ভাণ পত্রিকা BHAAN MAGAZINE

৫৩ তম ই-সংস্করণ ।। ৬৫ তম সংখ্যা  ।। ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

পার্থ হালদার photo

পার্থ হালদার

সম্পাদনা সহযোগী

পল্লব মিশ্র photo

পল্লব মিশ্র

প্রচ্ছদ অলংকরণ

দেবহুতি সরকার photo

দেবহূতি সরকার

অন্যান্য কাজে

সুচরিতা রায় photo

সুচরিতা রায়

অন্যান্য কাজে

পূর্ণতা নন্দী photo

পূর্ণতা নন্দী

অন্যান্য কাজে

মৌলিকা সাজোয়াল photo

মৌলিকা সাজোয়াল

অন্যান্য কাজে

অয়ন্তিকা নাথ photo

অয়ন্তিকা নাথ

অন্যান্য কাজে

কর্তৃক

৮৬, সুবোধ গার্ডেন, বাঁশদ্রোণী, কলকাতা: ৭০০০৭০ থেকে প্রকাশিত।

  • যোগাযোগ :  ৯৬৪৭৪৭৯২৫৬

 ৮৩৩৫০৩১৯৩৪ (কথা /হোয়াটসঅ্যাপ)

৮৭৭৭৪২৪৯২৮ (কথা)

  • Email : bhaan.kolkata@gmail.com 
Reg. No: S/2L/28241 548

সম্পাদকের  কথা

সত্য কী, মিথ্যাই বা কী?— এই  নিয়ে দার্শনিক আলাপে পূর্ণ হয়ে আছে আমাদের শাস্ত্রসমূহ। বেদ-বেদান্ত-স্মৃতি-শ্রুতি-মহাকাব্য-পুরাণ-ধর্ম-দর্শন-সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতি, এরা সব সত্যের সন্ধানে নানা প্রশ্নে, প্রতি-প্রশ্নে আলোড়িত থেকেছে সুদীর্ঘ কাল। নানা জিজ্ঞাসায় সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, ঠিক-বেঠিক, পথ-বিপথ-কে চিনতে চেয়েছে মানুষ। সত্যের সান্নিধ্য পেতেই আমরা ইতিহাসের পুনঃপাঠে, বিজ্ঞানের ধর্মে, কিংবা ধর্মের রাজনীতির সমকালীন পাঠ নিতে চেয়েছি। এই যোঝা নিতান্ত সোজা নয়। সে শেষত নিজের সঙ্গে নিজেরই যোঝা। তবু আজকের এখন, এই একবিংশের দুই দশকের পরও; আবার নতুন করে গুলিয়ে যাচ্ছে সত্য, মিথ্যা। এতদিন যে জ্ঞানে, যে মানদণ্ডে, যে আধারে ‘সত্য’কে যাচাই করতাম সেসব যেন অকেজো, ভোঁতা কিংবা বাতিল হয়ে পড়ছে। গভীর দার্শনিক স্তর থেকে নয়, স্বাভাবিক চলমান জীবনে, আমাদের নিজস্ব পরিসরে সত্যের যে স্বরূপকে যেভাবে টের পেতাম আমরা, আজ সে যেন ছলনাময়ী কুহকিনী। আজকের জেন-জি-এর কাছে সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় ঠিক কোন পথে, কোন অর্থে, কোন যুক্তিতে, কোন্ বিশ্বাসে রূপ নিচ্ছে;- সে সত্য-সন্ধান কি করছি আমরা? যদি না করি, তবে ভবিষ্যতের একটা বড়ো গণ্ডগোল ঘটতে চলেছে, তাকে সামলে ওঠা সহজ হবে না।

ষাটোর্ধ মানুষজন নয়, যারা টেনেটুনে চারটি দশক বেঁচে ফেলেছেন তাদের সিংহভাগ মানুষের মুখে আজকের স্কুল কলেজ পড়ুয়াদের সম্পর্কে ভুরি ভুরি বিরূপ কথা শুনি। শিক্ষিত মার্জিত বাপ-মায়েরা প্রকাশ্যে বলেন ছেলে-মেয়েদের মন-মর্জি তারা বোঝেন না। ততটা প্রকাশ্যে অবশ্য রাজনীতির ভাষা, ক্ষমতার ভাষা, আইন আদালতের ভাষা নিয়ে তেমন কিছু বলেন না তারা। কিন্তু নিশ্চিত বোঝেন সত্য মিথ্যা ন্যায় অন্যায়-এর যে ধারণা দিয়ে তাঁরা সমকালীন ‘এসব’ও বুঝতেন— এখন আর পুরোনো সূত্রে অনায়াসে তাকে পড়ে ফেলা যাচ্ছে না।

নিউজ প্রসবিনী মিডিয়ার কথাই ধরা যাক। একটা সময় টেলিভিশন ছিল না। বেতার ভাষ্য ছিল না। লিখিত সংবাদপত্র ছিল না। তাতেও জগতে সত্য ছিল, মিথ্যা ছিল। পরে ছাপা কথাকে আমরা ‘সত্য’ ভাবতে শিখলাম। রেকর্ডেড মন্তব্যকে ‘আসল’ বুঝতে শিখলাম। কিন্তু সে যে মরীচিকা, কয়েকটি দশকের অভিজ্ঞতাই তা জানান দিল। গল্পের সঙ্গে নিউজের শক্তপোক্ত দোস্তি হয়ে গেছে ততদিনে। বেজাতের ফিকশনের প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে নিজত্ব খুইয়েছে নন-ফিকশন। ব্যাখ্যার গরু গাছে চড়ল। বিশ্লেষণের ধুমে ছয়, নয় হল। ফেক, যার সহজ বাংলা জাল, সেই ফেক নিউজের বারুদে লাগা আগুনে এমন পাকানো ধোঁয়া উঠল যে, কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হল। চোখজ্বালার ওষুধ হিসেবে ‘সিরিয়াল’ কিংবা ‘রিল’-এর রেমিডি যারা বাছলেন তারা কি বাঁচলেন? সেখানেও চিত্ত বিনোদন, মস্তিষ্কের কোষগুলোর লজঝড়ে হওয়ার বিনিময়েই ঘটল! মিথ্যা তথ্য দিয়ে সংবাদ পরিবেশন আর অন্যায় নয়, ‘স্বাধীনতা’ বলে গণ্য হল। ব্যাখ্যার স্বাধীনতা মানা যায়। তা বলে ‘তিল’-এর সত্যকে ‘তাল’-এর সত্য করে তোলাও যে নরকের পথ, এ সত্য কি আমরা অনুভব করতে পারছি না?

তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। উড্রো উইলশন তাঁর ক্রিল কমিশন তৈরি করলেন। দেশ যুদ্ধ করছে কিন্তু দেশের জনগণের উন্মাদনা কোথায়। কমিশন এই উন্মাদনা সৃষ্টিতে কাজ করবে। প্রোপাগান্ডা কমিশন সত্যিই চোখ ধাঁধানো কাজ করেছিল। মাস ছয়েকের রাষ্ট্রীয় মদতে নিখুঁত সাইকোলজিক্যাল প্রচারে জনতা জার্মানি-এর সদ্যজাত শিশুটিকেও জ্যান্ত পোড়ানোর মতো চূড়ান্ত পাশবিকতার পক্ষে চলে আসে। সেই প্রথম এত যত্ন করে বোঝা গেল, লাগাতার প্রচার মানুষের ভেতরের বাসনা গুলোকে উস্কে দিয়ে তার দৃষ্টিপথকে কেবল রুদ্ধ করে না, বরং সে যা সত্যিই চায় না, তাকেই সে একদিন সত্য সত্যই চেয়ে বসে। যে পক্ষে থাকা কে জনতার ন্যায্য ও সত্য বলে মনে হত, তার উল্টো পক্ষের হয়ে কেন যেন সে দালালি করতে থাকে। এবং এই মগজ ধোলাই জনিত নির্বাচনকে সে তার ‘স্বাধীন নির্বাচন’ বলে ভ্রম করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে সব নৈতিক হয়ে ওঠে। যুদ্ধেরও যে নৈতিকতা অতীতে আমরা প্র্যাকটিস করেছি, তার থেকে উল্টো পথে একটা ‘রটনা’ কে সত্য বলে বিশ্বাস করানো হয় গণমাধ্যমকে দখল করে। লক্ষ লক্ষ জনতা, ইহুদী-কমিউনিস্ট-অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক মানুষকে ঠিক কেন ঘেন্না করে, তা নিজেরাই ঠাওর করতে পারে না। আবার এমন একটি রাষ্ট্র নির্মিত ন্যারেটিভকে সত্য বলে প্রতীত হয় যে লজিক্যাল চিন্তার ক্ষমতা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে। হুজুক গুজব সহ ধরে নেওয়া নানা কিছুই সে মানুষের বিশ্বাসে সত্য বলে ভ্রম হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কেটে গেছে সাত সাতটা দশক। পৃথিবীতে পুঁজিবাদ দু-চারবার বড়সড় ধাক্কা খেয়ে সামলে নিলেও এখন আর সে সঙ্কটমুক্ত নয়। ইরাকের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর থেকে যুদ্ধহীন দিন এ পৃথিবী কাটিয়েছে কি? ইদানিং যুদ্ধ এবং শান্তি একইসঙ্গে চলে। ক্ষমতা ভারসাম্য রাখতে যুদ্ধ কেবল লম্বা হয়ে যায়। এক যুদ্ধ তার ম্যারাথনের ব্যাটন অন্য যুদ্ধোন্মাদের হাতে তুলে না দিলে শান্তি মেলে না। এখন পুঁজির স্বার্থে, ক্ষমতার স্বার্থে যুদ্ধ যখন অবশ্যাম্ভাবী তখন যুদ্ধের প্রতি জনতার ঘৃণা থাকলে চলবে না। বরং শান্তির পক্ষে একটা ঘৃণাকে লাগাতার চাষ করে চলতে হয়। মিডিয়ার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। যে মিডিয়া যত যুদ্ধের পক্ষে, সে মিডিয়ার পক্ষে লগ্নি তত বেশি। ফলে আমাদের মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতির রচনা লিখন-এর ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই’— এখন আর সর্বজন স্বীকৃত স্লোগান নয়। রাস্তা ঘাটে বন্ধু স্বজনদের মধ্যে যুদ্ধানুরুক্তি ক্রম বর্দ্ধমান। যে যুদ্ধ চায় সে ভাবে এটা তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত। গোদি মিডিয়া মুখচেপে মিটিমিটি হাসে। সে তার শক্তির (অপশক্তির) পরিমাপ বোঝে। সাধারণ লোকের অনিচ্ছাকে সে ইচ্ছায় পরিণত করতে পারে। সত্য আর সনাতন নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী সত্য নির্মাণ করা সম্ভব!

