৫৮-তম-ই-সংস্করণ।। ৭০ তম সংখ্যা।।জুলাই, ২০২৬



গৌরাঙ্গ দণ্ডপাট
সম্পাদক
- Phone:+1 (859)00000
- Email:info@example.com


পার্থ হালদার
সম্পাদনা সহযোগী
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


সোময়েত্রী চ্যাটার্জি
প্রচ্ছদ
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


পল্লব মিশ্র
প্রচ্ছদ অলংকরণ
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


সুচরিতা রায়
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


পূর্ণতা নন্দী
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


মৌলিকা সাজোয়াল
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


অয়ন্তিকা নাথ
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
কর্তৃক
৮৬, সুবোধ গার্ডেন, বাঁশদ্রোণী, কলকাতা: ৭০০০৭০ থেকে প্রকাশিত।
- যোগাযোগ : ৯৬৪৭৪৭৯২৫৬
৮৩৩৫০৩১৯৩৪ (কথা /হোয়াটসঅ্যাপ)
৮৭৭৭৪২৪৯২৮ (কথা)
- Email : bhaan.kolkata@gmail.com
Reg. No: S/2L/28241 548
সূচিপত্র
।। সম্পাদকের কথা ।।
ক্ষমতা ঠিক কেন চায় মানুষ? ক্ষমতায় গেলে কেন ছেড়ে যায় মমতা? সবাই কি ক্ষমতা চায়? ক্ষমতা কখনো সমতা চায়? নিষ্ঠুর নৃশংস ক্ষমতাবানদের থেকে মসনদ কেড়ে নিতে যে জোর লাগে সেই শক্তি ( প্রতি-ক্ষমতা) মসনদে গিয়ে কেন দ্রুত অথবা ধীরে ধীরে সেই নিষ্ঠুরতারই পথ ধরে? ক্ষমতার প্রকৃতির মধ্যেই কি আছে অবশ্যাম্ভাবী নিষ্ঠুরতা? নাকি ক্ষমতা হারানোর ভয়ের মধ্যে আছে নৃশংস হবার প্রেরণা? ক্ষমতা হারানোর ভয় তাদের থাকে না যাদের ক্ষমতা নেই। অথবা যারা তা চায় না, যারা পেলেও নেয় না বা প্রত্যাখ্যান করে। তাই তাদের দ্বারা বড়ো কিছু গড়া অথবা অনেক কিছু ধ্বংস করা অসম্ভব। সাবধানী হতে হয় তাদের যাদের ক্ষমতা আছে।
আপাত দৃষ্টিতে গরিব মানুষের ক্ষমতা নেই। বাঁচার জন্য জীবন সংগ্রাম আছে। তাদের শ্রম চুরি করেই যে ক্ষমতাবানদের লম্ফঝম্ফ, মোটের ওপর এ নিয়ে ভাবার বড়ো একটা অবকাশ নেই ওদের। ভাবার ক্ষমতা আছে চিন্তাশীল মধ্যবিত্তের। তবে তারা নানা কারণে সহজ নন। অন্যের হয়ে ভাবতে গিয়ে স্বার্থের নানা সুতোতে জড়িয়ে যাওয়া তাদের নিয়তি। ওদের হয়ে কথা বলতে গিয়ে নিজের ধারণা চাপিয়ে দেওয়ার ‘ ক্ষমতা’ এঁদের করায়ত্ত। এ যে সর্বদা সচেতন ভাবে ঘটে, মোটেও না– অবচেতনে এই খেলা চলে। ফলে গরিব মানুষের বিদ্রোহ সত্য, সে বিদ্রোহ দমন করে, আবারো শোষণের যাত্রাকে অব্যাহত রাখাও কম সত্য নয়।
মধ্যবিত্তের ক্ষমতা বড়ো কম নয়। তবে সে ক্ষমতার ঝোঁক বড়ো এলোমেলো। সে নিজেকে ভালোবাসে। বড়ো হতে চায়। বিখ্যাত হতে চায়। নিদেনে জীবন কে উপভোগ করার জন্য অর্থ চায়। সম্মান চায়। সামাজিক মান্যতা আকাঙ্ক্ষা করে। তারপর কেউ কেউ ক্ষমতার পদলেহন করে দ্রুত উন্নতি চান। কেউ কেউ নিজের সম্মান বাঁচানোর চেষ্টা রেখে লড়েন এবং গর্বিত হন। কতিপয় থাকেন যাঁরা অনেকটা ছেড়ে অনেকদূর ঝোঁকেন গরিবদের স্বার্থে। এতে হয়ত ‘ ক্ষমতা’ লাগে। এই ক্ষমতায় অবশ্য মমতা আছে। স্বপ্ন আছে। সবাই খাচ্ছে,পরছে, থাকছে, আনন্দ করছে – এসব স্বপ্ন দেখায় ‘সুন্দর’ আছে। পৃথিবীর কল্যান, মানুষের কল্যাণ এই সুন্দরের ভিত্তি।
উচ্চবিত্তরা উচ্চাভিলাসী। আরো চাই। এতো আরো যা নিজে নিজে ভোগ করে শেষ করা যায় না। চৌদ্দ পুরুষের হয়েও অবশিষ্ট থাকে। এদের মন এই ভেবে সন্তুষ্ট নয় যে তাদের যথেষ্ট আছে। এদের চাই অনির্বচনীয় হুন্ডি। যাতে আইন- আদালত- পুলিশ- প্রশাসন- গুন্ডা- বদমাইশ- মিডিয়া- টিডিয়া – সব তাদের তাঁবে থাকে। তাদের মতো করে ইতিহাস লেখা হয়, তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী ভূগোল বদলায়। প্রযুক্তি তাদের সেবাদাসী হয়। ভাষা তাদের গোলাম হয়। তারা মাদারী খেলানোর মতো গরিবদের খেলায়। মগজ ধোলাই করে, ভাবনা দখল করে। দুনিয়ার গরিব গুলো ওদের দেখে যেন হিমালয়ের মতো মহান মনে করে। লোভী মধ্যবিত্তের যেন ভক্তিতে গদগদ হয়ে ওঠে হৃদয়। অধিকাংশ মানুষ আমাদের নীচে– এই বোধটিই উচ্চবিত্তের মনের শুশ্রূষা, বাঁচার চাবিকাঠি। যখন নিচুরা মরবে তখন এরাই ছুঁড়ে দেবে রুটি। আমরাই মারব, আমরাই রাখব- এই ওদের মনের ভাব। সব চলবে আমাদের মোতাবেক। এই আমাদের টা ‘আমার’ হলে একনায়কের একচেটিয়া তন্ত্র গড়ে ওঠে। স্যাডিস্টিক উল্লাস ক্ষমতাবানদের প্রিয় ডিস। এক দিক দিয়ে ম্যাগালোমেনিয়া তে আক্রান্ত না হলে এমনতর নৃশংস উল্লাসে মেতে ওঠা যায় না। একচেটিয়া পুঁজি, একনায়কতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র, ফ্যাসীবাদ– মানব সমাজের গভীরতর অসুখ থেকে জন্ম নেয়, বেড়ে ওঠে। সহজ সুন্দর যাদের চোখে মনে কোনো দাগ কাটে না তারাই ক্ষমতাবান জল্লাদ হয়ে উঠতে চায়। নীলাকাশ, নদীর পাড়, ঘাস ফড়িং, প্রিয় ফুল, প্রিয়ার অভিমান, রঙিন প্রজাপতি, শিশুর হাসির বিপ্রতীপে এদের রাক্ষুসে খিদে, পাশবিক উল্লাস। তবে অতি সীমিত হলেও জন্মসূত্রে ধনীর মনেও দরদ জন্মায়, এমনকি গরিবের পক্ষে দিন বদলের স্বপ্ন। রাজা হবার সাক্ষাৎ সুযোগ হেলায় ছেলে শাহাজাহান পুত্র দারা মরমীয়া সাধনায় ডুবে যান অন্তরের টানে। জমিদার পুত্র কৃষকদের মুক্তির সংগ্রামে জীবন বাজি রাখেন। এসব এ অন্যরকম ক্ষমতা লাগে। এ ক্ষমতা মমতা ভরা ক্ষমতা। সমতার জন্য লড়ে যাওয়ার ক্ষমতা। কুর্শি নয়, মুক্তির জন্য অর্জন করা সাহস ও ঝুঁকি এর প্রধান উপকরণ।
কিন্তু গড়তেও তো ক্ষমতা লাগে। সুস্থ সুন্দর হয়ে বাঁচতেও লাগে ক্ষমতা। মানবতার লাঞ্ছনা দেখে গর্জে উঠতেও লাগে ক্ষমতা। এই দুই ক্ষমতা তো এক নয়। সর্দারদের ভয়ঙ্কর ক্ষমতার মুখোমুখি হয়ে নন্দিনীর অসম লড়াইয়ে ছিল ‘সত্য’। নন্দিনী সুন্দরের আবাহনের গান গেয়েছিল বলেই একদিন অসম্ভব সম্ভব হল। নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকে হেলিয়ে দিয়ে গরিব মানুষের মুক্তির আকাঙ্খা ই এখানে প্রবল। রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ক্ষমতা নিজের পক্ষে টেনে আনা তাঁর লক্ষ্য ছিল না । এ ক্ষমতা সুন্দরের উপাসক, সত্যের সন্তান। আমরা এই ক্ষমতার সাধনা করি আসুন। আদর্শ শাসক এ পৃথিবী দেখেনি। এই সাধনায় সন্ন্যাসীর ত্যাগের সঙ্গে মিশে যাক রাজার বিনয়ী সেবা। মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসা রাজা রাজ্যের শিশুদের সেবা করুক। রাজা ত্যাগী হয়ে উঠলে সারা পৃথিবী বলশালী হয়ে উঠবে। এই আকালে সে স্বপ্ন আমাদের তাড়িয়ে বেড়াক। নিছক আরাম নয়, আমাদের এমন পৃথিবীর খোঁজ চালাতেই হবে। ভালোবাসা আর সহিষ্ণুতার গান গাইতে গাইতে পথ হাঁটতই হবে। জয় পরাজয়ের বানানো মান অপমান যাতে আমাদের স্পর্শ করতে না পারে! হে লালন, হে কবীর!- তোমরা সিংহাসনের ঐশ্বর্য দেখে, ওতে চড়ে বসা ক্ষমতায় অন্ধ রাজার পোশাক পরা বিকৃত মানুষটির অসহায় হুঙ্কার দেখে এখনো মিটিমিটি হাসছ, হেসে চলেছে, আমরা দেখতে পাচ্ছি।
পানু পাল : জনজাগরণের নৃত্য ও নাট্য - মধুমিতা পাল - অন্তিম পর্ব

পানু পাল: জনজাগরণের নৃত্য ও নাট্য
মধুমিতা পাল
অন্তিম পর্ব –
অনেকের সঙ্গে অনেক মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল ডিউটিতে। ইন্টারভিউতে বলছেন, এই পথনাটককে পোস্টার ড্রামা বলতে আমি রাজি নই। পথনাটক হচ্ছে এক ধরনের একাঙ্ক নাটক, এটা সোচ্চার অভিনয়ের জন্য। মঞ্চনাটকের সঙ্গে বলা যায় যে তফাতটা কেবলমাত্র আঙ্গিকগত।
যখন পথনাটক করেছি তখন কিন্তু পথনাটককে ঘিরে উৎসাহ যেমন দেখেছি তেমন জনপ্রিয়তাও দেখেছি। এখন যদি পথনাটক দেখতে মানুষের উৎসাহের অভাব দেখা যায় তাহলে আমার ধারণা, নাটকের বিষয় নির্বাচন বা উপস্থাপনায় কোন গণ্ডগোল হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে আঙ্গিকগত পরিবর্তনটা থাকা দরকার সেটা থাকছে না। পথনাটক নাটক নয় বা লোকে আকর্ষণ বোধ করে না এই যুক্তি মানতে আমি একেবারেই রাজি নই।
নাট্যকর্মীর আদর্শ, আমি যেমন একদিকে নাট্যকর্মী, তেমনি রাজনৈতিক দলের কর্মী। এভাবেই আমার নাট্যচর্চা শুরু হয়েছিল। নাটকের মধ্যে দিয়ে আমরা পার্টির অর্থাৎ কমিউনিস্ট আদর্শের কথাই বলতে চাই। তার আদর্শের কথা ভাবতে গিয়ে আমরা নিজেদের কথা সাংসারিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা কখনো ভাবি নি। নিজেকে সবসময়ই একজন দায়বদ্ধ রাজনীতিসচেতন শিল্পী-কর্মী বলেই মনে করেছি। আমার আদর্শবাদীতা আমার কাছে চিরজীবন আমি লালনপালন করেছি। নিজের মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে জীবনের সুখের উপকরণগুলো কিনতে চাইনি। আদর্শের প্রশ্নে ইউরোপের সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে আমি মনে করি, সবথেকে প্রাসঙ্গিকতা হচ্ছে সব সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যম একটা বিনোদনের উপকরণ হবে। তার মধ্যে পলিটিকাল কন্ট্রোল থাকবে না, মানুষ থাকবে না সেরকম আমি কোনোদিন করিনি, আমরণকাল করব না। অনেকের সঙ্গে অনেক মতবিরোধ হলেও আমি আমার জায়গায় চিরটাকাল অটুট থেকেছি।
