৫৬-তম-ই-সসকরণ।।৬৮ তম সংখ্যা।। মে, ২০২৬

পার্থ হালদার photo

পার্থ হালদার

সম্পাদনা সহযোগী

পল্লব মিশ্র photo

পল্লব মিশ্র

প্রচ্ছদ অলংকরণ

সুচরিতা রায় photo

সুচরিতা রায়

অন্যান্য কাজে

পূর্ণতা নন্দী photo

পূর্ণতা নন্দী

অন্যান্য কাজে

মৌলিকা সাজোয়াল photo

মৌলিকা সাজোয়াল

অন্যান্য কাজে

অয়ন্তিকা নাথ photo

অয়ন্তিকা নাথ

অন্যান্য কাজে

কর্তৃক

৮৬, সুবোধ গার্ডেন, বাঁশদ্রোণী, কলকাতা: ৭০০০৭০ থেকে প্রকাশিত।

  • যোগাযোগ :  ৯৬৪৭৪৭৯২৫৬

 ৮৩৩৫০৩১৯৩৪ (কথা /হোয়াটসঅ্যাপ)

৮৭৭৭৪২৪৯২৮ (কথা)

  • Email : bhaan.kolkata@gmail.com 
Reg. No: S/2L/28241 548

সম্পাদকের কথা

মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করতে নেই। চেহারা নিয়ে, ভাষা নিয়ে, উচ্চারণ নিয়ে, পোষাক আশাক, খাদ্যাভ্যাস নিয়ে হাসি ঠাট্টা করতে নেই। আলাদা মানে খারাপ নয়, ওরা অনেকক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে ভালো হতে পারে। জানলা দরজা খুললে ওদের আমাদের বন্ধুত্ব হবে। দেখা সাক্ষাৎ হবে। বিনিময় হবে। বানানো ভয় ঘুচবে। অন্য কালচারের বলে আলাদা করে দিতে নেই। হাসি তামাশা করতে নেই। ভেদাভেদ কোরো না। ওদের নাক আমাদের মতো উচ্চ নয়, অতএব ওরা আমাদের শত্রু— এমন অশিক্ষা যাতে তোমার না হয়! ছোটোবেলায় বাবা বলতেন বঙ্কিমের সাম্য পড়ো। জ্যাঠা বলতেন আমাদের সংবিধান-এ বাবা সাহেব বলেছেন… দাদু বলতেন ভোগ যাদের মুখ্য তারা দেবতা নিয়েও আমরা-তোমরা করে। জানিস না, বিবেকানন্দ বলেছেন— আপাত দ্বৈত, খণ্ড-বিখণ্ড বলে বিভ্রম জন্মালেও অদ্বৈত ব্রহ্মই সত্য। মা পড়তেন রবি ঠাকুর—’এই ভারতের মহামানবের সাগর তীরে’। ঠাম্মা বলতেন, মা বলেছেন তিনি সৎ-এর ও মা, অসৎ-এর ও মা। বড়ো হয়ে ঠাট্টা করতাম। চোর-ডাকাতে মা বললেও তুমি সাড়া দেবে? একটুও না দমে তিনি বলতেন বা-রে! ভালোর চেয়ে বিগড়ে যাওয়া সন্তানের যে বেশি শুশ্রূষা জরুরি!

এত প্রেম, এমন ভালোবাসা, এত দূর দৃষ্টি, এমন সহিষ্ণুতা, এমনতর দায় নিজের কাঁধে নেবার আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা মানুষ কোত্থেকে পায়! শুভ চিন্তা, কল্যাণ চিন্তায় অষ্টপ্রহর সজাগ থাকতে পারত কি করে ওরা? পারতো, কেননা একটা কল্যাণবোধ-এর মহল ছিল আকাশে বাতাসে। কালোও যে ভালো একথা আমরা শিখেছিলাম সহজভাবে। সুবলের বাবা না ফিরলে আমার মা-বাবা ভেবেছে, ওরা খাবে না, আমরা খাবো কী করে, দু-টো বাড়ির পরের বাড়িতে উপোস হলে, আমাদের গলার ভাত নামতে চায় না—এ শিক্ষা আমাদের সহজ শিক্ষা। নীতিকথার বই পড়ে মুখস্থ করা শিক্ষা নয়।

হোস্টেলে বকুলের সঙ্গে একপাতে খাবার খেয়েছি। বহুদিন বাদে জেনেছি ও মুসলমান। তাতে বকুল-গন্ধ কমেনি। আমার বন্ধুদের মধ্যে কে উপজাতি, জনজাতি -জেনেছি হয়ত চাকরির ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে। এমনকি অর্ণব যে ইয়ামস্ত ধনী, সেকথাও জেনেছি একযুগ পরে। রহিম বাবু, আমার বাপের স্কুলের বাঙলার মাস্টার। তার দুই ছেলে রাশেল আর গালিব কে আগে কোলে নেবে তা নিয়ে দাদা দিদিরা মারপিট করছে, আমি দেখেছি। আহা, কোলে নেবার জন্য ঝগড়া, আগলে রাখার প্রতিযোগিতা, ভালোবাসার জন্য যুদ্ধ।

বড়ো হয়ে বুঝতে চেয়েছি বুদ্ধ ক্ষমা বলতে ঠিক কী বোঝাতেন। কেমন ছিল করুণার অর্থ। রূপ, সনাতন কে কেমন করে এত আপন করে টানলেন চৈতন্য। কোন প্রেমের জোরে? কবীর ওরকম গাইলেন কোন্ মন থেকে। সমুদ্র সমান প্রেম, বর্ষাধারার মতো দরদ তিনি পেলেন কোথায়? তাঁর গানের কথা আর সুর যুগিয়েছিলেন কোন মহৎ প্রেমের দেবতা!

এখন ভাবি, প্রেম কি চলে যায়! ফুরোয়? এত ‘অপর’ বোধের অপরাধ নিয়ে কেন নির্লজ্জ প্রতাপে রাস্তা রোখে ‘ঘৃণা’। কেন ঘৃণা এত স্বচ্ছল হল এইসময়। এমন জনে জনের গভীরে শিকড় বিছাল, আমি ভাবি। কেন প্রেম কে চলে যেতে হচ্ছে গুপ্ত কক্ষে, নিভৃত আধ্যাত্মিকতায়? প্রতিদিনের যাপনে তার দেখা মিলছে না কেন? নাকি সব তারা-ই আছে দিনের আলোর গভীরে!

সেই সব প্রেমের দিব্যি দিয়ে রাত জাগা নিবিড় তারাদের আলো নেমে আসুক। আমাদের ভেজাক। বিভাজন ঘুচিয়ে দেবার জন্য প্রস্তুত হোক প্রেম। যারা প্রেমহারা কিন্তু প্রেমপাগল। তাদের তালিম দিক রঙিন তারারা। ওরা প্রস্তুত হোক। ঘৃণাকে পরাস্ত করে জয়ী হোক প্রেম। ছোটোবেলায় ঠাম্মা একেই বোধহয় ধর্মযুদ্ধ বলতেন!

