৫৯-তম-ই-সংস্করণ।। ৭১ তম সংখ্যা।। আগস্ট, ২০২৬



গৌরাঙ্গ দণ্ডপাট
সম্পাদক
- Phone:+1 (859)00000
- Email:info@example.com


পার্থ হালদার
সম্পাদনা সহযোগী
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


সোময়েত্রী চ্যাটার্জি
প্রচ্ছদ
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


পল্লব মিশ্র
প্রচ্ছদ অলংকরণ
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


সুচরিতা রায়
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


পূর্ণতা নন্দী
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


মৌলিকা সাজোয়াল
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


অয়ন্তিকা নাথ
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
কর্তৃক
৮৬, সুবোধ গার্ডেন, বাঁশদ্রোণী, কলকাতা: ৭০০০৭০ থেকে প্রকাশিত।
- যোগাযোগ : ৯৬৪৭৪৭৯২৫৬
৮৩৩৫০৩১৯৩৪ (কথা /হোয়াটসঅ্যাপ)
৮৭৭৭৪২৪৯২৮ (কথা)
- Email : bhaan.kolkata@gmail.com
Reg. No: S/2L/28241 548
।। সম্পাদকের কথা ।।
যুক্তির পথ থেকে আমরা ক্রমশ সরে আসছি। যুক্তিতে জোর না দিয়ে জোর করে যুক্তি দিচ্ছি। যুক্তির একটা ভান অন্তত এখনো আমাদের বাচনের মধ্যে রেখে দিতে হচ্ছে বলে পুরো সর্বনাশ ঘটেনি। তবে তা তুলে দেবার জন্য ব্যাগ্রতায় ত্রুটি দেখছি না। পশু হিসেবে ষাঁড় গণ্ডার এর চেয়ে শেয়াল কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি আমরা। ষাঁড়ের মধ্যে কেবল জোর আছে। শেয়ালের মধ্যে আছে বুদ্ধির জোর। বুদ্ধির জোর মানে যুক্তি দিয়ে বোঝার জোর। আর গায়ের জোর মানে যুক্তিকে নাকোচ করে দমানোর জোর। দমানোর জোর বাড়িয়ে সভ্যতার দম বন্ধ করানোর মত পরিস্থিতি একাধিকবার তৈরি হয়েছে। সে পরিস্থিতি কাটানো সম্ভব হয়েছে কেবল যুক্তির জোরে নয়, যুক্তিপূর্ণ প্রতিবাদের জোরে।
শেষ দু-তিন দশক সচেতন বাঙালিকে যুক্তির প্রচারক হতে হয়েছে। বলতে হয়েছে যুক্তির পথ মুক্তির পথ। বলতে হচ্ছে একেবারে গোড়ার কথাগুলো। কারণ খোঁজো, রিজন খোঁজো, লজিক খোঁজো। যা করছ, যা বলছ, যেভাবে করছ, যেভাবে বলছ তার রিজন খোঁজো। এভাবে করলে কী ফল হবে? আগে এসবে কী ফল ফলেছে? – এসব তলিয়ে ভাবো। মোদ্দা কথা বাঙালির তার্কিক এবং ভাবুক সেল্ফ কে ফিরিয়ে আনার ডাক দেওয়া হচ্ছে বারবার! আর্গুমেন্ট, বাতচিত, বাহাস, বিতর্ক, খোঁজ এবং সহনশীলতা চাই। চাই বিপরীত যুক্তিকে সম্মান প্রদানের পাঠ। তবু অবস্থার বিশেষ উন্নতি হচ্ছে না। অযৌক্তিক বিশ্বাস, অযৌক্তিক ভক্তি, অযৌক্তিক বাসনার বাগাড়ম্বর এখনকার গড় বাঙালির বসতভিটা। অযুক্তি কে যুক্তি বলার ভ্রম চিনতে না পেরে ফলাও বিজ্ঞাপনে নির্লজ্জ আস্ফালন চলেছে। অন্ধতার এমন গৌরব বড়ো অদ্ভুত বড়ো বেদনার। যার দ্বারা ক্ষতি হচ্ছে তার দিকেই এমন উৎকট রতি ইতিহাসের কোন্ বাঁকে লতিয়ে ওঠে, কেন ওঠে, কীভাবে ওঠে – এর হিসেব পাওয়া মুশকিল। অযৌক্তিক মানুষের অমানবিকতা দেখে মনুষ্যকূলেরই অনেকে ভয়ার্ত, কেউবা বিরক্ত, কেউবা হতাশ। মানুষ কী করে এমন অযৌক্তিক হতে পারে এসবের হদিশ না পেয়ে হতাশ!
বহু পন্ডিত বলেছেন, আমরা আগে একটা কিছু মনোমতো বিশ্বাস করি এবং তারপর সেই বিশ্বাসটিকেই যুক্তিপূর্ণ করে তুলতে চাই। যুক্তির পথ ধরে বিশ্বাসে পৌঁছাতে চাই না। যাকে বলে গোড়ায় গলদ। নিজের নিজের কমফোর্ট মতন নিজের নিজের যুক্তি তৈরি করি। বর্ম কে যুক্তি ভাবি, বেড়াকে বাড়ি। আমার ইন্টারেস্ট, আমার স্বার্থ যদি যুক্তিকে সেবাদাসী বানায়,– তবে তা কতদূর পর্যন্ত যুক্তি !?
গরিব মানুষের গরিবত্বের বিরুদ্ধে অবিরত অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে, যুক্তি জীবনবাদী। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম সেখানে প্রধান। সে লড়াই কখনো তাদের দিক থেকেই যুক্তির পক্ষে যায়, কখনো অযৌক্তিক পথে। ওখানে ঐতিহাসিক পরিস্থিতির পরিস্কার ভূমিকা। কিন্তু খোঁজের অভ্যাস গড়ে তোলা মোটামুটিভাবে তাদের শ্রমের মারাত্মক মূল্যে সম্ভব হয় না। তারা যাত্রা, থেটার, গান, গল্প বিজ্ঞাপন, স্কুল-বই ও মধ্যবিত্তের থেকে যুক্তি শেখেন। গান থেটার যদি ইনসাইডারদের হয় তবে তা প্রাণের এবং বাস্তবের কাছাকাছি। আর যদি তা দূর-দরদীদের হাতে গড়া হয় তবে তা মূলত রোমান্টিক এবং আবছায়া। আর এখন এ সবই মোটের ওপর পুঁজিবাদি শোষণ প্রক্রিয়া কে টিকিয়ে রাখার জন্য তৈরি করা যুক্তি। মানব মুক্তির যুক্তি নয়। অধিকাংশের কোনোক্রমে টিকে থাকার মূল্যে সামান্যর অনির্বচনীয় প্রতাপশালী হয়ে ওঠার যুক্তি।
এই প্রতাপশালীদের যুক্তি আর পিছিয়ে পড়া নিরন্ন মানুষের মুক্তির যুক্তি লড়াইটাও শেষ তিন দশকে অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। তার কারণ যুক্তির পথ ধরে আমরা যতদূর এগোতে পেরেছিলাম, অযৌক্তিক বিশ্বাস ও অযৌক্তিক ভক্তির পূর্বজ মেজাজ লুটেরা তন্ত্রের কারণেই আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে অত্যন্ত সুকৌশলে। মানুষের খাদ্য- বস্ত্র- বাসস্থান- শিক্ষা- স্বাস্থ্য- নিরাপত্তা এবং কাজের অধিকারের দাবির মতো একেবারে সহজ, সরল দাবি গুলি আর যৌক্তিক পথে এগোতে পারছে না। জাত- পাত- পোষাক-আশাক- ধর্ম- অধর্ম- সম্প্রদায়- সাম্প্রদায়িকতা এবং তৎজনিত অসূয়া ও ঘৃণার চাষ পরিবেশকে এমন কলুষিত করছে আমাদের ফিরতে হচ্ছে চৈতন্য অথবা কবীরের পথে। আমরা ভেবেছিলাম সে লড়াই হয়তো সম্পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে প্রতাপশালী তন্ত্র তার প্রয়োজনে সেই ঘেন্নার বাতাবরণ কে পুনঃস্থাপিত করতে পেরেছে। তাই ধর্ম ও রাজনীতির পার্থক্য বোঝাতে হচ্ছে, অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে যুক্তি সাজাতে হচ্ছে। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ঘৃণার বিপক্ষে ভালোবাসার পক্ষে যুক্তি দিতে হচ্ছে। অন্ধ বিশ্বাসের অন্ধকারের বিপক্ষে আলোর যুক্তি দিতে হচ্ছে। মনে হচ্ছিল এসব হয়ে গেছে। আমরা তর্কটি কে কেবল এগোব না, তর্কের মান বাড়াবো। আমরা উচ্চদরের যুক্তি বুনব। কিন্তু যুক্তিবাদী মন আমাদের জানিয়েছে যুক্তির প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাজ শেষ হয়নি এবং আমরা কেউ কেউ যখন উচ্চ বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাব, তখনও প্রাথমিক স্তরের যুক্তিচর্চার কথা ভেবে যেতেই হবে। দেশকে ভালোবাসলে, মানুষ কে ভালোবাসলে, এই ধরাধামের একজন মানুষ হিসেবে এর থেকে পরিত্রাণ আমরা চাই না।
ওয়েব সিরিজে নাসিরুদ্দিন আর জিমের যুগলবন্দি - অজন্তা সিনহা

ওয়েব সিরিজে নাসিরুদ্দিন আর জিমের যুগলবন্দি
অজন্তা সিনহা
মঞ্চ হোক বা ছোট বড় পর্দা, এমনকী আজকের ডিজিটাল মাধ্যম–নাসিরুদ্দিন শাহ মানেই নতুন কিছু প্রাপ্তি! অ্যামাজন এম এক্স প্লেয়ার-এর নতুন ৬ পর্বের ড্রামা সিরিজ ‘মেড ইন ইন্ডিয়া : আ টাইটান স্টোরি‘-তে স্বয়ং জে আর ডি টাটার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন নাসির। আর তাঁর যোগ্য সহচর হয়েছেন জিম সর্ভ, যিনি আছেন জারক্সেস দেশাইয়ের চরিত্রে। দুজনেরই থিয়েটার ব্যাকগ্রাউন্ড, অর্থাৎ অভিনয়ের দুর্দান্ত এক যুগলবন্দি দেখবেন দর্শক আমাজন এম এক্স প্লেয়ারের পর্দায়। গত ৩ জুন প্রিমিয়ার হয়েছে এই সিরিজের। আর শুরু থেকেই ভিন্নমাত্রায় দর্শকমন জিতে নিয়েছে এই শো। সিরিজটির চিত্রনাট্য লিখেছেন করণ ব্যাস। পরিচালনা করেছেন রবি গ্রেওয়াল। প্রযোজনার দায়িত্বে রয়েছে অলমাইটি মোশন পিকচার ডট কম।
নামেই বোঝা যাচ্ছে, সিরিজটি বিখ্যাত ঘড়ি ব্র্যান্ড টাইটান সম্পর্কিত। ঠিকই ধরেছেন। ভারতীয় ঘড়ি নির্মাতা টাইটানের প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড হিসেবে তার উত্থানের কাহিনি তুলে ধরেছে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া : আ টাইটান স্টোরি‘! বিনয় কামাথের লেখা ‘Titan: India’s Most Successful Consumer Brand’ বই অবলম্বনে নির্মিত এই সিরিজের পটভূমি উদারীকরণের আগের ভারত। সেই সময়ে দেশীয় শিল্পের সামনে ছিল নানা চ্যালেঞ্জ–বিদেশি ব্র্যান্ডের সীমিত উপস্থিতি, প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা এবং মধ্যবিত্তের সীমিত ক্রয়ক্ষমতা। এই পরিস্থিতির মধ্যেই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ম্যানেজিং ডিরেক্টর জারক্সেস দেশাই, দীর্ঘদিনের টাটা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান জে. আর. ডি. টাটার পরামর্শে একটি দেশীয় ঘড়ির ব্র্যান্ড গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন। সিরিজে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সংগ্রাম, কর্পোরেট রাজনীতি, নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করার ঝুঁকি এবং একদল মানুষের অদম্য পরিশ্রম তুলে ধরা হয়েছে।
সিরিজে অভিনয় প্রসঙ্গে নাসিরুদ্দিন বলেছেন, “জে. আর. ডি. টাটার ক্ষেত্রে আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে শুধু তাঁর দূরদর্শিতা নয়, বরং সেই নীরব আত্মবিশ্বাস, যার মাধ্যমে তিনি মানুষকে নিজেদের সীমার চেয়েও বড় স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করতেন। মানুষের সম্ভাবনা চিনে নিয়ে বিশ্বাসের সঙ্গে তা লালন করার এক অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর ছিল। ‘মেড ইন ইন্ডিয়া : আ টাইটান স্টোরি‘ তাই শুধু একটি ব্র্যান্ড তৈরির গল্প নয়। এটি বিশ্বাস এবং সাফল্য অনিশ্চিত থাকা সত্ত্বেও একটি ধারণাকে সমর্থন করার সাহসের গল্প।”
“জারক্সেস দেশাইকে আমার এমন একজন মানুষ বলে মনে হয়েছে, যিনি নীরবে কাজ করলেও বৈপ্লবিক চিন্তার অধিকারী ছিলেন। প্রচলিত নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করতে বা এখনও অস্তিত্ব নেই, এমন কিছুকে কল্পনা করতে কখনও ভয় পাননি। এই সিরিজের সবচেয়ে ভালো দিক হলো, এটি যেমন উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বিস্তারের কথা বলে, তেমনই এর কেন্দ্রে রয়েছে গভীর মানবিকতা, অধ্যবসায়, অন্তর্দৃষ্টি এবং অন্য কেউ বিশ্বাস করার আগেই একটি ধারণার উপর আস্থা রাখা। জারক্সেসের চরিত্রে অভিনয় করা এবং এমন বহুস্তরীয় ও অনুপ্রেরণামূলক গল্পে আমাজন এম এক্স প্লেয়ার-এর সঙ্গে কাজ করা সত্যিই দারুণ অভিজ্ঞতা।”–জানিয়েছেন জিম সর্ভ।
আমাজন এম এক্স প্লেয়ার-এর কনটেন্ট প্রধান অমোঘ দুসাদ বলেন, ‘মেড ইন ইন্ডিয়া : আ টাইটান স্টোরি‘ শুধুমাত্র একটি আইকনিক ব্র্যান্ডের যাত্রা নয়, এটি ভারতের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে গড়ে তোলা উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং উদ্যোগী মানসিকতার প্রতিফলন।” বলতে দ্বিধা নেই, সিরিজটিতে শুধুমাত্র কর্পোরেট সাফল্যের গল্প নয়, বরং ভারতীয় শিল্পের আত্মনির্ভর হয়ে ওঠার লড়াইও তুলে ধরা হয়েছে। সেই কারণে এটি ব্যবসা, ইতিহাস এবং মানবিক আবেগ–তিনটিরই এক অনন্য মিশ্রণ বলা যায়। কর্পোরেট ড্রামা ও বাস্তব জীবনের অনুপ্রেরণামূলক গল্প পছন্দ করেন এমন দর্শকদের জন্য সিরিজটি বিশেষ আকর্ষণীয় হবে, গ্যারান্টি। অভিনয়ে অন্যান্যদের মধ্যে আছেন বৈভব তত্বাওয়াদি, নমিতা দুবে, লক্ষবীর সারান ও কাবেরী শেঠ প্রমুখ।
গেছি বারবার - ময়ূরী মিত্র - পর্ব ১৫

গেছি বারবার
ময়ূরী মিত্র
একবার স্কুলে ঠিক হল, জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে নাচও হবে।
পাঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা
দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ ...
গানের এক একটা শব্দ উচ্চারিত হবে, আর এক একটা বাচ্চা বিভিন্ন প্রদেশের কস্টিউম পরে স্টেজে দাঁড়িয়ে ভ্রাতৃত্বমূলক অঙ্গভঙ্গি করে চলবে। মনেও আসে না, ঠিক কী সেজেছিলাম আমি! পাঞ্জাবি না গুজরাটি! ভ্রাতৃত্বের অতিপ্রকাশে দেশকে বিখণ্ড হতেই দেখে যাচ্ছি! ওহ! এ যে দেখি, ট্রামের স্মৃতি আমার গোটা জীবনকে আলোয় উসকে দিচ্ছে!
জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে জাতীয় নাচের পরিকল্পনা আমার বাল্যের দেশবোধকে জাগ্রত করেছিল, সন্দেহ নেই। অনুষ্ঠান ন’টায় শুরু। অত ছাত্রীর মেকআপের জন্য সবাইকে সাতটার মধ্যে স্কুলে আসতে বলা হল। বেলগাছিয়া থেকে বিডন স্ট্রিট আসতে বড়জোর আধঘন্টা। ছটার ট্রাম ধরলেই হত। আমি কাকাকে হুমকি দিলাম ফার্স্ট ট্রামে যাব, চারটের মধ্যে তৈরি থাকবে! কার অনুষ্ঠান! আর কে তৈরি থাকবে!
সবাই কত বকল, মা মারল দমদম। তবুও বাড়ির সবথেকে শান্ত আর নিরীহ কাকাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে ভোররাতের ট্রামে উঠলাম। অল্প আলোর বাল্ব, চাদর মুড়ি দিয়ে দু চারজন আধাঘুমন্ত মানুষ আর ভীষণ ঠাণ্ডা কাঠের চেয়ার – এই নিয়ে যখন স্কুলে পৌঁছলাম, তখন পাঁচটা। হয়ত আমার “জাতীয় সঙ্গীত নাচার” প্রবল ইচ্ছের সঙ্গে ট্রামের ঘন্টাধ্বনি এমনই মিশে গিয়েছিল যে ট্রাম ছাড়া অন্য কিছুতে যাবার কথা ভাবতেই পারিনি। অন্ধকার রাস্তায়, স্কুলের বন্ধ গেটের সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেও ক্লান্ত হইনি!
–দারোয়ানজি ওঠো! গেট খোল! তুমি কি জানতে না, আমি ফার্স্ট ট্রামে আসব! ফার্স্ট ট্রাম। এটা একটু আলাদা ধরণের ট্রাম। শুধু বেলগাছিয়া থেকেই আসে আর ব্রিজের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় হু হু বাতাস খায়! খোল বলছি।
ট্রামে পুরো গান গাইতে গাইতে এসেছি। ঘন্টির আওয়াজে নিজের গান নিজের কানে পৌঁছচ্ছিল না। তবে দেশের গান বুঝতে শিশুর প্রাণখানাই যথেষ্ট। তাই সে ভোরে পছন্দের যানে বসে বারবার গেয়েছি জনগণমন! স্কুলে পৌঁছে দেশের একজন সাজার মেক আপ নেব জাস্ট! তাড়া থাকবে না? বলুন। আজ যখন প্রিয় প্রতিবেশী দেশ লটারি করে দেশের মাটির গান বাদ দেয়, কিংবা ফের বাছতে যায়, মনকে সান্ত্বনা দিই! আহা! ওদের কাছে তো ট্রাম ছিল না! হয়ত ঘোড়া ছিল! ইঞ্চি মাটিতে ঘোড়া তাই ছুটছে এখন!
অনেকদিন ভেবেছি, ফার্স্ট ট্রাম কেন অন্যান্যদের থেকে জোরে ছোটে! তবে কি এ ট্রামের চাকায় ঘন্টায় পরেশনাথ হাত বুলিয়ে দেন! নাকি ব্রিজের ওপারের সাদাটুপি কাকাদের সুরেলা গান চাকাগুলোকে জোরে ঘুরিয়ে দেয়! আসলে ভোরবেলা ভগবান বলতে তখন এই দুইই আমার হাতে। লালমন্দিরের পরেশনাথ কিংবা ভালো সুরে গান গাওয়া কিছু মানুষ!
স্কুল টাইমের ট্রামে এক খোঁড়া মানুষ নিয়মিত একই টাইমে উঠত। কিছুক্ষণ ভিক্ষে চাওয়ার পর দেখতাম, সে যাত্রীদের সিটে বসে সবার সঙ্গে গল্প করতে করতে যাচ্ছে। তাকে আমি অন্য সব যাত্রীর মতোই দেখতাম। ট্রাম আর ট্রামের নিম্নবিত্ত বন্ধুযাত্রী আমাকে রাজা ভিখারির শ্রেণিবিভাগ বুঝতে দেয়নি।
কিছুদিন পরে ট্রামের একদিকের সিট সিঙ্গল সিট হয়ে গেল। হার্টের ওপর আমার বুক বাড়ল। ময়ূরকিশোরের প্রেমভাবনা ওই সিঙ্গল সিটে বসে আরো জাগরুক হল। দেখতাম – ঈষৎ নেকু সুরে মা বাবার কাছে বায়না করছেন – চতুর্থী এসে গেল। চল না আজ বিকেলে ট্রামে করে
ইয়ংবেঙ্গল যাই। ওখানের শাড়ি সস্তা কিন্তু উজ্জ্বল রঙ। আমার কলেজমাইনের বাবা একটা বই দুটো দিতে পারতেন না।
ফিরতি পথে মা সিঙ্গল সিটে। আমি ডবল সিটে বেজার বাবার পাশে। এখন মনে হয়, ওই সিঙ্গল সিট তখনকার ঠিক কত বঙ্গনারীর অভিমানের ভুলভুলাইয়া হয়েছিল।
ট্রামের জানলা বাসের চেয়ে খোলা ও লম্বা হত। বিশেষ করে ওই সিঙ্গল সিট থেকে মুখ বার করে পুরো আকাশ পাওয়া যেত। শ্রী মার্কেট থেকে পুজোর চুড়িদার কিনে, সিঙ্গল সিটের জানলার কাছে বসে প্যাকেট খুলতাম। আমার সামান্য ক্লিভেজ দেখানো নতুন কামিজ সযত্নে দেখত নগ্ন আকাশ। পেছনের সিটের একজোড়া বুট আমার নিউকাটে টুকটুক…
এক পা দোলাতে দোলাতে আর একটা মানুষ হয়ত, সে সময়ের আনন্দটুকু নিত। নিক না।
বর্ষার জল রাস্তা ছাপিয়ে ট্রামলাইন ঢেকে দিলে ট্রাম থেমে যেত। নিচে জল কিলবিল করছে কেউটের বাচ্চার মতো। সদাব্যস্ত যাত্রীরা নেমে বাসের খোঁজ করত। স্তব্ধ জলযানে আমি এক রাণী। শুধুই তার।
১৫.নবসংসার পথ
আজ রিহার্সাল শেষে পথে নামতেই বসন্ত পেলাম। এলোমেলো মিঠাই বাতাস চারদিক থেকে আসছে। আবার চারদিকে দৌড়ে যাচ্ছে। বসন্তের নিয়ম অনুযায়ী শুধু দক্ষিণা, এ বাতাস নয়। বাতাসগুলোর ওপর এত মায়া হচ্ছিল। এ বাতাস পূর্ণ ভোগসুখ দিলেও গৃহহীন। নতুন ঘরের খোঁজে ছুটছে আশপাশ। কোনো কোনো মানুষের জীবন হয়ত এমন বাতাস হয়ে যায়।
বাবা তখন খুব অসুস্থ। সারারাত বাইপ্যাপ চলে। ভোর চারটে নাগাদ আরাম নামে শরীরে। বাবার এই আরামটুকু দেখব বলেই চারটে অব্দি জেগে থাকতাম। তখন কার্তিক মাস। সল্টলেকের অনেক গেরস্ত সারারাত আকাশপ্রদীপ জ্বেলে রাখে। তারা ভরা ভোরে পৃথিবীর শেষ লাল শিখা মিশে যায়। একদিন রাত জেগে বারান্দায় ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুমের মধ্যে শুনি খঞ্জনী আর করতাল। স্রোতের মতো বয়ে যাচ্ছে বাজনা দুটো। একবার দূরে চলে যাচ্ছে। একেবার কাছে, একবারে কানের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। বাবা বিছানা থেকে চেঁচান “দ্যাখ তো কে, কে এমন নদীতে দাঁড় টানার মতো লয়ে বাজনা বাজাচ্ছে !”
বাজনাটা চলছিলই। আবছা আলোয় কার্তিকী পুষ্প ফুটে আছে বাগান ভরে। শুধু যারা বাজাচ্ছে বারান্দা থেকে তাদের দেখা যায় না। নীচে নেমে ধীরে ধীরে বাগানে হাঁটতে লাগলাম। যদি…। যদি তাদের দেখা যায়। বাজনা আবার স্পষ্ট। আমিও বাগানের কিনারায়। দুটো সরু মূর্তি মৃদু স্বরে গান গাইছেন আর খঞ্জনি বাজাচ্ছেন। আরেকজন শুধু করতালি দিচ্ছেন। রাস্তার একপাশ থেকে আরেকপাশে যাচ্ছেন আর আসছেন ।
“আপনারা কে? আগে দেখিনি কখনো। বাড়ি কোথায়?”
সুরেলা এক উত্তর। “মা ছিলাম বরিশালে। সেখানে ভূমির চেয়ে জল বেশি। আমরা কীর্তন গাইতাম। জলের ছলাৎ ছলাৎ-এর সঙ্গে সুর মেলাবার নেশা হয়ে গিয়েছিল গো মা। জন্মভূমি শুধু নেশা দেয়।”
আমার কৌতুহল বাড়ছিল… বললাম, “তারপর এ বাংলায় এলেন ?”
“না গো মা। তারপরেও দুই দেশ ঘুরলাম। বউটার বাপ মলো। ওকে নিয়ে গেলাম চট্টগ্রাম, শাওড়ির কাছে। শাউড়ি চোখে দেখে না। বউ বলল আমরা এখানেই থাকি। কাজ আমাদের কীর্তন গাওয়া। এখানের বাতাসে সুর মিলিয়ে বাজনাগুলান তুলে নি। কানা মা শুনবে …আরো কত লোক শুনবে !”
আমি বললাম “তা বেশ হল। আবার সেখান থেকে পালালে কেন গো …কত দেশের বাতাসে সুর মেলাবে গো তোমরা ?”
কার্তিকের ভোরে আরো আলো এল। নারী পুরুষের অবয়ব স্পষ্ট হচ্ছিল! দেখলাম পুরুষ যত শীর্ণকায় বউ তত যুবতী। এবার কথা বলল বউটি! “থেকে গেল শাউড়ি বুড়িকে গান দিয়ে পৃথিবী দেখাতে। মরে গেল ওর বউ। বউ মরতে জামাইয়ের আর কী কদর গো। শেষে বসিরহাট এসে মিনসে আমায় দেখল …”
আমি হাসলাম … “তোমায় দেখল আর বিয়ে করে কলকাতায় এল তাই তো? তা এদেশে গান দিয়ে কাকে কী দেখাবে গো মিনসের বউ? দেখো না …শহরে লোক কেবল ছোটে। তোমাদের গান তাদের দরজায় ধাক্কা খাবে শুধু ।”
দুজনেই চুপ। তারপর দুজনেই বলল, “ছুটের মানুষদিগে দরকার নাই। ভুবন যাদের হারিয়ে যাবে তাদের শ্বাস বাজনা দিয়ে সাজিয়ে যাই। ওপরে যাও মেয়ে। তোমার বাপকে ভোরের খাবার দাও গে। তিনি অসুস্থ আমরা জানি ! যাও যাও …”
দু’ কাপ চা খুব যত্ন করে বানিয়ে দিয়েছিলাম তাঁদের।
ওডিসি: মহাকাব্যিক চলচ্চিত্রে ঘরে ফেরার গল্প - অভিষ্যন্দা লাহিড়ী দেব

ওডিসি: মহাকাব্যিক চলচ্চিত্রে ঘরে ফেরার গল্প
অভিষ্যন্দা লাহিড়ী দেব
একটা দ্বীপে মাত্র দুটি মানুষ থাকে। এক নারী, আর এক পুরুষ। নারীটি ভালোবেসে পুরুষটিকে একটি নীলপদ্ম খেতে দেয়, তারপর বলে, ‘এবার কিন্তু তোমার সব কথা মনে পড়া দরকার!’ কিন্তু ওই নীলপদ্মের পাপড়ি যে সব ভুলিয়ে দেয়, সে কথা সেই নারী জানে। সে চায় না, পুরুষটি তাকে ছেড়ে কোথাও যাক। তাই সে রোজ পুরুষটিকে সেই নীলপদ্ম খেতে দেয়! ওডিসি ছবিটা ওডেসিয়াসের বীরত্বের গল্প নয়! এখানে মহাকাব্যের নায়ক ওডেসিয়াসকে সব সময় ঘিরে রাখে কয়েকটি নারীর বিষন্নতা! এথেনা, ক্যালিপসো, সার্সি, পেনেলোপি এমনকী ওডেসিয়াসের সঙ্গে একবারো যার দেখা হয়নি সেই হেলেন! সকলেই বড় বিষন্ন, বড় একাকী! তার মধ্যে একমাত্র পেনেলোপির অপেক্ষা শেষ হয়, ঘরে ফেরে ওডেসিয়াস! কিন্তু ঘর কি আর তাকে বাঁধতে পারবে?
ওডিসি দেখতে গিয়ে ‘রক্তকরবী’ মনে পড়ল। ‘রক্তকরবী’র মঞ্চ-নির্দেশনায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, রাজাকে মঞ্চে কখনো দেখা যাবে না। ক্রিস্টোফার নোলান পরিচালিত ‘ওডিসি’তে রাজা অ্যাগামেননের মুখটা একবারও দেখা যায়নি। মিশেল ফুকোর ‘পাওয়ার/নলেজ’-এ ক্ষমতার বর্ণনা দিতে গিয়ে ফুকো বলেছেন, ক্ষমতা বলপ্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত না হয়ে, নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ সত্যের ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকে। রক্তকরবীর রাজার ঘর, ওডিসিতে রাজা অ্যাগামেননের কালো হেলমেট– এ সবই সেই নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ সত্যের আড়াল! হেলেন যে প্যারিসের সঙ্গে ট্রয়ে পালিয়ে এসেছিলেন, সেই ঘটনাটা নিজের ক্ষমতাকে প্রসারিত করার কাজে ব্যবহার করেন রাজা অ্যাগামেনন। মৃত্যুর দ্বীপে যখন তাঁর দেখা হয় ওডেসিয়াসের সঙ্গে তখন সে কথা স্বীকারও করেন তিনি! অথচ এই রাজাকে যুদ্ধে যেতানোর জন্য নিজের অস্তিস্ত্বকে বলি দিয়েছে ওডেসিয়াস! দশ বছর ধরে চলেছে ট্রয়ের যুদ্ধ! অ্যাগামেনন না জেতা পর্যন্ত কেউ বাড়ি ফিরতে পারবে না! বাড়ি ফেরার তাগিদেই কাঠের ঘোড়াটা তৈরি করেছিল ওডেসিয়াস! তার ফন্দি কাজেও লাগল। কিন্তু তারপর আরো দশ-দশটা বছর ওডেসিয়াসকে শান্তি দিল না তার নিজের চৈতন্য! অপরাধবোধের সমুদ্রে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে ঘুরিয়ে মারল তাকে।
ওডেসিয়াস যখন ট্রয়ের বিরুদ্ধে দশ বছর ধরে যুদ্ধ করেছিল, তখন সে এথেনাকে দেখতে পেত না। দেবীর প্রতি তার বিশ্বাস তখনো ছিল, কিন্তু দেবী তার পাশে এসে বসেননি কোনোদিন। এথেনার উপহার হিসেবে ওডেসিয়াসের কাঠের ঘোড়াটা ট্রয়ের ভেতর টেনে নিয়ে গিয়েছিল ট্রোজানরা। তার অপরাধে যে সদ্য কৈশোর-উত্তীর্ণ মেয়েটির মুণ্ডু কাটা গিয়েছিল, তার সেই কচি মুখখানি ওডেসিয়াসের মন থেকে সরে না! তার স্মৃতিতে এথেনার পাথরের মূর্তির মুণ্ডু আর সেই মেয়েটির মুখ এক হয়ে ধরা দেয়। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবে বলে ট্রোজান ঘোড়া তৈরি করেছিল বীর ওডেসিয়াস। পুরো পরিকল্পনাটাই তার ছিল। তার রানি পেনেলোপের কাঁধ থেকে খুলে নেওয়া এথেনার ব্রুচটা সে আঁকড়ে থাকত সব সময়। তবু দেবী তাঁকে পথ দেখাতেন না। নিজের অপরাধবোধের সমুদ্রে যখন সে ভেসে বেড়াত, তখন কিন্তু দেবী তার পাশে এসে বসতেন। এথেনা শুধু যুদ্ধের দেবী নন, জ্ঞানেরও দেবী। তাঁর কাছে পৌঁছতে গেলে ভেলায় চেপে সমুদ্র পাড়ি দিতে হয়, বিশ্বাসের ভেলাই একমাত্র গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে! আমাদের দেবী স্তুতিতে বলে, ‘ত্বমেকা গতির্দেবী নিস্তারনৌকা’। অপরাধবোধের সাগরে বিশ্বাসের ভেলা। এই মহান কাহিনিতে অ্যান্টিনিউয়াসের স্বার্থপরতার গল্পটা কেমন যেন খেলো লাগে! কিন্তু তার লোভ আর স্বার্থপরতাও তো জগতের সত্য!
এ ছবির আলোটাও কেমন যেন বিষন্নতায় মাখা! আকাশ সব সময় মেঘাচ্ছন্ন! মহাকাব্যের কাহিনি, তবু পোশাকও কেমন ছেঁড়া-ছেঁড়া! অভিনয়ে সেই বিষন্নতাটা সকলেই খুব ভালো ধরেছেন। ম্যাট ডেমন, অ্যান হ্যাথওয়ে, চার্লিজ থেরন, টম হল্যান্ড, রবার্ট প্যাটিনসন সকলেই খুব ভালো! ভারী মনে ধরেছে লুপিতা ন্যুগোর হেলেনকে! সব মিলিয়ে এ ছবি দর্শনীয়। যারা এখনো দেখেননি, তাঁরা দেখে আসুন অবশ্যই।
শ্রাবণ মাস, বাবার মাথায় জল ঢালা ইত্যাদি প্রভৃতি - বিতান দে

শ্রাবণ মাস, বাবার মাথায় জল ঢালা ইত্যাদি প্রভৃতি
বিতান দে
একটা সিনেমার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। মনে পড়ার বিশেষ কারণ অবশ্যই শ্রাবণ মাস। ১৯৭৭ সালে প্রকাশ পায় বাংলা সিনেমা ‘বাবা তারকনাথ’। মুখ্য অভিনয়ে ছিলেন সন্ধ্যা রায় ও বিশ্বজিৎ। সেই সময়ে তো বটেই, পরবর্তীতেও এই সিনেমা বাঙালির অন্দরমহলে স্থান করে নিয়েছিল এবং জনপ্রিয়তার নিরিখে বহুদিন প্রচলিত ছিল বাংলা বিনোদনের জগতে। সিনেমার গানগুলিও মানুষের মুখে মুখে যথেষ্ট পরিচিতি পায়, “আজ তোমার পরীক্ষা ভগবান, তুমি পাথর নাকি প্রাণ” কিংবা “বোম, বোম, তারক বোম, ভোলে বোম, তারক বোম”-এর মতন গান এখনও মহাদেবের পুজো-পার্বণে বাজে। তাই শ্রাবণ মাস মানেই ‘বাবার মাথায় জল ঢালা’-র মাস, ছোটো থেকেই এমন এক প্রথাগত ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে মনের ভিতর।
আমার বড় হয়ে ওঠা কলকাতার যে অঞ্চলে বিধাননগর, সেখানে মিশ্র সংস্কৃতির মানুষের বাস। বিশাল পাঁচমহলা বাড়ি যেমন আছে, তেমনই আছে সরকারি আবাসন এবং কলকাতার অন্যতম বস্তি অঞ্চলও। শ্রাবণ মাস পড়লেই সেই বস্তি ও সন্নিহিত অঞ্চলগুলিতে দেখতাম মানুষের ভিড়, তারকেশ্বর যাওয়ার। উদ্দেশ্য একটাই, বাবার মাথায় জল ঢালা। এখন সবথেকে বড় সত্যিটা অন্য জায়গায়। আদৌ কি বাবার মাথায় জল ঢালতে যাচ্ছে এই অগুন্তি মানুষ? পাড়ার আশেপাশে যে সমস্ত ছোটোখাটো শিবমন্দির রয়েছে সেখানে শিবের পূর্ণাঙ্গ মূর্তি প্রতিষ্ঠিত। স্থানীয় মহিলারা দেখতাম শিব-পার্বতীর সেই সব মন্দিরে শিবরাত্রি পালন করছেন। কিন্তু শ্রাবণে জল ঢালার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দলে দলে মহিলা, পুরুষ, বাচ্চা, বুড়ো সকলে কাঁধে বাঁক ঝুলিয়ে খালি পায়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে যাচ্ছে বাবার মাথায় জল ঢালতে। উদ্দেশ্য একটাই, পুণ্যার্জন।
আমাদের ৩৩ কোটি দেবদেবীর দেশে জনসংখ্যা প্রায় ১৫১ কোটি। তার মধ্যে শিক্ষিত বা উচ্চশিক্ষিত মানুষের হার একেবারেই নগণ্য। তাই ধর্মীয় প্রসঙ্গে একটি বাস্তব অনেকেরই হয়তো জানা নেই। না জেনে কেবল নিহিত ভক্তির বশে হাজারও মানুষ শ্রাবণে ‘বাবার মাথায় জল ঢালতে’ যায় প্রতিবছর। ভারতীয় পুরাণমতে ভৃগু মুনির গুরুত্বহানি হওয়াতে ভগবান শিব কৈলাসে অভিশাপ-প্রাপ্ত হন, মর্ত্যে লিঙ্গরূপে পূজিত হবেন শিব। ত্রিদেবের অন্যতম প্রধান ও ক্ষমতাশালী দেবতা শিব এই অভিশপ্ত জীবন শুরু করেন মর্ত্যে। তাই ভারতবর্ষের সমস্ত প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ শিবমন্দিরগুলিতে শিবের কোনো মূর্তিপুজো হয় না, লিঙ্গপুজো হয়। তাই বছরের পর বছর যে অন্ধবিশ্বাসে কাতারে কাতারে মানুষ ‘বাবার মাথায় জল ঢালতে’ যান তাঁরা কার্যত না জেনেই যান যে ওটি আদতেই বাবার মাথা নয়, হতে পারে না। কারও ধর্মবিশ্বাস বা ভক্তিতে আঘাত করার কোনো প্রশ্ন উঠছে না। ভারতবর্ষ মূলত ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচারকেন্দ্রিক দেশ। প্রত্যেকের নিজস্ব ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের অধিকার রয়েছে কিন্তু মুশকিল হল শিক্ষায়। ১৯৪৭-এর পর দীর্ঘ একটি সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও শিক্ষার হার এখনও অন্তরায় এবং ধর্মীয় শিক্ষাও তার ব্যতিক্রম নয়।
প্রতিবছর শ্রাবণ মাসে এই অগুন্তি মানুষ যে বিশ্বাসের বশে হাজারো কষ্ট সহ্য করে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তারকেশ্বর যান, তাঁদের ধর্মীয় বাস্তবটিই জানা নেই। জানার পর বিশ্বাস কমবে নাকি বাড়বে তা ভিন্ন প্রসঙ্গ কিন্তু ধর্মবিশ্বাসের ভিতে একটি বাস্তবনিষ্ঠ সত্যি থাকার প্রয়োজন বলেই মনে হয়। ধর্মের স্রোতে ভেসে এখনও বহু মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকার থেকে অনেক দূরে বাস করছেন। কোনো রাজ্য বা দেশের জন্য এই ছবি একেবারেই আশাপ্রদ নয়। ব্যক্তিগত কাজে একবার শ্রাবণের ঠিক পরেই তারকেশ্বর যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানকার পরিবেশ ও পরিস্থিতি ছিল রীতিমতো চিন্তার। স্বাস্থ্য পরিষেবার ন্যূনতম মানদণ্ডটিও বজায় ছিল না! দুধপুকুরের অবস্থা পুণ্যার্থীদের ফুল-বেলপাতা ও প্রসাদে ছিল ভয়াবহ। ভক্তদের থাকার জায়গাগুলি যেমন অপরিচ্ছন্ন তেমনই শৌচাগারগুলির অবস্থা আরও খারাপ! দীর্ঘ এলাকা জুড়ে নেশার অবশিষ্টাংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। একটি দেশ বা রাজ্যের নিরিখে কোনো তীর্থস্থানের এমন ছবি চিন্তার কারণ বাড়িয়ে তোলে তো বটেই! ছোটো থেকেই দেখতাম যে অসংখ্য মানুষ বাবার মাথায় জল ঢালতে যাচ্ছে তাদের সঙ্গে থাকা মিউজিক বক্সে বাজছে অদ্ভুত কিছু গান, তার সঙ্গে বাংলা বা বাংলা গানের কোনো সম্পর্ক নেই।
এই যে বিরাট একশ্রেণির মানুষ বছরের পর বছর বাবার মাথায় জল ঢালার পুণ্যে হেঁটে যাচ্ছে মাইলের পর মাইল রাস্তা, তারা কি আদৌ ভাবিত নিজেদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা বা বাসস্থান নিয়ে? সুস্থ-স্বাভাবিক-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে তারা অভ্যস্ত নয় কেন? সরকার এবং প্রশাসনের কি বিরাট একটা দায় থেকে যায় না। খেয়াল করলে দেখা যাবে এই তীর্থস্থানগুলি থেকে আয়ের অঙ্ক বিশাল। ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে এই আর্থিক লেনদেনের প্রক্রিয়াটি প্রায় সকলেরই জানা। সেখানে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন বা রাজ্যস্তরের প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্তরা যদি এই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন না হন তাহলে ২০৪৭-এ গিয়েও অবস্থার বিশেষ পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। যে ন্যূনতম শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের প্রয়োজন সেখান থেকেই বহু দূরে এই অসংখ্য পুণ্যার্থীরা। কেবল ভক্তিকে উপজীব্য করে তাঁরা মাইলের পর মাইল হেঁটে যাচ্ছে না জেনেই; বাবার মাথায় জল ঢাললে আদতে কী হবে বা হতে পারে তার কোনো যথার্থ উত্তর জানা নেই। অথচ প্রশ্ন উঠতেই পারে যে বিশ্বাস কি এতসব যুক্তি মেনে চলবে? ধর্মীয় আবেগকে এইভাবে কি আদৌ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? বিষয়টা যুক্তি বা আবেগকে নিয়ে নয়, একটা বাস্তবসম্মত সুস্থ পরিকাঠামো নির্মাণের। এতটা রাস্তা খালি পায়ে হেঁটে যাওয়া থেকে, থাকা, শৌচাগার ব্যবহার করা সমস্ত কিছুর মধ্যে স্বাভাবিক রুচিশীলতার দিকটা ভাবা দরকার। লিঙ্গপুজোয় পূজিত হওয়া দেবাদিদেব মহাদেবের প্রতি বিশ্বাস বা আনুগত্য কমার জন্য নয়, প্রকৃত সত্যি এবং বাস্তবের কাছাকাছি পৌঁছানোই হয়ে উঠুক কর্তব্য। আশা করা যায় শ্রাবণে বাবার মাথায় জল ঢালার ধুম তাতে কমবে না বিশেষ।
