যে এক পূর্বশর্তাধীন নিয়তিনির্দিষ্ট দুর্ভাগ্যই এই পরাজয়ের কারণ। কিন্তু জেরেক্সাসের জেদ ও একগুঁয়েমি এই পরাজয়কে আরও ত্বরান্বিত করে। ইতিমধ্যে হতভাগ্য জেরেক্সাস একা ফিরে আসে। দারিয়ুস বয়োজ্যেষ্ঠ কোরাসদের বলে সচেষ্ট থাকতে, যাতে এই নিয়তিনির্দিষ্ট দুর্ভাগ্যকে এড়িয়ে চলা যায়। এই নাটকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হল- এসকাইলাস নাটকটিকে গ্রিক বিজয়ের পালা করে তোলেননি, বরং পারসিকবাহিনির দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষাপটে বিয়োগান্তক করুণরসের উপস্থাপনা করেছেন। স্বৈরশাসনের গ্লানি, একক আধিপত্যের সাফল্য যে চিরস্থায়ী নয় তা এই নাটকের মধ্যে পরিস্ফুট হয়ে উঠল। গ্রিকদের মতো রাষ্ট্রশক্তি হিসেবে অকিঞ্চিৎকর এক জাতির হাতে পারস্য সাম্রাজ্যের পরাজয়, যে ঐক্যবন্ধ প্রতিরোধের সূচনা তা ইতিহাস আমাদের জানায়। জেরেক্সাসের অদম্য লোভ, ভাড়াটিয়া সৈন্যদের নিয়ে লড়াই পরাভূত হয়েছিল গ্রিকদের বুকের রক্ত দিয়ে নিজের দেশকে বাঁচাবার অমিত প্রেরণার কাছে। হেরোদিতাসের ইতিহাসে জেরেক্সাসের এক বক্তৃতার উল্লেখ আছে যেখানে ঈশ্বরের অনুগ্রহে বিশ্বাসী এই সম্রাট গ্রিস জয়ের স্বপ্নকে বিধির বিধান বলে চিহ্নিত করতে চাইছেন। শেষ অবধি অবশ্য তাঁর এই ইচ্ছা সার্থক হয়নি। ‘পার্সিয়ান’ নাটকেও তাই এসকাইলাস দেখিয়েছেন ইতিহাস কোনও কাল্পনিক বিধানে চলে না, চলে বাস্তব পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। কিন্তু তিনি এই বাস্তবতাকে দেখিয়েছেন রূপকের মাধ্যমে নিয়তিনির্দিষ্ট বিয়োগান্তক পরিণতির কাঠামোকে সামনে রেখে।
‘অরেস্ত্রিয়া’ নাটকের মূলকথা হিংসা দিয়ে হিংসাকে জয় করার চেষ্টা এবং অন্ধ অহংবোধ ও যে কোনও কাজেই মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি শেষ অবধি শুভফলদায়ক হয় না। রাজা অ্যাগামেমনন ক্লাইতেমনেন্ত্রাকে বিবাহ করেন। তাঁদের
দুই কন্যা ইফিজেনিয়া ও ইলেকত্রা এবং একটি পুত্র অরাস্তাস জন্মগ্রহণ করে। ট্রয় অভিযানের প্রাক্কালে আগামেমনন তাঁর কন্যা ইফিজেনিয়াকে উৎসর্গ করেন। আগামেমননের অনুপস্থিতিতে তাঁর রানি আজিস্থাউসের সঙ্গে পলায়ন করেন ও আগামেমননকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন, যা শেষ অবধি সফল হয়। আজিস্থাউস ছিলেন কাপুরুষ, কিন্তু রানি তাঁর চরিত্রের টানাপোড়েনে এক অভূতপূর্বরূপ ধারণ করেন। সন্তানের হত্যায় বিচলিত না হয়ে প্রয়োজনবোধে স্বামীর হত্যায় অংশগ্রহণ- এই যে নিয়তিনির্দিষ্ট ঘটনা-এটাই প্রতিভাত হয়েছে অরেস্ত্রিয়া নাটকের কাহিনিতে। মানুষকে উৎসর্গ করা, বিশেষ করে কোনও কাজের প্রারম্ভে, প্রাপ্তির আশায় মানুষ-উৎসর্গ, রাজতন্ত্রের প্রাথমিক পর্বের এবং ধর্মীয় যাজকতন্ত্রের চূড়ান্ত ক্ষমতার সময়কে নির্দেশ করে। আবার অ্যাপোলো কর্তৃক পবিত্রকরণ ভূমিভিত্তিক অভিজাততন্ত্রকে স্বীকৃতি দেয়। নাটকীয় গুণপনা এবং মানবিক সম্পর্কের দিক বাদ দিলেও ‘অরেস্ত্রিয়া’ নাটকে সামাজিক ইতিহাসকে স্তরবিন্যস্ত করা হয়েছে আদিম উপজাতি, প্রারম্ভিক রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র এবং গণতন্ত্রের সমন্বয়ে। এসকাইলাসের নাটকে নাটকীয়তা ব্যতীত সময় ও সমাজের এই যে তথ্যচিত্রণ তা তাঁর নাটক ও থিয়েটারকে সঙ্গতভাবেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করেছে।