পানু পাল : জনজাগরণের নৃত্য ও নাট্য - মধুমিতা পাল পর্ব ৬

মধুমিতা পাল image

পানু পাল: জনজাগরণের নৃত্য ও নাট্য

মধুমিতা পাল

(আগের পর্বের পর)

ততদিনে দেশ  স্বাধীন হয়ে গেছে, রংপুর চলে গেছে ওপার বাংলায়। এখানে একটা কথা মনে পড়ল, রংপুর কিষান সভায় যখন কাজ করতাম তখন নিজেকে মনে হতো, “আ পারসেন অফ এগ্রিকালচার টু কালচার “.সন্ধ্যাবেলা একটা গোয়াল ঘরে বসে নানা ধরনের গান বাজনা চলত। আমি ওখান থেকেই অনেক কিছু সংগ্রহ করেছিলাম। ১৯৪৮ সালে আমার প্রথম নাটক ‘দখল’ মঞ্চস্থ হয়েছিল। নাটকটি লেখা হয়েছিল রংপুরী ভাষায়। এই নাটকে এক অন্ধ মানুষের চরিত্রে আমি অভিনয় করেছিলাম।

১৯৪৮ কলকাতায় চলে গেলাম। চরম অস্থিরতা, কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়েছে, আইপিটিএ’র অবস্থাও তথৈবচ, কোন মিটিং হচ্ছে না। এরকম একটা অবস্থায় আমি তখন কলকাতায় করার চেষ্টা চালাচ্ছি এই সময় পরিচয় হল ঋত্বিক-মৃণাল ওদের সঙ্গে। ১৯৫০ সালের শুরুতে বুলবুল চৌধুরীর সঙ্গে অনেকটা বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই তৈরি করলাম ধর্মীয় নৃত্যনাট্য। প্রথম অনুষ্ঠান চট্টগ্রামে হয়েছিল, তারপর সেখান থেকে ঢাকা-কুমিল্লা-ময়মনসিংহ ইত্যাদি অনেক জায়গায়। এরপর আরো দূরে শো করতে আমরা যাই পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি, লাহোর, মুলতান, পেশোয়ার আরো অনেক অনেক জায়গায়। এভাবে কেটে গেল বছর দুই-তিন। ফিরলাম কলকাতায়, নির্বাচন এসে গেছে। পঞ্চাশের দশকেই আমার পরিচয় হয়েছিল উৎপল দত্তের সঙ্গে, উমানাথ ভট্টাচার্য্যের ভবানীপুরের বাড়িতে। ১৯-৩৯২৩ সারারাত ধরে জেগে শেষ করলাম ‘ভাঙ্গা বন্দর’ লেখার কাজ। তখন সেন্ট্রাল এভিনিউ-এর কফি হাউসে নিয়মিতভাবে আনাগোনা করছে উৎপল দত্ত, ঋত্বিক, কালি ব্যানার্জি আরো অনেকে। সেই আড্ডাতেই একদিন ঠিক হলো, ‘ভাঙ্গা বন্দর’ অভিনীত হবে। তার মহড়া হবে ৪৬ নম্বর ধর্মতলা স্ট্রিটে। ‘ভাঙ্গা বন্দর’ হলো, এরপর এক এক করে ‘বিচার’, ‘বিসর্জন’ নাটকগুলো হয়েছিল। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে ততই কি করে আরো বেশি জোরালোভাবে আরো বেশি লোকের কাছে পৌঁছানো যায়। আমি তখনই আমি লিখে ফেললাম ভোটের ভেট।

ঋত্বিক ঘটক আর উৎপল দত্তের এই নাটকটা পড়ে এতটাই ভাল লেগেছিল তখন নাটকটি করার জন্য কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক নিরঞ্জনের অনুমতি পাওয়া গেল। ভোটের ভেটের একটা মজার গল্প বলি- ভাই বলছে মনুমেন্ট ময়দানে নির্বাচনকে ঘিরে প্রথম বড় জমায়েত হবে, সভাপতি মোজাফফর আহমেদ। উনি আমায় খুব স্নেহ করতেন। ওই সভায় সময় পাওয়াই মুশকিল, অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ২৫ মিনিট পাওয়া গেল। লাইন পড়ে গেছে, তারা বলছে একটুখানি সময় দিতে পারবেন এই নাটকটা করতে হবে। পথনাটকের শুরুতেই এই রকম চাহিদা আমি লাইফে কোথাও দেখিনি।

 

একের পর এক পথনাটক লিখতে থাকি। আমার উৎসাহ যেন দ্বিগুণ হয়ে চলে। পথনাটকের শুরুতেই যেই রকম চাহিদা সে অতি উৎসাহী আমি আরো নাটক লিখি। অর্থাৎ কোন একটা সমস্যা বা কোন রাজনৈতিক মেসেজ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য, সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে পথের মোড়ে মোড়ে নাটক অভিনয়ের এই ধারাটা ক্রমশ প্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। আমিও একের পর এক নাটক লিখতে থাকি। ঋত্বিক ঘটক সরস মন্তব্য করতেন জীবনে বিমল ঘোষের কাছে কবিতা, আর পানু পালের কাছে নাটক চাইতে গিয়ে কেউ নিরাশ হয়নি। (…ক্রমশ)

একমাত্র প্রাপ্তি, ভূমির অভিনয় - অজন্তা সিনহা

অজন্তা সিনহা image

একমাত্র প্রাপ্তি, ভূমির অভিনয়

অজন্তা সিনহা

যশরাজ ফিল্মস-এ ছ-বছর সহকারী কাস্টিং ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করার পর, ‘দম লাগা কে হ্যায়সা’ ছবিতে একজন অতিরিক্ত ওজনের নববধূর চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বলিউডে আত্মপ্রকাশ করেন ভূমি পেডনেকার। আর প্রথম ছবিতেই নজর কাড়েন তিনি। সেরা নবাগত অভিনেত্রী হিসেবে প্রচুর পুরস্কারও ঝুলিতে পুরে নেন ভূমি। যদিও এরপরই যে তাঁর হাতে কাজের বন্যা বয়ে যায়, তা কিন্তু ঘটেনি। কিন্তু যতটুকু সুযোগ পান, প্রতি ক্ষেত্রেই নিজের অভিনয় দক্ষতার প্রমাণ রাখেন বলিউডের এই অফ বিট অভিনেত্রী। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে ‘দ্য রয়ালস‘-এ ঈশান খত্তারের বিপরীতে প্রথম দেখা যায় তাঁকে। সেখানেও সাড়া ফেলে দেন ভূমি। তাঁর সহজাত ও বুদ্ধিদীপ্ত অভিনয় দর্শকদের আকর্ষণ করে সহজেই। সত্যি কথা বলতে কী, ‘দলদল’ প্রসঙ্গেও বলতে হবে, এই সিরিজের ইউএসপি নিঃসন্দেহে ভূমি। তাঁকে কেন্দ্র করে যেমন গল্প অনেকটাই আবর্তিত হয়, তেমনই নিজের শক্তিশালী অভিনয়ে ভূমি ঢেকে দেন সিরিজের দুর্বল দিকগুলি।

ভীত-সন্ত্রস্ত মহিলা পুলিশ অফিসার ডিসিপি রীতা ফেরেইরা (ভূমি পেডনেকার) এবং তার বিকৃত মানসিকতার প্রতিপক্ষের সমান্তরাল জীবনযাত্রা–এই হলো ‘দলদল’-এর মূল কথা। দু’জন যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ–একই পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ভাঙাচোরা সৃষ্টি। তাদের অতীত জীবনে রয়েছে সমস্যাগ্রস্ত মায়েরা, যারা শ্বাপদসঙ্কুল বাইরের দুনিয়া থেকে সন্তানদের দূরে রাখতে গিয়ে অজান্তেই তাদের ক্ষতি করেছে। রীতা উচ্চপদে উন্নীত হলেও, তার কাছে এটি একটি পুরুষতান্ত্রিক ক্রাইম ব্রাঞ্চে সস্তা প্রচারের কৌশল বলে মনে হয়। রীতার বস সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। পাশাপাশি সহকর্মীরা তাকে হিংসা করে। সুযোগ পেলেই কটাক্ষ করে তারা। অন্যদিকে তার প্রতিপক্ষ অর্থাৎ যে ভয়ঙ্কর অপরাধীটির বিরুদ্ধে রীতা লড়ছে, তার পরিস্থিতিও যেন আয়নার ছায়া। কার্যকারণে দুজনেই এমন দুর্বল পুরুষদের সঙ্গে জড়িত, যারা জীবনের চাপ সামলাতে অক্ষম।

পর্বে পর্বে আমরা দেখি, একটি ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলিং কেসের তদন্তে জড়িয়ে পড়েছে রীতা। বিষয়টি শহরে প্রবল আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। হত্যাকারী যে একজন সাইকো, সেটাও ক্রমশ প্রতিভাত। ডার্ক থ্রিলারের যেমন চরিত্র, তদন্তটি ধীরে ধীরে একদিকে রীতার জন্য মানসিকভাবে ক্লান্তিকর, অন্যদিকে দর্শকের জন্য দারুণ উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভিশ ধামিজার বেস্টসেলার উপন্যাস ‘ভেন্ডি বাজার‘ অবলম্বনে নির্মিত এই সিরিজ ভারতীয় অন্যন্য সাইকো থ্রিলারধর্মী সিরিজগুলির মধ্যে যতটুকু পার্থক্য গড়ে নিতে সক্ষম হয়, সেটা ওই ভূমি-সহ একদল শক্তিশালী অভিনেতার অবদানের গুণে। অভিনয়ে অন্যদের মধ্যে আছেন আদিত্য রাওয়াল, সামারা তিজোরি, গীতা আগরওয়াল শর্মা, চিন্ময় মান্ডলেকর, সন্দীপ কুলকার্নি, অনন্ত মহাদেবন, সৌরভ গয়াল, সন্দেশ কুলকার্নি, বিভাবরী দেশপান্ডে, বিজয় কৃষ্ণ প্রমুখ।

কাহিনির গুরুত্ব বা প্রাসঙ্গিকতা অনেকটাই হারিয়ে যায় দুর্বল চিত্রনাট্যের কারণে। লেখক তালিকায় আছেন শ্রীকান্ত অগ্নিস্মরণ, রোহন ডি’সুজা, হুসেন হায়দারি, প্রিয়া সাগ্গি ও সুরেশ ত্রিবেণী। অপ্রিয় সত্য হলো, এতজন মিলেও একটি নিটোল চিত্রনাট্য তৈরিতে অক্ষম হয়েছেন তাঁরা। অন্যদিকে সাত পর্বের এই সিরিজের ক্রিয়েটর সুরেশ ত্রিবেণী এবং পরিচালনা করেছেন অমৃতরাজ গুপ্ত–এই ক্ষেত্রেও সন্তোষজনক কিছু মেলে না। ‘দলদল’-এর স্ট্রিমিং শুরু হয় এই বছরই আমাজন প্রাইম ভিডিওতে। প্রত্যাশা জাগিয়ে শুরু হলেও প্রত্যাশা পূরণে অক্ষম হয়েছে সিরিজটি, সবাই না হলেও এমনটা কেউ কেউ মনে করছেন। আমার নিজের দেখে যেটা মনে হলো, শুরুটা আকর্ষণীয় হলেও পরে নাটকের অবস্থান অপ্রাসঙ্গিক ও অতিরঞ্জিত হয়ে যায়। আদতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া নিয়েই আপাতত চলছে ‘দলদল’-এর প্রথম সিজন। কোনও একটি সংবাদ মাধ্যম জানাচ্ছে এটি ‘পুরুষদের লেখা নারীর গল্প’ সমস্যায় ভুগছে। আবার কারও মতে ভালো অভিনয় থাকলেও ক্লিশে ও অপ্রয়োজনীয় ফ্ল্যাশব্যাক রয়েছে। তবে এটা বলা যায়, যাঁরা ডার্ক থ্রিলার পছন্দ করেন, তাঁরা অবশ্যই দেখতে পারেন ‘দলদল’। মন্দ লাগবে না।

স্যামুয়েল বেকেট (১৯০৬–১৯৮৯) - ড. কুন্তল মুখোপাধ্যায়

কুন্তল মুখোপাধ্যায় image  

স্যামুয়েল বেকেট (১৯০৬–১৯৮৯)

ড. কুন্তল মুখোপাধ্যায়

স্যামুয়েল বেকেট ছিলেন একজন আইরিশ নাট্যকার, ঔপনিবেশিক, কবি। তবে তাঁর বিশেষ পরিচিতি—তিনি অ্যাবসার্ট থিয়েটারের উদ্দাতা। তিনি ইংরেজি, ইতালিয়ান ও ফরাসী সাহিত্য চর্চা করেছেন, তবে লিখেছেন মূলত ইংরেজি ও ফরাসী ভাষায় দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ফরাসী প্রতিরোধ আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। জেমস্ জয়েসের কাছ থেকে তিনি ভাষার সুক্ষ্ম ব্যবহার ও শব্দের গভীরতা শিখেছিলেন। তবে জয়েস চাইতেন ভাষার Expansion বা অন্তর্ভুক্তি আর বেকেট চাইতেন ভাষার Subtraction বা ছেঁটে ফেলা। এছাড়া রেনে দেকার্তের দর্শন, বিশেষ করে মন ও শরীরের দ্বৈতবাদ–Dualism তাঁর লেখায় ফিরে ফিরে এসেছে। দান্তের আলিগিয়েরি (সারাজীবন বেকেট দান্তের ডিভাইন কমেডি নিজের কাছে রেখেছেন), শোপেন হাওয়ার –এর “পেসিমিজম্‌” হতাশাবাদ বেকেটকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বেকেট প্রথম জীবনে ট্রিনিটি কলেজ, ডাবলিনে অধ্যাপনা করলেও ১৯৩৭ সাল থেকে প্যারিসেই স্থায়ী ভাবে থাকতে শুরু করেন। প্রথম দিকে উপন্যাসের ট্রিলজি লিখলেও ১৯৩৭ সালে তিনি  ওয়েটিং ফর গোডোট নাটক লেখেন যা ১৯৫৩ সালের জানুয়ারি মাসে থিয়েটার দ্যা ব্যবিলনে প্রথম অভিনীত হয়। “ওয়েটিং ফর গোডোট” থেকেই বেকেটের নামের সঙ্গে অ্যাবসার্ড থিয়েটার” কথাটি যুক্ত হয়ে পড়ে।

অ্যাবসার্ড থিয়েটারের বৈশিষ্ট কী?

ক) অযৌক্তিক প্লট বা কাহিনী, যা প্রচলিত বাঁধা গতে সংলাপকে অমান্য করে।

খ) সংলাপের অর্থহীনতা।

গ) অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরী করা– যা অনেক সময় নিরর্থক ও কৌতুক পূর্ণ।

বেকেট মনে করেন মানুষ বেঁচে থাকে কিন্তু কেন বাঁচে তাঁর কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই। তাঁর নাটকের চরিত্রেরা অপেক্ষা করে কথা বলে, কিন্তু বোঝে না। কাজ করে, কিন্তু কোনো ফল হয়না।

বেকেটের নাটকে সময় এগোয় না, চরিত্ররা একই অবস্থায় আটকে থাকে, গতি নেই পরিবর্তন নেই, এটা মানুষের জীবনের অচলবস্থা।

ভাষার ব্যর্থতা– ভাষা যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এলোমেলো সংলাপ, কথার মাঝে নীরবতা।

মঞ্চ-মিনিমাল ও প্রতীকী– শূন্য মঞ্চ মনুষের অন্তর্গত শূন্যতা প্রকাশ করে।

হাস্যরস ও ট্রাজেডির সম্মিলন– Tragi-Comedy হাসায় কিন্তু বেদনাও প্রকাশ পায়।

অর্থহীন জীবনের অর্থ খোঁজার ব্যর্থ মানব প্রয়াসের মঞ্চরূপ।

ওয়েটিং ফর গোডো – একটি অ্যাবসার্ড ড্রামা – কিমিতিবাদী নাটক (ঝণ শ্যামল ঘোষ) – এখানে জীবনকে একটি লক্ষহীন ও পুনরাবৃত্তি মূলক চক্র হিসাবে রূপায়িত করা হয়েছে। মানুষের অস্তিত্ব মূলত এক ধরনের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, যা শেষ অবধি শূন্যতা আর অনিশ্চয়তায় ঘেরা। এক উষর প্রান্তরে ভ্লাদিমির ও এস্ট্রাগন দুই ছন্নছাড়া ভিক্ষুক ধরনের লোক গোডোর অপেক্ষায় বসে আছে তাদের নাকি গোডোর সঙ্গে অ্যাপয়নমেন্ট আছে যদিও তারা গোডোকে দেখেনি। গোডো আসে না, তাঁর বদলে একটি ছেলে এসে জানায় গোডো আজ আসবেনা, কাল অবশ্যই আসবেন। ঐ একই স্থানে দ্বিতীয় দৃশ্য – এরা অপেক্ষমান, কিন্তু গোডো আসেন না, ছেলেটি এসে জানায় গোডো আজও আসবেন না, তবে কাল আসবেন। নাটকের শেষ এখানেই। তাঁর মাঝে আর দু’টো চরিত্র আসে, তারা হল পোজ্জো এবং লাকি – একজন ব্যবসায়ী, অন্যজন দাস। পোজ্জো লাকিকে গলায় দড়ি দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে হাটে বিক্রী করতে। দ্বিতীয় দৃশ্যেও তাদের দেখা যায়। লাকিকে বিক্রী করা যায়নি। তবে পোজ্জো দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে, নাটকের সংলাপের ভাষা –

    ১) ভ্লাদিমির – আমরাকি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকব?

       এস্টাগন – হ্যাঁ, কারণ সে বলেছিল আসবে, আবার।

    ২) এস্টাগন – চল যাই

       ভ্লাদিমির – পারব না, আমরা অপেক্ষা করছি।

    ৩) ভ্লাদিমির – সময় যাচ্ছে, কিছুই বদলাচ্ছেনা।

      এস্টাগন – তবু আমরা আছি, এটাই কি যথেষ্ট নয়!

অর্থাৎ সংলাপে অর্থহীনতা, অপেক্ষা ও অস্তিত্ববাদের স্বরূপ প্রকাশ পাচ্ছে। চরিত্র নয়, পরিস্থিতিই প্রধান। গোডো কে? কোনো উত্তর নেই। সাধারণ ভাবে গোডো ঈশ্বর, আর ওই ছেলেটি ঈশ্বরের দূত। ভ্লাদিমির, এস্টাগন মানবতার প্রতিভূ, অপেক্ষা করছে ঈশ্বরের। ভ্লাদিমির আশাবাদী, জ্ঞানী; এস্টাগন নৈরাশ্যবাদী কিন্তু স্বপ্ন দেখে। পোজ্জো আর লাকি – তারা কি পার্থিবও আত্মিক দিকের প্রতিভূ? ভ্লাদিমির ও এস্টাগন আত্মহত্যার চেষ্টা করে। সফল হয়না। সচেতনে তারা জানে – “আকাশে বাতাশে আমাদের যন্ত্রণার চিৎকার ও কান্না”। আশা ও হতাশার অ্যাবসার্ডিটি জীবনকে এক নতুন অর্থ দেয়।

বেকেটের অন্যান্য নাটকগুলি হচ্ছে, “এন্ড গেম”, “ক্রাপস লাস্ট টেপ”, “হ্যাপি ডেজ”। এন্ড গেমেও চারটি চরিত্র। ল্যাগ ও নেল দুজনেরই দুর্ঘটনায় পা কাটা গেছে। তারা দুটো ডাস্টবিনে চলন শক্তিহীন বসে থাকে। তাদের ছেলে হ্যাম অন্ধ পক্ষাঘাতগ্রস্থ, হুইল চেয়ারে বসে থাকে। আর ক্লোভ ফাই ফরমাস খাটে, বিশ্রামের সুযোগ পায়না। দুটো জানালা দিয়ে সমুদ্র আর প্রান্তর দেখা যায়। তবে মনে হয়, এই ঘরের বাইরে প্রান নেই। সংলাপে বোঝা যায় –

“হ্যাম – প্রকৃতি আমাদের ভুলে গেছে।

ক্লোভ – প্রকৃতি বলে কিছু নেই।

হ্যাম – কিন্তু আমরা শ্বাস নিই। বয়স বাড়ে, চুলে পাক ধরে, দাঁত পড়ে যায়, আমাদের যৌবন চলে যায়, চলে যায় আদর্শবাদ।”

হ্যাম আর ক্লোভের মধ্যে ভালোবাসা ও ঘৃণার দ্বান্দিক সম্পর্ক। পরস্পর পরস্পরকে সহ্য করতে পারে না। আবার ছেড়েও যেতে পারেনা। ক্লোভ না খাওয়ালে হ্যাম খেতে পাবে না। আর ক্লোভ ভাবে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে, অন্তহীন শুন্যতা ও খাদ্যহীন বুভুক্ষা। কী হবে পরিণতি? তখনই ক্লোভ দেখে একটি ছেলে আসছে – সে কী পুনরুজ্জীবনের প্রতীক? বাক্য বিনিময় হয়, কিন্তু চিন্তার সেতু গড়ে ওঠে না। বেকেটের নাটকে লক্ষ্য করা যায়, মেটা থিয়েট্রিক্যাল কমেন্টারী অর্থাৎ বেকেটের নাটক নিজের নাটক হয়ে ওঠাকেই চিহ্নিত করে দর্শক কে মনে করিয়ে দেয় – “এটা অভিনয়”, অর্থাৎ নাটকের আত্মসচেতন ভাষ্য।

১৯৫৮ সালে লিখিত “ক্র্যাপস্‌ লাস্ট টেপ” নাটকে এক বয়স্ক ব্যক্তি, তাঁর ৬৯ বছরের জন্মদিনে আগের বছরের জন্মদিনের টেপ রেকর্ডারে নিজের কন্ঠস্বর শুনছেন। ১৯৬২ সালে লিখিত “হ্যাপি ডেজ” বেকেটের নাটকের একমাত্র মহিলা চরিত্র। উইনী নিজের কোমর অবধি মাটিতে প্রথিত করে বসে আছেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৪ বেকেট লন্ডন, প্যারিস, জার্মানীতে তাঁর রচিত নাটক গুলোর পরিচালনা করেছেন। তাঁর নিজের তৈরী করা Stage direction কেউ অমান্য করলে তিনি ক্ষুব্ধ হতেন। ১৯৮৪ সালে আমেরিকান রেপার্টারী থিয়েটার “এন্ড গেম” নাটকটির যে মঞ্চায়ণ করেছিল, তিনি তা অনুমোদন করেননি। ব্লিন, শেন্ডার, (ফ্রোন্স) ডোনাল্ড ম্যাকউনন, জর্জ ডিভাইন (ইংল্যান্ড) পিয়র চেবার্ট আন্তেয়নি লিবিরা (পোল্যান্ড) প্রভৃতি পরিচালকরা তাঁর পছন্দের ছিল। অভিনেতাদের মধ্যেও তাঁর পছন্দসই দের দিয়ে তিনি কাজ করাতেন। নাটকে আলোর ব্যবহারে অভিনেতার শরীরের উপর তিনি গুরুত্ব দিতেন। কাম এন্ড গো (১৯৬৬), ফুটফল্‌স (১৯৭৬), রকবে (১৯৮১), ওহিও ইমপ্রমপট্‌ টু (১৯৮১) এবং ক্যাটাস্ট্রফি (১৯৮২) প্রভৃতি নাটকে তিনি দর্শক ও অভিনেতার মধ্যে এমন এক উপলব্ধি চেয়েছিলেন, যেখানে শোনা এবং দেখার মধ্য দিয়েই দর্শক ও অভিনেতার সংযোগ ঘটবে। শব্দ এবং ক্যামেরার নিক্তিতে বেকেট তাঁর নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরী করেছিলেন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৭২ –র মধ্যে তিনি ছয়টি বেতার নাটক রচনা করেন। এগুলি হল – আল দ্যাট ফল, এমবার্স, ক্যাসান্ডেট, ওয়ার্ডস এন্ড মিউজিক, রাফ ফর রেডিও- প্রথম+দ্বিতীয়। বেকেট টেলিভিসনেও আকৃষ্ট হয়েছিলেন। স্পেস স্ট্রাকচার – এবং ক্যামেরার সমন্বয়ে কি ঘটতে পারে তা তিনি লক্ষ করেছিলেন বি বি সি –র এহ্‌ জো (১৯৬৬) এবং ক্লাউডস্‌ (১৯৭৭) প্রযোজনায়। ১৯৬৯ সালে বেকেট সাহিত্যের জন্য নোবেল প্রাইজ পান। ইউরোপিয়ান আধুনিকতা, উত্তর আধুনিকতার অন্যতম প্রবর্তক বেকেট সারা জীবন ভেবেছেন – How it is?

ছোটদের ছবি: ইরানি শৈশব! - পর্ব -৩

অরিত্র দে image

ছোটদের ছবি: ইরানি শৈশব! (Part -3)

অরিত্র দে

একদিকে এমন কিছু দর্শক আছেন যারা শুধু এটা ইরানি ছবি বলেই The White Balloon–কে গুরুত্ব দিতে চান না। আবার অন্যদিকে এমনও দর্শক আছেন যারা ঠিক একই কারণে ছবিটিকে খুব প্রশংসা করেন। তবে কোন দর্শক কোন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পড়েন, সে তিনি ইরানি হন বা অন্য দেশের, তা নির্ধারণ করা মোটেই সহজ নয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৯৬ সালের জানুয়ারিতে Sight and Sound পত্রিকায় সাইমন লোভিশ একটি রিভিউ লিখেছিলেন, যা ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে লেখা হলেও কিছুটা ভুল ধারণা ও কৃপণ মানসিকতার মনে হয়। সেখানে The White Balloon ছবিটিকে তিনি এমন এক ধারার মধ্যে ফেলেছেন, যাকে তিনি বলেছেন “কম তীব্রতার তৃতীয় বিশ্বের নব্য-বাস্তববাদ”।

তার মতে, এমন দেশে যেখানে সরকার শিল্পকে কড়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ইসলামি রাষ্ট্রের নানা নিয়ম মানতে হয়, সেখানে শিশুদের নিয়ে গল্প করা খুবই স্বাভাবিক, কারণ শিশুরা রাজনৈতিক বিষয়ে জড়িত নয়।

এইভাবে তৈরি হওয়া ছবিগুলোতে, তার কথায়, ঠান্ডা যুদ্ধের সময়কার সোভিয়েত সিনেমার মতোই নির্মাতারা এক ধরনের সাধারণ মানবিকতার আশ্রয় নেন। সেখানে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন একতা ও সহমর্মিতা দেখানো হয়, আর একই সঙ্গে সমাজের চলতে থাকা সমস্যাগুলোর কথা একটু ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলা হয়।

এই ধরনের বিশ্লেষণ আপত্তিকর। কারণ এতে বলা হয় যে The White Balloon ছবিটি নাকি “চাদর পরা নারীদের সর্বত্র দেখা যায় এমন ছবি যারা তাদের প্রচলিত ভূমিকা পালন করছে”—এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা পর্যন্ত করেনি। এইভাবে সমালোচনা করা মানে পানাহির মতো নির্মাতাদের ওপর এমন এক অতিরিক্ত দায় চাপিয়ে দেওয়া, যা পশ্চিমা সমালোচকেরা কখনও পশ্চিমা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ওপর চাপানোর কথা ভাবেনও না।

অবশ্যই ইরানি নারীদের ওপর হওয়া অত্যাচার নিয়ে লুভিশের ক্ষোভ সঙ্গত। কিন্তু প্রত্যেক ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতাকে বাধ্য করা যে তারা এই বিষয়েই কথা বলবে, এটাও এক ধরনের অন্যরকম দাসত্ব চাপিয়ে দেওয়া। পার্থক্য শুধু এই যে, এতে পশ্চিমা সমালোচকদের নিজের কোনো মূল্য দিতে হয় না।

শিকাগোতে যে কিছু পশ্চিমা “প্রাপ্তবয়স্ক স্বাধীনতা”-র ফলাফল দেখানো হয়েছে, সেগুলোর দিকে তাকালেই প্রশ্ন জাগে। যেমন Up Close & Personal ছবির আবেগময় কিন্তু সেক্সিস্ট গল্প, অথবা The Baby of Macon ছবিতে পিটার গ্রিনঅ্যাওয়ের সেই সাহসী সিদ্ধান্ত…১৭শ শতকের ফ্রান্সে ২১৭ জন সৈন্যের দ্বারা এক কুমারী মেয়েকে (জুলিয়া অরমন্ড) ধর্ষণের দৃশ্য দেখানো, যা গির্জার আশীর্বাদে এবং অরমন্ডের কান ফাটানো চিৎকারের মধ্যে ঘটানো হয়েছে। এসব দেখে মনে হয়, এই ধরনের বিস্তৃত ও অমানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সিনেমাগুলোই কি তাহলে সেই মডেল, যেটা অনুসরণ করতে ইরানি নির্মাতাদের বলা হচ্ছে…এমনকি নিজের ক্যারিয়ার ঝুঁকির মুখে ফেলেও?

অবশ্য এদের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে সাহসী The Birdcage ছবিটাও আছে, যেখানে এলেইন মে-র দারুণ হাস্যরসাত্মক চিত্রনাট্য ইঙ্গিত দেয় যে প্যাট বুকানানের আদর্শ নারীর স্বপ্ন পূরণ করতে পারে হয়তো শুধু একজন ড্র্যাগ কুইন। কিন্তু এই সিনেমাটি পশ্চিমা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের মধ্যে বিরল ব্যতিক্রম, যে সিনেমাগুলোর রাজনৈতিক সাহস সাধারণত খুবই কম। অথচ লুভিশ পরোক্ষভাবে পানাহিকে দোষ দিচ্ছেন যে তিনি নাকি এই পশ্চিমা সিনেমাগুলোর মতো হওয়ার চেষ্টা করেননি।

শেষ পর্যন্ত, লুভিশ ইরানের নারীদের পক্ষ নিয়ে যে যুক্তি দেন, তাতে মূলত The White Balloon-কে খারাপ বলা হচ্ছে শুধু এই কারণে যে ছবিটা ইরানি। একইভাবে, বলা হয় যে ইরাকের মানুষের স্বাধীনতার প্রতি পশ্চিমের মানুষের সমর্থন দেখানোর জন্য সাদ্দাম-বিরোধী নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞার ফলে অপুষ্টিতে যে অসংখ্য ইরাকি শিশু মারা যায়, তার দায় আবার ইরাকের নিজেদের ধর্মীয় কঠোরতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।

আরও সূক্ষ্মভাবে বলতে গেলে, ইরানি সিনেমার যে প্রশংসা করা হয় তাতে বলা হয়, ইরানের সরকার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ওপর যে নানা বিধিনিষেধ চাপায়, তা নাকি ক্লাসিক হলিউডের “প্রোডাকশন কোড”-এর মতোই এক ধরনের সুবিধা দেয়, কারণ এতে নির্মাতারা একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতরে (বা তার বিরুদ্ধে) কাজ করার সুযোগ পান…এই কথাগুলোও শেষ পর্যন্ত এক ধরনের উপর থেকে বলা, পৃষ্ঠপোষকতামূলক অর্থহীন বকবকানিতে পরিণত হয়। পশ্চিমা সমালোচনার এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি যেন দুই চরম অবস্থান দেখায়…একদিকে রক্ষণশীল ধারণা যে ইরানিরা আমাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, আর অন্যদিকে উদার ধারণা যে তারা ঠিক আমাদের মতোই। অথচ আসলে এই দুটোই পুরোপুরি সত্য নয়।

The White Balloon-এর কিছু ইরানি চরিত্র, বিশেষ করে এক খিটখিটে দর্জি (মোহাম্মদ বাখতিয়ারি), যে একজন ক্রেতার সঙ্গে ঝগড়া করছে…শহুরে আমেরিকান ইহুদিদের কথা মনে করিয়ে দেয়। আবার ইরানি নববর্ষ উদ্‌যাপনের কিছু প্রতীক ইহুদিদের উৎসব পাসওভারের কথাও মনে করায়। কঠোর অর্থে এগুলো “সমালোচনা” তখনই বলা যায়, যখন এগুলো ইহুদি ও ইরানি মুসলমান, দুই গোষ্ঠীর সংকীর্ণ ভাবনাকে একটু ভেঙে দিয়ে মনে করিয়ে দেয় যে, এই দুই গোষ্ঠীরই মূল উৎস পৃথিবীর একই অঞ্চলে।

তবে অন্য দিক থেকে দেখলে, এগুলো আসলে কোনো সমালোচনা নয়। এগুলো শুধু কল্পনা…এই ছবিটি দেখতে গিয়ে যেভাবে চলেছে, তার বর্ণনা মাত্র। কিন্তু ছবিটি ভালো না খারাপ…তার সঙ্গে এটি কতটা ইরানি, তার কোনো সম্পর্ক নেই। পানাহির অসাধারণ শিল্পকৌশল আসলে অন্য জায়গায়।

গেছি বারবার - ময়ূরী মিত্র পর্ব ১০ - ১১

ময়ূরী মিত্র  image

গেছি বারবার

ময়ূরী মিত্র

১০. কেশবচন্দ্র পথ  

কাল কেশবচন্দ্র স্ট্রিটে যেতে হয়েছিল৷ সে স্ট্রিটে জহর সিনেমা হলে এখনো সিনেমা চলে৷ আমি যখন গিয়েছিলাম, তখন বিকেল চারটে৷ জহরের  ভেতরে ম্যাটিনি চলছে৷ ছোট টিকিটঘর৷ বাইরে জাল ,টিকিট ও টাকা গলাবার সামান্য ফাঁক৷ টিকিটবিক্রেতা ও দর্শকের হাতের ছোঁয়া লাগে যে ফাঁকে৷ ভোজপুরী সিনেমা চলছিল৷ ভোজপুরী কেন, জিজ্ঞেস করতে স্থানীয় একজন বললেন, বিগত চার দশক ধরে এই অঞ্চলে বিহার ,উত্তরভারতের মানুষরা বসতি গড়েছেন দ্বিগুণ তিনগুণ হারে৷ বাইরে গরম ফুলুরি ভাজা হচ্ছে আর বিটনুন ছড়ানো হচ্ছে৷ কলকাতার দক্ষিণে যে চপ মুড়ি পাওয়া যায় না এমন নয়৷ কিন্তু উত্তরের পুরোনো পাড়ার চপের দোকানের বৈশিষ্ট্য হল ,আর কিছু থাকুক বা না থাকুক ফুলুরি থাকবেই৷ এবং সেটা সকাল থেকেই ভাজা হবে৷ বেথুন কলেজে আমার সহপাঠীদের মধ্যে অনেকে খাস উত্তর কলকাতার মেয়ে ছিলেন৷ তাঁদের বাড়িতে সকাল দশটা এগারোটায় একপ্রস্থ চপ খাওয়া হত৷ খেতেন অবসরপ্রাপ্ত পুরুষ ও বাড়ির বউরা৷ একে নাকি বলা হতো ছোট জলখাবার৷ অর্থাৎ মূল জলখাবারের দু একঘন্টা পরে এটা খাওয়া হত৷ খাওয়ার পর  বেচে যাওয়া ফুলুরি দিয়ে টক রাঁধা হত৷ আমি একবার বাগবাজারের এক আত্মীয়ের বাড়িতে ফুলুরির গা মাখা সর্ষেবাটার ঝাল খেয়েছিলাম৷ কাল সারা কেশবচন্দ্র স্ট্রিট ফুলুরির গন্ধে ভরে উঠেছিল ৷ হতে পারে , অনেকদিন বাদে গন্ধটা পেলাম বলে আমি নিজেই মাত হয়েছিলাম৷ অনেকদিন পরে রাস্তায় ইঁট পেতে নাপিতের কুচকুচও দেখলাম৷ ছোটবেলায় যখন ন্যাড়া হতাম কুচকুচ শুনতাম মন দিয়ে৷ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতাম ফুটপাথে আমার চুল পাহাড় হচ্ছে৷ কুচকুচের সঙ্গে কত শিশুর যে কান্না জড়িয়ে আছে!

সবে বসন্ত এসেছে৷ হাওয়ায় তেমন ভাপ জমেনি৷ তবু হিন্দুস্থানী বউরা বাচ্চা নিয়ে বৈকালিক চান সারছেন৷ বিকেলেও মাথা ভিজিয়ে চান করছেন দেখলাম৷ বাচ্চাগুলোর চুল দিয়েও টপটপ ঝরছে৷ আমার বাবা বলতেন, চানের সঙ্গে নাকি কতটা শীত কতটা গরম…এর কোনো সম্পর্ক নেই৷ জল যে কোনো ঋতুতেই নিজের মতো করে মানবশরীরকে স্নিগ্ধ করে৷ সভ্যতা ও শরীর গড়ার যুগ্ম ক্ষমতা আছে নাকি জলের! কাল ভিন প্রদেশের নরনারীর চানের আকুলতা দেখে বাবার চানপ্রেম মনে পড়ছিল বড্ড৷ বেলা তিনটে বাজলেও চান করে ভাত খেতেন৷ শীতে কাঁপছি…বাবা সেই তিনটের চান সারছেন৷ ভিজে মাথায় অন্ন ছোঁয়া৷ চলে যাওয়ার দুদিন আগেও হসপিটালের মেঝেতে শুইয়ে বাবাকে চান করাচ্ছেন নার্সরা৷ জ্বর কমছিল না তো! আর যে কমবে না…তাও বলে দিয়েছিলেন ডাক্তাররা৷ তবু তপ্তকে শীতল করে যেতে হয়! বাবাও হচ্ছিলেন শীতল ৷ রক্তচাপ নিম্নগামী, শরীরের সর্ব অঙ্গ বিকল হয়ে আসছে! তবু যে কি স্নিগ্ধ হচ্ছিল তাঁর মুখ! সেদিন আরো একবার বুঝেছিলাম…জলের কত শক্তি মাগো! 

সত্যিই তো! পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার সময় অতো তাপদগ্ধ হওয়া কি চলে! মৃত্যুর আগে ঠাণ্ডা হওয়া সর্বজীবের জীবেরই নিয়ম৷ ঠিক যেমন করে শীতার্তকে গরম বস্ত্র দেওয়াটা নিয়ম৷ অনেকে বলবেন নিয়ম কেন ভাই! এতো মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা৷ আমি তাদের বলি…তবে ভালোবাসাটাই নিয়ম৷ নিয়ম বললে ভালোবাসা খাটো হবে…ভালোবাসার এতো কম শক্তি নয়৷ 

বউবাচ্চা চান করে গা মুছছে৷ রাস্তা ভর্তি সাবান জল৷ গঙ্গা এসে সাবান জল ধুয়ে দেবে৷ এসব কলে এখনো গঙ্গার জল আসে ৷ মোড় ঘুরতেই রাদুর চটির দোকান ৷ ছোটবেলায় বাটার পাশাপাশি রাদুর দোকানের নাম ছিল খুব ৷ মুসলিম দোকানদাররা খুব আদর করে বাচ্চার পায়ে হাত বুলোতে বুলোতে ঠিক সাইজের জুতোটি বার করে দিতেন ৷ সাইজ মিললে রাণীর স্টেপিং দিতাম সারা দোকান ঘুরে৷ আয়না দিয়ে দেখতাম  এক দাড়িওয়ালা মানুষ বাবার মতোই মুগ্ধ দৃষ্টিতে আমার পা দেখছেন। ঠিক পঞ্চাশ বছর পর কালও দুপুরে একজন শিশুকেই দেখলাম রাদুতে ৷ বাবার সঙ্গে জুতোর তাকগুলোর সামনে  ঘুরছিল! বিক্রেতা মন দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন৷ 

আমিই বা এতো আশ্চর্য হচ্ছি কেন! দেশে তো খবরের পরিমাণ বেড়েছে…নাকী!

বৃদ্ধিও হয়ত ভালোবাসার মতোই একটা নিয়ম!

উল্টোদিকে নবনির্মিত বর্ণপরিচয় বিল্ডিঙ৷ দোতলায়  শ্রী লেদার্স৷ ঝকঝকে, নতুন৷ এক এয়ারহোস্টেসের পা।। জুতো লাগাচ্ছেন যুবক কর্মী। বোধহয় পূর্বপরিচিত৷ হাসতে হাসতে বলছেন…”সোজা আকাশ থেকে শ্রী লেদার্স ! দেখি ম্যাডাম…আকাশের পায়ে কুমীরের লেদার ফিট করে কিনা !”

 

১১. বাগবাজার পথ 

কাল গিরিশ মঞ্চে ফর্ম তুলতে যাওয়ার শেষ তারিখ ছিল৷ স্কুল শেষে হুড় এন্ড মুড় করে দৌড়াচ্ছি বাগবাজার বাটার কাছে একদল বউ৷ সাদা ,লাল জরি পাড় শাড়ি৷ যে ধরণের শাড়ি আশি নব্বইয়ের দশকে মা কাকীমারা পুজোআচ্চার দিন পরতেন ৷ ভালো খোলের ফুলিয়ার  ধপধপে সাদার ওপর লাল সুতো আর জরিতে ঠাসা পা৷ তখন বাড়ির ছোটখাটো পুজোতেও …এমনকি সত্যনারায়ণেও এই ড্রেস কোড৷ বাড়ির বউ মেয়েরা একই শাড়ি পরে পুজোর মালা গাঁথবেন…ফল কাটবেন ৷ তখন

শাড়ির জগতে  আলাদাভাবে হ্যান্ডলুম শব্দের জন্ম হয়নি৷ পাওয়ারলুম ব্যাপারটাও মায়েরা জানতেন কিনা জানি না৷ তাঁত মানে তাঁত …তাঁতির হাতে বোনা শাড়ি৷ এখন পাওয়ারলুমের ফালতুমি আগে বলে হ্যান্ডলুমের মহানতা তুলে ধরেন বস্ত্র ব্যবসায়ীরা৷ ওই অনেকটা জীবনে মিছে চালু করে সত্য প্রতিষ্ঠার ক্যারিশমার মতো৷

কালকের বউরা গঙ্গাচানে যাচ্ছিলেন৷ মাঘী পূর্ণিমার আগে গঙ্গা নাইবেন৷ এমনটাই বললেন অটোয় বসে৷ কলকল করে কথা বলেই চলছিলেন তাঁরা৷ সেটা অবশ্য নতুন গরমে নদীর জলে চান করার আনন্দে…নাকি চলে যেতে থাকা ঋতুর শেষ পুণ্যি অর্জনে কইতে পারি না৷ কারণ দুটি একটি অল্পবয়সীও ছিলেন৷ তাঁদের চোখে পুণ্যলোভ দেখিনি৷ শাশুড়ি কিংবা মায়েদের শুকনো জামাকাপড়ের ব্যাগ কোলে বসেছিলেন৷ ঠিক যেমন আমার মা তাঁর প্রিয় ছোট খুড়শাশুড়ির পিছে চলতেন৷ কী গঙ্গাচানে…কী বসিরহাটের ফাল্গুনী হলে সতীর দেহত্যাগ দেখ৷ জীবনের সব সিদ্ধান্তে খুড়শাশুড়িকে  জন্মদাত্রীর মর্যাদা দিতেন৷ মা আরতির কথায়…” কাকীমার ধর্মবোধ এতো সততা নির্ভর ছিল, ওঁকে ছাড়া কোনো কাজে এগোতে মন চাইত না৷” 

অটো ছুটছিল ঘাটের দিকে ৷ যুবতী জিজ্ঞেস করলেন মাতৃস্থানীয় মহিলাটিকে—

মা আমি নামব তো গঙ্গায়? একসঙ্গে নামব? 

“না আমি উঠে এলে নামিস৷ কাপড়ের ব্যাগ কারোর হাতে দিবি না৷ তোর দিদির হাতেও না৷ 

কাপড় পরে তারপর ভাতের পাতে বসল৷ সব এঁটো ওর৷ গঙ্গায় গিয়ে দেখবি..জল ছেড়ে ঘাটেই হেঁটে মরছে ৷ ওর ওপর ভরসা নেই ৷ সব চুরি হবে !” 

দিদি সম্ভবত ভদ্রমহিলার নিজের মেয়ে ৷ আর যে ওঁর গা ঘেঁষে একটার পর একটা প্রশ্ন করে যাচ্ছিল সে ছেলের বউ৷ তো ছেলের বউয়ের বোধহয় শাশুড়ির সঙ্গে গঙ্গায় নামার ইচ্ছ৷ খানিক চুপ থাকল৷ তারপর  বলে উঠল “দূর! আমি শুকনো পোঁটলা শেষ ধাপে বসিয়ে…এদিকে চোখ রেখে চান করব মা৷ তবু তোমার সঙ্গেই নামতে দাও মা !”

শাশুড়ি চাপড় দিয়ে বললেন “সূর্যের উল্টোদিকে চোখ রেখে চান করবি?” 

বউ হেসে বললেন “তো আলো পড়ে মা৷”

এই উত্তরে শুধু মুখ নয়, অন্তর স্তব্ধ হয় ৷ 

বাবা বলতেন “মাঘের চাঁদ আর মাঘী স্রোত বুদ্ধের খুব পছন্দের ছিল৷”

 ভগবান বুদ্ধ! মানুষের সর্বপ্রকার সৎ আচরণের নির্দেশ দিয়ে যিনি ভগবান৷ গ্রন্থের পাতায় নয়

আমায় ছেড়ে অটো এগিয়ে গেল গঙ্গায়৷ দুটো মাঝবয়সী লোক গল্প জুড়েছে গিরিশমঞ্চের উল্টোদিকের চায়ের দোকানে৷ এ দোকান ছিল হরেনদার৷ যখনই এ মঞ্চে নাটক করতে এসেছি, পকেটে দুটো লজেন্স নিয়ে স্টেজে চলে আসত৷ চুপিচুপি আমায় দিত৷ কতবার জিজ্ঞেস করেছি!

“আছছা হরেনদা! এই তো তোমার দোকানে চা খেয়ে এলাম! তখন দিলে না কেন!”

হরেনদা বলত” চুপ চুপ৷ এ তোমার আর আমার চুপিচুপি৷”

এমন ভালোবাসার মানুষ চিরতরে গেল আমায় না জানিয়ে ৷ হয়ত যে যার যত প্রিয়, তার কাছে তার যাবার খবর ততো অজনা থাকে!

মাঝবয়সীদুটো দুপুরবেলা গরম চা নিয়ে বখামি করছে…

“আরে ঝাঁকড়া পটলা রে! যার মাথার চুল বটের ঝুরির মতো বলে আমরা ঝাঁকড়া ডাকতাম৷ ওদের অংশটা বিক্রি করে দিচ্ছে ওর জেঠাটাকে৷ সিঁথিতে ফ্ল্যাট কিনেছে৷ চলে যাবে বৈশাখে ৷ “

এরা এতো বকবক করছে! 

রাস্তা পার হব…

Coca-Cola-র গ্রাসে মার্ক্স??? - সুচরিতা বড়ুয়া চট্টোপাধ্যায়

Coca-Cola-র গ্রাসে মার্ক্স???

সুচরিতা বড়ুয়া চট্টোপাধ্যায়

Old men start the wars Coca-Cola

Young men fight and die

Rich men count their profits while the poor folks cry,

But we can wake up

Yes, can see though’

The only war worth fighting is the one for me and you.

The only peace worth having is the one we may come true.

যুদ্ধ নয়, যুদ্ধ নয় দাঙ্গা হাঙ্গামা নয় শুধু শান্তি চাই শান্তি। মাত্রই রাজনীতির ক্ষেত্রে নয়, সমাজে অর্থনীতিতে, হাটে বাজারে খেলার মাঠে খেত খামারে মানুষে মানুষে জীবনে জীবন শান্তি চাই শান্তি। এই সময় আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র আমাদের সাধারণ মানুষদের ‘ম্যাজিকো-পলিটিক্যাল ম্যান’ সম্মোহনে আটকে রেখেছে জ্ঞানহীন বোধবুদ্ধিহীন আমরা মানুষ নিঃসঙ্গ হচ্ছি ছুটছি ছুটছি ছুটেই যাচ্ছি দিশাহীনভাবে এক যান্ত্রিক একচ্ছত্র পুঁজিবাদী আগ্রাসনের আবর্তে। শ্রমিক কৃষক শিক্ষক উকিল বলা যায় সেই ফরাসি বিপ্লবের তৃতীয় শ্রেণির সবাই সাধারণ মানুষ, সব্বাই গণহিস্টিরিয়ায় ভুগছি। এর থেকে মুক্তি নেই মুক্তি নেই। পচে যাচ্ছি পচে গেছি।

10th প্ল্যানেটের সাম্প্রতিক প্রযোজনা ‘হয়তো কোকাকোলা হয়তো মাক্স’ এমনই এক তীব্র রাজনৈতিক আর্থ সামাজিক সচেতনতা নির্ভর নাটক, বলা যায় দলিল। এই সময় দাঁড়িয়ে হাতেগোনা যে ক-জন শিক্ষিত পরিচালক আমরা দেখি তাদের মধ্যে শরণ্য, শরণ্য দে অন্যতম। নৈঃশব্দ আগাগোড়ায় মুড়ে রেখে একটা নাটক যখন পরিচালকের ভাষায় ক্যাকাফোনির পরিবেশ তৈরি করে, সময়কে সপাটে চড় মারে, তখন আমরা চুপ করে যাই। শিরদাঁড়াহীন আমরা মান-হুঁশহীনরা মুখ নিচু করে নিজেদের গর্তে ঢুকে যাই। এই নাটকে সভ্যতার ইতিহাস যে আসলে একেবারে মানুষের চিরকালীন শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস, যেখানে শৃঙ্খল ছাড়া আমাদের কোন কিছুই আর হারাবার নেই এই বিষয়গত দিকটাই শরণ্য চাবুক মেরে বুঝিয়ে দিয়েছে। কর্পোরেট পুঁজির গুলিয়ে দেওয়া সংস্কৃতি নীরব এবং শুধুই কয়েকটি আঙ্গিকের দৃশ্যায়নের মাধ্যমে তুলে ধরেছে। ভোগবাদী সময়ের বিচ্ছিন্নতা আমাদের যে যন্ত্রণা দেয় তা বারবার ছোট ছোট মুহূর্ত নির্মাণে আঘাত করেছে। বহুজাতিক পুঁজি আমাদের যে সর্বস্ব গ্রাস করছে কি নিঃশব্দে এবং নীরবে, নির্দেশক মার্ক্স লেনিন-এর হাতে কোকাকোলার ক্যান ধরিয়ে দিয়ে তীক্ষ্ণভাবে বিদ্ধ করেছে। তাই যখন দীর্ঘ দিনের ঘাড়ে বোঝা নিয়ে নিংড়ে যাওয়া পিষে যাওয়া মানুষগুলিই কি নিদারুণ যন্ত্রণায় কর্পোরেট দুনিয়ার টাই-বাঁধা শ্রমিকে পরিণত হয়, আমরা দর্শকরা জেনে বুঝেই শিউরে উঠি। সমাজ রাজনীতির কতটা গভীরে গেলে একজন পরিচালক এইভাবে তার নাট্য নির্মাণ করতে পারে? জানি না। প্রশ্ন নিজেদের কাছেই সাধারণভাবে মার্ক্সবাদ আমদের সমাজের ধনী-দরিদ্রের শ্রেণিগত বৈষম্য অর্থাৎ সমাজের বিত্তশালী বিত্তহীনের সংঘাতকে স্পষ্ট করে মানুষকে সচেতন করে। মানবতাবাদের সঙ্গে তার চিরকালীন দ্বন্ধ থাকলেও দর্শনগত ভালোবাসাবাসি চলতেই থাকে। শরণ্য-র এই নাটকের পরতে পরতে এই ভাবনা চলতেই থাকে। তৈরি করে এমন এক নাট্যভাষা আমরা, মুখ নিচু আমরা ক্রমশ আরো সিঁটিয়ে যাই। প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক যুগের পালাবদল ঘটে গেলেও আমরা এক থাকি এক। বনমানব থেকে শুধুই যন্ত্রমানবে রূপান্তর ঘটে। আমরা দেখি, সেই প্রাচীন যুগের চকমকি পাথর জ্বালিয়ে যে আগুন জ্বালানো শুরু হয়েছিল তার থেকে এই কম্পিউটার প্রযুক্তির যুগে নিঃস্বার কিছু যন্ত্রমানব তৈরি করাতেই তথাকথিত আধুনিক সভ্যতার সৃষ্টির হাস্যকর ভাবনাকে ফালাফালা করে দিয়েছে, শরণ্যর এই নাটক।

এই নাট্য নির্মাণে পরিচালক বহুজাতিক পুঁজিকে শুধুই এক ব্যবস্থা-র কঠিন শব্দে আটকে না রেখে বারবার নাট্য মুহূর্ত নির্মাণ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন আদিম যুগের আগুন আজ কোকাকোলা ক্যানে রূপান্তরিত পরিচালকের এই ভাবনা তাঁর তীব্র গভীর রাজনৈতিক সচেতনতা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আমরা নড়ে বসি। যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদীর গান ব্যবহার করে, সাইক্লোরামায় মুহূর্তে মুহূর্তে প্রজেক্টর ভিজ্যুয়ালের মধ্য দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে নাটক শুধু সংলাপে নয়, নাটকের মনন অভিমুখ তৈরি হয় এরই মধ্য দিয়ে পরিমিত কথা ব্যবহার অভিনয় পোশাক রূপসাজ দৃশ্যায়ন প্রতিটা বিষয় যে একটা নাটকের এক এক চরিত্র হয়ে ওঠে, এই নাটক তার জলন্ত প্রতিচ্ছবি। 10th প্ল্যানেটের প্রত্যেক কুশীলবকে এর জন্য আমার অন্তরস্পর্শ আদর রইল। ভাবতে ভালো লাগে রাহুল দেবযানী পারমিতা এরা প্রত্যেকেই শরণ্য-র যোগ্য প্রযোজনা সহযোগী হয়ে নাটকটিকে এক অন্যতর মাত্রা দিয়েছে।

নাটকটি দর্শক দেখুন, আরো অভিনীত হোক, বিশেষ করে এই সময়ের প্রজন্ম দেখুক, তাদের দৃষ্টি স্বচ্ছ হোক। এই নাটক দেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে আমাদের ভাবনা ঋদ্ধ হয়েছে। বিশেষ করে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমরা যখন অদৃশ্য শাসকের শাসনে পরিচালিত হতে বাধ্য হচ্ছি, এইসময় এই নাটক আমাদের মনের অবদমিত ভাবনাকে লালন করে। 10th প্ল্যানেটের পরিচালক শরণ্যসহ সকল কুশীলবকে আরো ভালোবাসতে ইচ্ছে করে, তাদের সাহসকে কুর্ণিশ জানাতে ইচ্ছে করে। তারা যে পচে যায় নি, রাজনৈতিকভাবে তীব্র সচেতন, এই ভাবনা ডানা মেলে দেয়। ভালো থাক ওরা

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *