
গৌরাঙ্গ দণ্ডপাট
সম্পাদক
গৌরাঙ্গ দণ্ডপাট
সম্পাদক
A small river named Duden flows by their place and supplies it with the necessary
- Phone:+1 (859)00000
- Email:info@example.com
পার্থ হালদার
সম্পাদনা সহযোগী
পার্থ হালদার
সম্পাদনা সহযোগী
A small river named Duden flows by their place and supplies it with the necessary
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
শ্রেয়া ঘোষ
প্রচ্ছদ
শ্রেয়া ঘোষ
প্রচ্ছদ
A small river named Duden flows by their place and supplies it with the necessary
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
পল্লব মিশ্র
প্রচ্ছদ অলংকরণ
পল্লব মিশ্র
প্রচ্ছদ অলংকরণ
A small river named Duden flows by their place and supplies it with the necessary
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
দেবহূতি সরকার
অন্যান্য কাজে
দেবহূতি সরকার
অন্যান্য কাজে
A small river named Duden flows by their place and supplies it with the necessary
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
সুচরিতা রায়
অন্যান্য কাজে
সুচরিতা রায়
অন্যান্য কাজে
A small river named Duden flows by their place and supplies it with the necessary
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
পূর্ণতা নন্দী
অন্যান্য কাজে
পূর্ণতা নন্দী
অন্যান্য কাজে
A small river named Duden flows by their place and supplies it with the necessary
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
মৌলিকা সাজোয়াল
অন্যান্য কাজে
মৌলিকা সাজোয়াল
অন্যান্য কাজে
A small river named Duden flows by their place and supplies it with the necessary
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
অয়ন্তিকা নাথ
অন্যান্য কাজে
অয়ন্তিকা নাথ
অন্যান্য কাজে
A small river named Duden flows by their place and supplies it with the necessary
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
কর্তৃক
৮৬, সুবোধ গার্ডেন, বাঁশদ্রোণী, কলকাতা: ৭০০০৭০ থেকে প্রকাশিত।
- যোগাযোগ : ৯৬৪৭৪৭৯২৫৬
৮৩৩৫০৩১৯৩৪ (কথা /হোয়াটসঅ্যাপ)
৮৭৭৭৪২৪৯২৮ (কথা)
- Email : bhaan.kolkata@gmail.com
Reg. No: S/2L/28241 548
সূচিপত্র
* সম্পাদকের কথা – গৌরাঙ্গ দণ্ডপাট
* কলকাতার গালগপ্পোর পর্ব – ২৩ – কিশলয় জানা
* পানু পাল: জনজাগরণের নৃত্য ও নাট্য পর্ব – ৫ – মধুমিতা পাল
* বিনীতের অভিনয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে ‘Physics Wallah’ – অজন্তা সিনহা
* রোমান থিয়েটার – কুন্তল মুখোপাধ্যায়
*ছোটদের ছবি: ইরানি শৈশব! ২ – অরিত্র দে
* গেছি বারবার পর্ব ৮-৯ – ময়ূরী মিত্র
সম্পাদকের কথা
ব্যক্তি মানুষ ভয় পেয়েই বাঁচে। টিকে থাকতে হলে তাকে বেঁচে থাকতে হবে। বাঁচার মতো বাঁচতে হলে মোকাবিলা করতে হয় হাজারো ইস্যুর সঙ্গে। নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে। নানা অজানা আশঙ্কা, বহু রকমের অস্থিরতা তাকে বিপন্ন করে।রোগ-ভোগ- শোক-তাপ-জ্বরা-জ্বালা-অর্থ-ধর্ম-কাম-সম্মান এসবই উদ্বেগ বাড়ায়। মাথা সজাগ, দেহ চঞ্চল। বেশি বেশি অর্থ যশ এবং ক্ষমতার মৌতাত যারা চান তাদের ভয় ভয়ানক। ধরেছি ছাড়ার ভয় ছাড়া, করছি ফলের আশা ছাড়া, বলছি শোনানোর অভিপ্রায় ছাড়া, চাইছি কামনা ছাড়া, দিচ্ছি প্রতিদান ছাড়া, বাসছি বাসনা ছাড়া, ভাসছি কূলের স্বপ্ন ছাড়া–এ বড় সহজ কথা নয়! সুখের অপরপ্রান্তে লেগে থাকে বিচিত্র অসুখ। স্বস্তির আবহে ফিরে আসে অস্বস্তি। নিরুপদ্রব দিনে আচমাকাই ঘিরে ধরে ভয়ের বাতাস। আমাদের বিপন্ন করে।
একটা জাতির সংস্কৃতি চর্চার গভীরে এই ভয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখার অনেক আয়োজন থাকে। থাকতে হয়। যে জাতির মধ্যে যত বেশি সামাজিক আদান-প্রদান, আপন হতে বাহির হয়ে দাঁড়ানোর আন্তরিকতা– সেই জাতির মধ্যে এই অজানা ভয়, এই অস্থিরতার প্রাবল্য কম। একইসঙ্গে মরারও একটা আনন্দ আছে। অনেক বড় নৈতিক জীবনের জন্য যূথবদ্ধ মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষার গভীরে থাকে আনন্দ।
উত্তর পুঁজিবাদী জীবনচর্চা ব্যক্তির পার্সোনালিটিকে খর্ব করে। ইন্ডিভিজুয়ালটির জয়গান গাওয়া হয়। আমি আমি এবং আমির কালো এবং গভীর গর্তে হুড়মুড়িয়ে তলিয়ে যাই আমরা। ব্যক্তির অধিকারের আন্দোলনকে তীব্র না করে, ব্যক্তিকে সমাজচ্যুত করে তোলার খেলায় উত্তর পুঁজিবাদ যত্নশীল ভূমিকা রাখে। এতে অজানা ভয়ে, অজানা অস্থিরতায় ব্যক্তি মানুষের বেঁচে থাকা যতই সঙ্কটাপন্ন হোক না কেন, সেই আশঙ্কিত, অস্থিরচিত্ত, নার্সিসাস, সেডিস্টিক প্লেজারে হাঁফ ধরা মানুষই পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। পুঁজির জয়রথের চাকা। অনেক পেয়েও উদ্বেগে দুশ্চিন্তায় হাড় হাভাতের মতো ভয়ে ন্যুব্জ মানুষরাই পুঁজি-রথের ফুয়েল।
সেই ভয় ও আশঙ্কার যন্ত্রণা থেকে উপশম পেতে দলে দলে মানুষ মন্দিরে মসজিদে যেত। এখনো যায়। কাউন্সিলরের এর কাছে যায়। সাইক্রিয়াটিষ্ট এর কাছে যায়, সংঘের কাছে যায়, ক্লাবের সভাপতি পদ নেয়। বাৎসরিক দুর্গাপূজা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের হোতা হয়ে উঠতে চায়। ধর্মচর্চার নামে খাদ্য- পোশাক- আচার-রুচিতে নব নব পরীক্ষা করে। যাতে সে কিছুটা আস্থা পেতে পারে। যাতে সে অন্য মানুষের সাহচর্য পায়। যাতে সে একটাকিছু মিথ্যে হলেও ঢাল হিসেবে বানিয়ে তুলে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।
আজকের রাষ্ট্র নামক যন্ত্রটি নব্য পুঁজিবাদের দাসত্ব মেনে নিয়েছে। উত্তর পুঁজিবাদী নিয়ম-কানুন হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় কানুন। ব্যক্তির মগজের ভেতর প্রতিদিন সেই কানুনকে যুক্তিগ্রাহ্য বলে চেনানো হচ্ছে। আমাদের দেশ, আমাদের সমাজ, আমাদের যূথবদ্ধ সংস্কৃতি ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। আমাদের অবসর, আরাম-আহ্লাদ, আমাদের সবুজ-নীলের বাসনা , আমাদের যাবতীয় বেঁচে থাকার অর্থ দূরে সরে যাচ্ছে। আমরা মরতে ভয় পেয়ে বেঁচে থাকছি। বেঁচে আমরা ত্রিগুণ মৃত্যু ভয়ে মরে বাঁচছি।এই বাঁচা মৃত্যুর চেয়ে অনেক খারাপ জেনেও বেঁচে থাকছি। আমাদের মরতে ভয়, বাঁচতেও ভয়। আমাদের বাঁচা নেই, ভয় আছে। আমাদের শুধু ভয়, মরা নেই। কুঁকড়ে যাওয়া ভীত আমরা বাঁচা এবং মরার মাঝখানে ঝুলে থাকছি। আমাদের বড় কষ্ট। আমাদের কেষ্ট তার বাঁশি নিয়ে ফিরে গেছে। আমরা ভাঙা সুরে, কাটা ছন্দে, ভুল তালে ভয়ে সেঁদিয়ে আছি।
ভয় থেকে মুক্তি পেতে আমরা ধনী হবার চেষ্টা করছি। অর্থ দিয়ে ভয় তাড়তে চাইছি। উল্টে ভয় বেড়ে যাচ্ছে। আমরা ক্ষমতাবান হবার চেষ্টা করছি। কিন্তু তাতেও ভয় কমছে না। অধিকার করে নিতে চাইছি ভয়ভূমিকে। তবু শক্ত মুঠো আলগা হয়ে ঢুকে পড়ছে ভয়েরই বীজানু। ভয় থেকে মুক্তি পেতে আমরা ক্ষমতার পা চাটছি। কিন্তু ভয় কমছে কোথায়? নষ্ট হচ্ছে মেরুদন্ড ও স্বাধীনতার স্বাদ! ক্ষমতা নড়ছে। আনুগত্য সরছে। কোন ক্ষমতা আমার কতটা ভয়কে, কীভাবে ঠেকাবে– হিসেব না মেলাতে পেরে আমি ঠকঠক করে কাঁপছি। ভয় অজেয়। সব বদলে যাচ্ছে ভয় ব্রহ্ম হয়ে থেকে যাচ্ছে। ব্রহ্ম ভয়ে আমাদের জীবিত মুহূর্তেরা কাঁপছে।অ্যাংজাইটি নিবারণের সুরা প্রার্থনা করছি আমরা। আমাদের ঠাকুর ঘর, তাসের খেলা, পরনিন্দা, হামবড়া ভাব, বোলচাল, মদের ঠেক সব একাকার করে ভয় ভোলার একটা অস্থায়ী ক্ষণ ভঙ্গুর প্রাচীর তৈরি করার ব্যর্থ চেষ্টায়, মিথ্যা অভিনয়ে আমরা ক্লান্ত হয়ে উঠছি।
তবু সবার একই রকম ভয় হয় না। যারা ভয় পাওয়ায় তারা ভয় পায় বেশি। এ এক বিজ্ঞান। যারা ভয় দেখানোর খেলায় নেই, বরং কিছু আত্মভোলা, ভয় তাদের কম। যারা নিজের স্বার্থচিন্তায় অষ্টপ্রহর সজাগ ভয়ের মাছি তাদের জ্বালিয়ে মারে । যারা ভাবছে এই তো জীবন, দেখা যাক কী হয়,- তাদের ভয় কম। আর যারা দুবেলা মরার আগে মরবে না বলে পণ করেছে, তারা অকুতোভয়। ভয় তাদের ত্রিসীমানায় খুব একটা ঘেঁসে না।
আমরা যারা গণতন্ত্র-প্রেমি দেশভক্ত, আমরা যেন বুঝেও বুঝতে চাই না; জেনেও জানতে চাইনা এই কথাটা যে, ভয় তাড়ানোতে দেশের কী ভূমিকা থাকতে পারে! ব্যক্তির দুরপনেয় ভয়কে শিথিল করে দিতে পারে দেশের প্রতি ভরসা। রাজার মনোভাব, সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি, প্রশাসনের হালচাল এবং ভয় বিযুক্ত সংস্কৃতির প্রতি বিশ্বাস– ব্যক্তির গোপনে জমা ভয়ের পাহাড়কে ভাঙে। কিন্তু যে রাষ্ট্রতন্ত্রের চালিকা শক্তি পূজিতন্ত্র, সে রাষ্ট্র-তন্ত্র আমাকে কতটুকু ভরসা দিতে পারে? পুঁজির স্বভাব পাখা মেলে ওড়া। তার উদ্দেশ্য ফুলেফেঁপে সে আরো বড় পুঁজি হবে। পুঁজিপতিরা আরও বড় পুঁজিপতি হবে। পুঁজি তার বিকাশের স্বার্থে যাকে প্রয়োজন তাকে ভরসা দেবে। ভয়হীন করবে। আর বাকিদের সে ভয়ার্ত করে রাখবে। সন্ত্রস্ত করবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেই। ব্যক্তি মানুষ ব্যক্তিগত ভয় যত বেশি, বাজার-পুজির পোয়াবারো। মানুষ যত ভয় পাবে তত সে বেঁটে হবে। তত স্বার্থ মগ্ন হবে সে। স্বার্থমগ্ন পরশ্রীকাতর ব্যক্তি মানুষই পুঁজি দেবতার নৈবেদ্য।
আজকের রাষ্ট্র ভয় কমাতে চায় না। শুধু এই কথাটা পর্যাপ্ত নয়। বলা ভালো রাষ্ট্র ভয় পাওয়ানোর একটাও মোওকা ছাড়ে না। প্রতিদিন নতুন নতুন ভয়ের রাক্ষস কে ছেড়ে দেয় সে। পথে-ঘাটে মাঠে ময়দানে অলিতে গলিতে পাড়ায় মহল্লায় সে ভয় ছড়াতে থাকে দ্রুত। এমনকি সে আতঙ্ক ঢুকে পড়ে আমাদের ভয়ার্ত নির্ঘুম বেডরুমে। এন.আর.সি, এস.আই.আর, ভোটার লিস্ট , নাগরিকত্ব, পুরনো দস্তাবেজ, লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আধার, লিঙ্ক আর সার্ভার, কার্ড আর ওটিপি, পাশ ওয়ার্ড, সংখ্যালঘু, শো-কজ, দলিত,আদিবাসী,পাকিস্থানী,খালিস্থানী, আরবান নকশাল, জল জঙ্গলের নব্য আইন, পাসপোর্ট, ব্যাঙ্ক, পুলিশ, হাসপাতাল, জন্মের সার্টিফিকেট আরো শতশত হাজারো হাজার ভয় দেখানোর কল। মূল্যবৃদ্ধি, স্বাস্থ্য বীমা, স্কুল ফিজ, নব্য নতুন একুশে আইন, প্রতিবাদ, নেতা পুলিশের জুলুম, গুন্ডা বাহিনীর দৌরাত্ম্য এর কী শেষ আছে! রক্তকরবী -এর নন্দিনী বলেছিল, ভয় দেখানোর ব্যবসা এখানকার মানুষের। নন্দিনী বিশুপাগল কিশোরের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে লড়াই টা সামনাসামনি না করলে, চোখে চোখ রেখে মোকাবেলা না করলে, আমাদের ভয় প্রশমনের কোনো সত্যকারের পথ নেই। পালানোর মিথ্যেতে ভয় বাড়ে। চোখে চোখ রেখে জীবন কে বাজি না রাখতে পারলে, ভয় আমাদের ছাড়বে না। আমরা তা পারিনা। কিন্তু নির্ভয় হওয়ার বাসনা আমাদের বিব্রত করে। নির্ভীক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ভয়টুকু যেন জয় করতে পারি, জীবন দেবতার কাছে এই আশু প্রার্থনা।
হুজুকে কল্কেতা – কিশলয় জানা পর্ব ২৩

হুজুকে কল্কেতা
কিশলয় জানা
বাঙালি চিরকালই হুজুকে জাতি। তার একটা-না-একটা হুজুক পেলেই হল। নাওয়া-খাওয়া ভুলে কিংবা নেয়ে-খেয়েই আবার সে মেতে ওঠে হুজুকে। আর সবার সেরা হচ্ছে কলকাতার বাঙালি। আজগুবি, সৃষ্টিছাড়া নিত্যনতুন ‘হুজুক’ তুলতে কলকাতার বাঙালির জুড়ি মেলা ভার। কথাগুলি আমার নয়, স্বয়ং মহর্ষি হুতোমের। বাঙালির তথা সেকেলে কলকাতার বেদ-বেদাঙ্গ-বিদ্যাস্থানেভ্য বলতে তাঁর যে ‘নক্শা’, তাতেই বলেছেন তিনি, কলকাতা তো কেবল কলকাতা নয়, যাকে বলে “হুজুকে কল্কেতা”।
কলকাতার বাঙালির প্রথম এবং প্রধান হুজুক বারোয়ারি পূজা। কোথায়-কবে-কে এর প্রথম প্রচলন করেছিলেন, সেই তথ্য-তালাশে যাচ্ছি না, কিন্তু নবসাজে শহুরে কলকাতা গড়ে ওঠবার সেই প্রথম দিন থেকেই এখানে বসবাসকারী বাঙালির এক এবং একমাত্র ধ্যানজ্ঞান যেন-তেন-প্রকারেণ একটি বারোয়ারি পূজার প্রবর্তন করা। আমি অভিজাত এবং বিত্তবান বাবুদের বাড়ির দুর্গোৎসবের কথা বলছি না, খাস নগর-কলকাতায় তার প্রচলন করেছিলেন ‘ব্ল্যাক জমিদার’ গোবিন্দরাম মিত্র। সেকালে লোকের মুখে-মুখে একখানি ছড়া ফিরত—
আমিরচাঁদের দাড়ি,
বনমালী সরকারের বাড়ি।
হুজুরিমলের কড়ি,
গোবিন্দরাম মিত্তিরের ছড়ি।।
এই ছড়ার আমিরচাঁদ এবং হুজুরিমল বাঙালি ছিলেন না, জাতিতে ছিলেন শিখ, পেশায় ব্যবসায়ী, সেইসঙ্গেই উভয়ে উভয়ের ভগিনীকে বিবাহ করায় ছিলেন নিকটাত্মীয়। ক্লাইভকে যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ঋণস্বরূপ দেন হুজুরিমলই। ক্লাইভ না-কি তাঁকে দেখে বিশ্বাসই করতে পারেননি যে লোকটির এত টাকাকড়ি থাকতে পারে। শেষে হুজুরিমলের ধনাগার দেখে বিস্ময়ে ক্লাইভের চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যায়। সিরাজের কলকাতা আক্রমণের সময় তাঁর সৈন্যরা হুজুরিমলের ধনাগার লুণ্ঠনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়, হুজুরিমল নিজে তাঁর ডান হাতখানি খোয়ান। বনমালী সরকার ছিলেন প্রথমদিকে গোবিন্দরাম মিত্রের একজন কর্মচারী, পরে ফুলেফেঁপে বড় মানুষ হন এবং কলকাতার দেশীয় মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে সুদৃশ্য এবং সুউচ্চ বাড়ি তৈরি করে মানুষের মনের হল অফ ফেমের মধ্যে ঢুকে পড়েন। গোবিন্দরাম ছিলেন কলকাতার দ্বিতীয় ডেপুটি ব্ল্যাক জমিদার। তাঁর আগে প্রথম ‘ব্ল্যাক জমিদার’ হিসেবে কাজ করেন নন্দরাম সেন। গোবিন্দরাম অবশ্য সবচেয়ে বেশিদিন এই পদে বহাল ছিলেন। ১৭২০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দ অর্থাৎ ৩২ বছর। তাঁর বাড়িতেই সর্বপ্রথম জাঁকজমক করে দুর্গাপূজা শুরু হয়। কিন্তু সে-সব পারিবারিক পূজা। কলকাতার বারোয়ারি পূজার প্রথম প্রচলন হয় জোড়াসাঁকোর ধনী ব্যবসায়ী শিবকৃষ্ণ দাঁ-এর উদ্যোগে। শিবকৃষ্ণের বড়বাজারে লোহার ব্যবসা ছিল, কয়লাখনি ছিল, উপরন্তু তিনি ছিলেন ইস্ট-ইণ্ডিয়া ও ইস্টার্ন রেলওয়ের ঠিকাদার। যাকে বলে বেহুদো বড়লোক। তবে তিনি কলকাতায় ‘বারোয়ারি’ পূজার প্রথাটি চালু করলেও, বাঙালির ‘বারোয়ারি’ প্রথম চালু করেন শান্তিপুর, উলো, গুপ্তিপাড়া, কাঁচড়াপাড়া ও চুঁচুড়ার অধিবাসীরা। সে-সময় গঙ্গার এ-পার ও-পারে এ-নিয়ে রীতিমতো হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলত, এখনকার মতো সেরা সিংহ, সেরা অসুর ইত্যাদির পেট্রন ছিল না বটে, কিন্তু মানুষ এক-এক বছর যে-এলাকার পূজা দেখতে উন্মত্তের মতো ছুটতেন, সেই এলাকার পূজাই সেরা বলে বিবেচিত হতো। অর্থাৎ, এখনকার বারোয়ারি-ট্রেণ্ড কলকাতা ঝেপে দিয়েছে মফস্সল থেকে। যাই হোক, প্রথমত শিবকৃষ্ণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা ইত্যাদি নিয়ে, তখন বলা হত ‘বারোয়ারি বৃত্তি’, কলকাতায় সম্মিলিত পূজা শুরু করেন। কালক্রমে এই হুজুকটা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন প্রান্তের ধনীদের মধ্যেই। তা-বলে এঁদের পরিবারে আলাদা করে পূজা হত না এমনটি কিন্তু নয়, কিন্তু ‘বারোয়ারি’-তে বারো ভূতের কেত্তন করা যাবে বলেই এই-জাতীয় হুজুকের জন্ম হয়। ক্রমে বারোয়ারি কলকাতার ধনী-দরিদ্র সব মানুষদের সাধারণ হুজুকে পরিণত হয়। এমনকি সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের বাড়ির ছেলেপিলেরাও এই হুজুকে সামিল হন এবং রীতিমতো জোরজুলুম করে পথচারীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করতে নেমে পড়েন। পালকি করে জেনানারা গেলেও তাঁদের হাত থেকে রক্ষে ছিল না। শেষে পেটন সাহেব নারীবেশে অভিযান করে কীভাবে সেই বারোয়ারির ভূতকে শায়েস্তা করেন, তা যেহেতু আগেই বলা হয়েছে, অতএব নিরস্ত হলাম।
বারোয়ারির হুজুক এতদূর জেঁকে বসেছিল যে, কলকাতার পশ্চিমে শিবপুর গ্রামের এক পূজায় আড়াইশো টিকিট ছাপা হয় লটারি খেলার জন্য। এক টাকা করে সেই টিকিট কাটবেন সবাই, শেষে যার নামের টিকিট পাইজে উঠবে, তাঁর নামেই সঙ্কল্প করে ওই বারোয়ারির প্রতিমা পূজা হবে। বারোয়ারির চাঁদা জোগাড়ের জন্য কত কৌশল ভাবা যায় ! তবে বাঙালির এই একটি হুজুক কিন্তু চিরকালীন হয়ে টিকে থাকতে পেরেছে, বাকি সব হুজুক নেহাতই ক্ষণস্থায়ী।
জাল প্রতাপচাঁদের ঘটনা বর্ধমানের হলেও তা-নিয়ে কলকাতার কৌতূহল কম ছিল না। বিষয়টি আমাদের সকলেরই জানা। বর্দ্ধমানের রাজা প্রতাপচাঁদ মরে গিয়ে আবার ফিরে এসেছেন—এই ঘটনায় কলকাতা তখন উত্তেজিত। ঘাটে-বাটে-মাঠে সকলের তখন এক কথা, এক আলোচনা—প্রতাপচাঁদের ফিরে আসা। মামলাটি দীর্ঘদিন চলেছিল এবং তাতে কলকাতার গণ্যমান্য অনেকেই, বিশেষ করে দ্বারকানাথ ঠাকুরের মতো মানুষ জড়িয়ে পড়েছিলেন। আজকে প্রমাণিত যে, প্রতাপচাঁদের বিরুদ্ধপক্ষ হিসেবে পরানচাঁদ, যিনি প্রথমে ছিলেন প্রতাপচাঁদের পিতা তেজচাঁদ রায়ের শ্যালক, সেই সূত্রে বর্ধমান রাজ এস্টেটের প্রধান দেওয়ান, পরে তেজচাঁদের শ্বশুর এবং তেজচাঁদের পোষ্যপুত্র মহতাব চন্দের পিতা, তিনিই ছিলেন মূল ষড়যন্ত্রকারী। তাঁর সঙ্গে কোন অজ্ঞাত কারণে যোগ দেন দ্বারকানাথ ঠাকুর, যাঁর মিথ্যা সাক্ষীতে প্রতাপচাঁদকে ‘জাল’ বলে সাব্যস্ত করা হয়। সে-সময় শহরের মানুষ এই মামলা নিয়ে প্রায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। এই হুজুক বাঙ্গালি-মননে কী অভিঘাত তৈরি করেছিল, তা বোঝা যায় অনেক কাল পরে যখন বঙ্কিম-অগ্রজ সুসাহিত্যিক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই ঘটনা নিয়ে ‘জাল প্রতাপচাঁদ’ নামের ইতিহাস-আশ্রিত ‘নবেল’টি লেখেন।
প্রতাপচাঁদ অসুস্থ হয়ে অন্তর্জলী যাত্রার শেষে মৃত্যুর পরেও ফিরে আসেন, আর সেই ‘মরা ফেরা’র কাহিনি হুজুকের আকারে অনেকদিন পর আবার ফিরে এসেছিল। হুতোম এ-নিয়ে বিস্তৃত লিখে গেছেন তাঁর নক্শায়। আরও অনেকে বলেছেন, যেমন— অম্বিকাচরণ গুপ্ত এবং ‘নদীয়া-কাহিনি’তে কুমুদনাথ মল্লিক। সিপাহী-বিদ্রোহে অনেক সিপাহীর মৃত্যু হলে নদীয়া অঞ্চলের কোন প্রতারক ১৮৬৯-৬০-এর দিকে এই গুজবটি ছড়িয়ে দেন যে, গোপালের (কৃষ্ণের) কৃপায় ১৫ কার্তিক রবিবার দশ বছরের মধ্যে যারা মারা গেছে, তারা ফিরে আসবে। কোন-কোন মতে, কার্তিক মাস নয়, ১৬ই আশ্বিন মরা ফিরবে এমন হুজুক ওঠে। যাই হোক, নদীয়া থেকে কলকাতায় হুজুকটি আসতে কিছুটা সময় লেগেছিল হয়তো, সেজন্যই হুতোমের মতকেই আমরা গ্রহণ করছি। কলকাতার লোক এই হুজুকে একেবারে উন্মত্ত হয়ে উঠল। শ্মশানঘাটগুলিতে মরা ফেরার অপেক্ষায় নির্দিষ্ট দিন ভোর থেকেই লোকে লোকারণ্য হয়ে গিয়েছিল। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, মায় বিধবারা ভিড় করে বসে রইলেন যে, গঙ্গায় ভাসতে-ভাসতে যমালয় থেকে মৃত প্রিয়জন ফিরে আসবে বলে। কিন্তু কোথায় কী ? ব্যর্থ বঞ্চিত হতাশ হয়ে শেষে যখন শহর বুঝল, বেবাক কথাটাই মিথ্যে হুজুক মাত্র, তখন সে-হুজুক হাউইবাজির মতো ফুস্ করে নিভে গেল।
ভূ-কৈলাসের হঠযোগীর আবির্ভাবকে কেন্দ্র করে এমনই এক হুজুকে সারা কলকাতা মেতে উঠেছিল। এ-কথা হুতোম বলেছেন, বলেছেন অক্ষয়কুমার দত্ত, আরও পরে বড়দের মুখে শোনা কথার উপর ভিত্তি করে বলেছেন বিবেকানন্দের মেজ ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর অতুলনীয় গ্রন্থ ‘কলিকাতার পুরাতন কাহিনি ও প্রথা’য়। সে-সময় পোর্ট ক্যানিং যাওয়ার জন্য রেলের লাইন বসানোর কাজ চলছিল, মাটি কাটার সময় মাটির অনেক নিচে একখানি শিবমন্দির এবং তার মধ্যে ধ্যানস্থ এক বছর তিরিশের যুবককে পাওয়া গেল, একেবারে নিশ্চল-নিষ্পন্দ। তাঁকে নিয়ে আসা হয় খিদিরপুরের ভূ-কৈলাসের রাজবাড়িতে। সেখানে অনেক চেষ্টার পরে তাঁর ধ্যানভঙ্গ করা হয়। এই মহাপুরুষকে দেখবার জন্য সারা শহর ভেঙে পড়েছিল। অনেকে সেই মহাপুরুষের পায়ের ধুলো মাদুলিতে পরে বাচ্চাদের হাতে বেঁধে দিল, শোনা গেল, এই মাদুলি হাতে বাঁধা থাকলে ভূত-প্রেত-শাঁকচুন্নি আর পালাতে পথ পাবে না। নতুন হুজুক পেয়ে কলকাতার মানুষ একেবারে নাওয়া-খাওয়া ভুলে গিয়েছিল। অনেক সম্ভ্রান্ত মানুষ তাঁকে দেখতে ভিড় জমিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের তো কথাই নেই। তবে এই হঠযোগী যে আদতে ভণ্ড এবং গোটা ব্যাপারটিই হুজুক, তা বলেছিল সমসাময়িক পত্রিকা ‘জনবুল’ কিংবা ‘জ্ঞানান্বেষণ’। মহাপুরুষের পরিণতি সম্পর্কে হুতোম বলেন, পরে ইনি লোকের হাত-পা টিপে পয়সা নিয়ে কায়ক্লেশে জীবনযাপন করতেন, অক্ষয়কুমার দত্ত জানিয়েছেন বারবণিতা-সংসর্গে এঁর মৃত্যু হয়, মহেন্দ্রনাথ জানিয়েছেন, ধ্যানভঙ্গের পর এঁর শরীর কৃশ হয়ে স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে এবং মৃত্যু হয়। তবে হুতোমের লেখার সময়েই এঁর সম্পর্কে যে সাধারণ মানুষের মোহভঙ্গ ঘটেছিল, তা বোঝাই যায়, নাহলে হুতোম তাঁর নক্শায় এভাবে ব্যঙ্গ করতে পারতেন না।
আর-একটি হুজুকের কথা শুনিয়েছেন হুতোম এবং মহেন্দ্রনাথ। এইখানে সেটি সংক্ষেপে জানিয়ে রাখি। ১৮৬০-এর দিকে কলকাতায় হুজুক ওঠে যে, দিল্লী থেকে এক পিশাচসিদ্ধ পুরুষ হোসেন খাঁ জিন্নী কলকাতায় এসেছেন এবং নানারকম আজব ঘটনা ঘটাচ্ছেন। বন্ধ সিন্দুকের মধ্যে থেকে টাকা গায়েব, এর হীরের আংটি সবার সামনে ফেলে দিয়ে ওর পকেট থেকে বের করা এইসব কাজ হোসেন খাঁ তার বশম্বদ পিশাচদের দ্বারা করাতেন বলে রটে গেল। কেশবচন্দ্র সেনের বাড়িতে এঁর বেশ যাতায়াত ছিল। কলকাতায় বেশ পসার জমিয়ে তুলেছিলেন হোসেন খাঁ। লোকে হুজুকে পড়ে তাঁর আজব কীর্তি দেখতে ভিড় জমাতো। তবে সন্দেহ নেই লোকটি আদতে ছিল পাকা ম্যাজিশিয়ান এবং প্রতারক। কলকাতার বিখ্যাত ঘড়ির ব্যবসায়ী হ্যামিলটনের বাড়িতে (দোকান) সমস্ত ঘড়ি চুরি করার অপরাধে হোসেন খাঁ ধরা পড়েন এবং তাঁর জেল হয়। জেলেই হোসেন খাঁ-র ইন্তেকাল হয়। ঘড়িচুরির অপরাধে ধরা পড়ার পরেই অবশ্য তাঁকে ঘিরে কলকাত্তাইয়া হুজুক থেমে গিয়েছিল।
কলকাতাবাসীর হুজুকের অভাব ছিল না। কখন সাতপেয়ে গরু নিয়ে হুজুক, কখন স্নানযাত্রা নিয়ে, কখন মোহান্ত-এলোকেশীর মামলা নিয়ে শহর একেবারে মশগুল। সদলবল এবং স-বেশ্যা সমেত কালীঘাটে গিয়ে আমদপ্রমোদ করাও আসলে হুজুকই। এই হুজুকে কত অর্থবান ব্যক্তি যে রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল, তার ইয়ত্তা নেই। রানি ভিক্টোরিয়ার স্বামী প্রিন্স আলবার্ট-এর অনুকরণে মাথার একপাশে সিঁথি কেটে চুল আঁচরানোর হুজুকেও দীর্ঘকাল বাঙালি মেতে ছিল। আর তারা পাশাপাশি কলকাতার বাবুদের বুলবুল লড়াই থেকে ঘটা করে বেড়ালের বিয়ে দেওয়া নিয়েও বাঙালির হুজুকে মেতে উঠত। এক বাবু বিড়ালের বিয়েতে এত টাকা ওড়ালে, আর-এক বাবু তার দ্বিগুণ-তিনগুণ উড়িয়ে বাবুয়ানির হদ্দ করে ছাড়তেন। এ-সবই হুজুকে-বাঙালির স্বভাবসুলভ কাজ।
কলকাতার হুজুকের কথা বলতে গেলে রাত কাবার হয়ে যাবে। সম্পাদক-মশাইয়ের মুখ এখনই ক্রোধে লাল। অতএব এবারের মতো বিদায় নেওয়ার আগে একখানি তুলনায় আধুনিক হুজুকের কথা বলে ক্ষান্ত দিই। কলকাতায় সেবার পচা পুকুরে মা গঙ্গার আবির্ভাব ঘটেছিল, আর তা নিয়ে হুজুকে কলকাতাবাসী দিনকয়েক মেতে উঠেছিল। এ-ঘটনাটি অনেক পরের। ১৯১১-র দিকের। উত্তরকলকাতার মুরলীবাগানে নামক এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছিল। সেখানে একটি বহুকালের পুরানো এবং পরিত্যক্ত পচা পুকুর থেকে একদিন আতর-গোলাপের সুগন্ধ বেরুতে দেখা গেল। পচা পুকুরে মা গঙ্গা আবির্ভূত হয়েছেন—এ-কথা রটে গেলে হুজুকে বাঙালি ভক্তি গদগদ চিত্তে সেখানে ছুটল। পূজা আর আরতিতে ক’দিন নরক-গুলজার হয়ে উঠল স্থানটি। কেউ-কেউ এই মওকায় সেই সুগন্ধী পচা জল মা গঙ্গার আশীর্বাদ বলে চার-পাঁচ টাকা দামে বিক্রি করতে লাগলো। শেষে সন্দেহ হওয়ায় কুন্তলীনের হেমেন্দ্র মোহন বোস পুলিশ নিয়ে এসে অনুসন্ধান করায় দেখা গেল, কুন্তলীনের কয়েক পেটি চুরি করে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। তারই কয়েক বোতল ভেঙে পুকুরের জলে মিশিয়েই এই প্রতারণার ব্যবসাটি ফেঁদে বসেছিল একদল দুষ্কৃতি। তাদের পাণ্ডা নিকটবর্তী গোরুর গাড়ির এক আড্ডার সর্দারকে গ্রেপ্তার করার পর এই হুজুক বন্ধ হয়ে যায়। তবে এই হুজুক বন্ধ হয়ে গেলেও, নত্য-নতুন হুজুক্ চলতেই থাকে। কলকেতের কী আর হুজুকের অভাব?
পানু পাল : জনজাগরণের নৃত্য ও নাট্য – মধুমিতা পাল পর্ব ৫

পানু পাল: জনজাগরণের নৃত্য ও নাট্য
মধুমিতা পাল
(আগের পর্বের পর)
১৯৪৩, বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবী আর বিশ্বযুদ্ধ সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চলছে দেশে অন্নের হাহাকার। রংপুরে অনাথ আশ্রম খোলা হলো যেখানে ঠাঁই পেল ৪৩ জন অনাথ ছেলে মেয়ে। সেই বছরই আবার রংপুরে মহকুমা কৃষক সম্মেলন তোড়জোড় চলছে। অনুষ্ঠানে সরোজ মুখার্জি আসবেন। অনুষ্ঠানের পরিকল্পনায় দিন-রাত ডুবে রয়েছি এই সময় অবলম্ব^নে একটা নৃত্যনাট্যের পরিকল্পনা করি। তুমুল আলোড়ন ফেলেছিল নৃত্যনাট্যটি। এদিকে ৪৩ গড়িয়ে ৪৪ সাল। কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলন কলকাতায়। আমিও রংপুর স্কোয়াড নিয়ে হাজির হলাম ওখানে। তখন এইসব রাজনৈতিক সম্মেলনে প্রচুর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। আমরা সেখানে মঞ্চস্থ করলাম নৃত্যনাট্য “হাঙ্গার এন্ড ডেথ”। প্রবল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল নৃত্যনাট্যটি কলকাতাতে। উচ্ছসিত লেখা বেরোচ্ছে কাগজে আর আমি রংপুরের কৃষক আন্দোলনের এক কর্মী হঠাৎ করে কলকাতার সাংস্কৃতিক জগতের পাদপ্রদীপে চলে এলাম। কলকাতা সম্মেলন শেষে আবার ফিরে গেলাম রংপুর। নতুন অভিজ্ঞতায় আরো শক্তিশালী সাংস্কৃতিক মঞ্চ গঠনের কথা মাথায় জমা বাঁধছে। কিন্তু ভাবনার জল শুকোতে শুকোতে ডাকলো কলকাতা থেকে। পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডেকে পাঠিয়েছেন সারা ভারত কৃষক সম্মেলন (৪৪) উপলক্ষ্যে অন্ধ্রপ্রদেশের বিজয়ওয়াড়া যেতে হবে। একা প্রায় এক বস্ত্রে চলে গেলাম বিজয়ওয়াড়া। কিছুদিন পর অবশ্য উষা দত্ত (নৃত্যশিল্পী) এবং অন্যান্যরা যোগ দিয়েছিলেন। ওখানে অনুষ্ঠিত হল নৃত্যনাট্য “ক্ষুধা ও মন্বন্তর এন্ড ডেখ”। এখনো মনে পড়ে দকী প্রচণ্ড আলোড়ন তুলেছিল নৃত্যনাট্যটা। দেওয়ার পালা শেষ করে এবার বোম্বাইয়ে নতুনভাবে গুছিয়ে নিয়ে তৈরি হল বেঙ্গল স্কোয়াড। মালাবার হইছে প্রথম অভিনয় “ক্ষুধা ও মন্বন্তর” এবং বিজন ভট্টাচার্যের লেখা জবানবন্দির হিন্দিতে অনুবাদ করা “অন্তিম অভিলাষ”। এসময় খুব মনে পড়ে শম্ভু মিত্রের সহযোগিতার কথা। সুহাসিনী দেবী, যিনি ছিলেন সরোজিনী নাইডুর বোন, অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে তিনি এতটাই উচ্ছসিত হলেন যে আমাদের আমন্ত্রণ করলেন এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন অনেকের মধ্যে বিজয়লক্ষী পন্ডিত, সরোজিনী নাইডু যিনি অনুষ্ঠান শেষে প্রায় কেঁদে উঠে বলেছিলেন, ‘ইজ দিস আওয়ার বেঙ্গলি?’ পরে কোন এক সমুদ্র তীরে প্রায় ৮ হাজার দর্শকের সামনে অনুষ্ঠানটা হয়েছিল। সেখানেই পরিচিত হলাম পৃথ্বীরাজ কাপুর, তখন যদিও খুব ছোট হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় সেই সব বিখ্যাত মানুষদের সঙ্গে। বোম্বাই থেকে চলে গেলাম সূরা, আমেদাবাদ ইত্যাদি স্থানে অনুষ্ঠান করতে। শেষে আবার মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে কলকাতা।
কি লিখব? শুধু চেতনার আগুন ছড়িয়ে দেবার কথা? কিন্তু নিজেদের মধ্যে কোথায় সেই উত্তাপ? কোথায় সেই চেতনা? শুধু স্বার্থপর, ক্ষুদ্রতা সেইসব নিয়েই যেন সবাই মত্ত। যে রাজনৈতিক চেতনাকে সঙ্গী করে এগিয়ে গিয়েছিলাম তার লেশমাত্র নেই নিজেদের মধ্যে। তবুও এর মধ্যেই এই সমস্ত অভিজ্ঞতাকে সঙ্গী করেই ধারণা হচ্ছিল আইপিটিএ গঠন করার। আবার রংপুর ও কৃষক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলন দেখতে দেখতে চলে এল ১৯৪৬-এর অন্তর্র্বর্তী নির্বাচন। সেই সঙ্গেই আমার জীবনের অন্য এক অধ্যায়। ভোটের আর তখন মাত্র ১৭ দিন বাকি। বিয়ে ঠিক করে ফেললেন, পাত্রী ময়মনসিংহের শেরপুর গ্রামের শ্রীমতি মমতা দত্ত। খেপি চলেছে এখনো আমার অসহায় নিঃস্ব জীবনের একমাত্র সহায়।
নির্বাচনের কিছুদিন আগের কথা। ভবানী সেন আসছেন রংপুরের সমাবেশে। প্রচণ্ড কর্মব্যস্ততা তখন। সমাবেশের সাংগঠনিক প্রস্তুতি অন্যদিকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কাজ। এমন ব্যস্ততার মধ্যে অতি দ্রুত প্রায় এক নিঃশ্বাসে লিখে ফেললাম ‘প্রিমিয়ার কথা’ বলে পাঁচালী ধর্মী একটি লেখা। সমাবেশে তার আবৃত্তি হল। ভবানী সেন পর্যন্ত ভীষণ উৎসাহিত হয়ে বললেন আর একটা কপি তাকে তখনই দিয়ে দিতে। পরের সপ্তাহেই সেটা ছাপা হল স্বাধীনতা কাগজে এবং আরো প্রচুর ফোল্ডারে ছাপিয়ে বিলি করা হল বিভিন্ন জেলায়।
নির্বাচনের পালা শেষ হতে না হতেই চিঠি পেলাম হেমাঙ্গ-র (হেমাঙ্গ বিশ্বাস) কাছ থেকে। পার্টির নির্দেশে সিলেট যেতে হবে স্কোয়াড তৈরির জন্য। আমার লেখা নাটক ‘রক্তের ঋণ’, কাটুন ধর্মী নাচ ‘ফ্রিডম মেড ইন ইংল্যান্ড’ আর হেমন্ত থাকতোই। তখন ওর গলায় জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র নবজীবনের গান খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে আসামের রাজধানী শিলংয়ে গেলাম। তখনকার মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈ এতটাই উৎসাহিত হলেন যে তিনি আমাদের যাবতীয় কর মুক্ত করে দিলেন। অনুষ্ঠান না করেই ফিরে আসতে হল।(…ক্রমশ)
বিনীতের অভিনয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে ‘Physics Wallah’ – অজন্তা সিনহা

বিনীতের অভিনয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে ‘Physics Wallah’
অজন্তা সিনহা
অলখ পান্ডে ‘Physics Wallah’-এর নাম আপনারা কেউ কেউ শুনেছেন, কেউ হয়তো শোনেননি। অন্তত বিজ্ঞানের অধ্যাপক, শিক্ষক বা ছাত্রছাত্রীরা তো এঁকে চেনেন নিশ্চয়ই! ইনি সেই সমাজমনস্ক আবেগপ্রবণ পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক, যিনি সাশ্রয়ী ও মানসম্মত শিক্ষা সারা ভারতের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতে অনলাইন শিক্ষার জগতে বিপ্লব ঘটান। এহেন অলখ পান্ডের জীবনী এখন ওয়েব পর্দায়। এছাড়াও পাঠক স্মরণ করতে পারেন, ‘কোটা ফ্যাক্টরি’, ‘অ্যাসপিরান্টস’-এর মতো সিরিজের কথা, যেখানে সুনির্দিষ্টভাবে শিক্ষাজগতের অব্যবস্থার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করা হয়। অত্যন্ত স্মার্ট ও বিশ্বাসযোগ্য ছিল দুটি প্রযোজনাই। প্রযোজক দ্য ভাইরাল ফিভার (The Viral Fever অথবা TVF) এবার নিয়ে এসেছে ‘হেলো বচ্চন’, ওই একই প্রেক্ষিত মেনে। পাঁচটি পর্বে গড়ে ওঠা এই সিরিজে দেখা যায়, কীভাবে এক ছোট শহরের শিক্ষক ব্যয়বহুল কোচিং ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করে শিক্ষায় সাশ্রয়ী বিপ্লব আনেন। নেটফ্লিক্স-এ আপাতত স্ট্রিমিং হচ্ছে সিজন ১! বলা বাহুল্য, ওয়েব দুনিয়া যে ক্রমশ চিরাচরিত বিনোদন রীতি অনুসরণ না করে বেশ কিছুটা ব্যতিক্রমী পথে হাঁটছে, সেটা দর্শকদের জন্য এক বিশেষ প্রাপ্তি।
অন্যান্য প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে ছবির কলাকুশলীদের কথা। কারণ, অসাধারণ দক্ষ ও সামাজিক দায়বদ্ধতায় ঋদ্ধ একটি টিম ছাড়া এমন নির্মাণ সম্ভব নয়। সত্যি ঘটনা অবলম্বনে সৃষ্ট এই জীবনীধর্মী নাটক (Biographical Drama) সৃষ্টির প্রধান রূপকার অভিষেক যাদব। তাঁর সঙ্গে নেপথ্যে কাহিনি নির্মাণে রয়েছেন বর্ণালী যাদব, অঙ্কিত যাদব, সন্দীপ সিং রাওয়াত। যেমন কাহিনির নির্মাণ, তেমনই পর্বে পর্বে পরিচালনায় এই সিরিজকে অভিনবত্ব দিয়েছেন পরিচালক প্রতীশ মেহতা। অভিনয়ে আছেন বিনীত কুমার সিং (অলখ পান্ডে), বিক্রম কোচার (প্রতীক মহেশ্বরী), গিরিজা ওক (অলখের বোন), অনুমেহ জৈন (শিবাঙ্গী), চিত্রাংশ রাজ (সনম), পঙ্কজ কাশ্যপ (কৃষ্ণ স্যার), মুদিত দ্বিবেদী (অলঙ্কৃত), প্রশান্ত শেঠি (অভিষেক), সত্যেন্দ্র সোনি (ভোলা) ! আছেন মনোজ যোশী, জয় সেনগুপ্ত, নমন জৈন, কুণাল শর্মা ও আরও অনেকে। এই যে নামগুলির উল্লেখ করলাম, এঁরা কেউ তারকা নন, এক একজন ডাকসাইটে অভিনেতা। এঁদের ছাড়া পর্দায় ‘হেলো বচ্চন’ বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারত না।
এই সিরিজে এমনভাবে কাহিনি উপস্থাপিত করা হয়েছে, যেখানে শুধু সাফল্যের কাহিনি নয়, বরং ভারতের প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থার অসাম্যও তুলে ধরা হয়েছে। পরিবারের চরম আর্থিক দৈন্য, ছাত্রদের ওপর মানসিক চাপ এবং ব্যবসা ও নৈতিকতার দ্বন্দ্ব–সবই এখানে ফুটে উঠেছে। বিনীত কুমার সিংয়ের অলখ পাণ্ডে একেবারে রক্তমাংসের এক চরিত্র হয়ে উঠেছে। অত্যন্ত সংযত ও বাস্তবসম্মত অভিনয় করেছেন তিনি। এতটুকু অতিরঞ্জিত না করে সহজ ও মানবিকভাবে চরিত্রটিকে তুলে ধরেছেন বিনীত। তার অভিনয় সিরিজটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। সহ-অভিনেতাদের মধ্যেও মেলে এক অসাধারণ সমন্বয়।
তবে, এই সিরিজের সবচেয়ে বড় শক্তি হল এর কাহিনি। দারুণ প্রাঞ্জলভাবে প্রান্তিক ছাত্রছাত্রীদের গল্প তুলে ধরা হয়েছে এখানে। দর্শক সহজেই অনুভব করবেন হরিয়ানার এক মেয়ের বিয়ের চাপের বিরুদ্ধে পড়াশোনার লড়াই অথবা নির্মাণ শ্রমিকদের কাজের ফাঁকে পড়াশোনা। এসব দৃশ্য খুবই আবেগপূর্ণ। যদিও কেউ কেউ সিরিজটির কিছু সীমাবদ্ধতাও খুঁজে পেয়েছেন। তাঁদের কথায়, গল্পটি অনেকটাই পরিচিত ‘আন্ডারডগ’ বায়োপিকের মতো এগোয়। ফলে নতুনত্বের অভাব অনুভূত হতে পারে। এটাও মনে হয়, গল্পের গভীর বিশ্লেষণের চেয়ে আবেগের উপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। তা সত্বেও বিষয়ের গুরুত্ব ও আন্তরিক অভিনয়ের গুণে ‘হেলো বচ্চন’ গ্রহণযোগ্যতা পায়। অন্তত নির্বোধ ও অতিরঞ্জিত মশালা সিরিজগুলির তুলনায় এই জাতীয় প্রযোজনা অনেক বেশি কাম্য।

- ছবি ঋণ— ইন্টারনেট
রোমান থিয়েটার – রোমান থিয়েটার
রোমান থিয়েটার
কুন্তল মুখোপাধ্যায়
রোমান থিয়েটার প্রাচীন রোমান সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিচিতি। গ্রীক থিয়েটার থেকে অনুপ্রাণিত হলেও রোমান থিয়েটারের নিজস্বতা অস্বীকার করা যায় না। খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দিতে রোমান থিয়েটারের সূচনা। মূলত ধর্মীয় উৎসবের নতুন সামাজিক অনুষ্ঠানে নাটক মঞ্চস্থ হতো।
রোমান মঞ্চ – কোরাস ও অভিনেতাদের প্রবেশের জন্য স্কেনার (মঞ্চের পেছনদিকে) দু-পাশে উন্মুক্ত প্যারোদাস দিয়ে জায়গা ছিল। গ্রীক নাটকে মঞ্চের স্কেনে গৃহের সামনের দিকে বিস্তৃত প্রোসেক্নিন (PROSKENION) কে রোমান মঞ্চে প্রোসেক্নিয়াম (PROSCAENIUM) বলা হতো। এই দুই শব্দের সম্মিলনে PROSCENIUM শব্দটির উদ্ভব – এমন একটা স্থান যা রঙ্গমঞ্চের যবনিকা এবং ঐক্যতানবাদকের বসবার জায়গায় মধ্যবর্তী স্থান অর্থাৎ মঞ্চের সামনের অংশকে বোঝায়।
রোমান থিয়েটারে মূল জঁ ছিল ট্রাজেডি, কমেডি, মাইম, প্যান্টোমাইম এবং এগুলো পরিবেশিত হতো সংগীত ও নৃত্য সহযোগে। রোমান নাট্যকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন প্লটাস (কমেডি), টেরেন্স (বাস্তব ধর্মী), এবং সেনেকা (ট্রাজেডি)।
প্লটাস কে কমেডি জিনিয়াস বলা হত। তাঁর অ্যাম্পিটায়রল “আউলেরিয়া” “মাইলস গ্লোরিওসার্স” নাটক গুলিতে গ্রীক কমেডির ছায়া ছিল। একই ভাবে গ্রীক কমেডির ছোঁয়ায় টেরেন্সও লিখলেন। “আন্দ্রিয়া” “দি ইউনাখ” “দি ব্রাদার্স” নাটক গুলি। সেনেকা ছিলেন কূট রাজনীতিবিদ। তিনি ছিলেন স্টেয়িক দার্শনিক [স্মরণ রাখতে হবে প্লটাস এবং টেরেন্স ছিলেন দুইজন ক্রীতদাস] যুক্তি, আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রশাসনিকতার উপরে, নৈতিক মান্যতা ছিল তাঁর জীবনের আদর্শ। মানুষের আচরনগত আবেগ কে গুরুত্ব দিয়ে তিনি শাসকের দায়িত্ব নির্নয় করেছেন। সেনেকার ট্রাজেডি তাই ছিল “ডার্ক, পাওয়ারফুল এবং ইনফ্লুয়েন্সিয়াল। তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটক মেদেয়া, ফ্লেইদা, থুয়েস্তস, ত্রোয়াদেস, অ্যাগামেমনোন, আয়দিপাউস, ফোয়েনিয়াস, হারকিউলিস, ওয়েতেউস, আকটোভিয়া, হেকুলেস ফ্লরেন্স। সেনেকার নাটক রেনেসা পরবর্তী ইউরোপে, বিশেষ করে ইংল্যান্ডের এলিজাবেথিয় যুগের নাটককারদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। স্টোয়িক থিম, উচ্চারণগত ধ্বনি ও বর্নবিন্যাস, আতঙ্ক ও হিংস্রতা ছিল তাঁর নাটকের মূল সূএ – যা সবথেকে বেশি দেখাগিয়েছিল। “আকটোভিয়া” (সম্রাট নিরো ও তাঁর স্ত্রী আকটোভিয়ার বিবাহ বিচ্ছেদ গত ট্র্যাজেডি) ও আয়দিপাউস নাটকে। সেনেকার নাটকের মূল পাঠ / টেক্স্ট ক্রিস্টোফার মালো, টমাস কীড, বেন জন্সন এবং উইলিয়াম শেক্সপিয়ারকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তার রোমান নাটকগুলি যেহেতু কোনো ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে জড়িত ছিল না, সেহেতু জনমানসে সেগুলি তেমন জনপ্রিয় ছিলো না।
ছোটদের ছবি: ইরানি শৈশব! ২ – অরিত্র দে

ছোটদের ছবি: অলিভারের টুইস্ট
অরিত্র দে
কিছু সমালোচক “দ্য হোয়াইট বেলুন”কে হালকা বা সাধারণ বাস্তবধর্মী বলে মনে করেন। আশ্চর্যের বিষয়, এমন মন্তব্য করেছেন এমনকি ছবির কিছু প্রশংসকও। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে গেলে ছবির অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে উপেক্ষা করতে হয়। যেমন—সাউন্ড এডিটিংয়ের অদ্ভুত ব্যবহার। মাঝেমাঝে রেডিওতে নতুন বছরের কাউন্টডাউনের খবর শোনা যায়, কিন্তু আমরা কোথাও কোনো রেডিও দেখতে পাই না।
আবার পানাহি ইচ্ছে করেই পুরো ছবিটা তেহরানের একটা ছোট এলাকার রাস্তা আর গলির মধ্যেই শুট করেছেন, শুধু কয়েকটা দোকানের ভেতরের দৃশ্য ছাড়া। এর ফলে ঘরের ভেতরের পারিবারিক জায়গাগুলো প্রায় দেখানোই হয়নি। এর কিছু অদ্ভুত ফলও আছে যেমন আমরা রাজিয়েহ আর আলির বাবাকে কখনো দেখি না, শুধু গলার শব্দ শুনি। আরও একটা বিষয় অনেক সমালোচক এড়িয়ে যান ছবির গল্পের অপ্রত্যাশিত মোড়। শেষ পর্যন্ত গল্পটা রাজিয়েহ বা আলিকে ঘিরে শেষ হয় না। তারা বাবা-মায়ের কাছে দৌড়ে চলে যায়, আর তখন আমাদের সামনে থেকে যায় এক আফগান বেলুন বিক্রেতা, যে ছবির একেবারে শেষ অংশে এসে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে ওঠে।
দ্য হোয়াইট বেলুনকে নির্দ্বিধায় বলা যায়, কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হওয়া নন-আমেরিকান ছবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়। সেই উৎসবেই ছবিটি ক্যামেরা দ’অর পুরস্কার জেতে। যদি মনে হয় কেন এটি অস্কারের জন্য মনোনীত হয়নি তাহলে একটি সহজ কারণ: ছবিটি ইরানের।
পশ্চিমা দুনিয়ায় ইরানের ছবিগুলোকে অনেক বাড়তি বাধার মুখে পড়তে হয়। যখন ইরানের চলচ্চিত্র জগতের মানুষরা ভোট দিয়ে The White Balloon-কে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের জন্য ইরানের সরকারি মনোনয়ন হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন, তখন ইরান সরকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ হিসেবে অ্যাকাডেমিকে অনুরোধ করে ছবিটিকে বিবেচনা থেকে বাদ দিতে। অ্যাকাডেমি সেই অনুরোধ মানেনি, যদিও শেষ পর্যন্ত ছবিটি পাঁচটি বিদেশি ছবির মনোনীত তালিকায় জায়গা পায়নি।
তবে The White Balloon ইতিমধ্যেই ইরানি সিনেমাকে যে বিপুল সম্মান এনে দিয়েছে, তার ফলে ইরানের কিছু সমালোচকের মধ্যে উল্টো প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে। অনেকের মতে, এর পেছনে পরিচালক পানাহি-র পরামর্শদাতা এবং ছবিটির প্রধান চিত্রনাট্যকার আব্বাস কিয়ারোস্তামি-র আন্তর্জাতিক খ্যাতিও একটা কারণ। জনজীবনে কিয়ারোস্তামি খুব একটা ধর্মীয় বা খুব একটা রাজনৈতিক ছিলেন না। কিন্তু ইরানের কিছু সমালোচক মনে করেন, তিনি যেন ফরাসি বুদ্ধিজীবীদের খুব প্রিয় একজন মানুষ। তাদের মতে, তিনি এমন একজন আন্তর্জাতিকধর্মী শিল্পী যার সাংস্কৃতিক পরিচয় অনেকটাই পাশ্চাত্যের দিকে ঝোঁকে। উদাহরণ হিসেবে কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন যে And Life Goes On… ছবিতে ভিভালদির সঙ্গীত এবং একটি ফরাসি গাড়ির ব্যবহার খুব বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে বাস্তবতা হল, যে কোনো ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা যদি আন্তর্জাতিকভাবে কিছুটা পরিচিতি পান—এবং সেই কারণে অর্থায়নের দিক থেকে ইরানের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না থাকেন—তাহলে সরকার স্বাভাবিকভাবেই তাকে কিছুটা সন্দেহের চোখে দেখে। যদিও এই সন্দেহের মাঝেও এক ধরনের সুরক্ষা থাকে, ফলে তাকে সহজে হয়রানি করা হয় না। কিয়ারোস্তামির মতোই ইরানি সিনেমার আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা মোহসেন মাখমালবাফও একই ধরনের সুরক্ষা পেয়ে থাকেন। তিনি তুলনামূলকভাবে বেশি ইসলামী ভাবধারার এবং তার কাজ কখনো কখনো অসমান মানের হলেও নিঃসন্দেহে প্রতিভাবান। তবুও তার কিছু ছবি নিষিদ্ধ হয়েছে।
১৯৬০ সালে জন্ম নেওয়া পানাহি ১৯৮৮ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে ইরানি টেলিভিশনের জন্য তিনটি প্রামাণ্যচিত্র এবং দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র তৈরি করেন। এর মধ্যে শেষটি ছিল কিয়ারোস্তামির প্রথম চলচ্চিত্র Bread and Alley (১৯৭০)-এর প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। Bread and Alley-এর সাথে The White Balloon-এর সম্পর্ক খুব স্পষ্ট। বিশেষ করে তথ্যচিত্র ও কল্পকাহিনির বুদ্ধিদীপ্ত মিশ্রণ এবং তেহরানের জটিল গলিপথগুলোকে দৃশ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ব্যবহার করার দক্ষতার মধ্যে এই মিলটি পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। কিয়ারোস্তামি শিশু ও কিশোরদের বৌদ্ধিক বিকাশের জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠানে ফিল্ম ইউনিট গড়ে তোলেন। এই প্রতিষ্ঠানটি ষাটের দশকের শেষ দিকে শাহের স্ত্রী শুরু করেছিলেন এবং এখন এটি ‘কানুন’ নামে পরিচিত—একটি রাষ্ট্র-সমর্থিত সংস্থা। এখন পর্যন্ত কিয়ারোস্তামির প্রায় সব চলচ্চিত্রই এই প্রতিষ্ঠান থেকেই নির্মিত হয়েছে।
এই ছবিগুলোর সবকটিই কঠোরভাবে বলতে গেলে শিশুদের ছবি নয়, আর কিছু কিছু আবার তথ্যচিত্রও। তবে বেশিরভাগ ছবিতেই শিশু চরিত্র থাকে। অনেক দিক থেকে এই ছবিগুলো এক বিশেষ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণশৈলী গড়ে তোলে, যার একটি ভালো উদাহরণ The White Balloon। এখানে সাধারণত খুব ঢিলেঢালা স্ক্রিপ্টে গল্প বলা হয়, যার মধ্যে তথ্যচিত্রের মতো বাস্তবতার ছোঁয়া থাকে, আর অভিনয়ে বেশিরভাগ সময়ই পেশাদার নয় এমন অভিনেতাদের ব্যবহার করা হয়। কিয়ারোস্তামি একটি বিশেষ কৌশল ব্যবহার করতেন, যেটি পরে পানাহিও গ্রহণ করেন। সেটি হলো গল্পের পুরোটা অভিনেতাদের কাছে আগে থেকে না বলা, বিশেষ করে শিশু অভিনেতাদের কাছে। এতে করে তাদের অভিনয়ে স্বাভাবিকতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা বজায় থাকে।
শৈশবে ইনস্টিটিউটে কিছু সিনেমার প্রদর্শনীতে উপস্থিত থাকার সময় তিনি Abbas Kiarostami–এর কাজের প্রতি আকৃষ্ট হন। পরে Jafar Panahi ঠিক করেন যে তিনি কিয়ারোস্তামির সঙ্গেই কাজ করতে চান। তিনি অনুসরণ করেছিলেন Luis Buñuel–এর উদাহরণ, যিনি সিনেমায় কাজ শুরু করেছিলেন Jean Epstein–এর সহকারী হিসেবে। সেই পথেই পানাহি একদিন নিজের “গুরু”কে ফোন করেন, তারপর চলে যান Through the Olive Trees ছবির শুটিং লোকেশনে। শেষ পর্যন্ত তিনি সেখানে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজের সুযোগ পান। ওই ছবির শুটিং চলাকালীন পানাহি কিয়ারোস্তামিকে তাঁর মাথায় থাকা The White Balloon ছবির মূল গল্পটা বলেন। কিয়ারোস্তামি তখন তাঁকে সাহায্য করেন—শুটিং লোকেশনে যাওয়া–আসার সময় গাড়িতে বসেই হঠাৎ করে একটি টেপ রেকর্ডারে গল্পটা বলে একটি চিত্রনাট্য তৈরি করেন। পরে সেটি লিখে নিয়ে আবার সম্পাদনাও করা হয়।
The White Balloon সম্ভবত প্রথম ইরানি চলচ্চিত্র যেটি স্পষ্টভাবেই কিয়ারোস্তামির প্রভাবের মধ্যে তৈরি। তবে ছবিটি তাঁর সামগ্রিক ধারা অনুসরণ করলেও তা খুবই ব্যক্তিগত ভঙ্গিতে ব্যবহার করেছে। কিয়ারোস্তামির ছবির একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো দীর্ঘ ও দূর থেকে নেওয়া শট যেখানে চরিত্র ও প্রাকৃতিক দৃশ্যকে দূর থেকে দেখানো হয়, আর সেই দৃশ্যের মধ্যেই দার্শনিকভাবে গল্পের অর্থ ও ঘটনা সংকুচিত হয়ে ধরা পড়ে। যেমন দেখা যায় And Life Goes On এবং Through the Olive Trees–এর শেষের অসাধারণ দৃশ্যগুলিতে। অন্যদিকে The White Balloon খুব সীমিত সময়ের মধ্যে এবং খুব ছোট একটি ভৌগোলিক পরিসরের মধ্যেই তেমনই গভীরতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
গেছি বারবার – ময়ূরী মিত্র পর্ব ৮-৯

গেছি বারবার
ময়ূরী মিত্র
৮. পুরুলিয়া পথ
পুরুলিয়ার পথে মাথায় ভূত এল টুকটুক করে৷ ফট করে নেমে পড়লাম বিকনা গ্রামে৷ অন্য নাম ডোকরা গ্রাম৷ ন দশটি পরিবার নিয়ে একটি গ্রাম৷ ছেলে বুড়ো এমনকি বাড়ির যুবতী বউও এখানে ডোকরা মূর্তি গড়ে৷ বউটিই প্রথম ডাকল৷ সে নিজেই এক বাচ্চা …তার ওপর কোলে নিয়েছে সদ্যজাত৷ পাঁচ মাস হল সে বাচ্চা বিকনা গ্রামের হয়েছে৷ বউটিই মূর্তিগুলো সাজিয়ে দিচ্ছিল৷ তার পাশে তার শাশুড়ি ননদ৷ একটা পালকি পছন্দ করলাম৷ বাঙালির পালকি নয়৷ সাহেবরা বিশেষ করে পর্তুগিজরা একসময় গ্রাম থেকে গ্রাম যেত পালকি চড়ে৷ সে পালকির গঠন বেশ আলাদা৷ চৌকোর বদলে নিটোল ডিম৷ দাম জিজ্ঞেস করতে বউটি খুব চড়া একটা দাম বলল ৷ চড়া মানে অস্বাভাবিক চড়া৷ চলে যেতে গিয়েও বারবার ফিরছিলাম শ্বেতমানবের যানের কাছে৷ বউ বোধহয় বুঝতে পেরেছিল আমার ভীষণ পছন্দ ওই পালকি৷ আমার লোভ তাকে লোভী করল৷ কী আশ্চর্য দেখুন! নদীর মতো লোভও কেমন এঁকেবেঁকে ছড়ায়! স্পষ্ট বুঝলাম তার চোখ হাসছে! হাসতে হাসতেই বলল ‘দাম কমাব না। নেবে নাও! নাহলে যাও অন্য দোকান৷ এটি পাবে না৷”
রাগ হল কেমন৷ লোভ ছেড়ে অন্য দোকানে গেলাম৷ সেখানে এক বৃদ্ধা সরস্বতী গড়েছেন৷ ডোকরার মূর্তিতে এমন ভাষাময় চোখ আমি আগে দেখিনি৷ পালকির চারগুণ দাম মূর্তির৷ কিন্তু ন্যায্য দাম৷ কিনে নিয়ে যখন গাড়িতে উঠছি কেমন অস্বস্তি হল৷ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম বউটা৷ দোকান ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে৷ দুটো ড্যাবা চোখ আমার সরস্বতী দেখছে! ঠোঁট টিপে রয়েছে৷ বোধহয় বুঝতে পারেনি এতবার নিতে চেয়েও শেষমেশ তার পালকি ছেড়ে দেব! অত ভিড়ে তাকে কী ভীষণ একা লাগছিল! জগতবিচ্ছিন্ন৷ হৃদয় অনেকসময় অন্যায্যের মোহে পড়ে! নাকি সে মুহূর্তে বউটির বেশি দাম চাওয়ার পিছনের গল্পটা সামনে আসছিল, বলতে পারি না ৷
গাড়ি ছাড়ার পর মনে পড়ল, প্রায় কুড়ি মিনিট তার দোকানে দরদাম করেছি৷ দাম করতে করতে ক্লান্ত হয়ে বসেও পড়েছি৷ একটি মুহূর্তের জন্যও তাকে শাশুড়ি ননদ ছাড়া একা দেখিনি৷ আবার একটি মুহূর্তের জন্য তার কোলের বাচ্চাটাকেও কেউ নেয়নি৷ বউয়ের একহাতে পর্তুগিজের পালকি তো আর এক হাত বাচ্চা আঁকড়ে৷
‘নীরব গল্প দেরীতে শোনা যায় রে খুকী…!’
সদ্য কেনা ধাতুমূর্তিটি কানে কানে বলল৷
৯. ওলাইচণ্ডী পথ
আমাদের সময় থেকেই শিবরাত্রি অবিবাহিতা মেয়েদের উৎসব হয়ে গিয়েছিল৷ শিবে জল ঢাললেই বর এসে দাঁড়াবে লিঙ্গের উল্টোদিকে৷ শিবের সঙ্গে প্রথম দেখা আমার ফাল্গুনী সিনেমা হলে৷ সতীর দেহত্যাগ সিনেমা দেখতে গিয়ে৷ সে সিনেমায় শিব মহাসুন্দর…ঘাড় অব্দি কোঁকড়ানো চুল৷ আরে বাবা! মাসল কী! ইয়া মোটা মোটা গুলি৷ দুর্গাসতীকে কাঁধে নিয়ে তা ধিন তা ধিন নাচ্ছেন৷ হাতের গুলি আরো স্পষ্ট হচ্ছে৷ বুকের খাঁজে জড়িয়ে আছে মরা বউয়ের লম্বা চুল৷ দেখছি আর ভাবছি! এমন রূপবান তোর বর! ও বউ তুই মরবি কোন দুঃখে! বরের নাচে নতুন ছন্দ জাগুক বউয়ের দেহে! সতী নবসতী হোক৷ কত বয়স তখন আমার! নয় দশ! তার মধ্যেই স্বামী স্ত্রী সম্পর্কের বোধ এসে গেছে আমার! হয়ত খানিকটা শরীরচেতনাও! নাহলে শিবের বাঘছাল পরা অর্ধনগ্ন শরীর আজো মনে পড়ে কেন! ফাল্গুনীর সিটের ছারপোকারা বিছের মতো কামড়াচ্ছে৷ ফর্সা থাই লাল হয়ে যাচ্ছে আমার! তবু শালা সতীনাথের নাচন গিলে যাচ্ছি!
বাঙালি অদ্ভুত জাতি! ভারতের ধর্মীয় ব্যাখ্যাও কিছু ক্ষেত্রে একেবারে অখাদ্য৷ ওমন রোমান্টিক সেক্সি পুরুষকে সেরফ পাঁচুঘটক বানিয়ে দিল! আকন্দ ধুতরার মালা পরাও শিবের গলে৷ আর বর হোক বিলে মাস্টার৷ রোগা, বেড়ালের মতো কুতকুতে কুচুটে চোখ ছিল বিলে মাস্টারের৷ সারাক্ষণ মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকত বিলে৷ সবাই ভাবতাম বিলে বোধহয় কেবল আমাকেই দেখছে৷ আমি বাকিদের দেখে একটু বেশি পরিমাণে খচ্চর ছিলাম তো৷ ক্লাস সেভেন এইটের মধ্যেই ধরে ফেলেছিলাম বিলে আধো আধো চোখে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকে টিউশন ধরার জন্য৷ এক সপ্তাহ ভোর একটা নির্দিষ্ট মেয়ের পিছে ছুটত বিলে মাস্টার৷ মেয়েটিকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া থেকে তার মায়ের কেরসিন জোগাড় করে দেওয়া অব্দি৷ পনেরোদিনের মধ্যে দেখা যেত মেয়েটা বিলের মাদুরে৷ একসঙ্গে আটটা সাবজেক্ট এক মাস্টারের কাছে পড়িয়ে গব্বে ফুলত “মুরগি মেয়েটার” মায়ের মুখ৷ বাঙালি মধ্যবিত্ত তখনো মেয়েদের জন্য কমদামি মাস্টার খুঁজত৷
“ও বিলে দুটো ছেলের খরচ টেনে আর পারি না৷ তুমি যদি মেয়েটাকে অঙ্ক বাংলা আর ওই ফিজিক্যাল সায়েন্স একসঙ্গে পড়িয়ে দাও তো ভালো হয় বাবা!”
বিলের মুখ ততোধিক করুণ…
“বুঝি কাকীমা। আমাকেও তো চলতে হবে৷ আপনি আরো দুটো (মুরগি?) জোগাড় করে দিন না!”
মায়েদের সেন্টু মেখে সারা পাড়ার শিব হয়ে গেল বিলে৷ যখন যে মেয়েকে পাচ্ছে, ধরে যে কোনো একটা ডিফিকাল্ট (বিলের মতে) সাবজেক্ট পড়িয়ে দিচ্ছে৷ মেয়েগুলো পাশ বা ফেল কিছু একটা করছে৷
ক্ষিপ্রতা বাড়ত শিবরাত্রিতে৷ শিবমন্দির বেলগাছিয়া ব্রিজের নিচে৷ ব্রিজের দু দিক থেকে দুটো রাস্তা মন্দিরে জুড়েছে৷ দুটো লাইন পুরো কন্ট্রোলে নিয়ে নিত বিলে মাস্টার৷ একবার দুধের ক্যান সমেত গোয়ালাও জোগাড় করে ফেলেছিল৷
“ভোরের দুধে শিব চান করাবেন কেন মাসিমা! সাঁঝের দুধে করাবেন৷ দোয়ানোর পর বালতিতে ডুবিয়ে দেখবেন একটু গরম৷ ওই দুধ শিবের প্রিয়৷”
আমার বন্ধু বাসন্তীর মা এইসব কথা শুনে একেবারে তদগত হয়ে গেলেন৷ ওঁরই বায়নায় সাইকেল চেপে গয়লা এল শিবমন্দিরের সামনে৷ বিলের নির্দেশে মা কাকীমাদের ছোট ছোট কাঁসার বাটিতে দুধ ঢেলে গেল গয়লা৷ হেব্বি বিক্রি শিবদুধের৷ আমরা মেয়েরা সেদিন লালপাড় গরদ পরেছিলাম ৷ তখন তো একবয়সী মেয়েরা নিজেদের মধ্যে প্ল্যান করে সাজত ! ফলে সেই শিবরাত্রিতে স্কুল ড্রেসের মতো একরকম গরদ পরে দাঁড়িয়েছিলাম৷ মা কাকীমার ভিড়ে হাওয়া কাটল বিলে আর বিলের গরদ পরা বাসন্তী৷
সবাই বাসন্তীর মাকে সান্ত্বনা দিল…
“মেনে নাও৷ দুটোকে ফিরিয়ে এনে বিয়ে দিয়ে দাও৷ শিব চাইছেন৷ তোমাদের বাড়ি তো বাবা শিবের মন্দিরের কাছে৷ ধরে নাও শিব তোমার মেয়েকে পয়লা নজর করেছেন৷ আকন্দ পরা দুবাহুর দুধগন্ধে বেঁধেছেন গো আমাদের বাসন্তীকে৷
রাধাবল্লভ বাড়ির কৃষ্ণসাধিকা ফুলির মা রসালো জিভে শিবমহিমা ব্যাখ্যা করে গেল৷ পারেও বাবা! কেচ্ছা দেখে কেষ্ট থেকে self transformation করল শিবে৷ কেচ্ছায় সান্ত্বনা দেবার সময় বাঙালির মাথার ঠিক থাকে না৷ ধম্মগুলোরও অন্তমিল তখন অবশ্যম্ভাবী ৷
অনেকদিন পরে বাসন্তীকে দেখেছিলাম! কী কারণে শিবমন্দিরের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম৷ শিবের ঘরটা সরু আর জনলাহীন৷ সূর্য তখন মাঝআকাশে, তবু শিবঘরটি আঁধার৷ সোমবারের শিবপুজো সারতে এসেছে বাসন্তী৷ সাদা থানে বাঁধা আঁটো শরীর ঠেকিয়ে রেখেছে লিঙ্গের গায়ে৷
একী! এই বাসন্তী! কবে হল এসব…
বাসন্তী হাসল। হাত ভর্তি ছানা চটকে৷
“জানিস একজন বলল আমায়৷ দুধের বদলে ছানাও নাকি মাখানো যায় লিঙ্গে!
বলতে বলতে আরো খানিক ছানা মাখাল বাসন্তী৷ চকচকে কৃষ্ণলিঙ্গে গাভীছানা!
আমিও হাসলাম ৷তবে জগতের সবথেকে রূপবান দেবতাটি যে সেদিন কার হাসি নজর করেছিল আমার জানা নেই৷ মাঝআকাশের সূর্যরশ্মি আর আপন ঘরের আঁধার মিলে নতুন দেবচক্ষুর জন্ম দিয়েছিল কি? কাকে জিগোই বল দেখি!
ফুলির মা এ জন্ম পার করছেন৷
পরপারে কার আশ্রয়ে …শিব না কৃষ্ণ …!
উভয়ই পুরুষ শরীর বটে!

31Mar
magazines
৫৪-তম-ই-সসকরণ।।৬৬ তম সংখ্যা।। মার্চ, ২০২৬

18Feb
magazines
৫৩-তম-ই-সসকরণ।।৬৫ তম সংখ্যা।। ফেব্রুয়ারি , ২০২৬

27Jan
magazines
৫২-তম-ই-সংস্করণ।।৬৪ তম সংখ্যা।। জানুয়ারি, ২০২৬

17Dec
magazines
৫১-তম-ই-সসকরণ।।৬২ – ৬৩ তম সংখ্যা।। আগস্ট ,…