আমি চালিয়েছিলাম বা এখনো করে যাচ্ছি। মূলভিত্তি প্রচুর মানুষের সাহায্য পেয়েছি, প্রচুর মানুষ প্রচুর গুণী ব্যক্তি নিরলসভাবে আমার সাথে কাজে সাহায্য করছেন। উৎসাহিত করেছিলেন শোভা সেন। বেশ কিছু বছর আমি ওদের সঙ্গে থাকতাম, ওদের সাথে পথ চলেছি। বছর ধরে পানু পালকে নিয়ে আমি এককভাবে কলকাতার বিভিন্ন হলে চেষ্টা করে গেছি ওর জন্মদিবস, মৃত্যুদিবস পালন করেছি। সেখানে নানা ধরনের বক্তৃতা অ্যারেঞ্জ করেছিলাম কিন্তু আজ ওর জন্মশতবর্ষে ওর কাজগুলোকে ফিরে পাওয়া, কাজগুলোকে যাচাই করা- এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই আমি পথে নেমেছি। আমার পানু পালের গবেষণার পথে যারা এসেছেন তাদের সকলকে আমার প্রণাম, অনেক কিছু তথ্য হয়তো দিতে পারলাম না বা সময়ও নেই। অনেক আরো অনেক অনেক তথ্য আছে যেগুলো অনবরত আসছে আমার হাতে বা আমি খুঁজে চলেছি সেই সব তথ্যের সন্ধান করে চলেছি।
রাহুল পুরকায়স্থ একজন কবি লেখক। তিনি লিখেছিলেন ছোট্ট কবিতা চার লাইনের- পথনাটকের পথের ধুলায় শেষ বিকেলের লাল আজও কি লেনিন ডাক দিয়ে যান? কমরেড পানু পাল!
এই নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল বেলঘড়িয়াতে যেখানে তিনি শেষ জীবন কাটিয়েছেন। সেখানেই তিনি অসাধারণ নৃত্যনাট্য রচনা করেছিলেন ‘ম্যান এন্ড মেশিন’, ‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই’। গোর্কি সদনে ডাক পড়লে নৃত্যনাট্যগুলো করার জন্য কারণ রাশিয়া এবং মস্কো থেকে ডেলিগেটস আসছে। পানু পাল তার দল-সহ এগুলো এই অসাধারণ সম্ভার নিয়ে হাজির হলেন। আমিও ছিলাম বয়স তখন ৫।
আকাশে অনেক তারার ভিড়ে ম্যান এন্ড মেশিনের একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। কীরকম জীবন নিয়ে কারখানায় শ্রমিকরা কাজ করবে ৮ ঘণ্টা এবং তাঁদের ন্যায্য দাবি মানতেই হবে মালিকপক্ষক এই সচেতনতাই বারবার তাকে নাড়িয়ে দেয় তার লেখাতে অন্যমাত্রা দিয়েছিল। ওঁর ম্যান অ্যান্ড মেশিনে উনি দেখিয়েছিলেন, পয়সার অভাবে একজন মানুষ মদ খেয়ে দিনের শেষে বাড়িতে ফিরছে।
‘ওমা দুটো খেতে দে মা খিদের জ্বালা কত সব’
মা বলছে, তোমার আর আমার খাবার আমি কোথায় পাব। ছেলে বলছে, সেই সকালে চলে গেলি দিয়ে দুটো বাসি রুটি, পথে পথে ঘুরে মর ক্ষতি ক্ষতি ক্ষতি ক্ষতি ও মাদক খেতে দে মা। এরকম হতে হতে মা তখন সাংঘাতিক ক্রোধে ছেলেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় কচি বাচ্চা চুপ কর বলছি পাছা নইলে বার চড় বসাব। ছেলে বলছে, চুপ ককরব না খেয়ে কি মরব তোরা কেমন বাবা-মা খেতে কেন দিবি না। তারপর তার বাবা আসে, তার বাবা মদের নেশায় চুর হয়ে আসছে এবং মা বলছে তোর মরণ হয় না।
অপরাধী দমনেঅগ্নি প্রিয়াঙ্কা - অজন্তা সিনহা

অপরাধী দমনে অগ্নি প্রিয়াঙ্কা
অজন্তা সিনহা
যাঁরা মহিলা ব্রিগেডের জয়জয়কার দেখতে চান, তাঁরা অবশ্যই খুব তাড়াতাড়ি দেখে নিন হইচই-এর নতুন ওয়েব সিরিজ ‘কুহেলি’। গত ১৫ই মে স্ট্রিমিং শুরু হয়েছে এই সিরিজের। পরিচালক অদিতি রায় নির্মিত নারী-কেন্দ্রিক
এই সিরিজে একঝাঁক প্রতিভাবান অভিনয়শিল্পীকে একত্রে পাওয়া যাবে। পাহাড়ের শান্ত পরিবেশে ঘেরা একটি ছোট্ট নির্জন শহরকে কেন্দ্র করে রহস্য, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং সূক্ষ্ম হাস্যরসের মিশেলে তৈরি হয়েছে এই সিরিজ। অর্থাৎ ‘কুহেলি’ একাধারে একটি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ও মার্ডার মিস্ট্রি।
প্রিয়াঙ্কা সরকার এই কমিক-থ্রিলার সিরিজে অভিনয় করেছেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ও গভীর ব্যক্তিত্বের পুলিশ অফিসার ডিএসপি অগ্নি বসুর চরিত্রে। তাঁর সঙ্গে অভিনয় করেছেন কৌশিক সেন, ঋধিমা ঘোষ, সুস্মিতা দে, অঙ্গনা রায়, শুভ্রজিৎ দত্ত, দুর্বার শর্মা এবং অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। নতুন এই ঘরানার চরিত্রে অভিনয় করা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল এবং সহ-অভিনেতাদের সঙ্গে শ্যুটিং সেটে কতটা মজার মুহূর্ত কাটিয়েছেন, তা নিয়েই কিছুদিন আগে এক পরিচিত সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপচারিতায় মুখ খুলেছেন অভিনেত্রী।
তিনি বলেছেন, ‘কুহেলি’ আসলে পাহাড়ে অবস্থিত একটি ছোট, বিচ্ছিন্ন কাল্পনিক শহরের নাম। কুয়াশায় মোড়া এই শহরটিই যেন আলাদা একটি চরিত্র। এখানেই আমার চরিত্র তদন্ত করতে আসে এবং ধীরে ধীরে অন্যান্য চরিত্র ও পরিস্থিতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তিনি আরও জানিয়েছেন, “চরিত্র হিসেবে অগ্নির মধ্যে যেমন একটি রুক্ষ দিক রয়েছে, তেমনই আরেকটি স্তর রয়েছে–সেটা হল কমেডি। সিরিজটি আসলে একটি কমিক থ্রিলার এবং এর হাস্যরস পরিস্থিতিনির্ভর, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া নয়। বাস্তবে যেমন বড় সংকটের মধ্যেও আশেপাশে কিছু না কিছু হাস্যকর ঘটনা ঘটে, এখানেও তেমনটাই দেখা যাবে। চরিত্ররা যদিও মজা করছে না, কিন্তু দর্শক অবশ্যই সেই কমেডির অনুভূতি পাবেন। অগ্নি বসু তাই থ্রিল ও কমেডির এক মিশ্র রূপ।”
পাঠক থুড়ি দর্শক জানেন, এর আগে প্রিয়াঙ্কা হইচই-এর থ্রিলার ‘মহাভারত মার্ডার্স’-এ এক মহিলা পুলিশের চরিত্রে অভিনয় করেন। তবে তাঁর ‘কুহেলি’-র কাজ নিঃসন্দেহে সম্পূর্ণ আলাদা। একথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য, দারুণ টানটান এক চিত্রনাট্যকে ঘিরে প্রতিটি দৃশ্য দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলে। আর অভিনেতারাও প্রত্যেকই তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেন। সিরিজের শ্যুটিং হয়েছে সিকিমে, যা তুলনামূলকভাবে খুব বেশি ব্যবহৃত নয়। ফলে জায়গাটি এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি করে। তাছাড়া ‘কুহেলি’-র কুয়াশা ও ধোঁয়াটে আবহকেও একটি স্বতন্ত্র চরিত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এখানে, যা দর্শক প্রতি মুহূর্তে অনুভব করবেন।
প্রসঙ্গত, এটা বোঝা যায়, এই শহরের বাসিন্দাদের প্রত্যেকের চরিত্রই অত্যন্ত ধূসর এবং সেখানে অনেক লেয়ার রয়েছে। । তাদের উদ্দেশ্যকে এক কথায় বিচার করা যায় না। বাস্তবে তাদের কেউই সম্পূর্ণ ভালো বা খারাপ নয়–তারা নানা আবেগের মিশ্রণ এবং সেই দিকটি চিত্রনাট্যে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দর্শককে এই জটিল মনস্তত্ত্ব নিয়ে ভাবতে বাধ্য করবে সিরিজটি। এখানে যেমন সাসপেন্স রয়েছে, তেমনই রয়েছে আবেগ ও মজার সঠিক ভারসাম্য, যা দর্শকদের আকর্ষণ করবে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, দর্শক বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বিভিন্ন দেশের কনটেন্ট দেখতে পারেন এবং নিজেদের পছন্দমতো বিষয় বেছে নিতে পারেন। বাংলায় ‘কুহেলি’-র মতো কনটেন্ট খুব একটা হয় না, তাই সহজেই এই সিরিজ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে দার্জিলিংয়ে এক পুলিশ অফিসারের রহস্যজনক মৃত্যুর তদন্ত, যা ধীরে ধীরে পারিবারিক গোপন রহস্য ও আবেগঘন টানাপোড়েনে ভরা এক জটিল খুনের রহস্যে পরিণত হয়। গল্পের শুরু দার্জিলিংয়ের কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ি পরিবেশে, যেখানে এক সিনিয়র পুলিশ অফিসারের আপাত আত্মহত্যা ময়নাতদন্তের পর নির্মম খুন বলে প্রমাণিত হয়। ডিএসপি অগ্নি এই মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে এবং তদন্ত করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ে এক জটিল রহস্যের জালে, যেখানে তিন বোনের উপর গভীর সন্দেহ তৈরি হয়। ভুক্তভোগী ও সন্দেহভাজনের সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। বলতে দ্বিধা নেই, এই সিরিজ মূলত মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা এবং পরিবেশগত সাসপেন্সের উপর জোর দেয়, শুধুমাত্র চমকপ্রদ মোড়ের উপর নয়।
আউগুস্তো বোয়ালের ফোরাম থিয়েটার ও লেজিসলেটিভ থিয়েটার- ড. কুন্তল মুখোপাধ্যায়
আউগুস্তো বোয়ালের ফোরাম থিয়েটার ও লেজিসলেটিভ থিয়েটার
ড. কুন্তল মুখোপাধ্যায়
আউগুস্তো বোয়ালের ফোরাম থিয়েটার ও লেজিসলেটিভ থিয়েটার
১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত জনসংস্কৃতির আহ্বানে মধ্যমগ্রামের বাদুতে একটি নাট্যকর্মশালা-পরিচালনা করে যান আউগুস্তো বোয়াল। সেখানে একান্ত আলাপচারিতায় এই নিবন্ধকারকে তাঁর নাট্য অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন বোয়াল। সেই আলাপচারিতার সূত্রেই এই নিবন্ধ। এই মুহূর্তে ব্রেশট-পরবর্তী রাজনৈতিক থিয়েটার ও তার নিরলস রূপায়ণে বোআল একজন একনিষ্ঠ নাট্যকর্মী। ১৯৩১ সালে বোয়াল ব্রাজিলের রিও শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা চেয়েছিলেন বোয়াল ডাক্তার হন। কিন্তু কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিগ্রিধারী বোয়াল শেষ অবধি থিয়েটারেই আকণ্ঠ নিমজ্জিত হলেন। পড়াশোনা করতে আমেরিকায় এসে নিউ ইয়র্ক শহরের ৪৬ নং রাস্তায় এক থিয়েটারে জড়িয়ে পড়লেন তিনি। ১৯৫৬ সালে ব্রাজিলে ফিরে এসে সাও পাওলোর এরিনা থিয়েটারে ডিরেক্টর হিসেবে ‘মাইস অ্যান্ড মেন’ (১৯৫৬), ‘জুম্বি’ (১৯৬৪), ‘ত্যর্তুফ’ (১৯৬৫), ‘দা ম্যানড্রেক’ (১৯৫৬) প্রভৃতি নাটক মঞ্চস্থ করেন। বোআলের ভাষায়, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য নাট্যরচনা, নির্দেশনা বা অন্যান্য ক্রিয়াকলাপ সবই তিনি করেছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হলেন বোআল। ১৯৭১ সালে এরিনা থিয়েটার আক্রান্ত হল। বোয়ালকে রাখা হল কারান্তরালে। তিন মাস বাদে জেল থেকে বেরিয়ে তিনি চলে গেলেন আর্জেন্টিনায়, থাকলেন সেখানে ১৯৭৬ সাল অবধি। ব্রাজিলে যা পারেননি তাই করলেন আর্জেন্টিনায়। ১৯৭১ সালের ‘তোরকামাদো’ এবং ১৯৭৩ সালের ‘আঙ্কেল স্কুরজ ম্যাকডাক’ তাঁকে দিল পরিচিতি। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে তিনি কাজের সূত্রে ঘুরে বেড়ালেন। আর এইভাবে তৈরি হল তাঁর ‘Theatre of the Oppressed’-এর দর্শন। দর্শকের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে তিনি থিয়েটারকে করে তুলতে চাইলেন, ‘Rehearsal for the revolution’ I
বোয়ালের ফোরাম থিয়েটার সব সময়ই একটা বাণীর বা মেসেজ বহন করে। ফোরাম থিয়েটার দর্শক ও অভিনেতার পার্থক্য দূর করে দর্শককে করে তোলে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী। ‘Spectator’ এখানে হয়ে ওঠে ‘Spectactor’। নাট্য-অভিনয় চলাকালীন সময়ে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ রেখে অভিনয় বন্ধ করে দর্শকদের নাট্যক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করিয়ে তাদের মধ্য থেকেই রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলন শুরু করার কাজ করতে চায় ফোরাম থিয়েটার। অঞ্চল বা গ্রামভিত্তিতে এই ফোরাম থিয়েটার এক ধরনের ‘ইস্যু’-ভিত্তিক সাংস্কৃতিক প্রচারে নেমে পড়ে। মাদকাসক্তি-বিরোধী, নারী নির্যাতন-বিরোধী, জাতিদাঙ্গা-বিরোধী প্রভৃতি ‘ইস্যু’ ফোরাম থিয়েটারে গুরুত্ব পায়। বোয়ালের ভাষায়, এইভাবে তৈরি হয় ‘theatricalisation of politics’ ধারণা। সত্তরের দশকে পেরুতে এই ফোরাম থিয়েটারের কাজ শুরু করলেও বর্তমানে রিওতে বোয়াল এই কাজেই ব্যস্ত।
শারীরিক ভাষা মূর্ত হয়ে ওঠে ফোরাম থিয়েটারে। মানুষের শরীরের যান্ত্রিক ব্যবহার না করে, তাকে ‘despecialise’ করে তোলাই হল ফোরাম থিয়েটারের মূল লক্ষ্য। পাঁচটি পদ্ধতিতে এই কাজ ব্যবহৃত হয়। এগুলি হল:
ক. স্পর্শ, অর্থাৎ কোনও কিছু ছুঁয়ে অনুভব;
খ. শ্রবণ- যা বোয়ালের কথায় মনোযোগপূর্বক শ্রবণ;
গ. শরীরের বিভিন্ন ইন্দ্রিয়গুলিকে প্রাণবন্ত কর্মশীল করে তোলা;
ঘ. দৃশ্য জিনিসকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখা এবং
ঙ. স্মৃতি বা স্বরূপ। এই পাঁচটি পদ্ধতিতে কমিউনিকেট করার চেষ্টা চালানো হয় যাতে ব্যক্তির আবেগ ও অনুভূতি একটি বিশেষ মাত্রায় পৌঁছতে পারে। আর এইভাবে নাট্যকর্মে একীভূত হয়ে পড়বেন নাট্যকর্মী ও দর্শক। থিয়েটার হয়ে উঠবে একটি মুখপাত্র।
বোয়ালের থিয়েটার-দর্শনের প্রভাবে ও কার্যকরী নেতৃত্বে ইতিমধ্যেই ফ্রান্সে, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে, উত্তর আমেরিকায়, ইউরোপের অন্যান্য অংশে, আফ্রিকায়, এমনকি ভারতেও ‘থিয়েটার অফ দি অপ্রেসড্’-ভিত্তিক ফোরাম থিয়েটার গড়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে ১৯৮৬ সালে ব্রাজিলে সরকার পরিবর্তনের পর বোয়াল আমন্ত্রিত হয়েছেন স্বদেশে। ফোরাম থিয়েটার নিয়ে হাজির হয়েছেন দরিদ্র বিদ্যালয়-ছাত্রদের সামনে। তৈরি করেছেন সাক্ষরতাভিত্তিক থিয়েটার কর্মসূচি। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই কর্মধারারও পরিবর্তন ঘটেছে।
১৯৯৪ সালে এখন বোয়াল তাঁর শহর রিও-র একজন কাউন্সিলার। সেখানে তিনি শুরু করেছেন থিয়েটার নিয়ে নতুন আর এক ধরনের পরীক্ষা। এই নতুন থিয়েটার পদ্ধতির তিনি নাম দিয়েছেন ‘Legislative theatre’ | লেজিসলেটিভ থিয়েটার সাধারণ মানুষকে সংসদীয় ব্যবস্থায় আরও বেশি আপন করে নেয় এবং দেশের আইন প্রণয়নে তাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালনে উদ্যোগী করে তোলে।
ফোরাম থিয়েটারে যেমন সমস্যা বিষয়টিতে দর্শকদের মধ্যবর্তিতা বা হস্তক্ষেপ ঘটে- এখানে সেইভাবেই এই হস্তক্ষেপের পরবর্তী বিশ্লেষণী আচরণগুলো যত্ন সহকারে সংগৃহীত ও লেখা হয়। এই লেখ্য বিশ্লেষণগুলি পরবর্তী সময়ে আইন প্রস্তুতির ক্ষেত্রে আলোচিত ও বিবেচিত হয়। এইভাবে থিয়েটারের মাধ্যমে দর্শকের অভীপ্সাপূরণের একটা চেষ্টা চলে। বোয়ালের ভাষায়, ‘theatricalisation of politics’ এইভাবে একটা সুন্দর পরিণতি আশা করতে পারে। লেজিসলেটিভ থিয়েটার অবশ্য এমন বিভ্রম তৈরি করে যাতে বুঝিবা মনে হয় সাধারণ মানুষ সক্রিয়ভাবে আইন প্রণয়নে অংশগ্রহণ করেছে। আসলে, দর্শকদের মধ্যবর্তিতা, অনুপ্রাণিত বিশ্লেষণ যাই হোক না কেন, আইন প্রণয়নের সময় বিশেষ রাজনৈতিক দল বা বিশিষ্ট প্রতিনিধির সংসদীয় আচরণ-উদ্যোগের ভূমিকাই বেশি আকর্ষণীয় ও গ্রাহ্য বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু লেজিসলেটিভ থিয়েটারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ, দর্শক যে রাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পর্কে, রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপ সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণালাভকরে- সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ থাকে না।
বোয়ালের ‘থিয়েটার অফ দি অপ্রেসড্’-এর দর্শন, ফোরাম থিয়েটার ও লেজিসলেটিভ থিয়েটার, সবকিছুরই মূল কথা- থিয়েটার হল একটি অস্ত্র, যা দিয়ে এতদিন শাসক শ্রেণি তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে; কিন্তু এই থিয়েটারই নিপীড়িত মানুষের মুক্তির উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। বোয়ালের এই দর্শন আজ শুধু তৃতীয় বিশ্বের মানুষের কাছে নয়, উন্নত দেশের মানুষদের কাছেও গ্রহণীয় হয়ে উঠেছে।
গেছি বারবার - ময়ূরী মিত্র - পর্ব ১৩ - ১৪

গেছি বারবার
ময়ূরী মিত্র
১৩. খালপথ
আজ উল্টোডাঙ্গা বস্তি এবং সেখান থেকে ডালপট্টি হয়ে আর জি কর খালপারের রাস্তা ধরে যাচ্ছিলাম। খালের ধারে বসতি বেড়েছে। প্রচুর মানুষ টিনের বাড়ি বানিয়ে বাস করছেন। কাঠের ঘরও বেশ কটা চোখে পড়ল। কিছু গেরস্ত বাড়ির সামনে নতুন করে তুলসী, জবা, নয়নতারা ইত্যাদি পুঁতেছেন। কেউ কেউ আবার খাল অঞ্চলের পুরোনো গাছগুলোকে যত্ন করে বাঁচিয়ে রেখেছেন। একটি কাঠের ঘরের বাইরে বেশ কটি ঝুলন্ত টব। দরজায় কমলা প্রিন্টেড পর্দা। যথেষ্ট পরিমাণ নোংরা হলেও বাড়ির মানুষদের রঙের বোধটি ভালো। কমলা রঙে বিকেলের সূর্য ভেঙে পড়েছে। তৈরি হচ্ছে এক আজিব কমলিনী। এই কমলিনী অনেকটা রামায়ণের মায়াসীতার মতো। সীতার আদলে তৈরি হয়েছিল মায়াসীতা। আর পৃথিবীর যত মালিনী এক হয়ে হয় কমলিনী। কমলিনী এক ছায়ামালিনী গো। যে ক্ষণে সে আসে সেই ক্ষণ সবুজ আর কমলা হয়ে ওঠে। মাঝে এঁকে নাও বাপু একটি অশোক।
গাড়িতে বসে নিজের ফালতু কল্পনায় হাসতে লেগেছি। বাস্তবিক এ অঞ্চলে গাছ এখনো বেশি। ঠেলা চলে বলে একজায়গায় গাড়ি দাঁড়িয়েছিল অনেকটা সময়। মুখ বাড়িয়ে দেখছিলাম ফুটপাথে ছেলেরা ব্যাট বল ধরেছে। ল্যাম্পপোস্টের পাখি খেলুড়ে দেখে হিংসায় মরছে বুঝি।
আউট আউট –ছেলেগুলো চেঁচাল।
উবের চালক বিরক্ত হয়ে বললেন, “ম্যাডাম মাথা ঢোকান ভিতরে! কেন যে ধরলাম এই রুট! গাড়ি আর এগোবে না। সামনের ঠেলায় পাইকারি ডাল।”
ভদ্রলোক একটু বেশিই গজগজ করছেন। একটু পাগলা আছি কিনা! হঠাৎই জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কলকাতায় কবে থেকে গাড়ি চালান?”
“ছোটো থেকে। আমরা রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর দিনে বনগা বর্ডার পেরোই।”
আমি আর একটু কৌতূহল দেখালাম “কোথায় থাকতেন?”
“এই অঞ্চলে!”
উত্তরদাতার গলায় স্মৃতি না স্মৃতির ঝঞ্ঝাট …..বুঝি নি অবশ্য। পাগলের এত বোঝার দায় নেই।
সে শুধু কমলিনী খোঁজে।
১৪. ট্রামপথ
আমার বর্ণপরিচয় শেখার স্কুল ট্রাম লাইনের ধারে। স্কুলের নাম আনন্দম। কলেজস্ট্রিটের দিকে মুখ করলে শ্যামবাজারের ঠিক পরের স্টপেই আনন্দম। বাগানহীন এই স্কুলে দুটো দোলনা। মা বলেন, এই নার্সারী স্কুল আমি নাকি একদম পছন্দ করতাম না। ট্রাম থেকে নেমে রাস্তা পার হয়েই ফিরতি ট্রামে ওঠার জন্য রেডি হয়ে যেতাম। পাছে মা জোর করে স্কুলে টানে, সেই ভয়ে রাস্তায় আর যাঁরা বেলগাছিয়ামুখী ট্রামের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতেন তাঁদের কারোর বাচ্চা সেজে যেতাম। ফিরতি যানে ঘরে ফেরার বাড়তি আনন্দ প্যারাম্বুলেটরের শিশুও কি অগ্রাহ্য করতে পারে।
ছোট থেকেই আমরা উত্তর কলকাতার বেলগাছিয়ায়। পরেশনাথ ব্রিজ শেষ হয়েই কয়েকটা ঘটাং ঘট ঘটাং ঘট। ট্রাম ঢুকে যেত ডিপো তে। বিশাল অঞ্চল জুড়ে ট্রামডিপো। ট্রামে করে ডিপো ঘুরে ফের স্টার্টিং পয়েন্টে এসে বাড়ি ঢোকা। ডিপোয় বড় বড় ঘাস। বর্ষায় জল পেয়ে আরো আধহাত লম্বা হয়ে যেত। ডিপোর মধ্যে ট্রাম বেশি জোর ছুটত না। হয়ত এই গতি নির্ধারণের নির্দিষ্ট কোনো কারণ থাকত না, সবসময়। আসলে ঘোড়ার কি ট্রেনের ব্যস্ততা ট্রামের থাকে না। পোয়াতি হাতির মতো মন্থর আর দুলকি চাল ট্রামের পছন্দ। জানলা থেকে হাত বাড়িয়ে ঘাস ধরতাম আর রামচেল্লান চিল্লাতাম, “মা জানো, একে বলে ঘাস গাছ!”
আমার প্রকৃতিবিজ্ঞান খাতায় চারটে জ্যান্ত ঘাস ফেভিকল দিয়ে সাঁটানো হল। ক’দিন খাতার কোনো দিয়ে ঝুলল ঘাস।আস্তে আস্তে শুকিয়ে, কখন যে ঝরেও গেল! প্রকৃতিবিজ্ঞানের শব্দে শুধু থেকে গেল ফেভিস্মেল। ট্রামে চড়ে সেই আমার প্রথম আবিষ্কার। এরপর থেকে প্রকৃতিবিজ্ঞানে কখনো একবারে পাশ করিনি। মার খেয়ে, একটুও লজ্জা না পেয়ে বলতাম, “আমি হোল লাইফ ট্রামে চড়ে স্কুল যাব আর ট্রামের মতো স্লো মোশনে বিজ্ঞান পাশ দেব।” পাকু হওয়ার পর বুঝে গেলাম স্কুল হোললাইফ থাকে না। কিন্তু ট্রাম যে চিরকাল থাকবে এ একপ্রকার বিধানসরণির সব বাচ্চা ধরে নিয়েছিল।
ততদিনে অবশ্য ফোর ফাইভে উঠে গেছি। কেজি থেকেই আনন্দম ছেড়ে ভর্তি হয়েছি বিডন স্ট্রিটের হোলিচাইল্ডে। আমার ট্রাম যাত্রা বেশ কয়েকটা স্টপেজ লম্বা হয়েছে। আমি অবশ্য বলতাম, লাইনটা বড় হয়ে যাচ্ছে। (…ক্রমশ)
‘বিদায়বরণ’, সম্পর্কের রাজনীতি নাকি রাজনীতির সম্পর্ক থেকে নিজেদের খুঁজে পাওয়া? -বিতান দে

‘বিদায়বরণ’, সম্পর্কের রাজনীতি নাকি রাজনীতির সম্পর্ক থেকে নিজেদের খুঁজে পাওয়া?
বিতান দে
- নির্দেশনা ও সাঙ্গীকরণ: সমুদ্রনীল সরকার
- প্রযোজনা: করুনাময়ী সপ্তর্ষি
- আলোক প্রক্ষেপণ: সৈকত মান্না
- রূপসজ্জা: অজিত মণ্ডল
- শব্দ প্রক্ষেপণ: তথাগত দে, জয়ন্ত চক্রবর্তী
- অভিনয়ে: স্মিতা চক্রবর্তী, নম্রতা রায়, দীপ কায়জার বসু, জয় ভট্টাচার্য, তপন পুরকাইত, অমিত রায়, সমুদ্রনীল সরকার
- কোরাস: প্রিয়াঙ্কা রায়, শ্রেয়া দাস
- অন্তর্বর্তী গান: বিপ্রজিৎ ভট্টাচার্য
ধরুন আপনি জানেন আপনি এইমুহূর্তে মরে যাবেন। অথচ আপনি বাঁচতে চান, প্রবলভাবে বাঁচতে চাওয়ার দিকে আপনার শেষ জীবনীশক্তিটুকু দিয়ে যেতে চান কিন্তু দেখতে পাচ্ছেন চারিদিকে এক দমবন্ধ করা পরিবেশ। তারপর? আপনাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলতে চাইছে কিছু বিষাক্ত মানসিকতা আর তার ভেতর থেকে আপনি আপ্রাণ চেষ্টা করছেন একটু জল খুঁজে পেতে। পৃথিবীর আদি প্রাণশক্তি গাছের শিকড়ে পৌঁছে যাবে সেই জল আর গাছ আপনার জীবনীশক্তিকে ফিরিয়ে আনবে আবার। তারপর হঠাৎই সেই দুঃস্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠলে বুঝবেন আদতে আপনি একা, ভীষণ একা। গল্পটা খুব চেনা মনে হতে পারে কারণ এ গল্প আমার, আপনার যে কারও গল্প। এ গল্প বহমান সময়ের। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আবর্তিত হতে থাকা এক মানুষের গল্প, বহু মানুষের গল্প। বিশ্বসাহিত্যে এমন এক কাহিনি লিখেছিলেন আন্তন চেকভ, ‘আঙ্কল ভানিয়া’ এবং তার বাংলা রূপান্তর ‘বিদায়বরণ’; সাঙ্গীকরণ ও নির্দেশনায় সমুদ্রনীল সরকার, প্রযোজনায় করুনাময়ী সপ্তর্ষি।
ডাক্তার অরণ্য বসু এমন এক মানুষ যিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেন গাছকে বাঁচিয়ে রাখতে। এক একটি সবুজ প্রাণ যেন সমস্ত বিষবাষ্পকে শুষে নিতে পারে, সব প্রাণহীনতার বিরুদ্ধে নতুন প্রাণের সঞ্চার দেখতে পান ডাক্তার গাছের মধ্যে দিয়ে। হঠাৎ স্বপ্নে তাঁর শ্বাসরোধ হয়ে আসার মুহূর্তে সেইসব গাছ হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার অবলম্বন কিন্তু কার জন্য বাঁচবেন ডাক্তার অরণ্য? যে বাড়িতে তিনি এসে উপস্থিত হয়েছেন প্রফেসরের শারীরিক পরিস্থিতিকে নিরীক্ষণ করতে, সেই বাড়ির সকলে যে ভীষণ একা! ডাক্তার অরণ্য বসুর মতোই সম্পূর্ণ একা। হ্যামিলটনগঞ্জের মতন এক অখ্যাত জায়গায় বিদেশে জীবন কাটানো, শহুরে মানসিকতার অধিকারী প্রফেসর সমর্পণ চ্যাটার্জির কেনই বা ভালো লাগবে? কেনই বা তাঁর আধুনিক দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী জাগরী সেই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতন জীবনে সুখী হয়ে উঠবেন? এই কেনগুলোর কোনো উত্তর জানা নেই অরণ্যের। উত্তর জানা আছে যার, সে ভাস্কর। একসময়ে নিজেকে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার যে অদম্য ইচ্ছায় ভাস্কর নিজেকে লালন করেছিল, ক্রমশ বিশাল বাড়ির একাকী ছায়ায় সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। দিদি এবং অধ্যাপক সমর্পণের প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একমাত্র ভাগ্নী সুরভীকে মানুষ করতে করতে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছে ভাস্কর! পরিবারের শেষ অবলম্বন সেই বিশাল বাড়ির ভিতর একা গুমরে মরা ভাস্করের কোনো সৃষ্টিশীল সত্তা আর জীবিত নেই। অরণ্য তার বাল্যবন্ধু, আর সবাই সেই বিরাট একাকী দুনিয়ার অংশীদার, হয়তো বা ভাস্করের প্রতিদ্বন্দ্বী কিংবা বিরাট এক সম্পর্কের রাজনীতির এক একটা বোড়ে!
কোন প্রবল জৈবিক তাড়নায় ডাক্তার অরণ্য বসু প্রফেসরের স্ত্রীকে পেতে চায়? কেনই বা ভাস্করের ভিতর জাগরীর প্রতি এক শারীরিক চাহিদা উপস্থিত হয়? কেনই বা জাগরী বারবার তার সৎ মেয়ে সুরভীকে অরণ্যের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার কথা বলে? এই সবের ভিতর কি বহুদিনের এক প্রাচীন আদিম মানুষী সংস্কারের বাস, নাকি সবের ভিতর কেবল ঘুরে মরে এক বিশাল ছেড়ে যাওয়া ইমারতের প্রেতাত্মা? ‘বিদায়বরণ’ আসলে কার? একটি প্রাচীন বাড়ির ভিতরে থাকা কতগুলি মানুষের অস্তিত্বের, নাকি সেই বাড়ি বিক্রি করে চলে যাওয়ার আধুনিকতায়? সম্পর্ক বা ওই একা বেঁচে থাকা এক একটি মানুষ কি তবে নিজেদেরকেই ছেড়ে যেতে চায়? এমন বহু প্রশ্নের সামনে দর্শককে দাঁড় করায় এই নাটকের প্রতিটি অধ্যায়, চরিত্র, সংলাপ।
ঘাত-প্রতিঘাত এবং অন্তর্দ্বন্দ্বের এক অদ্ভুত সমাপতন ঘটেছে ‘বিদায়বরণ’ নাটকে। নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করা সহজ নয়, এই নাটক কার্যত সেই আয়নার মতন মনের ভিতরের সবরকম অবস্থানকে খুঁজে নিতে চেয়েছে। এমন নাটক তৈরি ও নির্দেশনার জন্য অবশ্যই বিশেষ কৃতিত্ব দিতে হয় সমুদ্রনীল সরকারকে। চেকভ তাঁর সাহিত্যিক পরিবেশ ও সামাজিক অবস্থান থেকে যেভাবে মূল রচনাটি সৃষ্টি করেছিলেন তাকে প্রায় হুবহু বাংলার প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা সহজ ছিল না। এর পাশাপাশি অবশ্যই আসতে হয় অভিনয় প্রসঙ্গে। নাটকটিতে যে দুটি চরিত্র বারবার নজর কেড়েছে, ডাক্তার অরণ্য বসু এবং ভাস্কর। দুজনের পারস্পরিক উত্তর-প্রত্যুত্তর থেকে অভিব্যক্তি, চোখে পড়ার মতন। অরণ্যের ভূমিকায় দীপ কায়জার বসু একেবারে যথাযথ। উচ্চারণ থেকে প্রতিটি মানসিক অবস্থান এবং শারীরিক অবয়বকে অনবদ্য ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলেছেন দীপ। তাঁর সঙ্গে একেবারে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন সমুদ্রনীল সরকার। তাঁর অভিনয় এটি প্রমাণ করেছে, তিনি কেবল দক্ষ নির্দেশক বা চিত্রনাট্যকারই নন, অত্যন্ত বলিষ্ঠ অভিনেতাও। অন্যান্য চরিত্রে সুরভীরূপী নম্রতা রায় কিংবা জাগরীর ভূমিকায় থাকা স্মিতা চক্রবর্তীর অভিনয় প্রশংসাযোগ্য। কোথাও অভিনয়ের মধ্যে বিশেষ কৃত্রিমতা নজরে পড়েনি। প্রফেসরের ভূমিকায় অমিত রায়, মেসোমশায়ের ভূমিকায় তপন পুরকাইত এবং মানসের ভূমিকায় জয় ভট্টাচার্য মানানসই। কেবল প্রফেসর তাঁর আবেগ বা অনুভূতি প্রকাশে কোথাও কোথাও একটু বেশি উচ্চকিত বলে মনে হয়েছে। বাড়ি বিক্রির প্রস্তাবে তাঁর নাটকীয় ভঙ্গি কিছুটা অতিনাটকীয় মনে হতে পারে। তেমনই মেসোমশাই চরিত্রটির পরিসর একদম স্বল্প। এই চরিত্রটিকে যদি আরেকটু বেশি পাওয়া যেত ভালো লাগত। অভিনয়ের ভিতরেও যেন কোথাও একটু জড়তা কাজ করেছে। তবে মানস অর্থাৎ জয় ভট্টাচার্য বাড়ির চাকর হিসেবে যে অভিনয়টি করেছেন তা অনবদ্য। যখনই মঞ্চে এসেছেন নিজের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেছেন অসাধারণ মুন্সিয়ানায়।
করুনাময়ী সপ্তর্ষি প্রযোজিত ‘বিদায়বরণ’ অভিনীত হতে চলেছে আগামী ২৬ জুলাই তপন থিয়েটারে। এটি তাঁদের চতুর্থ প্রযোজনা হতে চলেছে। একটি বিরতিসহ দু-ঘণ্টা সময়ের এই নাটকটি আপনাদের নিয়ে যেতে পারে এমন অনেক অমীমাংসিত সমীকরণে, যার ভিতরে রয়েছে সম্পর্কের রাজনীতি অথবা আপনি বলতে পারেন রয়েছেন আপনি নিজেই! নিজেকে, নিজেদের একটু অন্যভাবে খুঁজে পেতে, খুঁজে নিতে এই নাটকের পরবর্তী অভিনয়ে দর্শক হয়ে উঠতে পারলে মন্দ লাগবে না। আর মঞ্চের ভিতর আলো, আবহ, শব্দ প্রক্ষেপণ, রূপসজ্জা এবং কোরাস বারবার আপনাকে ভাবাবে; ভাবতে বাধ্য হবেন আপনি, সম্পর্কের রাজনীতি নাকি রাজনীতির সম্পর্কে বাঁধা পড়ে আছি আমরা? কারা আসলে একা, ভীষণ একা?