‘প্রমিথিউস’, ‘পার্সিয়ান’ এবং ‘অরেস্ত্রিয়া’- এইসব নাটকের মধ্যেই এসকাইলাসের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছিল। এই নাটকগুলিতেই তিনি স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের এবং যে কোনও ধরনের কর্তৃত্বপদের বিরোধিতা করেছেন। রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ক্ষমতা যে জনগণের হাতে, তা স্বীকার করেই তিনি জনগণকে ‘গভর্নর অব দা সিটি’ (সাপ্লিয়ান্সস) নামে আখ্যাত করেছেন। হেরনের সঙ্গে সম্পর্কসূত্র ধরে তাঁকে যেভাবে গণতন্ত্র-বিরোধীরূপে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেটা বোধহয় সত্য চিত্র নয়। বিভিন্ন সময়ে তিনি যেভাবে উদার, ক্ষমাশীল এবং রাজ্যশাসনে জনগণের অংশগ্রহণের ঘটনাকে তাঁর নাট্যরচনায় চিত্রিত ও সমর্থন করেছেন- তাতে মনে হয় না তিনি গণতন্ত্রী শাসনের বিরোধী ছিলেন। অবশ্য এ-ও ঠিক যে তিনি গণতন্ত্রের একনিষ্ঠ পূজারি ছিলেন না। গণতন্ত্রের পক্ষে তিনি ততক্ষণই মত প্রকাশ করেছিলেন যতক্ষণ তা অভিজাততন্ত্রকে অস্বীকার করতে চায়নি। স্বাধীনতার বান্ধব এসকাইলাস কখনই জনগণের হাতে নিরঙ্কুশ অবাধ এবং চরম ক্ষমতা সমর্পণ করতে
চাননি। যে গণতন্ত্রকে তিনি সমর্থন করেছিলেন তা একটু সংরক্ষণধর্মী, যেখানে জনগণ চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী হলেও মূল প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালিত হত মনোনীত একটি পরিষদ দ্বারা এবং যা কখনই জনতার দাবির কাছে মাথা নত করত না।
স্বৈরতন্ত্র ও অলিগার্কির বিপদ সম্পর্কে সজাগ থাকা, আবার সেই সঙ্গে জনপ্রিয় নিয়ন্ত্রণের নৈরাজ্য থেকেও দূরে সরে থাকা- এই এক অদ্ভুত মিশ্র শাসনব্যবস্থার মধ্যেই তিনি নিরাপত্তা ও সার্থকতা খুঁজে পেয়েছিলেন (ইউমেনদিস)। রাজনৈতিক দিক থেকে এসকাইলাস ছিলেন নরমপন্থী। তিনি বিবদমান উভয় রাজনৈতিক পক্ষের গঠনমূলক সৃজনধর্মী কাজকর্মকে পক্ষপাতহীনভাবে সমর্থন করতেন। ‘ইউমেনদিস’ নাটকে তাঁর এই নিরপেক্ষতা খুব স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে।
খ্রিস্টপূর্ব ৪৫৬ সালে এসকাইলাস মারা যান। ইতিমধ্যে অবশ্য এথেনিয়ান সমাজের কাঠামো বদলে যেতে শুরু করেছে। দাসশ্রমিকদের সংখ্যাবৃদ্ধি এবং পারস্য-বিরোধী গ্রিক কনফেডারেশনের পরিবর্তন এথেনিয়ান সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটিয়েছে। এই শতাব্দীর মধ্য সময়ে এথেন্স শুরু করেছে সাম্রাজ্যবাদী বিজয় অভিযান। শ্রেণীবৈরিতা বা উত্তেজনা, দাসদের সংখ্যাবৃদ্ধি ও সাম্রাজ্যের বিস্তৃতিতে চরম পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সংকট তখন গণতন্ত্রের নেতিকরণের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিপ্লবের এই নঞর্থক দিক সম্পর্কে এসকাইলাস তেমন বিশেষ সচেতন ছিলেন না। তিনি সচেতন ছিলেন এর সদর্থক সম্পর্কে যা তাঁর নাট্যশিল্পকর্মকে অবিরাম উৎসাহ জুগিয়েছে। এসকাইলাসের কাছে সংগ্রামের শেষে জয় হয়েছে করায়ত্ত- তাই বিরোধীদের সঙ্গে করা হয়েছে সমন্বয়।
দ্বন্দুবাদের নিয়ম অনুযায়ী এ যেন বাদ (Thesis) থেকে প্রতিবাদে (Anti-Thesis) গমন, যা শেষ অবধি সম্বাদে (Synthesis) পরিণত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। আর এই কারণেই এসকাইলাস ২৫০০ বছর আগের নাট্যকর্মী হলেও আজও তাঁর প্রাসঙ্গিকতার উপযুক্ততা বর্তমান রয়েছে।
ছোটদের ছবি: সরল না গরল? - অরিত্র দে

ছোটদের ছবি: সরল না গরল?
অরিত্র দে
শিশুমন বৃন্দাবন। নিশ্চিন্দিপুর থেকে চাঁদের পাহাড়। কল্পনার রাসলীলা চলছে চলবে। কিন্তু ভিনগ্রহীরা? তারাও কি ‘শিশু ভোলানাথ’? নাকি ‘আঠারো বছর বয়স’? ছাঁচে ফেলা ভিনগ্রহী কে দেখেছে? যে মুখচোরা? তোতলা? বিকলাঙ্গ? বাঁচা মরা? এদের মধ্যে কেউ? লোকাল ট্রেনে ধুঁকতে ধুঁকতে ঝাললজেন্স বেচা যে নিপাট ভালোমানুষ লজ্জা পাওয়া লজ্জাবতী আবার ছুঁয়ে দেখতে ভুলে গেছে সে দেখেছে? নাকি কর্পোরেট ল্যাডারে হাঁফাতে হাঁফাতে উঠতে গিয়ে বসের বাসিমুখের খিস্তিখেউড়ে মানিয়ে নেওয়া ধোপদুরস্ত ‘অমলকান্তি’? উত্তর মেলে। পঞ্চা ঘোষের বাঁশবাগানে।