আমাদের আজকের তথ্যপ্রযুক্তির হাতে গরম প্রমাণ সাবুদের দুনিয়াতেই সত্য কোনঠাসা হয়ে পড়ছে। আমরা রঙিন বিজ্ঞাপনের ঝকঝকে তকতকে আপাতস্মার্ট গালভরা কনক্লুশনকে কনটেক্সট ছাড়াই সত্য বলে বিশ্বাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এমন উপুর্যপরি রকমারি ঘটনা, তথ্য উঠে আসছে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে যে একজন মানুষের পক্ষে সেসবকে তলিয়ে বোঝা প্রায় অসম্ভব। সবকিছু জানার দায় বাড়ছে। সবকিছুর দায় নিতে গিয়ে কোনোকিছুই বোঝা যাচ্ছে না, উপলব্ধির কাছে আবেদন রাখছে না। হাজারও ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আগেই হাজারও ঘটনার তীরে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে মস্তিষ্ক। হাজারও ঘটনার অন্দরে নবরসের বিচিত্র রূপ কোনো ভাবকেই রসোত্তীর্ণ হতে দিচ্ছে না। ভাষার জাদুতে প্রকাশের জোকারিতে গম্ভীর বিষয় ‘আলগা’ হয়ে যাচ্ছে। আর ‘আলগা’ বিষয় গম্ভীর। ধোঁয়াশাই সত্য হয়ে উঠছে বলে ভয় হচ্ছে। Darrell Huff-এর How to lie with statistics যদি কেউ পড়েন, তার আতঙ্ক কয়েকগুণ বাড়বে। তথ্যের কায়দা কানুনের সঙ্গে সত্যের দূরত্ব এতখানি ভেবে বিস্ময় বাড়বেই। অন্যদিকে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ফিলোসফির অধ্যাপক “On Bullshit” নামে একটি ছোট্ট কিন্তু মহামূল্যবান বই লিখেছেন। এই বইতে আমাদের সময়ের সত্য ও মিথ্যার ডাইকোটমিটিকে অত্যন্ত পরিচ্ছন্নভাবে ধরতে পেরেছেন Harry G. Frankfurt। এই যে কোনো কোনো কথাকে আমরা ‘সত্য’ বলে ভাবতে পারি না আবার ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিতে পারি না। এই যে একটা গিলতেও পারি না, ওগরাতেও পারি না’— এই দশাটি এই সময়ের ‘সত্য’। মিথ্যা পৃথিবীতে সবসময় ছিল। সত্য কী এটা বোঝার জন্যও দরকার ছিল মিথ্যার ধারণা। কিন্তু সত্যের প্রতি আগ্রহ ও সম্মানবোধ ছিল মানুষের জীবনের বাস্তব। কিন্তু এই একবিংশে সত্য সম্পর্কে আগ্রহ কমছে। সত্য আর তত সম্মানিত বস্তু থাকছে না। পূর্বে যিনি মিথ্যা বলতেন তিনি জানতেন কোন্ সত্যকে তিনি আড়াল করছেন। অর্থাৎ মিথ্যা বললেও সত্যের ধারণা অটুট ছিল। কিন্তু এই সময়ের বহু মানুষের কাছে সত্য মিথ্যা নিয়েই ডোন্ট-কেয়ার ভাব। সত্য এখন স্বার্থনিষ্ঠ। আমার পক্ষে গেলে সত্য, আমার বিপক্ষে গেলেই মিথ্যা। এমন অসার এবং অবান্তর যদি সত্য সত্যই আজকের বাস্তব হয়,তাহলে যে ত্যাগের পথে প্রকৃত সত্যের বোধ কে ফিরিয়ে আনা যায়, সেই আত্মত্যাগের পন্থা খুঁজে পেতেই হবে। সত্যের বোধ ছাড়া মিছিমিছি এ সংসারে বাঁচাই বা কী, মরাই বা কী!

কলকাতার গালগপ্পোর পর্ব ২১ - কিশলয় জানা

কিশলয় জানা photo

কলকাতার দিশি কেচ্ছা

কিশলয় জানা

সেকেলে কলকাতার দিশি-কেচ্ছার কথা বলতে গেলে রাত কাবার হয়ে যাবে, আরব্য-রজনীর শাহরাজাদী থাকলে হয়ত এক হাজার এক রজনী পার করে দিত। কিন্তু এই অধমের সেই ক্ষমতা নেই, তার উপর সম্পাদকের রক্তচক্ষুর ভয়ও আছে, অতএব ‘যাহা বলিব সাঁটে বলিব’ ; আর নির্বাচিত কয়েকটিই বলব। বহুশ্রুত গালগপ্পোকে ফেনিয়ে বলার মধ্যে কোন কেরদানি নেই।

   আরও অনেক কিছুর মতো কলকাতার দিশি কেচ্ছাও শুরু হয়েছিল দিনরাত নরক-গুলজার করে তোলা বাবুদের সূত্রেই। তাঁরাই ছিলেন নিত্য-নতুন কেচ্ছার জোগানদার। এই দিক থেকে কিছু শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত বাবুদের মধ্যে আপাতভাবে কোন প্রভেদ ছিল না। এঁদের কেউ-কেউ কেচ্ছা রটলে তাতে ‘সুনাম বাড়বে’ বলেই জেনেবুঝে কেচ্ছা করতেন, আবার কেউ-কেউ নিরুপায়ের মতো কেচ্ছার জন্ম দিতেন। যেমন—কলকাতার বাবু-বংশের বিখ্যাত আটবাবুর অন্যতম পলাশীর যুদ্ধ নামক ষড়যন্ত্রে ক্লাইবের পক্ষের সাহায্যকারী  নবকৃষ্ণ এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী এবং বিত্তবান্‌ বাবু চূড়ামণি দত্ত। বাবুয়ানিকে কেন্দ্র করে এবং বড়মানুষী দেখানোর প্রতিযোগিতায় এঁরা কেউ কারুর চেয়ে কম যেতেন না। সর্বদাই কেমন করে এ-ওঁকে হারাবেন, ও-ওঁকে হারাবেন—সেই চিন্তাই মাথার মধ্যে ঘুরপাক্‌ খেতো। এঁদের নিয়ে অনেক গালগপ্পো চালু আছে, আমরা সে-সব এখানে বলব না। আমরা বলব সেই চমকপ্রদ কেচ্ছাটির কথা, যেখানে নবকৃষ্ণ মারা গেছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে চূড়ামণি দত্ত একটি কদর্য কেচ্ছার জন্ম দিলেন। রাজা নবকৃষ্ণ ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ নভেম্বর নিজের বাড়িতেই ঘুমন্ত অবস্থায় পরলোকগমন করেন। সে-যুগে এইজাতীয় মৃত্যুকে অপঘাত মৃত্যুর সামিল বলে মনে করা হতো। যে-মৃত্যুর সঙ্গে সজ্ঞানে অন্তত তিনদিনের গঙ্গাবাস অর্থাৎ অন্তর্জলী যাত্রা, হরিনাম ইত্যাদি জড়িত নেই, তাকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলতে নারাজ ছিল সে-কাল। নবকৃষ্ণ ঘুমের মধ্যে মারা গেলে সকলে কানাকানি করতে থাকে। এইসময় চূড়ামণি দত্ত নিজেও গুরুতর অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে ছিলেন। কিন্তু তিনি যেই শুনলেন নবকৃষ্ণ ঘুমের মধ্যেই মারা গিয়েছেন, কোনরকম অন্তর্জলী যাত্রা বা গঙ্গাবাস না-করেই, তখন অসুস্থ চূড়ামণি ভাবলেন, এবার মওকা মিলেছে নবকৃষ্ণকে ছোট করার। অতএব সেই অবস্থাতেই বিছানা ছেড়ে উঠে বহু ঢুলী এনে নিজে একটি রূপোর পালকিতে বসে গঙ্গাযাত্রায় চললেন। বিয়ের শোভাযাত্রার মতো জাঁকজমক করে শোভাযাত্রা নবকৃষ্ণের বাড়ির সামনে নিয়ে এসে থামলেন চূড়ামণি। শোভাযাত্রায় তখন অসংখ্য লাল পতাকা উড়ছে, কত দল যে নগর-সংকীর্তন করছে তার ঠিক নেই। চূড়ামণির চতুর্দোলাটিতে নামাবলীর চন্দ্রাতপের মাঝে বসে আছেন  চূড়ামণি, মাথায় শালগ্রাম শিলা, তুলসীমালার ঝালর, চারদিকেও তুলসী গাছ। সেই অবস্থায় নবকৃষ্ণের বাড়ির সামনে এসে ঢুলীদের তিনি ইশারা করতেই তারা বিচ্ছিরি অঙ্গভঙ্গি করেই গান গাইতে লাগল—

আয়রে আয় নগরবাসী দেখ্‌বি যদি আয়।

 জগৎ জিনিয়া চূড়া জম আনিতে যায়।।

 জম জিনিতে যায় রে চূড়া জম জিনিতে যায়।

 জপ তপ কর কিন্তু মরিতে জানিলে হয়।।

লোক-দেখান সেই চিৎকার কতটা মনের পক্ষে পীড়াদায়ক, তা আগেই উল্লেখ করেছি। তার উপর শিষ্টাচারবিরুদ্ধ। অবশ্য বাবুরা আর কবেই বা শিষ্টাচার মেনে সব কাজ করেছেন ?

    কলকাতার দিশি কেচ্ছার কথা উঠবে আর “কালীপ্রসাদী হাঙ্গামে”র কথা বলব না, তা কি হয়? হুতোম তাঁর নক্‌শায় এই নিয়ে কটাক্ষ করেছেন। রাজনারায়ণ বসু তাঁর অতি সুস্বাদু বই ‘সেকাল আর একাল’-এ কালীপ্রসাদী হাঙ্গামের কথা বিস্তৃতভাবে বলেছেন। বলেছেন প্রাণকৃষ্ণ দত্ত, তাঁর “কলিকাতার ইতিবৃত্ত” নামক সুখপাঠ্য বইতে। উৎসাহী পাঠক সেসব অরিজিন্যাল পড়ুন, না-হলে সাত নকলে আসল খাস্তা হয়ে যাবে। আমরা সম্পাদকের রক্তচক্ষুর ভয়ে অল্পে সারছি। সেকালের বড়লোকবাবুদের অন্যতম হাটখোলার মদনমোহন দত্তের উত্তরপুরুষ ছিলেন লম্পট ও উৎসন্নে যাওয়া কালীপ্রসাদ দত্ত। নিষিদ্ধ মাংস খাওয়া থেকে শুরু করে অনিয়ন্ত্রিত মদ্যাপান, মেয়েদের শ্লীলতাহানি ইত্যাদি নানা গুণের আধার ছিলেন কালীপ্রসাদ। শেষে বিবি আনর নামের একজন মুসলমান উপপত্নী রাখায় সমাজে ছি-ছি, ঢি-ঢি পড়ে গেল। ভিতরে-ভিতরে রাগে গজরালেও তবুও তখনও বর্ষায় নি সমাজপতিরা। কিন্তু কালীপ্রসাদ তুচ্ছ একটি জমি-সংক্রান্ত বিবাদের কারণে তাঁর এক বড়োলোক আত্মীয়ের সঙ্গে ঝুটঝামেলায় জড়িয়ে পড়লে, সেই বড়োলোক আত্মীয়ের উসকানিতে কালীপ্রসাদ একেবারে সমাজচ্যুত হলেন আর-কি ! শেষে তাঁকে উদ্ধারে এগিয়ে এলেন দত্তকুলের শ্রীকৃষ্ণ রামদুলাল সরকার। এই রামদুলাল আগে খুব দরিদ্র ছিলেন, প্রায় ‘ভিক্ষান্নে বাঁচায় বসুধা’র কেস। শেষে কোন-এক-উপায়ে তিনি মদনমোহন দত্তের কাছে চাকরি পেয়ে যান। সেখানে একদিন মদনমোহনের দেয় টাকা দিয়ে জাহাজ কিনতে এসে দেরি হওয়ায় নির্দিষ্ট জাহাজ কিনতে না পেরে পৃথক একটি নিমজ্জমান জাহাজ কিনে বসেন, যা ডায়ামণ্ডহারবারের কাছে ডুবে গিয়েছিল এবং নীলামে উঠেছিল। নিজের দূরদর্শিতা দিয়ে রামদুলাল বুঝতে পারেন উক্ত জাহাজ কেনা বেশ লাভজনক, কারণ জাহাজটি ছিল দামি-দামি জিনিসে পরিপূর্ণ। রামদুলাল তখন দশ টাকা মাহিনায় মদনমোহনের হৌসে কাজ করেন। জাহাজ নীলামে ডেকে নেওয়ার জন্য তাঁর মালিক মদনমোহন তাঁকে চোদ্দ হাজার টাকা দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। তিনি সেই টাকায় উক্ত জাহাজ কিনে পরে তা এক সাহেবকে বিক্রি করেন এক লক্ষ চোদ্দ হাজার টাকায়। অর্থাৎ পুরো এক লক্ষ টাকা লাভ। রামদুলাল চাইলে গোটা লভ্যাংশই আত্মসাৎ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি এসে প্রভুকে এক লক্ষ চোদ্দ হাজার টাকাই দিয়ে বরং ক্ষমা চাইলেন যে, প্রভুকে জিজ্ঞাসা না করেই অন্য জাহাজ নীলামে ডেকে তিনি কিনে নিয়েছিলেন। যেমন কর্মচারী, তেমনই মালিক। মদনমোহন চোদ্দ হাজার টাকা রেখে এক লক্ষ টাকা রামদুলালকেই ফেরৎ দিয়ে কর্মচারীর বিচক্ষণতার পুরস্কার দিলেন। সেই টাকায় ব্যবসা করে রামদুলাল মৃত্যুকালে রেখে গিয়েছিলেন এক কোটি তেইশ লক্ষ টাকা। একালে যখন যত্র-যত্র কানামামা থেকে নেই-মামার ঘরে-বেঘরে কোটি-কোটি টাকা পাওয়া যাচ্ছে, তখন আমাদের কাছে এই টাকার পরিমাণ বেশি বলে মনে না হলে একটা কথাই বলব, রামদুলাল পরলোকগমন করেন ১৮২৫-এ, অতএব এই টাকার হিসেব উনিশ শতকের তৃতীয় দশকের। ভারত-মার্কিন জলপথ বাণিজ্যের পথিকৃৎ কিন্তু এই রামদুলাল সরকার-ই। আজকাল বাঙালি ব্যবসাকে ডকে তোলায় পারঙ্গম, আর সেকালের বাঙালি উদ্যোগপতিরা ব্যবসায় আঙুল ফুলে কলাগাছ হতেন। তবে এত টাকা কামালেও রামদুলাল শেষ দিন পর্যন্ত মদনমোহনকেই তাঁর প্রভু বলে মনে করতেন এবং খালি পায়ে নত মস্তকে মাস গেলে মদনমোহন যতদিন জীবিত ছিলেন, দশ টাকা বেতন নিয়ে আসতেন।

   এহেন রামদুলাল নিজে নিষ্ঠাবান হয়েও প্রভুর বংশধর কালীপ্রসাদকে জাতে তুলতে একেবারে উঠে-পড়ে লাগলেন। সমাজপতিদের হুংকার দিয়ে বলে উঠলেন, “সমাজ আমার সিন্দুকে। আমি সমস্ত কুলীন-ব্রাহ্মণদের কিনে নেবো!” এই উদ্দেশ্যে শুধু নদীয়ার পণ্ডিত এবং কুলীনদের উৎকোচ ও উপঢৌকন দিতে তিনি দু’ লক্ষ টাকারও বেশি খরচ করেছিলেন। কালীপ্রসাদের ঘরে ‘সমন্বয়-সভা’ বসিয়ে সেখানে কুলীন ব্রাহ্মণ ও কায়স্থদের বিরাট শোভাযাত্রা এনে শেষে কালীপ্রসাদের গৃহে তাঁদের ভোজনের এলাহী ব্যবস্থা করে শেষ পর্যন্ত কালীপ্রসাদকে জাতে তুলিয়েই ছেড়েছিলেন। এমনি তাঁর জেদ ও অহংকার। অবশ্য এ-কাজে ঘর শত্রু বিভীষণের মতো বাগড়া দিয়েছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ জামাতা রাধাকৃষ্ণ মিত্র। এমনকি নির্দিষ্ট দিনে শ্বশুরকে ঘরে তালা দিয়ে আটকে পর্যন্ত রেখেছিলেন, কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারেননি। এই নিয়ে সেকালে চারণিকরা যে কত গান বেঁধেছিলেন তার ইয়ত্তা নেই। রামদুলাল কালীপ্রসাদের মাসোহারারও ব্যবস্থা করেন, যা তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁরই ব্যবস্থাক্রমে বহাল ছিল। অনেক পরে এই পরিবারের এক কর্তা তাঁর মেয়ের সঙ্গে বিখ্যাত ইয়ং-বেঙ্গল রামগোপাল ঘোষের বিবাহ দিলে এই মাসোহারা বন্ধ হয়ে যায়।

    পরচর্চা আর পরনন্দা বাঙালির দুটি জনপ্রিয়তম শখ। পরের কারণে বাঁশ দিয়া বলি, এ-জীবনে তুমি ধন্য হও—এই-ই আমাদের প্রিয়তম কামনা। অতএব নিঃশ্বাস ফেলার আগেই আর-একটি কেচ্ছার অবতারণা করা যাক্‌। বাঙালি হয়ে জন্মেছেন আর ভাওয়াল সন্ন্যাসীর কেস্‌ কিংবা জাল প্রতাপচাঁদের ঘটনার কথা শোনেননি, আমাদের মধ্যে এমন লোক দুটি মেলা ভার। বঙ্কিমের বড় দাদা সুলখেক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এ-কথা জানতেন বলেই ‘জাল প্রতাপচাঁদ’ লিখে জমিয়ে দিয়েছিলেন। বর্ধমানের রাজা তেজচন্দ্রের তেজ অব্যাহত রাখতে একের-পর-এক সাত-সাতটি বিবাহ করেন। এমনই এক রাজবধূ বসন্তকুমারী। তাঁর ভাই মহাতপচাঁদ ছিলেন তেজচন্দ্রের দত্তকপুত্র। রাজার শ্যালক, পরানচন্দ্র, যিনি ছিলেন বসন্তকুমারীর পিতা এবং আরেক রাজবধূ কমলকুমারীর ভাই, তিনি একেবারে ধূর্ত শৃগালের মতো রাজার দুর্বলতার সুযোগে নিজের নাবালক পুত্রের বকলমে হয়ে ওঠেন সর্বেসর্বা। রাজার প্রথমা রানির গর্ভজাত প্রতাপচাঁদই ছিলেন সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। কিন্তু তাঁকে বঞ্চিত করতে পরানবাবু কলকাঠি নেড়ে নিজের নাবালক পুত্রকে উত্তরাধকারী ঘোষণা করান। অসুস্থ অবস্থায় অন্তর্জলী যাত্রা করার ছুতোয় পরানবাবুর ষড়যন্ত্রের হাত থেকে বাঁচতে প্রতাপচাঁদ পালিয়ে যান, পরে ফিরে এলে তাঁকে জাল প্রতাপচাঁদ বলে হাজতে দেওয়া হয়। এই মামলার সূত্রে জড়িয়ে পড়েছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর, রাজা দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় প্রমুখ অনেকেই। পরানচন্দ্রের ঘুষের প্রভাবে ইংরেজ বিচারক পর্যন্ত বিচারের নামে প্রহসন করেন, মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে প্রতাপচাঁদের কফিনে শেষ পেরেক পোঁতেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। আসল হয়েও নকল সাব্যস্ত হয়ে প্রতাপচাঁদ জেলে যান, সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। এদিকে তেজচন্দ্র তখন পরলোকে। তাঁর বিধবা বসন্তকুমারীর সঙ্গে বর্ধমান রাজপরিবারে আসা যাওয়ার সূত্রে উকিল দক্ষিণারঞ্জনের ধীরে-ধীরে প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রেমের ফাঁদ পাতা এ ভুবনে দুই প্রেমিক-প্রেমিকা প্রথমবার পালানোর চেষ্টা করে ধরা পড়লেও, দ্বিতীয়বার আর কেউ পারলেন না। কলকাতায় ফিরে দক্ষিণারঞ্জন রানি বসন্তকুমারীর পক্ষে আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করলে আদালত শমন দিয়ে রানিকে কলকাতায় নিয়ে আসেন এবং সেখানেই তৎকালীন পুলিশ ম্যাজিষ্ট্রেটকে সাক্ষী রেখে দক্ষিণারঞ্জন বসন্তকুমারীকে বিবাহ করেন। এই বিবাহ নিয়ে সেদিন সমাজে যে কী পরিমাণ আলোড়ন উঠেছিল, কেচ্ছা রটেছিল, একালে বসে তা অনুমান করাও মুশকিল। তবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবা-বিবাহ দেওয়ার বহু আগে এটিই প্রথম বিধবা-বিবাহ।

    সেকালে কেচ্ছা মানেই গুপ্তপ্রেম, চুরি-চামারি, জাতপাত নিয়ে খবরদারি। নবকৃষ্ণ যখন ছলে-বলে-কৌশলে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছ থেকে অগ্রদ্বীপের গোপীনাথকে হরণ করলেন এবং অনেক অনুনয়-বিনয়ের পরেও যখন ফেরৎ দিতে অস্বীকার করএলন, তখন তাঁর নামেও চুরির অপবাদে কোর্টে মামলা হয়েছিল। তিন লক্ষ টাকা কৃষ্ণচন্দ্র ঋণ নিয়েছিলেন নবকৃষ্ণের কাছ থেকে। তার বিনিময়ে নবকৃষ্ণ অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ মূর্তি চিরকালের মতো কাছে পেতে চাইলেন। তবে সে চাওয়া প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল বলাই বাহুল্য। শেষে কায়দা করে সেই মূর্তি ফেরৎ পান কৃষ্ণচন্দ্র, মতান্তরে কৃষ্ণচন্দ্র আসলের অনুরূপ নকল মূর্তি নিয়ে যান, বিলকুল ধরতে না পেরে।

   রামমোহনকে নিয়েও কিন্তু কেচ্ছার অন্ত ছিল না। তিনি ব্রাহ্ম হয়ে আগেই জাতিচ্যুত হয়েছিলেন বলে অবশ্য সমাজের চোখে তাঁর কীর্তিকলাপ তেমন প্রতিরোধের মুখে পড়েনি, এক সতীদাহ ছাড়া। না-হলে সমাজের হিসেবমতো কালীপ্রসাদ যা অন্যায় করেছিলেন, রামমোহনও তেমনটাই করেছিলেন কিন্তু। সেকালে ভারতবর্ষের সবচেয়ে মহার্ঘ বাইজি নিকি বাইকে নিয়ে তিনি স্বামী-স্ত্রীর মতোই থাকতেন। অনেকে বলেন, রামমোহন-পুত্র রমাপ্রসাদ আসলে নিকি-বাইয়েরই সন্তান। এ-নিয়ে প্রকাশ্যে ঢাকঢোল না বাজালেও, কানাকানি যে নিতান্ত কম হয় নি, তা বোঝাই যায়। নতুবা সেকাল পেরিয়ে পরবর্তীকালেও সে-কেচ্ছা ঝড়ের গতিতে প্রবাহিত হত না।

    দিশি কেচ্ছার কথা যখন উঠলই, তখন আর-একটি কেচ্ছার কথা চুপি-চুপি বলি। বিষয়টি কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বলে সচরাচর কলকাতা-কেন্দ্রিক কেচ্ছার মধ্যে কেউ এই সাপের ঝাঁপি খোলেন না। কেচ্ছাটি আর কাউকে নিয়ে নয়, ভারতবর্ষের যে-কোন ভারতীয় ভাষায় প্রকাশিত প্রথম দৈনিক ‘সম্বাদ প্রভাকরে’র সম্পাদক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তকে নিয়ে। হ্যাঁ, পাঠক ঠিকই ধরেছে, ইনিই সেই আদি অকৃত্রিম বাঙালি-রসনার কলম্বাস ছড়াকার ঈশ্বরগুপ্ত। বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, দীনবন্ধু মিত্র প্রমুখদের পেট্রন ঈশ্বরগুপ্তের স্ত্রির সঙ্গে তাঁর বনিবনা ছিল না, আজ এ-কথা সকলেই জানেন। চিরদিন দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। এ-হেন ঈশ্বর গুপ্ত না-কি সমকামী ছিলেন। তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সেকালের একজন অভিজাত পরিবারের কিশোরের। এই নিয়ে নানা বিবাদ-বিসম্বাদেরও খবর পাওয়া যায়। এই কেচ্ছাটি যাঁর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি তাঁকে সে-যুগের কেচ্ছা-সম্রাট বলতে পারি, তিনি হলেন গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য্য তর্কবাগীশ। সেইসময়কার ‘সম্বাদ ভাস্কর’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে এই কুৎসাগুলি তিনি ছড়াতেন। অবশ্য ঈশ্বরচন্দ্রও কম যান না, তিনিও ‘পাষণ্ডপীড়ণ’ নামের আর-একটি কাগজ বের করে এর উত্তর দিতেন। গুড়গুড়ে ভট্টাচার্য্যের অসীম প্রতিভা। একালের একজন জনপ্রিয় লেখকের মতো (সাহিত্যিক নন, লেখক) কার অন্দরমহলে কে কার সঙ্গে রাতে ঘুমাচ্ছে, কে কার গর্ভের আসল পিতা, কে কে গুপ্ত রাঁঢ় নিয়ে থাকে—এসব একেবারে অন্দরমহলে উঁকিঝুঁকি মেরে জোগাড় করা খবরাখবর গুড়গুড়ে ভট্টাচার্য্যের কাছেই থাকত। এক-একটি কাগজ বার হত, আর বাঙালি মেতে উঠত নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের মতো রোমাঞ্চ নিয়ে। মোটের উপর এ-নিয়ে সেদিনের বাঙালি জীবন যাকে বলে ছিল সরগরম।

    দিশি কেচ্ছার ভাঁড়ার অন্তহীন। সে সহজে শেষ হওয়ার নয়। কিন্তু সম্পাদকের রক্তচক্ষুর ভয়ে আপাতত খান তিনেক কেচ্ছার কথা পেড়েই থামতে হচ্ছে। পরে পাঠক আস্কারা দিলে না-হয় আবার কলকাতার কেচ্ছার কথা ফাঁদা যাবে। এই নিয়ে একটি বইয়ের কথা বলতে পারি, পাঠক এই কেচ্ছাগুলির সঙ্গে আরও কিছু কেচ্ছা পড়তে পারবেন। বইটি হল অকালপ্রয়াত সুবীর রায়চৌধুরীর লেখা ‘সেযুগের কেচ্ছা, একালের ইতিহাস’।

পানু পাল: জনজাগরণের নৃত্য ও নাট্য তৃতীয় পর্ব - মধুমিতা পাল

মধুমিতা পাল image

পানু পাল: জনজাগরণের নৃত্য ও নাট্য

মধুমিতা পাল

যুগান্তকারী নৃত্য, নাটক, পথনাটক, প্রবন্ধ—তার সৃষ্টির প্রচুর কাজ ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যার দার্শনিক চিন্তা তার ব্যক্তিত্ব, তার লেখা এবং প্রবন্ধগুলোর মধ্যেই ছড়িয়ে আছে। 

ওর একটা প্রবন্ধ থেকে পাঠ করছি আমি। পড়ে শোনাচ্ছি—প্রবন্ধ: সংস্কৃতির সংকট একাল ও সেকাল- সংস্কৃতির সংকট ও তার সঙ্গে প্রগতিশীলদের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার সূত্রপাতের জন্য কালান্তর পত্রিকার সম্পাদক পরিচালকদের অশেষ ধন্যবাদ, এটি কালান্তর পত্রিকায় বেরিয়েছিল। দীপেন বন্দ্যোপাধ্যায় তার নিবন্ধ ‘আজকের নাটকে’ হৃদয়ে ভারাক্রান্ত হয়ে চল্লিশের দশকের গণশিল্পী নামে পরিচিত কৃতি শিল্পীদের বর্তমান মঞ্চে উপস্থিতি অসম্ভব কামনা করেছেন। এই কামনা কি বাস্তবে রূপায়িত হওয়া সম্ভব?  এক্ষেত্রে সাধন দাশগুপ্ত-এর সঙ্গে গলা মিলিয়ে আমার অস্পষ্ট কথা না। কিন্তু আবার শোভনলাল দত্তগুপ্ত-এর সঙ্গে একমত হয়ে বলি, এই কল্পনার বাস্তবায়ন কমিউনিষ্টদের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের মধ্যে। আর এর মধ্য দিয়েই অপূর্ণতার অন্ধকারকে কাটিয়ে পূর্ণতার আলোর রাজ্যে প্রবেশাধিকার। এখানেই মূল প্রশ্ন কেন্দ্রীভূত—সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অন্যান্য সব ক্ষেত্রের মতোই প্রতিনিয়ত চলেছে শ্রেণিসংগ্রাম। পুঁজিবাদ সবকিছুর মতো সংস্কৃতিকেও পণ্যে পরিণত করেছে, পুঁজি যেখানে মুখ্য, বিবেক সেখানে গৌণ। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল এদের কাছে নামমাত্র। অর্থাগমের সহজ সুলভ পথে এদের আনাগোনা তাই তারা বেছে নেয় বিকৃত সংস্কৃতির পথ। আর এর পিছনে ধনতান্ত্রিক প্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্রের ও সরকারের সকল যন্ত্র ক্রিয়াশীল। এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যারা সুস্থ-সবল চেতনা সৃষ্টি করে যাবার ব্রত নেয় তাদের বিরুদ্ধে নেমে আসে নিষ্ঠুর আক্রমণ এবং এদের জন্য তৈরি থাকে সরকারের দমন-পীড়ন-নিষ্পেষণ। সমগ্র অবস্থানটাই চলছে ধনিক শ্রেণির অর্থনৈতিক কাঠামোকে ভিত্তি করে। চল্লিশের দশককে গণনাট্যের স্বর্ণযুগ বলে যে আখ্যা দেওয়া হয় তাতে আমি দ্বিমত পোষণ করি। এ যুগের শুরু ও শেষ প্রায় একসময় ছিল। নতুনত্বের আকস্মিকতার চমক বোম্বে থেকে আসা নৃত্যগোষ্ঠী এবং বাংলায় বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন নাটকের আবির্ভাব তৎকালীন মঞ্চ ধারাকে চুরমার করে দিয়েছিল। সৃষ্টি করেছিল একেকটা মাইলস্টোন আলোড়ন সৃষ্টিকারী নাটক, নৃত্যনাট্য। সৃষ্টি হয়েছিল অসাধারণ সমস্ত পেইন্টিং। ঘূর্ণির টানে প্রায় সব নামিদামি শিল্পীরা কেন্দ্রীভূত হয়েছিলেন গণনাট্য আকাশে। কিন্তু তাদের উদয় এবং অস্ত সমসাময়িক।

আসলে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ আইপিটিএ যখন ভেঙে গেল বা ৫০ বছর পূর্তি উৎসবে যখন তাদেরকে ডাকল না, এরকম অনেকেই ডাকেনি, ব্রাত্য করে দেয়া হয়েছিল, তখন থেকেই ওর মন ভাঙতে শুরু করল। তবুও কিন্তু আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়নি, ওর কথার পরিপ্রেক্ষিতে, একটা সভ্যতার পরিণতি অবশ্যই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হবে। তার জন্য মানুষকে শ্রেণিসংগ্রাম বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। গণনাট্য সংঘ শ্রেণির সচেতনতা বিস্তারে কাজ করতে চেয়েছিল। ভাঙ্গা গলায় তিনি অনবরত বলে যেতেন এই ভাবনাটাই যে প্রতিধ্বনিত হয়েছে প্রতিমুহূর্তে আমি সেই ভবনা থেকে বেরোই কীভাবে?

