ভাণ পত্রিকা BHAAN MAGAZINE
৫৪ তম ই-সংস্করণ ।। ৬৬ তম সংখ্যা ।। মার্চ , ২০২৬



গৌরাঙ্গ দণ্ডপাট
সম্পাদক
- Phone:+1 (859)00000
- Email:info@example.com


পার্থ হালদার
সম্পাদনা সহযোগী
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com

শ্রেয়া ঘোষ
প্রচ্ছদ
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


পল্লব মিশ্র
প্রচ্ছদ অলংকরণ
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


দেবহূতি সরকার
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


সুচরিতা রায়
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


পূর্ণতা নন্দী
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


মৌলিকা সাজোয়াল
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


অয়ন্তিকা নাথ
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
কর্তৃক
৮৬, সুবোধ গার্ডেন, বাঁশদ্রোণী, কলকাতা: ৭০০০৭০ থেকে প্রকাশিত।
- যোগাযোগ : ৯৬৪৭৪৭৯২৫৬
৮৩৩৫০৩১৯৩৪ (কথা /হোয়াটসঅ্যাপ)
৮৭৭৭৪২৪৯২৮ (কথা)
- Email : bhaan.kolkata@gmail.com
Reg. No: S/2L/28241 548
সূচিপত্র :
সম্পাদকের কথা
আদিকাল থেকে বেচা-কেনা চলছে। বাঁচার জন্য দেওয়া-নেওয়ার কারবার চালিয়েছে মানুষ। পেতে গেলে মূল্য দিতে হয়। আবার অমূল্য জিনিসের মূল্য নেই। মানে যে মূল্যে সোনাদানা মেলে সেই মূল্যে সে ধরা দেয় না। মেলে না বলেই সে অমূল্য। একটার গতি দামাদামির পথ ধরে শেষত বৈষয়িক। অন্যটি মূল্যমানে যাচাইয়ের পথ ধরে বোধের কাছে পৌঁছতে চায়। সম্ভবত একেই মূল্যবোধ বলে। বাঁচতে গেলে অর্থকড়ির প্রসঙ্গ আসে। অর্থকারীভাবেই আসে। কিন্তু অর্থ-কড়িকে জীবন ভাবলে জীবন পালায়। ইঁদুর দৌড়ে ক্লান্ত দেহ-মনে বিকৃতি আসে। বিকৃতিতে অভ্যাসও জন্মে যায়। মরাকে জ্যান্ত মনে হয় তখন। পচা জলে যেমন পোকা, বিকৃত পুঁজিতন্ত্রে তেমন কোনোক্রমে টিকে থাকা অসন্তুষ্ট বিরক্ত মানুষ!
রুটি কিনতে পয়সা লাগে। রুটি পেট ভরায়। ছাতা কিনতে পয়সা লাগে। ছাতা রোদ বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে। আলো, অন্ধকারেও দেখাতে পারে বলে কেরোসিন কিংবা ইলেকট্রিকের দাম আছে। কিন্তু রামমোহন বিদ্যাসাগরের আলোর দাম অমূল্য। ওসব দাম দিয়ে কেনা যায় না। আর একটা ছবির দাম, একটা অতি পুরাতন ভাষ্কর্যের দাম কীকরে এত বেশি, একথা খুব সহজে বেশি মানুষের মাথায় ঢোকে না। ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি দাম দিয়ে কিনে ফেলা মুশকিল!
ব্যাপারটা জটিল হল কয়েক শতাব্দী জুড়ে। শেষ কয়েক দশকে লাগামছাড়া। এখন লোকে সাহিত্য কিনতে চায়। আলো জোছনা কিংবা জল বাতাস আগুন ও বৃক্ষকে অর্থের জোরে বশে রাখতে চায়। যা কিছু সামাজিক ধর্মীয় সাংস্কৃতিক তাকে অর্থনীতি রাজনীতির মিশ্রিত অতিকায় ক্ষমতার তাঁবে রাখতে চায়। লুন্ঠনের নৌকো পণ্য ভেবে নারীকেও নিয়ে যায়। শিশুদের নিয়ে যায়। ক্রমশ বিকৃতির চরম নরকে এপিস্টাইন ফাইল হয়ে ভেসে ওঠে তারা। পাড়ে তোলার আগেই ভোট-জোট-গ্যাস-প্রার্থী এবং বোমারু বিমান কেনার হাটে লেগে যায় তীব্র কোলাহল। জীবনের গহন পথের নীরবতার আনন্দকে ভেঙে উঠে আসে অসহ্য হলাহল। এত ডাকাডাকি, হাকাহাকি, দম্ভ, আস্ফালন আর প্রত্যাঘাতে বাতাসে ‘সত্য’ হয়ে ওঠে একমাত্র বাজার। পরাক্রমশালী বাজারের পদতলে নতজানু আমাদের জীবন। বুঝতে পারার আগেই আমরা বিক্রি হয়ে গেছি।
গণতন্ত্রের উৎসবে ভোট কেনা হয়। ভোট বেচার চুক্তি করে ভোট-দালালরা। খারাপকে ভালো, ভালোকে খারাপ, কমকে বেশি, বেশিকে কম দেখাতে মিডিয়া কেনা হয়। মিডিয়া নিরপেক্ষতার মোড়কে ‘পক্ষপাত’ বেচে। মিডিয়ার কর্মীরা আসল বোঝে, কিন্তু চাকরির জন্য ‘নকল’ বেচে। না বেচলে মিডিয়াজীবী বাজার থেকে কিনবে কী? না কিনলে পুঁজিবাজারে মানুষ ব্রাত্য। যত কিনবে তত তার দর বাড়ে। যত দামি জিনিস তত দামি মানুষ। যে মানুষ, কিনতে পারে না সে মানুষ পুঁজিতন্ত্রে পশুবৎ। তাকে করুণা করে রুটি ছুঁড়ে দিয়ে আনুগত্য কেনা হয়। মিছিল লম্বা করা হয়। ক্ষমতার পক্ষ নিয়ে ভোট লুঠ করানো হয়। সে মন্দ বর্বর বিকৃত ক্ষমতাবানের হয়ে পুলিশের লাঠি খায়। জেল খাটে।
রমরমা বাণিজ্য আসরে আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বিক্রি হয়ে যায়। বাপ বদলে নির্লজ্জ বান্দারা সিংহের গর্জন করলেও আমরা ইঁদুরের দাঁত দেখি। ভোট পরিচালক অফিসাররা বিক্রি হয়ে যান। নিরপেক্ষতার সরজমিনে তদন্ত করতে গিয়ে তারা বিষাক্ত পাপে জড়িয়ে পড়েন। কেননা তারা ইতোমধ্যে বিক্রিত। তারা সাহেব বিবির গোলাম। আমাদের ব্যালট বক্স বিক্রি হয়ে যায়। গননা কেন্দ্র বিক্রি হয়ে যায়। কেন্দ্রীয় বাহিনী তদন্ত কমিটি বিচার বিভাগ যে সব চালবাজি করে, তার কারণ তারা আসলে ‘তারা’ নয়। তারা আসলে ‘ওরা’। যারা ওদের কিনে নিয়েছে। প্রার্থী নির্বাচনে দেখা হয় কে কত বেশি মূল্যে বিক্রি হতে প্রস্তুত! নিজেকে বেচতে না পারা প্রার্থীরা গুদামে পচা অভিমানী শশার মতো নষ্ট রসের গল্প বলে। মিডিয়া দেখায়। আমরা ভাত খেতে খেতে দেখি। বিকৃত পুঁজির খপ্পরে যেহেতু আমি সেই কবে কোন পাইকারি হাটে বিকিয়ে গিয়েছি, তাই বিবেকহীন আমার এসব দেখে অস্বস্তি হয় না। আমি বিনোদিত হই। বিনোদনও বিকিনির হাটে তাবেদারির শর্তে বিক্রি হয়ে গেছে।
এরপরেও কিছু অবিক্রিত থাকে। কিছু হাঁটা, কিছু চাওয়া, কিছু বিশ্বাসী উচ্চারণকে আলো ছড়াতে দেখি। পথে ঘাটে হাটে অলিতে গলিতে স্বপ্ন সন্ধানী নাছোড়বান্দা তরুণ তরুণী গলা ছেড়ে, মাথা ও মেরুদণ্ড বিক্রির বিরুদ্ধে সোচ্চারে স্লোগান তোলে। আমরা যারা অল্প গরমে আলুথালু, অল্প শীতে জবুথবু; আমরা যারা নিরাপত্তার সন্ধানী হয়ে সাহস বন্ধক রেখে এসেছি ওই সব স্লোগান আমাদের বিব্রত করে। আমাদের দেহ মনে অনুশোচনার তন্দ্রা এনে দেয়। তবু মন চায় এইসব দুরন্ত সাহসীরা জিতে যাক। ওরা একদিন পারবে বিক্রিকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে। বস্তু আর মানুষের তফাত বুঝবে। মন মাথা বন্ধক রেখে আমরা যারা ধুঁকতে ধুঁকতে টিকে আছি। ওরা জীবন বাজি রেখে সেই অন্ধকার অস্বাস্থ্যকর বিকৃত ব্ল্যাকহোল থেকে আমাদের মুক্ত করবে। আমাদের খুব লোভ। আমাদের লোভ মেরুদণ্ড টানটান রেখে ডানা মেলে ওড়ার।
কলকাতার গালগপ্পোর পর্ব ২২ - কিশলয় জানা

কলকাতার কেলেঙ্কারি
কিশলয় জানা
এতবড় একটা শহর ধীরে-ধীরে বিকশিত হচ্ছে, আর তাতে কেলেঙ্কারি ঘটবে না, এমনটা হতে পারে? তার উপর নানা জাতের-নানা মানসিকতার-নানা ধরণের মানুষের যেখানে ওঠা-বসা, তাদের মধ্যে রয়েছে যেমন সাধু-সজ্জন, নেহাতই ছা-পোষা, তেমনই রয়েছে কত ভণ্ড, প্রতারক, চোর-জোচ্চোর। শহর সেদিন সকলেই কোল দিয়েছিল, ফেরায়নি কাউকেই। নতুন গড়ে উঠতে থাকা একটি নগরের পক্ষে তা সম্ভবও ছিল না। আর এ-সবের হাত ধরেই কলকাতায় কেলেঙ্কারির অভাব হয় নি কোনদিন। সেকালের সংবাদপত্রে আর কতটুকুই বা ধরা আছে তার ? যাই হোক, কলকাতার কেচ্ছার কথা যখন উঠেছেই, তখন কেলেঙ্কারির কথাই বা বাকি থাকে কেন?
কলকাতার কেলেঙ্কারি বললেই প্রথমেই যার কথা মনে পড়ে সেটি হল ‘অন্ধকূপ হত্যা’। ইংরেজ-অধিকৃত ভারত তথা বাংলার ইতিহাসে, আরও স্পষ্ট করে বললে, কলকাতার ইতিহাসে এতবড় গালগপ্পো সম্ভবত এর আগে বা পরে আর তৈরি হয়নি। গপ্পোটি ঠারে-ঠোরে অনেক ইংরেজ ঐতিহাসিকই বলেছেন, যেমন, অর্মি, আইভিস্, স্টুয়ার্ট, লেথব্রিজ প্রমুখ, কাছাকাছি সময়ে ফলাও করে বলেন এইচ. ই. বাস্টেড তাঁর ‘ইকোজ্ ফ্রম ওল্ড ক্যালকাটা’ নামক বহুপঠিত বইতে। এই বিবরণ অনুযায়ী, ইংরেজদের বিরুদ্ধে কলকাতা আক্রমণ করে সিরাজ সর্বমোট ১৪৬ জনকে বন্দি করেন এবং তারপর কুড়ি বর্গফুট দীর্ঘ-প্রস্থ কক্ষে এই সমস্ত বন্দিকে ভরে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন ২৩ জুন। বর্ষা সে-বছর দেরিতে নেমেছে। চারদিকে একেবারে বাও নাই, বাতাস নাই, লোহার ঘরে বাস-এর কেস। ঘরে জানালা বলতে দুটি ছোট গবাক্ষ। থাকা-না-থাকা সমান। যত রাত বাড়তে লাগল, তত বন্দিরা অস্থির হয়ে উঠলেন। হলওয়েলও উক্ত বন্দিদের মধ্যে একজন। রক্ষীকে হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে রক্ষী অবেক চেষ্টা করল, কিন্তু হা হতোস্মি! বন্দিরা জল খেতে চাইলে গরাদের ফাঁক দিয়ে ভিস্তিওলা জল দিল বটে, কিন্তু শেষরক্ষা হল না। ভরে দেখা গেল মাত্র ২৩ জন জীবিত আছেন, বাকিরা পরলোকগমন করেছেন। হলওয়েল প্রমুখদের কাছ থেকে এই ঘটনার কথা জেনে সকলেই সিরাজকে দায়ী করে যা-নয়-তাই বলতে লাগলেন। আবার কোন-কোন ইংরেজ ঐতিহাসিক অন্ধকূপ হত্যার দায় সিরাজের নয়, তাঁর অধীনস্থ কর্মচারীদের মস্তিষ্কপ্রসূত বললেন। তবে সকলেই একটা কথা মেনে নিলেন, সিরাজ দায়ী হোন বা না-হোন, অন্ধকূপ-হত্যা যে হয়েছে তার কোন সন্দেহ নেই। লর্ড মেকলে তো সিরাজকে জীবন্ত-পিশাচের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অথচ মজার ব্যাপার হলওয়েল এণ্ড কোং-এর ফলাও করে বলা অন্ধকূপ-হত্যার ব্যাপারে এক-একজন এক-একরকম বিবরণ দিয়েছেন। মোট কতজন ইংরেজকে অন্ধকূপে বন্দি করা হয়েছিল, সে-ব্যাপারে একজন এক-একবার এক-একরকম হিসেব দিয়েছেন। মজার ব্যাপার, সমসাময়িক আর-কোন নথিপত্রে এই ঘটনার কোন উল্লেখ নেই। ক্লাইভ একবার চিঠিতে ১৫০ জনের মৃত্যুর কথা বললেও, পরে সিরাজের কলকাতা আক্রমণের কথা জানিয়ে লণ্ডনের ডিরেক্টরদের যে চিঠি লেখেন, সেখানে অন্ধকূপ-হত্যার কোন উল্লেখ নেই। এমনটি সত্যি হলে ক্লাইভ কোম্পানির ডিরেক্টরদের তাতানোর সুযোগ ছাড়তেন বলে মনে হয় না। হলওয়েল এই গালগপ্পোকে সত্যি প্রমাণ করতে মরিয়া ছিলেন বলে নিজেই মনুমেন্ট বানিয়ে মৃত স্বজাতিদের উদ্দেশে নিবেদন করেন। দীর্ঘকাল যাবৎ এ-দেশের ঐতিহাসিকেরাও এ-বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত ছিলেন। পরে প্রমাণিত হয়েছে, এটি হলওয়েলের স্বেচ্ছাকৃত একটি একশো ভাগ মিথ্যে গপ্পো; অন্ধকূপ-হত্যার মতো কোন ঘটনা আদৌ ঘটেনি। সম্মুখযুদ্ধে কোন-কোন ইংরেজ সৈন্য মারা গিয়েছিলেন, এই মাত্র। তবে দীর্ঘদিন পর্যন্ত এই কেলেঙ্কারি ইংলণ্ড এবং বাংলার জনমানসে আলোড়ন তুলেছিল। তবে নবগঠিত কলকাতার প্রথম কেলেঙ্কারি যে এটিই, তাতে সন্দেহ নেই।
দ্বিতীয় যে কেলেঙ্কারি কলকাতার জনমানসে আলোড়ন তুলেছিল, তার নায়ক প্রাণকৃষ্ণ হালদার যদিও কলকাতার অধিবাসী ছিলেন না, ছিলেন চুঁচুড়ার বাসিন্দা। তবে কলকাতার লাট-বেলাটের সঙ্গে তাঁর বিলক্ষণ ওঠা-বসা ছিল, এমনকি তাঁর বাড়ির জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজায় যোগ দিতেন সেকালের অনেক সম্ভ্রান্ত ইংরেজ। ‘ক্যালকাটা গেজেটে’র মতো সংবাদপত্রে রীতিমতো ফলাও করে বিজ্ঞাপন দিয়ে চেনা-অচেনা ‘বাবু’দের এবং সেই সঙ্গেই সমস্ত ইংরেজ সাহেবসুবোদের দশ দিন ব্যাপি চলা নাচের আসরে আমন্ত্রণ জানান হতো। ব্রাহ্মণ-কায়স্থেরাও বাদ যান নি। অতিথিদের ‘টিফিন’ থেকে ‘ডিনার’, সঙ্গে দেদার বিলিতি পানীয় দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। কেবল দুর্গাপূজা নয়, কখনো গরীবদের জন্য বিনামূল্যে দাতব্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করে, কখন নিউ ইয়ার্স ডে’তে কলকাতার অন্যতম সম্ভ্রান্ত রাজা বৈদ্যনাথের বাড়িতে মল্লযুদ্ধের আসরে নিজের মল্লবীরকে লড়িয়ে পুরস্কার জিতে চুঁচুড়ার প্রাণকৃষ্ণ অল্পদিনের ভিতরেই কলকাতার না-হয়েও কলকাতার আলোচনার মধ্যমণি হয়ে বসেছিলেন। এঁর ভাই নীলমণি হালদার অবশ্য অল্পদিনেই কলকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাবু হিসাবে গণ্য হয়েছিলেন। ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার বুকে সর্বত্র বাবু প্রাণকৃষ্ণ হালদারের জয়জয়কার। ঠিক তার বছর দুয়েক পরেই ওই ‘ক্যালকাটা গেজেট’ থেকেই আমরা জানতে পারি, কোম্পানির জাল কাগজ দেখিয়ে নানা জনের কাছ থেকে প্রায় পঞ্চাশ থেকে ষাট লক্ষ টাকা ধার করে আর শোধ করতে চান নি। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এই অপরাধে তাঁর সাত বছরের দ্বীপান্তর হয় ‘প্রিন্স অব ওয়েলস্’ দ্বীপে। একা যাননি অবশ্য, তাঁর ভাই নীলমণি হালদারও ছিলেন। দুই ভাই মিলিতভাবে ষড়যন্ত্র করেছিলেন একালের বিখ্যাত মামা-ভাগ্নের মতো। যাই হোক, প্রাণকৃষ্ণের চুঁচুড়ার সম্পত্তি তো বটেই, কলকাতার বুকে যে আটটি বাড়ি ছিল, সমস্তই নিলামে ওঠে। এর মধ্যে রাসেল স্ট্রিটের বাড়িটিই ছিল সবচেয়ে বড়। আট বিঘা পনেরো কাঠার উপরে তৈরি। অনেককাল পরে আমরা আবার দিশি কাগজের এক কোণে ছোট্ট খবর ছাপতে দেখি, যেখানে দ্বীপান্তরবাস শেষে ফিরে এসে কপর্দকশূন্য প্রাণকৃষ্ণ লোকের কাছে হাত পেয়ে সামান্য পয়সা নিচ্ছেন এক মটর আফিম খাবেন বলে। প্রাণকৃষ্ণ একালের সারদা প্রভৃতি চিটফাণ্ডের সাঙ্গপাঙ্গদের আদি-উপাস্য। কলকাতার বৃহত্তর কেলেঙ্কারির প্রথম নাটের গুরু।
পূজা-দান-খয়রাত ইত্যাদি ‘কবলিয়ে’ বড়মানুষ ‘বাবু’ হয়ে ওঠার এই ইতিহাসে আরও অনেক বাবুই নিঃশেষিত হয়েছিলেন, সে-সব বাবুদের বাবুয়ানির গালগপ্পো অন্য কোন পর্বে শোনান যাবে। আপাতত দুর্গাপূজার কথা যখন উঠলই, তখন এই পূজাকে কেন্দ্র করে একখানি কেলেঙ্কারির কথা এখানে শোনান যাক্। জোরজুলুম করে চাঁদা আদায় করে ‘বারোইয়ারি পূজা’ চালু হয়েছিল কলকাতায়, সে-কথা হুতোম জানিয়েছেন। তেমনই হুতোম সাঁটে আর-একটি ঘটনার কথা জানিয়েছেন, একখানি কেলেঙ্কারির কথা, সেটাই বলি এখন। সে-সময় বারইয়ারি পূজার রমরমা দেখে অনেক অভিজাত বাড়ির ছেলেপিলেরাও বাড়ির পূজার জন্য রাস্তা-আটকে জোরজুলুম করে চাঁদা আদায় করতেন। পথযাত্রী মহিলারাও এই জুলুমের হাত থেকে রেহাই পেতেন না। সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের বাড়ির কয়েকজন ছেলে এবং তাদের শাকরেদ এই উপায়ে বেহালার রাস্তায় বেশ কিছুদিন ধরে টাকাপয়সা আদায় করছিল। এইসময় একদিন একটি সুসজ্জিত পালকি চলেছে এই পথ দিয়ে। দেখেই বোঝা যায়, কোন সম্ভ্রান্ত ঘরের জেনানা চলেছেন। সঙ্গে বেহারারা কেবল। হঠাৎ রায়চৌধুরীবাড়ির যুবকেরা পালকি থামাতে বললে বেহারারা ঘাবড়ে গিয়ে পালকি থামাল। তারা সবিনয়ে জানাল, বড় ঘরের মাইজিকে নিয়ে তারা চলেছে, কর্তারা কেউ নেই, তাদের যেন ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। তারা নাছোড়বান্দা। শেষে পালকির ঘেরাটোপ খুলে জেনানাকে দেখেই ছাড়বে তারা। সেকালে সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে-বউরা অপর পুরুষের সামনে ঘোমটা পর্যন্ত সরাতেন না, সে-সময় এই আবদার ! যাতে পালাতে না পারেন জেনানা, সেইজন্য চারদিক ঘিরে যুবকেরা পালকির পর্দা সরাতেই জোঁকের মুখে যেন নুন পড়ল। পালকির ভিতর বসে আছেন চব্বিশ পরগণার দোর্দণ্ডপ্রতাপ ম্যাজিস্ট্রেট পেটন। রায়চৌধুরীদের মতো সম্ভ্রান্ত ঘরের যুবকদের মুখ হাঁ। কেলেঙ্কারির একশেষ হতে অবশ্য বাকি ছিল না। কিছুজন পালালো দুড়দাড় করে, কয়েকজনকে খপ্ করে ধরলেন পেটন। পিটিয়েছিলেন কি-না সে-কথা ইতিহাসে লেখা নেই। তবে ব্যস্, রায়চৌধুরীবাড়ির যুবকদের জোরজুলুমের যে সেখানেই ইতি হয়েছিল, তা বলা বাহুল্য।
এবার একটি মজাদার কেলেঙ্কারির কথা শোনাই। গপ্পোটি বলেছেন বিখ্যাত ব্রাহ্ম সমাজকর্মী এবং সুলেখক প্রাণকৃষ্ণ দত্ত তাঁর ‘কলিকাতার ইতিবৃত্ত’ বইয়ে। পাঠক মূল বইটি পড়লে আরও অনেক কিছু জানবেন আর বুঝবেন, বর্তমান লেখক আদতে এক মহাপুরুষ চোর, নানা গুণীর নানা লেখা লেপে-পুঁছে এনে ইধার-কা-মাল- উধার, উধার-কা-মাল ইধার করেই এতকাল চালিয়ে এলো। যাই হোক, গপ্পোটা বলি। সেকালে দুর্গাপূজায় যেমন, কালীপূজায়, এমনকি গঙ্গাপূজাতেও কোন-কোন ‘বাবু’রা বেশ জাঁকজমক করতেন। আর বাবুদের জাঁকজমক মানে তাতে কোন কেলেঙ্কারি হবে না, এমনটা হতেই পারে না। কালীশঙ্কর ঘোষের বাড়িতেও তেমন একটি কেলেঙ্কারি ঘটলো। কালীশঙ্কর ঘোষের আদি বাড়ি চোপায় হলেও, এঁরা কলকাতায় এসে শোভাবাজারে বাড়ি করেন, এঁর পুত্রই ছিলেন হরচন্দ্র ঘোষ, বিখ্যাত ডিরোজিয়ান এবং সিভিল কোর্টের প্রথম এ-দেশীয় বিচারপতি। সততার জন্য সে-যুগে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হতো। বিখ্যাত হুতোম তথা কালিপ্রসন্ন সিংহের বাবা এবং কালীশঙ্কর ঘোষ অভিন্নহৃদয় বন্ধু চিলেন। হরচন্দ্র ঘোষকেই তিনি নাবালক কালীপ্রসন্নের সমস্ত সম্পত্তির অছি নিযুক্ত করেন। ষোলো বছর বয়স হলে তিনি গচ্ছিত সম্পত্তি চারগুণ বর্দ্ধিত অবস্থায় কড়ায়-গণ্ডায় কালীপ্রসন্নের হাতে তুলে দেন। সরশুনায় পরে তাঁরা বাড়ি করে উঠে যান। বিখ্যাত ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘বঙ্গাধীপ পরাজয়’-এর লেখক প্রতাপচন্দ্র ঘোষ এই হরচন্দ্র ঘোষের সুপুত্র। সে যাই হোক, শোভাবাজারে থাকবার সময়কার এক কালীপূজার দিনের ঘটনা। ঘোর শাক্ত কালীশঙ্কর বাড়ির কালীপূজা উপলক্ষ্যে আকন্ঠ মদ্যপান করেছেন, বাড়ির গুরু, পুরোহিত, ছেলেপিলের দল থেকে শুরু করে গিন্নি এবং অন্যান্য বউ-ঝিরাও বাকি থাকেনি। সুরাপানে সকলেরই প্রায় তূরীয় অবস্থা। প্রচলিত আছে, এইরকম আর-একবার ঢুলিরা পূজার দিন দুপুরে স্নান করবে আর কিছু খাবে বলে বাড়ির কর্ত্রীর কাছে তেল আর জলপানি চাইলে তিনি বলেছিলেন, ‘কি তোরা আমার বাড়িতে কি-না তেলজলপান চাইছিস্ ! মিঠাই খা আর মোমবাতি মাখ্।’ আর-একবার নেশার ঘোরে কর্তার খাস-চাকর কর্তার একখানা পা হারিয়ে ফেলেছে বলায় তা নিয়ে কর্তা থেকে শুরু করে বাড়িময় সক্কলে এদিক-ওদিক খুঁজতে বলে শেষে গুরুদেবের বাড়ি পাঠায় এই বলে যে, নৈবেদ্য দেওয়ার সময় ভুল করে তার সঙ্গে কর্তার একখানা পাও বোধহয় চলে গেছে। কর্তা নিশ্চয়ই পা খুলে ঠাকুরঘরে বসেছিলেন! তা সেবার কালীপূজার রাতে কালীশঙ্করের মনে হল যে, আমি এতগুলি পশুকে বলিদান দিয়ে স্বর্গে পাঠিয়ে এত পূণ্য অর্জন করছি, এখন যদি গুরুদেবকে বলি দিয়ে স্বর্গে পাঠাই, তাহলে আমার আরও বেশি পূণ্য হবে। সে-কথা জানানোয় মাতাল গুরুদেবও ‘তথাস্তু’ বলে নেচে উঠলেন। শেষে হাড়িকাঠের কাছে এনে ফেলা হল। যাদের বলি দেওয়ার কাজ করবে বলে আনা হয়েছিল, তারা কেবল বেশি মদ খেলে বলিদান দিতে পারা যাবে না বলে, নামমাত্র মদ মুখে দিয়েছিল কর্তার সম্মানের জন্য। তারা তো দেখল বিপদ। কেলেঙ্কারি বাধল বলে। সকালে উঠে যখন খোঁইয়ারি ভাঙবে, তখন হাতে হাতকড়া অনিবার্য। অতএব তারা বিনীত ভাবে বলল, কর্তা, যে খাঁড়ায় পশুদের বলি দেওয়া হয়, সে-খাঁড়ায় কি-আর গুরুদেবকে বলি দিতে আছে? আমরা বাড়ি গিয়ে একখানা নতুন খাঁড়া নিয়ে আসি, তারপর বলি দিচ্ছি। কর্তারা সে-ব্যক্তির কথা সঙ্গত বুঝে সম্মতি দিলেন অন্য খাঁড়া আনবার জন্য। সে বাকিদের সতর্ক করে শেষে থানা থেকে পুলিশ নিয়ে এসে আসন্ন কেলেঙ্কারির হাত থেকে গুরুদেবসহ কালীশঙ্করদের সবাইকে যেমন বাঁচাল, সেইসঙ্গে নিজেও বাঁচলো।
কলকাতায় কেলেঙ্কারির অভাব নেই। তার মাত্র দু’-চাট্টি বলা হল। পাঠক যেন ভেবে বসবেন না, সেকেলে কলকাতায় কেলেঙ্কারির অভাব ছিল। নিত্য দু-দশটা কেলেঙ্কারি বরং এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে ঘটে চলতো। ধর্মীয় কেলেঙ্কারিগুলি সঙ্গত কারণেই এখানে বলা হল না। এবারের পর্ব শেষ করি একটি কেলেঙ্কারি এবং একজন সাহসী নারীর কথাকে দিয়ে। সে-সময় কলকাতার গ্রামগুলিতে ছড়িয়ে-ছিটয়ে থাকা পুকুরগুলিই ছিল পানীয় এবং অন্যান্য প্রয়োজনে ব্যবহার করা জলের মূল উৎস। সেইরকমই একটি স্থান হল মির্জাপুর, যাকে আজকের সকলে চেনেন সূর্য সেন স্ট্রিট বলে, তার খানিকটা অংশ। তা এইখানেই একটি পুকুরে জনৈক কোন কায়স্থের সুন্দরী যুবতী স্ত্রী একা স্নান করছিলেন, এইসময় সম্ভ্রান্ত পরিবার সীতারাম ঘোষ ( যাঁর নামে এখন আছে সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট )-এর পুত্র বাবু পীতাম্বর ঘোষ কয়েকজন মোসাহেবকে সঙ্গে নিয়ে সেই যুবতী মেয়েটিকে ধরে নিয়ে যায় এবংবাড়ির ভিতর কোন এক জায়গায় তার শ্লীলতাহানি করে। পীতাম্বর ভেবেছিল, মেয়েটি অন্য মেয়েদের মত মুখ বুঝে মেনে নেবে লোকলজ্জার ভয়ে, ফলে তার দুষ্কর্ম গোপনই থাকবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা হল না। মেয়েটি ছাড়া পেয়েই কাছাকাছি পটলডাঙা থানায় গিয়ে নালিশ করে এবং থানাও সত্বর ব্যবস্থা নিয়ে পীতাম্বর ঘোষকে ধরে নিয়ে গেলে হাজতে পোরে। ‘সমাচার দর্পণ’ কেবল এটুকু কেলেঙ্কারির কথা জানিয়েছে। বিচারে কী হল, তা জানাবে বলে প্রতিশুতি দিলেও, তেমন কোন সংবাদ চোখে পড়ে না। যাই হোক, মেয়েটিকে আমাদের জানাশোনার মধ্যে কলকাতার প্রথম প্রতিবাদী ‘নির্ভয়া’ বলা চলে। কেলেঙ্কারির কথা গোপন না করে সে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিয়েছিল বলে তাকে কুর্নিশ।
পানু পাল: জনজাগরণের নৃত্য ও নাট্য চতুর্থ পর্ব - মধুমিতা পাল

পানু পাল: জনজাগরণের নৃত্য ও নাট্য
মধুমিতা পাল
(আগের পর্বের পরে)
একবার তো অতি উৎসাহের আতিশয্যে গায়ের জামাটা পুড়িয়ে ফেলেছিলাম বিদেশি বস্ত্র পেড়াানোর আন্দোলনে। বাড়ি ফিরে খুব ভয়ে ভয়ে ব্যাপারটা বাবাকে জানাতেই বাবা বললেন সব ঠিক আছে তবে একটা গণ্ডগোল হয়ে গেছে জামাটা বিদেশে কাপড়ের ছিল না। এই ছিল আমার বাবা, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। বাবার ছিল নাচ গান ইত্যাদিতে প্রবল উৎসাহ যদিও ঠাকুরদার ছিল ভীষণ আপত্তি। ছোটবেলা থেকেই তাই অবচেতনেই চলছিল একদিকে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ অন্যদিকে সাংস্কৃতিক মননশীলতার চর্চা।
এরই মধ্যে একবার জেলখাটা হয়ে গেল, যা পরাধীন এবং স্বাধীন ভারতবর্ষে আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। তখন বয়স মাত্র ১২, খুব সামান্য কারণে বিপর্যয় ঘটেছিল। কুড়িয়ে পাওয়া একটা কৌতুক বোমা বন্ধুদের সঙ্গে কৌতুহলবশে ফাটিয়ে ফেলার অপরাধে। বিদেশী শাসকদের কাছে সন্ত্রাসবাদি আখ্যা পাবার মতো উপযুক্ত বয়স আমার হয়েছে। এক বছরের জেল, অভিজ্ঞতাটা একটানে দূর দূর নিয়ে গেল আমায়। আর হেমচন্দ্র বক্সের কাছে ছোটবেলার পড়াশুনা পরবর্তীকালে ডাকাতির আসামী হিসাবে চালান হয়েছিলেন আন্দামানে নিশ্চয়ই মনে আছে সবার। এভাবেই কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে প্রস্তুত হলাম। কলেজে পড়াকালীন সময়ে প্রায় অগোচরে ভালোবেসে ফেললাম নাচকে, প্রথাগত কোন অনুশীলনের মধ্যে নয় একান্তভাবেই নিজের তাগিদে রংপুর ঘুরতে ঘুরতে যেগুলো সংগ্রহ করেছি সেই তাগাদাতে। চারপাশের প্রকৃতি ও পরিবেশ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সৃষ্টি করেছিলাম ছন্দ এবং সুরের একটা অন্যরকম ভাষা। সেই সময় একটা সুযোগ এল উদয় শংকর-এর অনুষ্ঠান দেখবার। আমার তরুণ রক্তে নৃত্যের মাদকতা যখন ছড়িয়ে পড়ছিল আমার পুরো শরীরে। অনুষ্ঠান হয়ে গেল, যখন এদিকে আমি নৃত্যে মশগুল অন্যদিকে রাজনৈতিক আন্দোলনের চেতনা তৈরি হচ্ছে মনের গভীরে। জীবনের মূলে আছে যে মানুষ সেই মানুষের জন্য আন্দোলন—কৃষক আন্দোলন। যেমনভাবে গ্রামীণ পরিবেশ থেকে সৃষ্টি হয়েছিল আমার নৃত্যের ভাষা তেমনি গ্রামীণ জনজীবন হয়ে উঠেছিল আমার রাজনৈতিক চেতনার উৎস। তাই বারবার আমি এ কথাটাই জোর দিয়ে বলতে চাই—আমি কৃষক আন্দোলনের লোক। তাই শহর কেন শুনবে আমার কথা? মনে রাখবে আমার গভীরে বেড়ে ওঠা আশা-আকাঙ্ক্ষা-আন্দোলনের কথা?
১৯৩৮-এ প্রথমবার কলকাতায় এলাম তখন কলকাতার রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সুভাষ বোস-এর সাহসী পদচারণা আর সাংস্কৃতিক মন্ত্রী ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক শিল্পী সংঘের নতুন আন্দোলনের আবেগ। উত্তেজনাগুলো আমার মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছিল। প্রায় দু-বছর কলকাতায় কাটিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ফিরে গেলাম রংপুর। ওখানে কিছু বন্ধুবান্ধব নিয়ে তৈরি করলাম তরুণ নাটকের দল। প্রথম নাটক ‘রোল নাম্বার ৪৯’। আমার প্রথম মঞ্চস্থ করা হালকা হাসির নাটক। পশ্চিম ইউরোপে তখন নেমে এসেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালো ছায়া, আর তা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে সমগ্র বিশ্বে। এবার আন্দোলন—শিল্পকে করে তুলতে হবে সংগ্রামের হাতিয়ার। চারিদিকে তার তোড়জোড়। শিল্পের সংজ্ঞা দ্রুত বদলে যাচ্ছে ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে’ আসছে সাম্যবাদের ঢেউ। আমারও রাজনৈতিক চেতনায় উঁকি দিচ্ছে নতুন শ্রেণিহীন শোষণমুক্ত বিশ্বের ভাবনা। বলশেভিক কাগজ ইন্ডিয়া এবং আরও অসংখ্য নিষিদ্ধ সাম্যবাদী চেতনার বই পত্রিকা ইত্যাদি আমার চেতনাকেও ধারালো করছিল। ততদিনে আমি অবশ্য নিজেকে আরও বেশি করে জড়িয়ে ফেলেছি কৃষক আন্দোলনের মধ্যে। অক্লান্তভাবে ছুটে বেড়াচ্ছি এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে, এক মহকুমা থেকে অন্য মহকুমায় সংগঠনের প্রয়োজনে। একদিকে কৃষকদের ন্যায্য দাবি দাওয়া চাহিদাকে সাম্যবাদী আন্দোলন, অন্যদিকে তাদের মুখের ভাষার প্রথম ইত্যাদির অন্নেষণ—এই দুইয়ের মধ্যে আমার জীবন তখন উত্তাল। একটা গানের কথা খুব মনে পড়ছে, এভাবেই ঘুরতে ঘুরতে সংগ্রহ করেছিলাম গানটা। এ প্রসঙ্গে বলি, আমি যখন খুব ছোট তখন দাদুভাই এই গানটা না প্রায়ই বাড়িতে করত, মনে নেই। একটু পাঁচালী টেনে টেনে একই রকম সুর বারবার ফিরে আসছে। গানটা রংপুরের কোন একটা জায়গা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। গানটা এইরকম—’ডাঙ্গর বধুয়া তুই ঘোরাবার বালুচর সেই কয়তর আনিয়া দিল আন্ধার নিশাকালে রে, বধুয়া তুই কয়তর নারো, কয়তর চারও, কয়তর এর নাইরে পইরা। পিদিম জালাইয়া দেখো, দাঁড়াক কাওয়ার বাচ্চারে কাউয়ার বাচ্চা। ডাঙ্গর বধুয়া তুই আবার চালু রে কাটার আনিয়া দিল আন্ধার নিশাকালে রে, ডাঙ্গর বন্ধুয়া তুই।’
ক্রমশ…
মনোজ-জয়দীপের জুটিতে ফাটাফাটি ফ্যামিলি সিজন ৩ - অজন্তা সিনহা

মনোজ-জয়দীপের জুটিতে ফাটাফাটি ফ্যামিলি সিজন ৩
অজন্তা সিনহা
মনোজ বাজপেয়ী যে শুরু থেকেই এই ওয়েব সিরিজের ইউএসপি, তাতে কারওই কোনও সন্দেহ নেই। তবে, ফিকশন জিনিষটা কখনওই কোনও অভিনেতার একার কাঁধে ভর করে এগোতে পারে না। সেদিক থেকে পরপর দুটি সিজনে যাঁরা এই সিরিজকে পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছেন তাঁরাও কেউ কম যান না। নামের তালিকা দীর্ঘ, তাই সেই বিস্তারে যাব না। আমাদের এবারের আলোচ্য ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান ৩’ অর্থাৎ জনপ্রিয় এই সিরিজের সিজন ৩–সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে এই সিরিজ সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য কিছু তথ্য জানাই।
‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান ১’ প্রথম প্রদর্শিত হয় ২০১৯ সালের জুলাই মাসে লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত টেলিভিশন ক্রিটিকস অ্যাসোসিয়েশন-এর সামার প্রেস ট্যুরে এবং ওই বছরই ২০শে সেপ্টেম্বর আমাজন প্রাইম ভিডিওতে মুক্তি পায়। এটি সমালোচক ও দর্শকদের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা পায়, বিশেষ করে অভিনয়, লেখা ও নির্মাণের জন্য। ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান ১’ পরবর্তীকালে আমাজন প্রাইম ভিডিওর অন্যতম সর্বাধিক দেখা স্ট্রিমিং সিরিজে পরিণত হয়। সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দ্বিতীয় সিজন স্ট্রিমিং শুরু ৪ই জুন ২০২১-এ। তৃতীয় সিজনের ট্রেলার প্রকাশিত হয় ৭ই নভেম্বর ২০২৫-এ। এই বছরই ২১শে নভেম্বর এর স্ট্রিমিংও শুরু হয়ে যায়।
শুরুতেই এই সিরিজের দুর্দান্ত অভিনেতা টিমের কথা বলেছিলাম। এ বাবদ সিজন ৩-এর অন্যতম সেরা আকর্ষণ নিঃসন্দেহে জয়দীপ আহলাওয়াত (রুকমা)! প্রচণ্ড শক্তিশালী এই অভিনেতা এই মুহূর্তে ভারতীয় বিনোদন দুনিয়ায় নিজের অপরিহার্যতা প্রমাণ করেছেন। এই সিরিজের প্রতি ফ্রেমে যখনই তিনি এসেছেন, তখনই দর্শকের প্রাপ্তির ভান্ডার পূর্ণ থেকে পূর্ণতর হয়ে উঠেছে। এছাড়াও এই সিরিজের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন নিমরাত কৌর। মনোজ, জয়দীপ ও নিমরাত ছাড়াও এই সিজনে আছেন প্রিয়ামণি, শরিব হাশমি, গুল পনাগ, সীমা বিশ্বাস, আদিত্য শ্রীবাস্তব, আশ্লেশা ঠাকুর, দর্শন কুমার, বেদান্ত সিনহা, নীরজ মাধব, বিপিন শর্মা, শরদ কেলকার, যুগল হংসরাজ, দিলীপ তাহিল, শ্রেয়া ধন্বন্তরী প্রমুখ। ক্যামিও চরিত্রে আছেন দক্ষিণী তারকা বিজয় সেথুপথি।
তৃতীয় সিজনে কাহিনি উত্তর-পূর্ব ভারতে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যায় এবং দেখানো হয় কীভাবে চিন কোভিড-১৯ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সীমান্ত বরাবর নিজেদের উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে রাখে। একই সঙ্গে একদল আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সংস্থা পরিকল্পিত অরাজকতা সৃষ্টি করে এই অঞ্চলে সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম বিক্রি বাড়ানোর চেষ্টা করে। পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে উত্তর-পূর্ব ভারতে বিস্ফোরণের পর। এরফলে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর শান্তি-পরিকল্পনা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এদিকে শ্রীকান্ত (মনোজ) ও সুচিত্রা তাদের নতুন ফ্ল্যাটে উঠেছে, যা কেনা হয়েছে সুচিত্রার উপার্জনে। ধৃতি এখন কলেজে পড়া এক সামাজিক কর্মী আর অথর্ব স্কুলে ব্যালে শিখছে। শ্রীকান্ত ও কুলকার্ণী শান্তি-আলোচনার উদ্দেশ্যে নাগাল্যান্ডে যায় নেতা ডেভিড খুজো-র সঙ্গে দেখা করতে, যিনি সব বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে এক ছাতার নিচে এনে শান্তিচুক্তি করানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু ডেভিডের নাতি স্টিফেন, যে তার নিজস্ব এমসিএএস গোষ্ঠীর নেতা, সে এই শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে। ডেভিড, কুলকার্ণী ও শ্রীকান্তের সঙ্গে তীব্র বিতর্কের পর রাগে বেরিয়ে গিয়ে স্টিফেন প্রতিশ্রুতি দেয় যে সে এই আলোচনাকে নস্যাৎ করবে।
ইংল্যান্ডে বিলিয়নিয়ার দ্বারকানাথ প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের একটি সংগঠন দ্য কালেকটিভ-এর সঙ্গে কাজ করছেন, যাতে ভারতে প্রধানমন্ত্রী প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেন। দ্বারকানাথ ফ্রিল্যান্স কন্ট্রাক্টর মীরা এস্টনকে নিয়োগ করেন পরিস্থিতি এমনভাবে তৈরি করার জন্য, যাতে ওই চুক্তি এগোতে পারে। মীরা নাগাল্যান্ডের ড্রাগ/অস্ত্র চোরাচালানকারী রুকমার সঙ্গে যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে মেজর সমীরকে ব্যবহার করে। ডেভিড, কুলকার্ণী ও শ্রীকান্ত যখন বিদ্রোহী নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে যায়, তখন তাদের অনুসরণ করছিল স্টিফেনের লোক ছুবা। ছুবা দেখে, রুকমা ও তার লোকেরা এমসিএএস বিদ্রোহীদের ছদ্মবেশে এসে কাফেলাটিতে হামলা চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে ডেভিড প্রাণ হারান এবং গুরুতর আহত শ্রীকান্ত অসহায়ভাবে দেখতে থাকে কীভাবে রুকমা কুলকার্ণীকে হত্যা করে। মোটামুটি এভাবেই এগিয়েছে ‘ফ্যামিলি ম্যান ৩’-এর গল্প!
সিরিজটি প্রযোজনা ও পরিচালনা করেছেন রাজ ও ডিকে এবং সুমন কুমার ও তুষার শেঠের সঙ্গে মিলে গল্প-চিত্রনাট্যও লিখেছেন ওঁরা। সংলাপ লিখেছেন সুমিত অরোরা, সুপর্ণ ভার্মা ও মনোজ কুমার। মিউজিক সচিন-জিগার। এই সিজন স্ট্রিমিং হচ্ছে ২৬টি পর্বে। তৃতীয় সিজন মুক্তির সঙ্গে সঙ্গেই আগের দুটি সিজনের মতোই দুর্দান্ত সাড়া ফেলে দিয়েছে দর্শক দরবারে। মনোজ বাজপেয়ী একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এই সিরিজ তাঁকে যে জনপ্রিয়তা দিয়েছে, সেটা তাঁর এত বছরের কেরিয়ারে একটা রেকর্ড বলা যায়। এই রেকর্ড আসলে একটি সংখ্যা মাত্র নয়, অভিনেতা মনোজের চূড়ান্ত দক্ষতা ও আত্ম নিবেদনের প্রতীক–প্রজন্মগতভাবে যা অন্যদের উদ্বুদ্ধ করে চলেছে।
গেছি বারবার ষষ্ঠ ও সপ্তম পর্ব - ময়ূরী মিত্র

গেছি বারবার
ময়ূরী মিত্র
৬ . শিবগঞ্জ পথ
দুপুরে বাসন্তীর শিবগঞ্জ রওনা দিয়েছিলাম৷ পথে দুপাশে সবুজ শস্য সমাহার৷ কলাবাগান বেশি৷ তাল নারকেল সুপুরি গাছ৷ এ অঞ্চলের সবুজের ঘনত্ব ও প্রকার দেখার মতো৷ গরমের গাঢ় নীল আকাশ মায়া তৈরি করছিল৷ হয়ত সাদা মেঘের ডিঙিগুলোর মাঝে মাঝে নীলকে আরো গাঢ় লাগছিল৷ গরম ভুলে যদি কখনো দুপুরে গ্রীষ্মের আকাশ দেখি, তাহলে হয়ত বোঝা যাবে রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ঋতুর মধ্যে কেন গ্রীষ্মও মর্যাদা পেয়েছে৷ একটি সবুজ ভরা ক্ষেত্রের ঠিক মাঝে হলুদ উচ্ছে ফুল ফুটে৷ যেন বলছে…দেখো ভাই সবুজ যদি মহান হয়, হলুদ তবে গরবী গর্ভিনী৷
হাইওয়ের ধারের জলাশয়ে ছপছপ পা ফেলে হাঁটছে৷ কালো ঠোঁট সাপের মতো দুলছে কেন যখন ভাবছি, তখন দেখলাম তার ঠোঁটের ফাঁকে সত্যি সত্যি সাপ৷ এ বক খুন্তে বক৷ সাপ এদের প্রধান শিকার৷ বাসন্তীর কাছাকাছি এসে পর পর বোরখার দোকান৷ সাইনবোর্ডে লেখা, এখানে শুধু নানারকম বোরখা পাওয়া যায়৷ আমি লিখি৷ লেখক উচিত অনুচিত নির্ধারণ করেন না৷ তিনি শুধু বলতে পারেন, দেখো এটা ঘটছে৷ দশবছর আগেও এখানে বোরখার এত দোকান দেখিনি৷ একটু পরেই বিশাল পোস্টার…পাঁচ দিনের ঈদ উৎসবে মহা ইসলামী জলসা৷ এর মানে বুঝিনি৷ সর্বজ্ঞানী সর্বকালেই এসবের মানে বোঝাবার জন্য ঘুরঘুর করে৷ তাঁরা বলতে পারবেন হয়ত৷ মূর্খ শুধু sincerely ব্যথিত হয়৷
মহাইসলামের মানে না বুঝলেও মহানন্দের মানে বুঝলাম শিবগঞ্জ স্কুলে পৌঁছে৷ স্কুলে ছাত্রাবাসে কন্ঠি গলায় ছাত্র খেলায় জিতে চুমু দিচ্ছে ঈদের খোকাকে৷ স্কুলের বাইরে চার গৃহস্থের চার পুকুর৷ কোনোটি মজা কোনোটি তাজা৷ একটি চারকোণ পুকুরের একাধারে রোগা পাতলা আম গাছ৷ টুপটাপ কাঁচা মিঠে আম পড়ছে পুকুরের জলে৷ ভাঙা ঘাটে বসে হাত থেকে মেহেন্দি ঘষে তুলছে তানজিরা৷ জিজ্ঞেস করলাম “মেহেন্দি তুলছিস কেন? এখনো তো উজ্জ্বল আছে৷ “তানজিরা ঝামট দিয়ে বলল” কাল স্কুল৷ স্কুলে এসব পরব কেন?”
“আচ্ছা বেশ৷ তোদের গাছের আম যে জলে পড়ে গেল!”
এবার হাসল৷
“চিংড়ি আম খাবে৷”
“মেহেন্দি তুলে কী করবি? পাশে অনুষ্ঠান হচ্ছে! চল না দেখতে! প্রাইজ পাব আমি!”
“সময় নেই৷ জবা ফুলগুলা তুলতে হবে৷”
এতক্ষণ দেখিইনি, তানজিরাদের বাগান টকটকে লাল৷
মহামূর্খ ময়ূরী এতক্ষণে মহাসূর্য বুঝেছে৷
৭. দার্জিলিং পথ
মৃত্যুকালে মানুষ জীবনকে ভুবন ভাবে নাকি ভুবনের সর্বত্র নিজেকে দেখতে চায় এ নিয়ে ধাঁধাটা থেকেই গেছে আমার৷ হয়ত এ দ্বন্দ্বের মধ্যেই মৃত্যু রহস্যময় থেকে যায়৷ আবার এই প্রশ্নই মৃত্যু কতখানি বিচ্ছেদমূলক তাও বুঝিয়ে দেয়৷ এবারে দার্জিলিংয়ে এক বস্ত্রবিক্রেতার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললাম৷ নাম আদিরাজ৷ ভদ্রলোক বংশসূত্রে ভুটান৷ কবে ও কত পুরুষ আগে পরিবার ভুটানে থাকত, তা জানেন না৷ যবে থেকে পৃথিবী চিনেছেন তবে থেকে মাতৃভূমি হিসেবে তিব্বতকেই জেনে এসেছেন৷ চীন যুদ্ধের আগে ১৯৫৬ সাল নাগাদ আদিরাজের বাবা গোটা পরিবার নিয়ে ভারতে চলে আসেন৷ তখন থেকেই আদিরাজরা দার্জিলিংয়ে৷ আদিরাজ বলছেন “মাদাম আমার বাবা প্রাক স্বাধীনতা যুগেও তিব্বত থেকে কলকাতা আসতেন৷ ব্রিটিশের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য করতেন। no middleman …! বাবা তিব্বত থেকে আনতেন পাহাড়ি নুন ও ফার৷ আর কলকাতা থেকে নিয়ে যেতেন ইলেকট্রনিক জিনিস! ভীষণ মানসিক জোর ছিল বাবার৷ ওই জোর দেখে আমিও ঠিক করেছিলাম ব্যাপারী হব৷ শুধু বিক্রেতা নয় মাদাম৷ ব্যাপারী হয়ে দেশের অর্থনীতির গতিবিধি বুঝব৷ কিন্তু…!”
আদিরাজ চুপ করে গেলেন দেখে প্রশ্ন করলাম “কিন্তু…কী?”
“বাবা ভারতে এসেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন৷ আমি যত বোঝাতে লাগলাম, ভারতে ভালো ভালো ডাক্তার আছে…তুমি ভালো হয়ে যাবে বাবা…ততই অবিশ্বাস করতে লাগলেন নতুন দেশকে! নিজে যে দেশে উৎসাহ ভরে এলেন সেই দেশ তাঁর চক্ষুশূল হয়ে উঠল৷ ছেলেমানুষের মতো সারাদিন কাদঁতেন! বলতেন, মাতৃভূমি ছেড়ে আসার পাপে আমার মারণব্যাধি ধরল৷ মারা যাওয়ার এক মাস আগে বায়না…এপার থেকেই তিব্বত দেখি চল! তো নিয়ে বাবাকে বর্ডারে! মরতে থাকা বাবার সঙ্গে আমারও শেষবার দেশ দেখা! বাবা চলে গেল৷ আমিও আর দার্জিলিং ছাড়িনি৷ কেন জানি না আমার মনে হয়, বারবার মানুষ যদি ভূমি ত্যাগ করে, ভূমিও প্রাণ হারায়! ভূমিকে মেরে ফেলার পাপটা তো দানবের মতো!”
একটানা কথাগুলো বলে বড়ো বড়ো শ্বাস ফেলছিলেন আদিরাজ৷ এবার দোকান বন্ধ করবেন৷ পাহাড়ি বসন্তে একটি সুগন্ধী চুরুট টানতে টানতে বাড়ি ফিরবেন৷ তাঁর শেষ কথাগুলো বিদ্ধ করলেও খানিকটা অপার্থিব লাগছিল৷ বস্তুনির্ভর সত্য বিশ্বাস করাটা তুলনামূলক সোজা৷ অপার্থিবে বিশ্বাস করতে আরো প্রাণ লাগে৷ মাথামুণ্ডুহীন পরামর্শ দিয়েছিলাম কেবল…
“আদিরাজজি বাড়ি ফেরার পথটা দীর্ঘ করবেন৷ ম্যালের এপাশ ওপাশের গলিতে উঁকি দিয়ে দেখবেন ফুটপাথের বিক্রেতারা ঠিকঠাক বাড়ি রওনা দিয়েছেন কিনা!” শুনলেন কিনা কিংবা শুনে বুঝলেন কিনা তা আর দেখিনি৷
আজ শুনলাম আমার বন্ধু চলে গেছে মাসখানেক আগে৷ কর্কট রোগে ভুগল পাঁচবছর৷ চিকিৎসার জন্য নিজের কষ্টের পয়সায় করা বাড়িটা বিক্রি করে দিয়ে আমায় বলেছিল “বাড়ি বিক্রি করেছি তো কী ক্ষতি হল বল! আমার ছেলে, আমার ভালোবেসে বিয়ে করা বরটা তো আমায় আরো কিছুদিন দেখতে পাবে!” নুন কত জায়গায় থাকে! পাহাড়ে সাগরে! জীবিত থাকার সাধে!
তথ্যচিত্রের তথ্য ও হালের এক চিত্র - সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
তথ্যচিত্রের তথ্য ও হালের এক চিত্র
সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
এক অর্থে তথ্যচিত্র দিয়েই ছায়াছবির যাত্রা শুরু। সেই লুমিয়ের ভাইয়েরা আমাদের প্রথম যে ছবি দেখালেন এর শুরু মনে হয় সেখান থেকে। তারপর রবার্ট ফ্ল্যাহার্টি থেকে জিগা ভের্তভ-এর কত না তথ্যচিত্রের বিশ্বময় রসায়ন।
এই বাংলায় যার শুরু হীরালাল সেনের হাতে। যেখানে তিনি বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ঘিরে এক তথ্যচিত্র তৈরি করলেন। আর ছবিটির বিজ্ঞাপনে লিখলেন ‘আমাদের নিজেদের স্বার্থে খাঁটি স্বদেশী সিনেমা’! তারপর আমরা কয়েক দশক পেরিয়ে পেলাম হরিসাধন দাশগুপ্তকে। যিনি এই বাংলার তথ্যচিত্র নির্মাণে পথিকৃৎ-এর ভূমিকায়। তারপর থেকে কত না তথ্যচিত্র এই বাংলায়, সাহিত্য-সংস্কৃতির কত না কৃতীজন, সমাজ, রাজনীতি, জনগোষ্ঠী এমন বিবিধ বিষয় নিয়ে ছবি। সেই চিদানন্দ দাশগুপ্ত, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, বারীন সাহা, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, গৌতম ঘোষ, উৎপলেন্দু চক্রবর্তী, সৌমেন গুহ, আনন্দ পটবর্ধন, রাজা সেন, শঙ্খ ঘোষ পেরিয়ে বহমান এই ধারা। তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারি ফিল্ম-এর জায়গায় নাম হিসেবে উঠে এল নন-ফিকশন ফিল্ম, এসে গেল আত্মজৈবনিক ‘বায়োপিক’। সিক্সটিন, থার্টিফাইভ, সেভেন্টি, সিনেমাস্কোপ, থ্রিডি, সুপার এইট পেরিয়ে চলে এল দূরদর্শন পর্দা। এমনই এক পরিপ্রেক্ষিত- পরিমণ্ডল-এ এখনকার আরেক ছবির কথা আমরা বলি।
পরিচালক সুবীর চন্দ রাঢ় বাংলার জনজাতি সমাজ ঘিরে এক তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। ছবি ‘জাগ্রণ’। বিষয়, এই পেছিয়ে থাকা জনজাতি গ্রাম-সমাজ।চিত্রনাট্য পরিচালকের। তিনি তাদের এগোনোর দিশা স্হাপনের চেষ্টা করেছেন। রাঢ় বাংলা বলতে মূলত, বীরভূম-বাঁকুড়া-পুরুলিয়া-মেদিনীপুর(পূর্ব-পশ্চিম) এই পাঁচ জেলা।
জনজাতি গ্রাম-সমাজ, জনজাতি জনসমষ্টি বলতেই চোখে যে ছবি ভেসে ওঠে, তা প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গে, প্রকৃতি পুজোয় ঘেরা। তার হাত ধরে দুমসা, মাদল, বানাম, টামাক, সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাঁধনা, দাসাই, বাহা, অম্বাবদি পরব-মেলা ও পায়ে পায়ে নাচের ঢেউ। চলে হাড়িয়ার উন্মাদনা।
জনজাতি-জন মানেই , ডাক্তার-বদ্যিতে বুনো গাছপাতা, শেকড়-বাকড়, ওঝা-গুনিন ও পুজো পাঠের নানা সংস্কার। সুবীর বাবু এইদিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। তার ছবির উদ্দেশ্য এইসব প্রথা-আচার-বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসার দিকে। এইজন্য তিনি জনজাতিদের ভেতর থেকেই যে শিক্ষক, যে শিক্ষিত সমাজ তৈরি হয়েছে তাদের কথা শুনেছেন আর দেখার মতো বিষয় হল তিনি এই ছবিতে জনজাতি যুবকদের দিয়েই তাদেরই নানা জীবনযাপন, ঘটনা-উপঘটনা অভিনয় করিয়েছেন। জনজাতি মানুষজনের অংশগ্রহণে এই ঘটনাপ্রবাহের অভিনয় বড় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। পরিচালকের এইভাবে সহ নাগরিকের সংস্কারের তাগিদ সত্যিই খেয়াল করেন মতো।
ছবির চিত্রগ্রহণে তেমন আলাদা কলাকৌশল নেই, নেই আবহের আতিশয্য। নানা প্রসঙ্গ ঘিরে জনজাতি গ্রামগুলির যে স্বভাব-নিসর্গ, তাকেই তিনি ব্যবহার করেছেন, এনেছেন ছৌ নাচের অনুষঙ্গও। ছবির চিত্রগ্রহণে দেবাশিস রায়, গোকুল পান্ডে ও শতদ্রু চক্রবর্তী। আবহ বাণীপ্রসাদ বণিক। পরিমিত আবহে, চিত্রগ্রহণে বিষয়ের আবেদনে ও অভিনয়ে এই তথ্যচিত্র আমাদের কাছে এক অন্য বার্তা নিয়ে আসে।