ডেস্টিনেশন প্লুটো, ডেস্টিনি আর্থ। সৌজন্যে যান্ত্রিক গোলযোগ। ক্রেনিয়াস গ্রহের জিনিয়াস ফেল! মহাকাশযান মহা ফাঁপরে! ফাঁপরে চার ফুটের অ্যাং। ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’। সত্যজিৎ রায়ের দ্বিতীয় বাংলা গল্প। প্রথম বেরোয় ‘সন্দেশ’ পত্রিকায়। ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি সংখ্যায়। অ্যাং-এর ইলাস্ট্রেশনটিও সত্যজিতের করা। গ্রাফাইটের আঁচড়ে ভিনগ্রহী শরীর। ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’-কে আরও রক্তমাংস দেয় ‘এলিয়েন’ চিত্রনাট্য। সত্যজিতের প্রথম কল্পবিজ্ঞান চিত্রনাট্য। তবে কাহিনিতে মিল নেই বললেই চলে।
২৪/৪/৬৭। সত্যজিতের খেরোর খাতার এককোনে লেখা তারিখটা। ‘এলিয়েন’-এর চিত্রনাট্য শেষ করার তারিখ। গল্প থেকে চিত্রনাট্য নয়। শুধুই চিত্রনাট্য। টাকার কাঙাল গগনলাল বাজোরিয়া। স্বার্থপর। ধনী। মাড়োয়ারি। এসেছেন গ্রামবাংলায়। জলাধার খুঁড়বেন বলে। সঙ্গী জো ডোভালিন। মার্কিন ইঞ্জিনিয়ার। উপস্থিত মোহন। বিজ্ঞানমনস্ক সাংবাদিক। উদ্দেশ্য গ্রামজীবন চেখে একটি প্রতিবেদন লেখা। সেই গ্রামেরই পদ্মপুকুর। ভিনগ্রহী মহাকাশযান সেখানেই নামে। উদ্দেশ্য পৃথিবী থেকে স্যাম্পেল নিয়ে গিয়ে এক্সপেরিমেন্ট। তার জন্য দরকার মিডিয়াম। সংযোগ। বন্ধুত্ব। অগত্যা হাবা। শিশু। অনাথ। গরীব। অভুক্ত। শিকার। সমাজের। রাজনীতির। অর্থনীতির। তবু ভিনগ্রহীর সাথে খেলা চলে মনে মনে। মহাকাশযান দর্শনের ফল বাজোরিয়ার একরকম। ডোভালিনের একরকম। মোহনের একরকম। গ্রামবাসীদের একরকম। ‘এলিয়েন’-এর স্কেচ ‘হাবা’ না হলেও মনে ধরবে।
স্কেচের ‘এলিয়েন’ খর্বকায়। খেতে-পায়-না উদ্বাস্তু বালক। হেঁড়ে মাথা। চোয়াল-ঢোকা গাল। এতটুকু মুখ। আরও ছোট নাক, কান। হাড় বের করা হাত-পা। ছেলে না মেয়ে বোঝার উপায় নেই। শুধু আছে শরীর জুড়ে দ্যুতি। অপার্থিব। অতিলৌকিক। অতিকায়। চোখে নানা রঙের খেলা। চোখের রঙেই মন পড়া যায়। দূরবীন হলে চোখ সবুজ, অনুবীন হলে চোখ নীল। এটা-ওটা ছুঁয়ে বুঝতে চোখ হতো হলুদ। আবার এনার্জি তৈরী আর প্রাণীকুলের মাথা পড়ে ফেলতে চোখ হতো বেগুনী। নীরব, নিৰ্জীবকে প্রাণ দিতে চোখ হতো লাল। রংবদলের এই খেলার কারণ সত্যজিতের চিত্রনাট্যে বাস্তব। ম্যারী সিটন সত্যজিতের বায়োগ্রাফি লেখার সময় এলিয়েনের ডিটেলড স্কেচ দেখে চোখ সার্থক করেছেন। এই চরিত্রায়ন এই প্রথম। এলিয়েন দেখতে দুর্বল। হাতে কোনো অস্ত্র নেই। কিন্তু সাংঘাতিক মনের শক্তি। কেউ তার দিকে তাকালেই বা ছুঁয়ে দিলেই চোখের রং বদলে যেত। মরা মানুষও বেঁচে উঠতো এলিয়েনের মনের ম্যাজিকে। সবুজ ধানক্ষেতে পাকা সোনালী ধান। মুকুলধরা আমগাছে পাকা আম। এই কল্পলোক এসেছিল ‘পরশপাথর’ ছবিতে। কিছুটা। চিত্রনাট্যের শেষে আছে এলিয়েন চলে যাচ্ছে। আর্থের স্যাম্পেল হিসেবে যাবে বলে সাপ-ব্যাঙ, প্রজাপতি, পদ্মফুল, পাখিরা একদম রেডি। আর যাচ্ছে একটা ফোকসং। পল্লীগীতি। হাবার কাছে শেখা পল্লীগীতি। ফুল, নদী আর মাঠের গান। হাবা আর এলিয়েনের কানেকশন। নো ডেঞ্জার। নো ভায়োলেন্স। নো হলিউড। আণবিক নয়। পারমাণবিক নয়। মানবিক।
১৯৬৬ সাল। আর্থার সি ক্লার্ক ততদিনে ওয়ার্ল্ড ফেমাস সায়েন্স ফিকশন রাইটার। সত্যজিতের সঙ্গে রয়েছে চিঠি চালাচালি। সেই সুবাদেই আলাপ হয় শ্রীলঙ্কার ফিল্ম প্রোডিউসার মাইক উইলসনের সঙ্গে। কথা হয়। পাকা কথাও হয়। ঠিক হয় ১৯৬৭ সালে ‘এলিয়েন’ প্রডিউস করবে উইলসন। পিটার সেলার্স হবে মাড়োয়ারি বাজোরিয়া। প্রথম পছন্দের ডোভালিন ছিল মার্লন ব্র্যান্ডো। কিন্তু মেলেনি ডেট। অগত্যা স্টিভ ম্যাকুইন। তাকেও না পাওয়া গেলে পল নিউম্যান। স্পেশাল এফেক্টসের জন্যে সল বাস। ক্যামেরাম্যান। কারিগর। ছবির ইংলিশ নাম হবে ‘এলিয়েন’। বাংলা নাম ‘অবতার’। সব ঠিক। কিন্তু সব ঠিক হয়েও হইল না ঠিক। জানা গেল উইলসন ‘এলিয়েন’ প্রডিউস করবে কলম্বিয়া পিকচার্সের ব্যানারে। সেই উইলসন কলম্বিয়াকে অনেকগুলো স্ক্রিপ্ট জমা দেয়, পায় ১০০০০ আমেরিকান ডলার। সত্যিজিতের হাতে রইল পেন্সিল। অতঃপর কলম্বিয়া সত্যজিৎকে জানায়, উইলসন আউট, কলম্বিয়া ইন। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসেই শুটিং শুরু। লোকেশন বোলপুরের গ্রাম। রেকি করতে গেল সত্যজিৎ, সুব্রত মিত্র, বংশী চন্দ্রগুপ্ত। উঠলো কিছু ফুটেজ। কিন্তু গোঁয়ার উইলসন। ক্যালাস কলম্বিয়া। চিত্রনাট্য জমা পড়লেও চলচ্চিত্র হলো না।
১৯৭৭ -৭৮ সাল। তৈরি হয় ‘ক্লোজ এনকাউন্টার অফ দ্য থার্ড কাইন্ড’। স্পিলবার্গের প্রথম হিট সাই-ফাই। তিন-চার বছর পর আরেকটা ভার্সন রিলিজ করে। তারও আগে রিলিজ করে একটা ইন্টারভিউ। ম্যারী সিটনের ইন্টারভিউ। ১৯৮১ সালে। ম্যারী বললেন, “আমি যখন স্পিলবার্গের ‘ক্লোজ এনকাউন্টার অফ দ্য থার্ড কাইন্ড’ দেখি, আমার দেখা মাত্রই সন্দেহ হয় পরিচালক নিশ্চয়ই সত্যজিতের ‘এলিয়েন’ ছবির চিত্রনাট্যটি, যেটি কলম্বিয়া অফিসে জমা দেওয়া হয়েছিল, সেটি দেখেছেন, নয়ত শুনেছেন। স্পিলবার্গ সত্যজিতের চিত্রনাট্যটি থেকে দুটি বিষয় চমৎকারভাবে তুলে নিয়ে ব্যবহার করেছেন। একটি হচ্ছে অজানা গ্রহবাসীর আকৃতি এবং তাকে দেখে সরল শিশুটির ভয় না পাওয়া।” ‘ক্লোজ এনকাউন্টার’-এর নিউ ভার্সনের এই সিন্ ওল্ড ভার্সনে নেই। কলকাতায় ওল্ড ভার্সন রিলিজ করে জ্যোতি সিনেমাহলে। নিউ ভার্সন রিলিজ করে মিনার্ভা-তে। ১৯৮২ সালে। নিউ ভার্সন সত্যজিতের অজানা ছিল। অজানা ছিল নিজের ‘এলিয়েন’ স্ক্রিপ্টের সাথে একাধিক মিল। যেমন ভিনগ্রহীরা পৃথিবী থেকে প্রজাপতি, পাখি, ফুলের স্যাম্পল নিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে সংগীতে সংগীতে। তা ছাড়া প্রথম ছবিতে অন্য গ্রহবাসীকে খুব একটা স্পষ্ট করে দেখাননি স্পিলবার্গ। সত্যজিতের অ্যাং-এর সঙ্গে স্পিলবার্গের ভিনগ্রহীর হুবহু মিল।
১৯৮১ সাল। শুরু হয় স্পিলবার্গের নতুন ছবি। ‘এ বয়েজ লাইফ’। পরে নাম বদলে হয় ‘এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল’। সংক্ষেপে ‘ই. টি.’। প্রথম দেখানো হয় ১৯৮২ সালে। ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। দেখেন সস্ত্রীক সত্যজিৎ রায়। চমকে ওঠেন। দুঃখ পান। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে স্বামীর হাত চেপে ধরেন বিজয়া রায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, ‘তোমার আর এলিয়েন করা হবে না’। সত্যজিৎ বলেছিলেন, ‘এলিয়েন’ চিত্রনাট্য থেকে অনেক সিন্, আইডিয়া এবং ইন্টেন্ট নিখুঁত ভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে। এটাকে চুরি বলা যাবে না, কারণ প্রমাণ করা মুশকিল। ই.টি.-র ‘হাবা’ এলিয়ট। শিশু এলিয়ট। ‘এলিয়েন’ আর ই.টি.-র আশ্চর্য ক্ষমতার আশ্চর্য মিল। মৃতপ্রায় জিরেনিয়াম ফুলের গাছটিকে ই.টি. বাঁচিয়ে তোলে। শিশুর কেটে যাওয়া আঙুল ই.টি. সারিয়ে তোলে তার আঙুলের আলো দিয়ে।
স্পিলবার্গের ‘ইন্ডিয়ানা জোনস’ শুট হয়েছিল শ্রীলঙ্কায়। সেখানেই স্পিলবার্গের সঙ্গে দেখা হয়েছিল আর্থার সি ক্লার্ক-এর। ‘এলিয়েন’ চিত্রনাট্য তাঁর পড়া ছিল। কথা ছিল ‘এলিয়েন’ রিলিজ করলে আর্থার ক্লার্ক একটি উপন্যাস লিখবেন। বইটি প্রকাশ করবে একটি বিদেশি প্রকাশক। এবং কাহিনিকার হিসেবে দুজনেরই নাম থাকবে। স্পিলবার্গকে ‘এলিয়েন’-এর সঙ্গে ‘ক্লোজ এনকাউন্টার’ এবং ‘ই.টি.’- এর আশ্চর্য মিলের কথা বলতেই স্পিলবার্গের উত্তর, ‘আমি কি করে সত্যজিতের চিত্রনাট্যের কথা জানব বা হাতে পাব? ১৯৬৭/৬৮ সালে আমি তো স্কুলের ছাত্র।’ সত্যজিৎ চুপ। চুপ থাকতেই চেয়েছেন। আন্তর্জাতিক আদালতের ব্যাপার। সহজে মীমাংসা হবার নয়। ল এন্ড অর্ডার ফলো করার আর্জিও আসে। ১৯৮৩ সাল। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম স্টুডেন্ট অসীম ছাবরারের হাতে আসে ‘এলিয়েনের’ চিত্রনাট্যের একটা ভিডিওগ্রাফ। সত্যজিৎ কলম্বিয়াকে যে ভিডিওগ্রাফ পাঠিয়েছিলেন, ইটা তারই কপি। সৌজন্যে এক বন্ধু। অসীমের সাথে কথা হয় আর্থার সি ক্লার্ক-এর। কথা হয় সত্যজিতের। অসীম মার্কিন সংবাদপত্রে একটি প্রবন্ধ লেখেন। গোটা বিশ্বে হইচই পড়ে যায়। সত্যজিৎ অনেক ফোন ও চিঠি পান। সত্যজিতের বক্তব্য: ‘এইসব ব্যাপারে আইনের আশ্রয় নিতে আমার একদমই ভালো লাগে না।’
সত্যজিতের শিশুমন অনায়াসে ক্রেনিয়াসে পৌঁছে যায়। ইঁদুরদৌড়ের ইতরপনা তাঁর পোষায় না। তিনি শরীরে সাবালক, মনে মনে ‘হাবা’ লোক। তাই তাঁর দোরে ‘এলিয়েন’ আসে। আর আমাদের দোরে কীকরে বিলিয়ন আসবে তাই ভেবে আমরা এলিয়েনেটেড হয়ে যাই।
স্ববৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল বং গোয়েন্দা বাবু একেন - অজন্তা সিনহা

স্ববৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল বং গোয়েন্দা বাবু একেন
অজন্তা সিনহা
ভালো নাম একেন্দ্র সেন। বেশ কিছুটা ব্যতিক্রমী, মজাদার এই বাঙালি গোয়েন্দা অবশ্য একেনবাবু নামেই অধিক পরিচিত। স্রষ্টা লেখক সুজন দাশগুপ্ত একেনবাবুকে কলমে এঁকেছেন নিপাট মধ্যবিত্ত বাঙালি রূপে, যাবতীয় রং বৈশিষ্ট্য নিয়ে। আমরা তাঁকে কিঞ্চিৎ মিতব্যয়ী বলে জানলেও এই মানুষটিকে তার দুই ঘনিষ্ঠ সহচর বাপি ও প্রমথ কিপ্টে বলেই অভিহিত করে থাকে। একেনবাবুর বেশবাস নিতান্ত মধ্যবিত্ত বাঙালি ভদ্রলোকের মতো, যা অনেক সময়ই অবিন্যস্ত থাকে। মাথায় টাক, কিছুটা গোলগাল একেনবাবুকে দেখতে খানিকটা হাস্যকর। যদিও আদতে তিনি যথেষ্ট তীক্ষ্ণবুদ্ধির মানুষ। উল্লেখ্য, অধিকাংশ গল্পের গোয়েন্দার মতো শারীরিক কসরতে তেমন বিশ্বাসী নন ইনি।
আমেরিকায় একটি খুনের তদন্তে গিয়ে কলকাতার এক কমন পরিচিতের সূত্রে বাপি ও প্রমথর সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতে শুরু করেন একেনবাবু। এরপর বাপি ও প্রমথকে সঙ্গে নিয়েই একেনবাবু সেই জটিল অপরাধের সুরাহা করে একেবারে তাক লাগিয়ে দেন সেখানকার পুলিশ কর্তাদের। তারপর অপরাধতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করতে আমেরিকাতেই থেকে যান একেনবাবু। এদিকে তার স্ত্রী (একেনবাবুর ভাষায় ফ্যমিলি) থাকে কলকাতায়। ফলে মাঝে মাঝেই দেশে আসতে হয় একেনবাবুকে। অর্থাৎ এখন গোয়েন্দা একেনের কর্ম ও ব্যাক্তিগত যাপন আবর্তিত নিউ ইয়র্ক-কলকাতা জুড়ে।
ইতিমধ্যে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে একেনবাবুর। ফলে স্বদেশ বা বিদেশ যেখানেই থাকুন তিনি, অপরাধের তত্ত্বতালাশ রীতিমতো তাড়া করে বেড়ায় একেনবাবুকে। সুজন সৃষ্ট সিরিজে আমরা দেখি রহস্যভেদী একেনবাবুর কাহিনিগুলি লিখছেন আমেরিকা প্রবাসী অধ্যাপক বাপিবাবু। দরকার মতো তাতে মশলা যোগ করছে প্রমথ। ওদের তিনজনের ভাবনার আদানপ্রদান, এদিক ওদিক খোঁজখবর, খুনসুটি থেকে সিরিয়াস অপরাধচর্চা–এই নিয়েই একেনবাবু সিরিজ। ওরা তিনজন ছাড়াও গল্পে আছেন একেনবাবুর স্ত্রী। এছাড়াও একেন-সিরিজের বিভিন্ন গল্পে উঠে এসেছে একাধিক চরিত্র।
বড় পর্দা, ওয়েব সিরিজ থেকে পডকাস্ট সর্বত্র চূড়ান্ত জনপ্রিয় একেন-কাহিনি। আমাদের আলোচ্য বিষয় ওয়েব সিরিজ। আর হইচই-এ প্রদর্শিত এই সিরিজের প্রাণপুরুষ নিঃসন্দেহে অনির্বাণ চক্রবর্তী। জটায়ু সন্তোষ দত্তের মতোই নিজেকে একেন চরিত্রের ছাঁচে ঢেলেছেন তিনি। এতটাই যে পর্দার বাইরেও অনেকেই তাঁকে একেনবাবু নামেই চেনেন। পর্দা ও থিয়েটারের এই শক্তিশালী অভিনেতা ওয়েব দুনিয়ায় ইতিমধ্যেই প্রদর্শিত সিরিজের সব কটি কাহিনিতে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন ও নিজেকে অপরিহার্য করে তুলেছেন।
ইতিমধ্যেই ৮টি সিজন স্ট্রিমিং হয়ে গেছে। মোট ৫০টি পর্ব দেখেছেন দর্শক। চিত্রনাট্যকার পদ্মনাভ দাশগুপ্ত নিপুণ দক্ষতায় সাজিয়েছেন দৃশ্যাবলী। বিভিন্ন গল্পের পরিচালনায় আছেন জয়দীপ মুখার্জি, সুরজিৎ চ্যাটার্জি, অনুপম হরি, অনির্বাণ মল্লিক, অভিজিৎ চৌধুরী। বাপি চরিত্রে প্রথমে ছিলেন সৌম্য ব্যানার্জি, সিজন ৬ থেকে বাপির ভূমিকায় অভিনয় করছেন সুহোত্র মুখোপাধ্যায়। প্রথমে দেবপ্রিয় বাগচী ছিলেন প্রমথর ভূমিকায়, সিজন ৬ থেকে এই চরিত্রে এসেছেন সোমক ঘোষ। এছাড়াও বিভিন্ন সিজনে আমরা পাই টলিউডের এক ঝাঁক চেনামুখের অভিনেতাকে। এতজনের ভিড়ে উজ্জ্বল বিভায় দাঁড়িয়ে এক ও অদ্বিতীয় অনির্বাণ চক্রবর্তী, যাঁকে ঘিরেই পল্লবিত যাবতীয় কর্মকাণ্ড।
এই প্রথম সমুদ্রশহর পুরীতে এসেছেন একেনবাবু। সঙ্গে
বাপি এবং প্রমথ। হঠাৎই রহস্যজনক ভাবে খুন হয়ে যায় একজন কত্থক নৃত্যশিল্পী। অতএব বাপি এবং প্রমথকে নিয়ে সেই রহস্য উদঘাটনে ময়দানে হাজির একেনবাবু। গত জানুয়ারিতে হইচই চ্যানেলে প্রিমিয়ার হয় একেন সিরিজের ৮ নম্বর (আপাতত সর্বশেষ) সিজন–শিরোনাম ‘পুরো পুরী একেন’। বলা বাহুল্য, আর পাঁচজন বঙ্গ সন্তানের মতোই পুরীতে ছুটি কাটাতে গিয়েছিল ওরা। তারপরই সেই নৃত্যশিল্পীর খুন হওয়া ও ঘটনায় একেনবাবুর জড়িয়ে পড়া। গল্প বলে দিলে মজা মাটি। এটুকুই বলার, অনুসন্ধানের প্রয়োজনে একেনবাবু এন্ড কোম্পানি হানা দেবেন শিল্পীর অতীত জীবনে। খুনের উৎস লুকিয়ে সেখানেই।
সিজন ৮ পরিচালনা করেছেন জয়দীপ মুখার্জি। চিত্রনাট্য প্রতিবারের মতোই লিখেছেন পদ্মনাভ দাশগুপ্ত। অভিনয়ে অনির্বাণ, সুহোত্র ও সোমক ছাড়াও আছেন রাজনন্দিনী পাল, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, দুর্বার শর্মা, রোজা পারমিতা দে, শঙ্কর দেবনাথ ও রাহুল অরুণোদয় বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ।
একেন সিরিজের সব কটি সিজনই রয়েছে হইচই চ্যানেলে, আর প্রত্যেকটিই টানটান রহস্যে ভরপুর। যাঁরা এখনও দেখে উঠতে পারেননি, আজই চোখ রাখুন হইচই এর পর্দায়। নির্মল আনন্দের বুদ্ধিদীপ্ত এই ক্রাইম থ্রিলার সিরিজ মন্দ লাগবে না গ্যারান্টি !!
গেছি বারবার - ময়ূরী মিত্র

গেছি বারবার
ময়ূরী মিত্র
কেউ কেউ বলেন “হ্যাঁ লা ছাগলিনী তোর গল্পে শুধু পথ আর পথ! আঙুলের ডগায় বাড়ি ঘরদোরের গপ্প আসে না কেন রে! পথে আবার কালো লোকের কথা, ময়লামাখা বউয়ের চটুল গান কিংবা শিকনি গড়ানো বাচ্চার কান্না! সাদা তোর চোখে পড়ে না?” তোদের এসব কথা শুনে ছাগলিনী হাসে খ্যা খ্যা! বলি পথ না লিখে করব কী! এতবড়ো ভুবনে পথও অগুনতি৷ সীমায় যাওয়ার পথ কিংবা সীমা ছাড়ার পথ! তারপর ধর…জলরাশি! দেখতে সর্বদেশে একরকম৷ কিন্তু সর্বদেশ তো আর এক পথে নয়! একরকমও নয়৷ জলের ফেনা টুকরো হয়ে কত যে পথ তৈরী করে দেয় রে মা! তবে না নাবিক নতুন দেশ খুঁজে পায়! বাকি রইল ফর্সা লোকের গল্প! ফর্সা যে বড়ো দেখা যায়! সব দেখে ফেললে দেখার ইচ্ছে মরে! দেখারও তো পথ থাকে! সে পথ আঁধার না হলে গল্পদীপ কোথা দিয়ে জ্বালব! কেনই বা জ্বালব!
১ . নির্মল মিত্র পথ
আজ আগরপাড়া অনুষ্ঠান শেষে টালা ব্রিজ দিয়ে ঢুকলাম নির্মল মিত্তির স্ট্রিটে৷ ব্রিজ যেখানে ঢালু হচ্ছে, সেখানেতে টালা পোস্ট অফিস৷ কত ছোটো থেকে পোস্টঅফিসের বাড়িটি দেখতাম৷ বাড়িটি একটু ফুটোফাটা ছিল বলেই যেন টানত বেশি৷ ছেলেকালে পোস্টঅফিসকে তো পোস্টমাস্টারের বাড়ি ভাবতাম৷ তখন থেকেই ব্রিজের ফুটপাথের ওপর দাঁড়াবার এক মস্ত নেশা! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডাকঘর দেখতাম আর মাকে বলতাম “ওই বাড়িটা এবার ভেঙে যদি পড়ে! পোস্টমাস্টারের ভাতের হাঁড়িতে ইঁটের সঙ্গে টিকটিকির ল্যাজ পড়বে! লোকটার খাওয়া হবে না! বাড়ি বাড়ি ঘুরে খবর দেওয়া হবে না ওর! খিদে পেটে ড্রইংখাতায় ছবি আঁকা আর চিঠিপত্র বিলি কোনোটাই হয় না যে মা!”
আজ অবশ্য পোস্টঅফিস দেখিনি৷ ব্রিজের আলোটা বড্ড বেশি ছিল যে! তবে নির্মল মিত্রে আগের মতোই রাস্তার ধারে লোক৷ পাশে দু-চারজন বউমানুষ, এ রাস্তায় বসতবাড়ি কম৷ ব্রিটিশ আমলের গোডাউন বেশি৷ সে সব গোডাউনে দেড়তলা সমান দরজা৷ কয়েকটায় বেশ কারুকাজ৷ একটা গোডাউনের প্রায় মধ্যেই তেলেভাজার দোকান বসে গেছে! রাত নটায় এক কড়া তেলে টগবগ করছে আলুর চপ৷ আমাদের গাড়ির চালক সাউজি খুব সরল৷ যেই বললাম “এত রাতে অন্ধকার রাস্তায় টাটকা তেলেভাজা কোন গেরস্ত খায়!” সঙ্গে সঙ্গে সাউজির টাটকা উত্তর “গেরস্ত খায় না৷ মালখোর আর তাদের “না-বউ” গুলো খায়৷ সারাদিন খাটে তো! ঠাণ্ডা বাসি ওরাই বা খেতে যাবে কেন!”
ততক্ষণে না-বউয়ের কোলের বাচ্চার খাঁটি কান্না শোনা যাচ্ছে! দেখলাম মা নিজে খেতে ব্যস্ত! আহা বাধ্য হয়েই তো ব্যস্ত! খিদে বড্ড বাধ্য করে গো! সামনে লরি! অস্বাভাবিক তীব্র বেগে চলছে! এক জায়গায় ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ল ৷ এই রে! পুলিশ ধরল নাকি !সাউজি বললেন “ওতে গরু যাচ্ছে৷ পুলিশ ওসব গাড়ি জন্মে ধরবে না৷ সামনে হয়ত গাড্ডায় পড়েছে৷”
“কী করে বুঝলেন!”
সাউজির নির্ভুল অঙ্ক!
“গরুর লরির নম্বরপ্লেট থাকে না৷ পিছনে গরু নামানোর রড লাগানো থাকে! গাড়ির নম্বর না দেখলেই পুলিশ বুঝে যায় গরু যাচ্ছে৷ ব্যাস ছেড়ে দেয় লরি!”
বলতে বলতে একটু কি শ্বাস পড়ল সাউজির?
“মাদাম কিলো কিলো দুধ পৃথিবীতে আসতে পারছে না! আর কিছুদিন পরে বাচ্চাদের দুধ পুরা ফিনিশ হয়ে যাবে!”
গরুর লরি কান ফাটিয়ে হর্ণ দিল৷ বাচ্চাটাও চেল্লাচ্ছে! পথের বাচ্চার আর কিছু না থাক, খাবার খোঁজার মারাত্মক দম৷ সাউজি লরিকে পাশ কাটালেন৷ গরু নামানোর সিঁড়িদুটো আরো একবার দেখে নিলাম৷ ওটা গাভীপথ৷ শিশুর হাঁটার কথা ছিল৷
অন্নপূর্ণা বসুর ‘স্বার্থপর’: চেনা গল্পের অপূর্ব অভিঘাত - একটি ভাণ-এর প্রতিবেদন
অন্নপূর্ণা বসুর ‘স্বার্থপর’: চেনা গল্পের অপূর্ব অভিঘাত
একটি ভাণ-এর প্রতিবেদন
অন্নপূর্ণা বসুর ‘স্বার্থপর’ সহজ জীবনের গল্প বুনেছে। চেনা জীবনের অতিচেনা গল্প চেনানোর গুণে, শোনানোর ঢঙে এক দরকারি অভিঘাত তৈরি করতে পেরেছে। সাম্প্রতিক কালে এমন দৃষ্টান্ত বাংলা ছবিতে পাইনি আমরা। রহস্য রোমাঞ্চ ম্যাজিক তন্ত্র আর সাইকো থ্রিলারে ক্লান্ত বাংলা ছবির দর্শক স্বার্থপর’ দেখতে এসে থ্রিলড হলেন বেশি। যে গল্পে আপাতভাবে নতুনত্ব কিছু নেই।
একটা ভাই-বোনের গল্প এবং পিতৃগৃহের সম্পত্তি নিয়ে মন কষাকষি, দূরত্ব এবং কোর্ট কাচারি- এ একেবারে নতুন কিছু নয়। এ বাঙালি জীবনের অঙ্গ। এ আমাদের অতি চেনা প্লট। এই সাধারণ বিষয় বেছে সিনেমার ভাষায় ফেলতে গিয়ে পরিচালক অন্নপূর্ণা একটা অসাধারণ কাজ করলেন। সেটা হল, সাধারণ গল্পটাকে তিনি নাটকীয় ঘাত-ঘোত দিয়ে ‘অসাধারণ’ করে তোলার চেষ্টা করলেন না। সহজ সুরের স্বাভাবিক ছন্দের ভেতরেই যেভাবে অনেক অব্যক্ত ছন্দপতনের অনুভূতি লুকিয়ে থাকে, ঠিক সেভাবেই এসে পড়ল ভাই-বোনের দ্বন্দ্বটা। বড় ধীরে এবং পরিস্থিতির সুতো জড়িয়ে, সিনেমা শিল্পের জাস্টিফিকেশনের পথ ধরেই এল সংসারী ভাই ও বিবাহিত বোনের দূরত্বটি।
আমাদের সহজ জীবনের অর্থ হল চালু প্রথা পদ্ধতিকে আমরা প্রশ্নহীন এবং স্বাভাবিক বলে ধরে নিই। নারী পুরুষের প্রকাশ,কাজের ধরনের ভেতরেরই একটা একপেশেমি থেকে যায়। ওসব ধরতে গেলেই ছন্দভঙ্গ হয়। আবার না ধরলে ব্যক্তিত্ববান মানুষের গভীরে একটা হীনতার ক্লেদ জমে।
দাদা বোনের বাড়িতে ফেরার তাড়াহুড়োর মধ্যে নো-অবজেকশনে সহি করিয়ে নেয়। গঙ্গা পাড়ের পুরনো বাড়ির দোতলাটা তিনি হোমস্টে বানাতে ভাড়া দিয়ে দেবেন। এই কাজটা দাদার কাছে স্বাভাবিক। এমনকি বোনের বরের কাছেও। কিন্তু বোনের ছোটবেলাকার আহ্লাদের যাবতীয় চিহ্নগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার আগে বোনের সঙ্গে একটিবার শলা করার কথা মনে হয়নি দাদার। দাদা এবং বোনের এতদিনকার এমন সুসম্পর্কের মাঝে এই একটিমাত্র ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বোন ঠিক কতদূর যাবে? এমন একটা সংশয়ের ভেতর দিয়েও ক্রমশ পরিস্থিতি তেতে উঠল। বোনকে যেতে হলো আইনি লড়াইয়ে। যখন বাস্তবে মেয়েটিকে বোনের চরিত্রে,যখন মেয়েটির স্ত্রীর চরিত্রে কিংবা মায়ের চরিত্রে নামতে হয় তখন ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে। সে সবকটা চরিত্রের মধ্যে একটা বেসামাল অবস্থা তৈরি হয় যদি তিনি তার ‘মানুষ’ চরিত্রটিকে মানবিক সত্তা টি কে বড়ো করে তোলেন। তখনই নানাদিক থেকে আক্রান্ত হতে হল তাকে। কতক আক্রমণ অন্য চরিত্র থেকে, অনেকটাই পরিবেশ পরিস্থিতি থেকে। কেননা আমাদের পরিবেশের কাছে ‘মানুষ’ চরিত্র হয়ে খানিকক্ষণ বেঁচে থাকাটাই অপ্রথাসিদ্ধ উৎপাত, বিশেষত মেয়েদের।
আবার মেয়েদের সহনশীল বাস্তবমুখী যাপনে যে ব্যালেন্সের খেলা, দু-খানা বাবা দু-খানি মা, দেওরের ছেলে আর দাদার ছেলে, পিসতুতো মাসতুতো জ্ঞাতিগুষ্ঠীও পিতৃ-মাতৃপক্ষ এবং স্বামী পক্ষ মিলিয়ে যে বিপুলাকার ক্ষেত্র তৈরি হয় সেখানে সেই মেয়েটির ইচ্ছে অনিচ্ছার দাম কতটুকু? এরমধ্যে যদি চাকরি থাকে তাহলে সময় থাকে না। অন্যদিকে সময় রাখতে গেলে ‘সেল্ফ’ তার ডানা মেলতে পারে না।পরনির্ভরশীল হতে হয়। এই গল্পে বোনের চরিত্রে কোয়েল মল্লিক গৃহবধূর ভূমিকায় স্বাধীন হতে গিয়ে দেখেন তিনি কখন কতটুকু স্বাধীনতা পাবেন সেটা মোটের ওপর তার স্বামী সিদ্ধান্ত নেন। অথচ তিনি যে স্ত্রীর স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করেন এ সম্পর্কে মোটেও সজাগ নন স্বামী। প্রথাগত চলন মানেই মোটের ওপর তা প্রশ্নহীন অনুশাসন। এটাই প্রথাসিদ্ধ ধারণা। ছবিতে দেখি, দাদার কাছে উকিলের চিঠি পাঠালেও দাদা এবং বোনের বরের মধ্যে একটা পারস্পরিক সম্মান থেকে যায়– ওটি সম্ভবত পুরুষতন্ত্রের কমফোর্ট জোনের জন্যই।
তবে দাদা চরিত্রটিও একবল্গা নয়। জেদ ইগো সমেত সে মানবিক এবং বোনের সঙ্গে দূরত্বের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তাকেও বিদ্ধ করে এবং শেষে কিছুটা ক্লান্ত।
দুই পক্ষের দুই উকিলের দ্বন্দ্বে যে পরিমাণ বিপুল প্রেক্ষিত উঠে আসে তাতে আমাদের সহজ পক্ষপাতের সব চেনা বাইনারিকে ভেঙে দেয়। একদিকে সরখেলের অতি বাস্তববাদী পুরুষালি যুক্তির ঝাঁঝ, অন্যদিকে হৃদয় উত্থিত সত্য উপস্থাপনের জীবনের সহজবাদী খণ্ডন আমাদের অভিভূত করে।
আইনি লড়াইয়ের মাঝেও ভাইফোঁটা হয়। তিক্ততার মাঝেও বোন পৌঁছলে বরফ গলে। বোন হেরেও জিতে গেলে ভাই বুঝতে পারে জিতে ভুল হল। বাস্তবত কোর্টের রায় বোনের পক্ষে যায়। স্ত্রীর অসুখে, অর্থকড়ির চাপে, উৎপাটিত ইগোর জ্বালায় দাদা ভেঙেও বোনের দয়া দাক্ষিণ্য পাবার কথা স্বপ্নেও ভাবেনা। ঠিক তখনই পরিচালক আমাদের স্বপ্ন দেখান। বোন অধিকার নেয় না বাড়ির। ওর নিজেকে জানানোর ছিল অধিকারের কথা। কখনও সেটা বাইরের বাস্তবতায় পরখ করে নিতে হয়।
দুটি দৃশ্য আমি ভুলি না। একটা হল শেষ পর্বে দাদা বোনের অভিমান ভাঙার মর্মস্পর্শী একান্ত দৃশ্যের মাঝে বৌদি ঘরে ঢুকে পড়তে গিয়েও নিঃশব্দে ফিরে যান। আহা, নিভৃতি সব সম্পর্কের সম্পত্তি। কেবল কান্ত প্রেমের নয়।
দ্বিতীয়টি, দুদেল উকিল সরখেলের (অভিনয়ে অনির্বাণ চক্রবর্তী) বোনপক্ষের উকিল (রঞ্জিত মল্লিক)-এর কাছে পরাস্ত হয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। পরাস্ত পক্ষকে তার পাওনার কথা কড়া ঢঙে মনে করিয়ে দিয়ে। আমরা যখন মোটের ওপর তাকে কিছুটা ভিলেন গোচের নিদেনে যান্ত্রিক অথবা অর্থ পিশাচ গোচের চেহারা দিয়েছি তখনই তিনি তার গাড়ির দরজা খোলেন। দর্শক দেখেন, ভেতরে পিতার জন্য অপেক্ষামান ছেলে। বেশি বোঝার আগেই ‘প্রতিবন্ধী’ ছেলেটিকে নিয়ে গাড়ি ছেড়ে যায়। আমরা অবাক হয়ে দেখি, দুঃখ কষ্টকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে কে যে কেমন করে বেঁচে থাকে, আমরা তার কতটুকু জানি!
অন্নপূর্ণা বসুর এটিই প্রথম ছবি। আশায় রইল বাঙালি দর্শক। ছবির যা হতশ্রী দশা এখন। অন্নপূর্ণা যদি এমন দুধ-ভাতের সহজ সংবেদের ছবির জোগান দেন—তবে বাঙালির কিছুটা অরুচি ঘোঁচে।