এত কিছু কথা বলেছি, কিন্তু বলা হয়নি ওর “হাঙ্গার এন্ড ডেথ”, অন্যতম মাইলস্টোন একটা বিখ্যাত সৃষ্টি আইপিটিএ যুগের। রংপুরের বিনয়ের বোন শ্রীমতী রায়চৌধুরী দাদুভাইয়ের সঙ্গে নাচেন নৃত্যনাট্যটিতে। এই নৃত্যনাট্যে দাদুভাই হতেন ডেথ আর রায়চৌধুরী হতেন হাঙ্গার। এমনও কথিত আছে গ্রামেগঞ্জে, এই নৃত্যনাট্য দেখে তাদের যা কিছু আছে চাল-ডাল তাদের গায়ের সামান্য গয়না সমস্ত খুলে পার্টি কমরেডদের হাতে তুলে দিত। নৃত্যনাট্য দেখার পরে হাপুস নয়নে কেঁদেছিল সরোজিনী নাইডু, দাদুভাই স্তম্ভিত হয়ে গেছিল। তেতাল্লিশের মন্বন্তরের উপরে ওখানে এটি তৈরি হয়েছিল, করেছিল পানু পাল।

এই বিষয়ে একটি একটি উদাহরণ দিচ্ছি আপনাদের সামনে। এপিক থিয়েটার বেরিয়েছিল “A case study in Revolutionary realism. river raychaudhuri in Epic theatre writes entirely about the central ballet troop.  While Tripti Mitra in two page articles remembers her youth.”4

এবার আমি সরাসরি চলে যাব পানু পাল যা লিখেছেন, তার কথা, তার জবানবন্দি—আমি কৃষক আন্দোলনের লোক, শুধু সেই সূত্রে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া। এখন তো সব কিছুকে ভুলে গিয়ে এগিয়ে যাবার সময়। এই সময়ে আমার মত বাতিল হয়ে যাওয়া অগোছালো প্রায় নিস্ব লোকের কথা জানতে কার বা দায় পড়েছে। তবুও আমি জানিয়ে যাচ্ছি সময়ের সাক্ষী রেখে যাচ্ছি আপনাদের সামনে। বান্ধা গ্রামে আমার জন্ম। বাড়িতে রাজনৈতিক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেই কবে খুব ছোট আমি তখন দাদুর হাত ধরে খদ্দরের সদর্পে আউরে যেতাম, প্রাদেশিকতা শেখানো বুলি।

ক্রমশ…

আরিস্তোফানেস - কুন্তল মুখোপাধ্যায়

কুন্তল মুখোপাধ্যায় image  

আরিস্তোফানেস

কুন্তল মুখোপাধ্যায়

গ্রীক নাটকার আরিস্তোফানেস (C446-386BCE)-কে কমেডির জনক আখ্যা দেওয়া হয়, তাঁর নাটকে স্যাটায়ার/ব্যাঙ্গ,মজাদার-রসাত্মক সংলাপ, কথোপকথনের সমাহার লক্ষ করা যায়। তাঁর সময়ের এথেন্স পেলোপোনেশিয়ান যুদ্ধ (৪৩১-৪০৪ খৃষ্টপূর্ব) প্রসূত এমন এক সময় যখন সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক পরিবর্তনের এক জোয়ার এসেছিল। অনেকেই এই সময়কে গ্রীসের সাংস্কৃতিক, মেধাচর্চারবিশিষ্ট অধ্যায় বলে চিহ্নিত করেছেন। আরিস্তোফানেস সুপরিচিত তাঁর স্যাটায়ারের জন্য, তাঁর নাটকগুলিতে প্রচ্ছন্নভাবে সমাজের অসংগতি, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সরাসরি কঠোর ভাষার বদলে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ ব্যবহার করলে কঠিন সত্যও মানুষ সহজে গ্রহণ করে, শুধু বিনোদন নয়, ভাবতে থাকে—“এমনটি কেন হল”,  আসলে হাসির আড়ালে গভীর সত্য ও তীব্র প্রতিবাদ সূচীত হয়। প্রাচীন এথেন্স শুধু নয়, বিভিন্ন সমাজেই নতুন ফসল ঘরে তোলার সময় যেসব ধর্মীয় কৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হত, সেখানে সং সেজে, মুখোশের অন্তরালে সমাজের ক্ষমতাবান দের প্রশ্ন করা হত, তাদের কাজ নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করা হত। আরিস্তোফানেসের নাটক এমনই কমেডির আদলে গড়ে উঠেছিল। সেই সময়ের কমেডি নাটকে দুটি শিবির পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে বাক্‌ যুদ্ধ করত—এই বিষয়টিকে আগুন বলা হত। নাটকের মূল দ্বন্দ্ব, নৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক মতবিরোধ স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হত। অর্থাৎ আগুন হ’ল–কমেডি নাটকের যুক্তি নির্ভর বিতর্ক। এর মাঝে নাটকের মধ্যভাগে পাত্র-পাত্রীরা মঞ্চ বা অভিনয় স্থল থেকে চলে গেলে কোরাস সরাসরি দর্শকদের উদ্দেশ্যে নাট্যকারের হয়ে বক্তব্য রাখত তাঁকে পারাবাসিস বলা হত। পরবর্ত্তীকালে এখান থেকেই এলিয়েনেশন-এর জন্ম। কাহিনির প্রবাহ থেকে কিছু সময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন থেকে নাট্যকারের মতামত প্রকাশ পেত। আরিস্তোফানেসের নাটকে এমনটাই দেখা যেত। তাঁর নাটকে তদানীন্তন গ্রীক জনসমাজের মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে–যা কোনো কোনো সময় ইতিহাসকারদের অসম্পূর্ণ কাজকে সম্পূর্ণ করেছে। এইভাবে সফোক্লেস ও ইউরিপিদেস-এর যুগকে অতিক্রম করে, তিনি সেই প্রাচীন গ্রীসে এক আধুনিক নাট্যাভাসের সূচনা করেন।

আরিস্তোফানেসের প্রথম নাটকগুলি ‘দি ব্যাংকোয়েটার্স’, ‘দি ফ্রাগস্’ (৪২৫ খৃষ্টপূর্বে লিখিত হলেও ৪০৬ খৃষ্টপূর্বে অভিনীত) তেমন চর্চার মধ্যে আসে না, অবশ্য এসব নাটকের ক্ষেত্রেও তিনি অভিনবত্ব এনেছেন। যেমন–ফ্রাগস্-এর মাধ্যমে লেনিয়া উৎসবে কোরাসের ব্যবহার। লেনিয়া ছিল তুলনামুলক ভাবে স্থানীয় ও অন্তরঙ্গ উৎসব ব্যান্ডের কোরাস দর্শক রুচি অনুযায়ী জনপ্রিয় কৌতুক সৃষ্টি করে। আবার অনেকে ব্যান্ডকে মৃত্যু ও পাতাল জগতের সীমান্ত রক্ষকের প্রতীক বলেও ব্যাখ্যা করেন। ডায়োনিসাসের পাতাল লোকে যাবার পথে ব্যান্ডদের দেখা মেলে। আরিস্তোফানেসের এগারোটি নাটক (১১টি) উদ্ধার করা গেছে যেগুলির মধ্যে ৯টি ৪০৫ খৃষ্টপূর্বের মধ্যে অভিনীত হয়েছে। এগুলিকে ওল্ড কমডিজ বলা হয়। আর দুটি নাটক তাঁর পরিণত জীবনের রচনা, যেগুলিকে মিড্‌ল কমেডিজ বা নিউ কমেডিজ বলা হয়। সময়ের ক্রম তালিকানুযায়ী নাটকগুলি হল—

১) আখার নেইয়াস (৪২৫ খৃষ্টপূর্ব) আকারনীয়বাসীরা

২) হিপ্পেইস (৪২৪ খৃষ্টপূর্ব)– নাইটস, বীর রাজপুরুষেরা

৩) নেফেলাই (৪২৩ খৃষ্টপূর্ব)– মেঘ।

৪) স্ফিকেস (৪২২ খৃষ্টপূর্ব)– ওয়াসপ্‌, বোলতা

৫) ইরিনি (৪২১ খৃষ্টপূর্ব)– পিস, শান্তি

৬) ওরনিথেস (৪১৪ খৃষ্টপূর্ব)– বাউস, পাখি।

৭) লাইসিসত্রাতা (৪১১ খৃষ্টপূর্ব)

৮) থেসমোফোরিয়াজসে (৪১১ খৃষ্টপুর্ব)– নারীদের উৎসব

৯) বাত্রাখোয়া (৪০৫ খৃষ্টপূর্ব)- ফ্রগ, ভেক

১০) একক্লিসিয়াজুসে (৩৯২ খৃষ্টপূর্ব)– নারীদের পরিষদ

১১) প্লুতোস (৩৮৮ খৃষ্টপূর্ব)– ধনসম্পদের দেবতা

এছাড়াও আরিস্তোফানেসের লেখা কয়েকটি নাটকের খন্ডাংশ পাওয়া যায়, যেগুলির অভিনয়ের সময়ই শুধু জানা গিয়েছে। এগুলি হ’ল–

ক) দেইতলেস (৪২৭ খৃষ্টপূর্ব) ব্যাঙ্কোয়েটস্‌, ভোজন।

খ) ব্যাবলনীয় (৪২০ খৃষ্টপূর্ব)

গ) ফার্মার্স (৪২৪ খৃষ্টপূর্ব)– কৃষক।

আরিস্তোফানেসের নাটকগুলিতে সেই সময়ের দৈনন্দিন জীবনের ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নাটকগুলিতে থিয়েট্রাকিলিটি প্রবল। কোরাসের ব্যবহারে অবাস্তব বা পশুপাখিদের প্রত্যক্ষ করা যেত। যদিও তারা সাধারণ এথেনীয়ানই ছিলেন। তাঁর নাটকে সমাজ, রাজনীতি, যুদ্ধ যেমন এসেছে, তেমনই কবি, দার্শনিক বা অগ্রজ নাট্যকারদেরকে রসিকতা ও ব্যাঙ্গ সমালোচনা এসেছে। যুদ্ধনীতি, বিশেষকরে পেলোপেনৈশিয়ান যুদ্ধের বিরুদ্ধে তিনি সাহসের সঙ্গে সমালোচনা করেছেন। আকারনীয়বাসীরা বা আখারচেইয়াস নাটকে যেভাবে কমেডির আড়ালে সমসাময়িক যুদ্ধ ও রাজনীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন, তা বিস্ময়কর। যুদ্ধ চলাকালীন যুদ্ধ উন্মাদনার মধ্যে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের বিরোধিতা করে, শান্তির স্বপক্ষে মতামত রেখেছেন, কোরাসের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন, স্পার্টা আর এথেন্সের দীর্ঘকালীন যুদ্ধে মানুষের কী কী ক্ষতি হয়েছে। আরিস্তোফানেসের প্রায় সব নাটকেই সমসাময়িক রাজনীতির কথা উঠে এসেছে। ওয়াপ্‌স (৪২২), বাউস (৪১৪), ক্লাউড্‌স প্রভৃতি নাটিকে আইন আদালত, জুরী ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা (এমনকি সক্রেটিসকে মঞ্চে নিয়ে আসতে দ্বিধা করেননি)-র সমালোচনা করেছেন। তবে লাইসিস্ত্রাতা (৪১১) নাটকে যেভাবে গ্রীক রমনীরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে– সেক্স স্ট্রাইক, যৌন অমান্যতা প্রদর্শন করেন তা বর্তমান সময়ের নাটকেও বিরল। লাইসিসত্রাতার নেতৃত্বে এথেন্স নারীরা, শপথ নিয়ে বলেন, কোনো পুরুষ, কোনো স্বামী, কোনো প্রেমিক আমাদের কাছে চরম উত্তেজিত অবস্থায় এসে প্রেম নিবেদন করলেও আমরা কোনভাবেই তাদের কাছে নিজেদের সমর্পন করব না। সুন্দর পোশাকে সুসজ্জিত হয়ে আমাদের পুরুষদের কাছে নিজেদের আরও মোহময়ী করে ভুলব, কিন্তু স্বেচ্ছ্বায় তাদের সঙ্গে কোনো শারীরিক সম্পর্কে আবদ্ধ হব না। এমনতর সেক্সুয়াল ডিসওবিডিয়েন্সর চিত্র কখনও লাইসিসত্রাতার কথনে উঠে আসে। আধুনিক রাজনীতির মূল কথা—দুর্নীতিগ্রস্থরা চান জনগনের অর্থ আত্মসাৎ করতে। আর সেই কারনেই তারা মানুষের দৃষ্টি ঘোরাতে সবসময় নানা ঝঞ্ঝাট বাধাতে চায়। তাঁর শেষের দিকের নাটক একিক্সসিয়াজুসে ও তোস বা ওয়েলথ্‌ এ তাঁর কমেডি একটু প্যারোকিয়াল হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে ওয়েলথ এর মধ্যে মর‍্যালিটি প্লের ছায়া দেখা গিয়েছিল, কোথাও হয়ত তিনি প্লেটোর সাম্যবাদের সমর্থক হয়ে উঠেছিল। এথেন্সের পতনের পর তাঁর লেখার বদল ঘটে। আর ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। রাজনীতির ধারও অনেকটা কম এমন মানসিকতা থেকে তাঁর শেষের দিকের নাটকগুলি, আগেকার নাটকগুলি থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়ে, প্রাসঙ্গিকতাও নষ্ট হয়।

ছোটদের ছবি: অলিভারের টুইস্ট - অরিত্র দে

অরিত্র দে image

ছোটদের ছবি: অলিভারের টুইস্ট

অরিত্র দে

65th - magazine image ‘অলিভার টুইস্ট’ পড়ার একটি বড় কারণ হল এটি চার্লস ডিকেন্স লিখেছেন। চার্লস ডিকেন্স কল্পনাধর্মী গল্পের একজন অগ্রদূত। মানুষের স্বভাব ও সমাজ সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল খুবই গভীর। তাঁর লেখায় মানুষের চরিত্রের দিকগুলো অন্ধকার হলেও সূক্ষ্মভাবে ফুটে ওঠে। অলিভার টুইস্ট মূলত লন্ডন শহর, তার উপকণ্ঠ এবং নগরজীবনের গল্প। এতে শহরের অপরাধজগতের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। উনিশ শতকে যখন ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের শুরু, সেই সময়কার লন্ডনের মানুষের জীবন এতে দেখানো হয়েছে। বিশেষ করে লন্ডনের অনাথ শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ এবং উচ্চবিত্তদের দ্বারা তাদের উপর হওয়া শোষণ ও প্রতারণার কথা এখানে উঠে এসেছে। অলিভারের জন্ম একটি ওয়ার্কহাউসে। জন্মের সময়ই তার মা মারা যান, ফলে সে অনাথ হয়ে পড়ে। এরপর সে একটি অনাথাশ্রমে বড় হয়। অনাথাশ্রম ছেড়ে কাজের খোঁজে বের হলে দেখা যায়, তখন শিশুশ্রম খুব অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। সে এখানে-সেখানে ছোটখাটো কাজ করে, কিন্তু অনেক সময়ই কোনো পারিশ্রমিক পায় না। একসময় সে একটি চোরের দলে জড়িয়ে পড়ে। সে পকেটমার হয়ে যায়। তাদের কাজ ছিল মানুষের রুমাল চুরি করা। একদিন সে ধরা পড়ে এবং আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। বিচারক তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে তাকে ছেড়ে দেন। পরে অলিভার সৎ মানুষ হওয়ার চেষ্টা করে এবং অপরাধজগত থেকে দূরে থাকতে চায়। কিন্তু দলের নেতা তাকে সহজে ছাড়তে চায় না এবং ব্ল্যাকমেল করে আবার অপরাধের পথে টেনে আনার চেষ্টা করে। অলিভার টুইস্ট এমন একটি উপন্যাস, যেখানে সমাজ ও পরিবেশ কীভাবে মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে তা দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে এটি দেখায়, সব প্রতিকূল প্রভাবকে অতিক্রম করে মানুষ কীভাবে নিজের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে। একেবারে চলচ্চিত্রপযোগী প্লট। 

উপন্যাসকে চলচ্চিত্রে রূপান্তর করা সহজ কাজ নয়। কারণ বই ও সিনেমার গল্প বলার ধরণ, গতি এবং চরিত্র গঠনের পদ্ধতি একে অপরের থেকে আলাদা। তাই নির্মাতাদের ঠিক করতে হয়—উপন্যাসের কোন অংশগুলো রাখা হবে, কোনগুলো সংক্ষিপ্ত করা হবে, আর কোনগুলো বদলানো হবে—যাতে সিনেমাটি সুন্দর ও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা যায়। উদাহরণস্বরূপ, একটি উপন্যাসকে সিনেমায় রূপ দিতে গেলে সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ঘটনা ও চরিত্রকে ছোট করে বা কমিয়ে আনতে হয়।65th- magazine

‘Twist’ ২০২১ সালের ছবি। ভালো ছবি নয়। শুধু ভালো লাগে এই কারণে যে ক্লাসিককে ক্লাসিক থেকে আলাদা হয়ে দেখিয়েছে। উপন্যাসের আধুনিক রূপ। এই সময়ের গল্প। টুইস্ট এক গ্রাফিতি আর্টিস্ট। প্রতিভা আছে। প্রতিষ্ঠা নেই। নেইসর্বস্ব যাপন। অগত্যা অপরাধ জগত। গ্যাংস্টারস। মাইকেল কেইন এখানে গ্যাং লিডার ফাজিন। তাঁর সংলাপগুলো সিনেমার সম্পদ। তাঁকে পর্দায় দেখতে এখনও বেশ ভালো লাগে। Sky যে পরিচিত গল্পকে আবার একইভাবে না করে নতুনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ডিজনি যেভাবে Oliver & Company–তে উপন্যাসটির নিজস্ব ব্যাখ্যা সফলভাবে তুলে ধরেছিল, সেভাবে এই সিনেমাটি ততটা সফল হতে পারেনি।

২০০৫ সালের ‘Oliver Twist’ সমালোচকদের কাছে প্রশংসা পেয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এটি বক্স অফিসে তেমন সাফল্য পায়নি। বিখ্যাত এবং বিতর্কিত পরিচালক রোমান পোলানস্কি পরিচালিত এই ছবিটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে নির্মিত। ফাজিনের চরিত্রে স্যার বেন কিংসলে অসাধারণ, কারণ তিনি চরিত্রটির মধ্যে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে ডুবিয়ে দিতে পেরেছিলেন। তবে সমালোচনা হলো—একটু বেশিই নিরাপদ। অন্য ‘Oliver Twist’-এর বাইরে এখানে নতুন কিছু নেই। এই কারণে কিছু সমালোচকের মতে ছবিটিতে স্বতন্ত্রতা ও নতুনত্বের অভাব ছিল, ফলে কিছু অংশে এটি একটু নিরস মনে হতে পারে। তবে এই ছবিতে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আছে। সবচেয়ে লক্ষণীয় হল মিসেস মেলাই চরিত্রটির অনুপস্থিতি, যার ফলে গল্পটি আরও বেশি করে আর্টফুল ডজার এবং তার সঙ্গী কিশোরদের দলকে ঘিরে এগিয়েছে।

ডিজনির অ্যানিমেটেড সিনেমা ‘Oliver & Company’, যা চার্লস ডিকেন্সের ‘Oliver Twist’ থেকে অনুপ্রাণিত, এই ক্লাসিক গল্পটির সবচেয়ে মৌলিক ও আকর্ষণীয় সংস্করণগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। এখানে অলিভার একজন গৃহহীন ছোট বিড়ালছানা, যে বেঁচে থাকার জন্য ফাজিন নামে এক মানুষের নেতৃত্বে থাকা কুকুরদের একটি দলে যোগ দেয় এবং শহরের রাস্তায় জীবন কাটায়। মূল উপন্যাসে ফাজিন চরিত্রটিকে কিছুটা সহানুভূতিশীলভাবে দেখানো হলেও, এই সিনেমায় তাকে আরও বেশি পছন্দনীয় ও মানবিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ছবিটি মাঝারি মানের সাফল্য পেয়েছিল। অনেকে মনে করেন, ৯০–এর দশকের ‘ডিজনি রেনেসাঁ’ শুরু হওয়ার পেছনে এই সিনেমারও কিছু ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে এর অ্যানিমেশন স্টাইল ও গানগুলো খুব প্রশংসা পায়। “Why Should I Worry?” গানটি সমালোচকদের কাছ থেকে দারুণ প্রশংসা পেয়েছিল এবং সেরা মৌলিক গানের জন্য গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কারের মনোনয়নও পেয়েছিল। এই ছবিতে কণ্ঠ দিয়েছেন জোয়ি লরেন্স, বিলি জোয়েল, চিচ মারিন, বেট মিডলার এবং ডম ডেলুইসের মতো বিখ্যাত শিল্পীরা। যদিও এটি ডিজনির সবচেয়ে পরিচিত অ্যানিমেটেড সিনেমাগুলোর মধ্যে নয়, তবুও ‘Oliver & Company’ ধীরে ধীরে অনেক ভক্তের প্রিয় হয়ে উঠেছে এবং এর ফ্যান-ফলোয়িং খুব ভালো।

১৯৪৮ সালে মুক্তি পাওয়া ডেভিড লিনের নির্মিত ‘Oliver Twist’ চলচ্চিত্রটি ভিক্টোরিয়ান লন্ডনের গৃহহীন শিশুদের যে নোংরা, অন্ধকার ও করুণ পরিবেশে থাকতে হতো, তা অত্যন্ত জীবন্তভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। এর আগে লিন চার্লস ডিকেন্সের আরেকটি উপন্যাস Great Expectations অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার ফলেই এই সিনেমাটি হয়ে উঠেছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মনোগ্রাহী, যা উপন্যাসটির বিশেষত্ব ও আবেগকে সুন্দরভাবে ধরে রাখতে পেরেছে। ফাজিন চরিত্রে অ্যালেক গিনেস এবং বিল সাইক্স চরিত্রে রবার্ট নিউটনের অভিনয় ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। বিবিসির মতে, এই সিনেমাটি পরবর্তী ডিকেন্স-ভিত্তিক চলচ্চিত্রগুলোর জন্য একটি মানদণ্ড স্থাপন করে। পরে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট তাদের সেরা ১০০টি ব্রিটিশ চলচ্চিত্রের তালিকায় এই ছবিটিকে ৪৬তম স্থানে রাখে।

সব সময়ের সেরা মিউজিক্যাল ছবিগুলোর মধ্যে ১৯৬৮ সালে নির্মিত ‘Oliver!’ নিঃসন্দেহে অন্যতম। ক্যারোল রিড পরিচালিত এই ছবি মূল গল্পের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেও একেবারে নতুন ও মৌলিক মনে হয়। এর বড় কারণ হল, রিড ছবিটি বানিয়েছিলেন লায়নেল বার্টের ১৯৬০ সালের একই নামের স্টেজ মিউজিক্যালের উপর ভিত্তি করে। ছবিতে রয়েছে অনেক স্মরণীয় গান, যেমন “Food, Glorious Food,” “Consider Yourself,” এবং “You’ve Got to Pick a Pocket or Two।” মুক্তির পর ছবিটি সমালোচকদের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা পায়। শুধু গান নয়, এর চিত্রগ্রহণ ও অভিনয়ও বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। ফাজিনের চরিত্রে রন মুডি এবং বিল সাইকস চরিত্রে অলিভার রিড তাঁদের অভিনয়ের জন্য আলাদা করে প্রশংসা পান। আর অলিভার টুইস্ট চরিত্রে মার্ক লেস্টার ও দ্য আর্টফুল ডজার চরিত্রে জ্যাক ওয়াইল্ড তাঁদের অভিনয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বড় অভিনেতা হওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়েছিলেন। ৪১তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে ছবিটি দারুণ সাফল্য পায়। এটি মোট ১১টি অস্কারের জন্য মনোনীত হয় এবং ছয়টি পুরস্কার জেতে—এর মধ্যে ছিল সেরা ছবি, সেরা পরিচালক (রিড) এবং কোরিওগ্রাফার ওন্না হোয়াইটের জন্য বিশেষ সম্মাননা। আজও Oliver! সর্বকালের সেরা ব্রিটিশ চলচ্চিত্রের তালিকায় উল্লেখযোগ্যভাবে স্থান পায়। এটি প্রমাণ করে যে ছবিটি দর্শকদের মনে কতটা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।

রুদ্ধশ্বাসে দেখার মতো সুপার ন্যাচারাল থ্রিলার ‘নিশির ডাক’- অজন্তা সিনহা

অজন্তা সিনহা image

রুদ্ধশ্বাসে দেখার মতো সুপার ন্যাচারাল থ্রিলার ‘নিশির ডাক’

অজন্তা সিনহা

65th magazine - ajanta shinhaবাংলা ওয়েব সিরিজের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই একের পর এক দৃষ্টান্তমূলক কাজ করেছেন পরিচালক জয়দীপ মুখার্জি। তাঁর পরিচালিত সিরিজে টানটান রহস্য তো থাকেই, সঙ্গে ব্যাখ্যাতীত কিছু আলো-ছায়াময় ঘটনা–সবার ওপরে গানের প্রাধান্য। হইচই-এর নতুন সিরিজ সুপার ন্যাচারাল থ্রিলার ‘নিশির ডাক’ও এই ঘরানারই অনুসারী। গান এখানে আবহ নয়, মুখ্য ভূমিকা হয়ে ওঠে বলা যায়। এখানেও আমরা দেখি একদল পিএইচডি ছাত্রছাত্রী বিস্মৃত এক শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী নিশিগন্ধা ভাদুড়ির ওপর গবেষণা করতে সোনামুখীতে আসে। প্রসঙ্গত, নিশিগন্ধা এই মাপের শিল্পী, যার গানে মুগ্ধ হয়েছিলেন স্বয়ং গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

65th magazine - ajanta shinhaকিন্তু ছাত্রছাত্রীর দলটি যে উৎসাহ, উদ্দীপনা নিয়ে এসেছিল গ্রামে, তা অচিরেই আতঙ্কে পর্যবসিত হয়। কারণ, নিশিগন্ধার অতৃপ্ত আত্মার উপস্থিতি। শীঘ্রই তারা বুঝতে পারে, গ্রামটি প্রতিহিংসাপরায়ণ আত্মা নিশি-র ভয়ঙ্কর উপস্থিতিতে আক্রান্ত, যেখানে গান গাওয়া জীবনঘাতী হতে পারে। প্রতিটি পর্বে ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় নিশির কিংবদন্তি হয়ে ওঠার যাত্রাপথ এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অভিশাপের ইতিহাস। অতীতের নানা ট্র্যাজেডির সঙ্গে জুড়ে থাকা ভয়াবহ ঘটনাগুলো একের পর এক ছাত্রছাত্রীদের ওপর নেমে আসে।

সোনামুখীতে আসার পর ছাত্রছাত্রীরা খুব দ্রুত টের পায় তারা এক ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়ে পড়েছে। এক বন্ধুর মৃত্যুর পর তারা বুঝতে পারে, গ্রামে গান গাওয়া বিপজ্জনক। জানা যায়, নিশির আত্মা অতীতে ছয়জন সঙ্গীতশিল্পীকে হত্যা করেছিল। ঘটনা পরম্পরায় একজন কনস্টেবল মারা যায় এবং সেই সূত্রেই ছাত্রছাত্রীর দলটি রাতে গ্রামে আটকে পড়ে। এরপর তারা এমন একটি ঘর খুঁজে পায়, যেখানে লুকিয়ে ছিল এমন কিছু, যা ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের প্রতীক বলা যায়।

দলের একজন ছাত্রকে গ্রাস করে নিশি। এক রহস্যময় বৃদ্ধা ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এবং এক ছাত্রী অদ্ভুত সব চিঠি পায়। গ্রাম সম্পর্কে ভাবতে ভাবতে সে অনুভব করে, হাড়-হিম নীরবতার গভীরে লুকিয়ে আছে এমন এক গল্প–যা তার কখনও জানা উচিত ছিল না। এই পর্ব থেকেই গল্পটি এগিয়ে যায়, যেখানে অতীতের অভিশাপ এবং বর্তমানের ভীতিকর অভিজ্ঞতা একসূত্রে বাঁধা পড়ে।

এই সিরিজের অভিনেতারা হলেন শ্রীজা দত্ত, সুরাঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজদীপ গুপ্ত, সোমক ঘোষ, সত্যম ভট্টাচার্য, স্বেতা মিশ্র, অরুণাভ দে, অনুভব কাঞ্জিলাল, অর্ণব ব্যানার্জি, মুকুল কুমার জানা, ছন্দক চৌধুরী, রৌনক ভৌমিক, মৈনাক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঋক চট্টোপাধ্যায়। আপাতত ছয় পর্বের প্রথম সিজন স্ট্রিমিং হচ্ছে হইচই চ্যানেলে। টানটান চিত্রনাট্য, দুর্দান্ত লোকেশন ও সেট এবং চমৎকার আবহ–সব মিলিয়ে রুদ্ধশ্বাসে দেখার মতো হয়েছে এই প্রযোজনা। কনসেপ্ট আর্য রায়। গল্প লিখেছেন শ্রীজীব। মিউজিক বিনীত রঞ্জন মৈত্র। সিনেমাটোগ্রাফি টুবান। প্রযোজনা এসভিএফ এন্টারটেইনমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড।

গেছি বারবার চতুর্থ ও পঞ্চম পর্ব - ময়ূরী মিত্র

ময়ূরী মিত্র  image

গেছি বারবার

ময়ূরী মিত্র

৪. ইন্দ্র বিশ্বাস পথ

কেমন একটা হয় আমার! পুরোনো দিনের মানুষ, তিনি যদি অচেনাও হন, চলে গেলে মনে হয় পৃথিবী কী যেন একটা হারাল৷ মা ধরণী একটা গয়না হারাল৷ নিজের এ মনোভাবের ব্যাখ্যা আজও দিতে পারব না৷ শুধু মনে আছে, কোনো বুড়োমানুষ মারা গেলে  আমার থেকে লুকোতেন মা। ইন্দ্রবিশ্বাস রোডের এক প্রান্তে লেডিস পার্ক। সেটায় শুধু লেডিসরা বসতেন কিনা জানি না অবশ্য৷ বকুলে ভরে থাকত পার্কটা। অনেকগুলো বকুল গাছ। সেই সঙ্গে মাটিতে ঝরা বকুলের পাহাড়। ঝরা ফুলও তো গন্ধ দেয়। লেডিস পার্ক মনে পড়লে একঝাঁক সুগন্ধ পাখি হয়ে ছুটে আসে। এই লেডিস পার্কের কাছে একটি বাড়িতে প্রাইভেট টিউশন পড়াতেন পিসি। আমি তো চিরকালই কাকা পিসিদের কুত্তা। কুত্তা হতেই ভালোবাসতাম আরকি! কেউ বাইরে বের হল তো ছুটলাম পিছু পিছু। পিসির সঙ্গেও যেতাম তাঁর টিউশন বাড়ি। এই বাড়ির সবথেকে বুড়ো মানুষ গভীর রাতে চলে গেলেন। ভোরের বেলা যখন পিসির সঙ্গে গেছি, দেখলাম ছাদের ওপর শুয়ে আছেন।  আকাশ ভর্তি মেঘ সেদিন।যতবার এই আকাশতলে শোয়ানো ঠাণ্ডা শরীর দেখেছি, মানুষটির আর না ফেরা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি।  বদ্ধ ঘরের মৃতদেহ আমাকে এই অনুভব দিতে পারেনি।সেদিনও বুঝে গেলাম, টিউশন বাড়ির বুড়ো কর্তা ফিরবেন না। ফিসফিস করে বললাম “বকুল এনে ঢেলে দেব পিসিমণি!” পড়াতে গিয়ে আচমকা মৃত্যু দেখে পিসিমণি হতচকিত হয়ে গিয়েছিলেন ! চট করে উত্তর দিতে পারলেন  না।এক ছুটে নীচে নেমে রাস্তা পার হলাম। বেশ কিছু বকুল ফ্রকে ভরে ছড়িয়ে দিলাম সাদা চাদরে। ঘন হয়ে ছিল ফুলগুলো। পায়রার পাখার রঙে মেঘ। সঙ্গে ঠাস বুননের বকুল কতটা মানিয়েছিল আজ আর মনে করতে পারি না। বুড়োবাবুকে যখন নীচে নামানো হল, ধাক্কাধাক্কিতে ফুলগুলো বুক থেকে বিছানায় গড়িয়ে পড়েছিল। দেখলাম বুকের কাছে মাটি লেগে। মাটি থেকে ফুল কুড়িয়েছিলাম। ফুলের মাটি মাটিপুত্রের বুকে। সেদিন স্কুল যাইনি৷

পরদিন স্কুল ডায়েরিতে মাকে দিয়ে মিথ্যে লিখিয়েছিলাম ৷

“মা লেখো আমার জ্বর হয়েছিল। একশো-দুশো যা হোক লেখো। কিন্তু কিছুতেই লিখবে না কাল আমি অনেকটা কেঁদেছিলাম।” 

অনেকবছর পর বিয়ে হয়ে আবার ফিরেছিলাম ইন্দ্র বিশ্বাস রোডে। অতনু তখন  “শনিবারের চিঠির” সম্পাদক সজনীকান্ত দাসের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। যে ঘরে তাঁর সঙ্গে প্রথম বাস, সে ঘরে বড়ো শিকের দক্ষিণের জানলা। হাওয়া বাতাসে নতুন বেডকভার ওড়ে। আকাশের যেন পূর্ণ অবস্থান সেগুন কাঠের খাটে। একটাই অসুবিধে জানলা দিয়ে আকাশ দেখা গেলেও ভুবনসংসার দেখা যায় না। যা দেখতে না পেলে মরমে মরি গো!

ঘরের সামনে দিয়ে সিঁড়ি নেমে গেছে! ঠিক মুখোমুখি সিঁড়ির দেওয়ালে লুডোর ছকের ডিজাইন। প্রতি ছকে চার ফোঁকর।  চোখ রেখে ছোটোবেলার রোডটা রোজ নতুন করে মাপি।রোডের ওপাশের মাঠে ল্যাংটা বাচ্চাদের খেলা দেখি। একদিন  বৃষ্টি নামল।সে বৃষ্টিতে ইন্দ্র বিশ্বাসের রাস্তা জলে ভর্তি হয়ে গেল। মাঠের ঘাসও জলে গুবগুবে। মৃতদেহ নিয়ে লরিটা ঠিক আমার লুডোর ছকের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ফোঁকরের মাঝ দিয়ে দেখতে গিয়ে  মরা শরীর  টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। একবার এই ফোঁকর আরেকবার ওই ফোঁকর। কখনো খণ্ড পা কখনো হাঁফহীন বুক। চোখ বন্ধ করে ফেললাম। খানিক পরে চোখ খুলে দেখি কটি জলখণ্ড! আমাকে সে শীতল করে গেছে৷

৫. খানপুর পথ

ছোটোবেলায় মায়ের থেকে একটু দূরে গেলেই মনে হয়, বাবা!  কত দূরে মা রয়ে গেল।বুকে তখন দুটো ডানা গজাত ঝটপট। আমার তখন ন-দশ বছর।  আমার দুই  কাকা সল্টলেকের শ্যামলী আবাসনে কোয়ার্টার পেলেন। এই দুই কাকা আমার খুব প্রিয়।আমার ছোটোবেলার বড়ো হয়ে যাওয়ার অনেকটা এঁদের কাছে। আগে একসঙ্গে থাকতাম।  এবার আলাদা বাড়িতে থাকবেন জেনে মন খুব খারাপ হত।মাঝে মাঝে কাকা পিসিদের সঙ্গে চলে আসতাম শ্যামলীর কোয়ার্টারে। কখনো স্কুল করে কখনো তিন-চারদিন ধরে স্কুল কামাই দিয়ে। বাকি বন্ধুদের ব্যাপারে বলতে পারি না! তবে আমার বাড়িতে স্কুল কামাইয়ের ব্যাপারে অঢেল অনুমতি ছিল। যেবার টানা থাকতাম শ্যামলীতে দুপুরবেলা

কোয়ার্টারের চারতলার ছাদে উঠতাম। বিশেষ করে শীতকালে। শিরশির হাওয়া দিত। ছাদ থেকে দেখতাম টালা ট্যাঙ্ক দাঁড়িয়ে আছে রোদ মেখে৷

আমরা তখনও বেলগাছিয়ায় ভাড়াবাড়িতে! কাজেই হিসেবমতো মা আছেন টালার পেছনে ইন্দ্র বিশ্বাস রোডে। চোখে ছবি আসত।

‘মা জানলার ধারে চুল আঁচড়াচ্ছে। আজ কি অশ্বত্থ পাতা লাগিয়েছে তেলের সঙ্গে! না না না! একদিনও পাতা বন্ধ করা উচিত নয় মায়ের! শেষে আমার মতো ন্যাড়ামুন্ডি হয়ে না যায়! হয়ত দুপুরবেলাতেই হ্যারিকেন টেবিলল্যাম্প সাদা ন্যাকড়া ন্যাকড়ায় মেজে নিয়েছে! কিন্তু আজ তো আমি নেই! সন্ধেবেলায় লোডশেডিং হলে টেবিলল্যাম্প আর কার জন্য জ্বালবে মা! দেখো গিয়ে হয়ত একা ল্যাম্পে চোখ রেখে বসে থাকবে!’ 

সে কত কথা! কথার পিছে কথা! একটা আস্ত গল্প বানিয়ে ফেলতাম কোয়ার্টারের ছাদে দাঁড়িয়ে! অথচ টালা থেকে শ্যামলী কতটুকু আর দূর বলুন!

তখন সল্টলেকে আবাসন ও ব্যক্তিগত বাড়ি দুইই খুব কম। মাঠের পর মাঠ শুধু। মোটা মোটা ঘাস। ছিঁড়লে আঠা বেরোয়। আমি ভাবতাম, এ নিশ্চয় বিশেষ ধরণের  দুধঘাস। সল্টলেকে যত বাড়ি বেড়েছে ওই ঘাস দেখিনি আর। যে কথা হচ্ছিল, বিস্তৃত ফাঁকা মাঠের পর অনেক দূর দেখতে পেতাম শ্যামলীর কোয়ার্টারের ছাদ থেকে। উল্টোডাঙ্গার স্টেশন দিয়ে রেলগাড়ির আওয়াজ আসত স্পষ্ট। আওয়াজ যত এগোত মনের ছবিগুলোয় আরও কষ্ট লাগত! মাকে নিয়ে শিশুর ব্যাথা আনন্দ…কোনটা কখন আসে তা যেমন বোঝা যায় না, তেমনি কী যুক্তিতে তাকে সুখ কিংবা দুঃখ বলে চিহ্নিত করা হবে তাও না! ধানশূন্য মাঠ যখনই দেখেছি বুক খাঁ খাঁ করত। ফাঁকা মাঠ ঘিরে রাখত তাল সুপুরি গাছ।তখন গাছগুলোর ওপর রাগ!

“এই হুঁদো গাছ সরে গিয়ে মাঠটাকে ছড়িয়ে দে! আরও একটু বড়ো করে দিলে নিশ্চয় মাঠটা ধানে ভর্তি করে ফেলবে!” 

একবার সূর্যাস্তে ওরকম ধান ছাঁটা ক্ষেত দেখলাম।আল দিয়ে আসছে কজন মানুষ! বেচারীরা যাচ্ছে নিজের কাজে! আমার মনে হচ্ছে ওরাই ক্ষেতটাকে ফাঁকা করে দিয়েছে! তাই ঘেন্না দুঃখে ক্ষেতমাতা গায়ে সন্ধে মেখেছে! ঠিক যেমন করে আমার মা অভিমানে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকে অবিকল সেই ভঙ্গি! সেই সূর্যাস্ত সেই ধান হারা ক্ষেত আজও একখানি বিষাদছবি হয়ে আছে !

কাল গ্রামের একটা স্কুলে গিয়েছিলাম।কাজের ফাঁকে একবার ক্লাস ওয়ানের শ্রেণিকক্ষে গিয়েছিলাম। দু-তিনজন বাচ্চা খাবার খাচ্ছিল। ক্লাসরুমের পাশে টানা জমি। তাতে বিশেষ ফল ফুল নেই। কিন্তু যথেষ্ট সবুজ নিয়ে সে আছে বসে। একটি মেয়েকে  জমিটা দেখিয়ে বললাম “মাঝে মাঝে পড়ার ফাঁকে জমিটা দেখবি!”

সে বললে “ও তো রোজ দেখি! মাঠ৷”

আমি তার চুলের মধ্যে আঙুল চালিয়ে বললাম “মা”

সে আবার বললে “মা বাড়িতে ৷”

উঁহু। আরও কাছে৷

ভূমি থেকে দূরত্ব কমানোর অপেক্ষা শুধু৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *