৫৭-তম-ই-সংস্করণ।। ৬৯ তম সংখ্যা।। জুন, ২০২৬

magazine poster
পার্থ হালদার photo

পার্থ হালদার

সম্পাদনা সহযোগী

পল্লব মিশ্র photo

পল্লব মিশ্র

প্রচ্ছদ অলংকরণ

সুচরিতা রায় photo

সুচরিতা রায়

অন্যান্য কাজে

পূর্ণতা নন্দী photo

পূর্ণতা নন্দী

অন্যান্য কাজে

মৌলিকা সাজোয়াল photo

মৌলিকা সাজোয়াল

অন্যান্য কাজে

অয়ন্তিকা নাথ photo

অয়ন্তিকা নাথ

অন্যান্য কাজে

কর্তৃক

৮৬, সুবোধ গার্ডেন, বাঁশদ্রোণী, কলকাতা: ৭০০০৭০ থেকে প্রকাশিত।

  • যোগাযোগ :  ৯৬৪৭৪৭৯২৫৬

 ৮৩৩৫০৩১৯৩৪ (কথা /হোয়াটসঅ্যাপ)

৮৭৭৭৪২৪৯২৮ (কথা)

  • Email : bhaan.kolkata@gmail.com 
Reg. No: S/2L/28241 548

সম্পাদকের কথা

‘এমন যদি হতো আমি পাখির মতো উড়ে উড়ে বেড়াই সারাক্ষণ’

তাহলে কেমন হতো? পাখির কথা ভাবতে গিয়ে পাখি-মন কে  ছুঁলে স্বাধীন-মনের ‘রূপক’ হয় পাখি। অনুভব মানে আপনাতে মত্ত হওয়া নয়, আপন হতে বাহির হয়ে দাঁড়ানোর ঋদ্ধতা। যখন আমি চেষ্টা করেও তা পারিনা, তখন যন্ত্রণাবিদ্ধ কবি লেখেন–

“যদি জানতেম আমার কিসের ব্যথা/ তোমায় জানাতাম”

জানা হল না বলেই জানানো হল না। জানার ইচ্ছেটা এখনও যদিওবা জীবন্ত।

“আমি যদি হতাম বনহংস/ বনহংসী হতে যদি তুমি”

– তবে,  ছিপছিপে শরের ভিতর কেমন একটা নিরালা জীবন ঘটতে পারে, কবি কল্পনায় পৌঁছে কাব্যের অক্ষরে তারই আল্পনা আঁকতে পেরেছিলেন।

“আবার আমি যদি বাবা হতুম, বাবা হত খোকা/ না হলে তার নামতা/ মারতাম মাথায় টোকা”

ছোটো খোকা, বড়ো মানুষ বাবাকে কল্পনায় পেয়ে  চরিত্ররূপের বদল ঘটিয়েছে। ঘটাতে গিয়ে বাবাকে কল্পনায় পেতে হয়েছে তাকে। আবার এ যেমন অদূর ভবিষ্যতের কল্পনা, তেমনি সুদূর অতীতে কল্পনার পক্ষিরাজে চেপে পৌঁছেও গেছেন কবি।

“আমি যদি জন্ম নিতেম/ কালিদাসের কালে/ দৈবে হতাম দশম রত্ন/ নব রত্নের মালে”

তখন শুধু কালিদাস বনলে চলে না, কালিদাসের কালকেও অনুভবে আনতে হয়। মোটকথা কল্পনার শক্তি ছাড়া ‘অন্য’ হওয়া যায় না। আমির বদ্ধকূপে পচে মরতে হয়। তুমি ছাড়া আমি অচল। তোমার খোঁজে ‘অন্য’ হতে পারলেই অন্যের হৃদয় চেনা যায়। সে হৃদয়ের শোক,আনন্দ, আশা, নিরাশা, যন্ত্রণাকে আপন করে অনুভব করা যায়। যদি যায়, তবে এই মন্ত্রে অপর ‘আপন’ হয়ে ওঠে। ‘আমি’, ‘তুমি’ এবং ‘তুমি, ‘আমি’ হয়ে যায়। নিজেকে দেখলে তাকে দেখা যায়, তাকে দেখলে নিজের ছবি স্পষ্ট হয়। এমন মন্ত্রে মানুষ ‘মানুষ’ হয়ে ওঠে। একজীবনে লক্ষ জীবন জুড়ে যায়। প্রাণীজগৎ- জড়জগৎ, অতীত- বর্তমান- ভবিষ্যৎ – সব জুড়ে গিয়ে ঝলমল করে চিত্ত। মানুষ বড়ো হয়ে ওঠে। বড়ো মানে সত্য। সত্য মানে সুন্দর। সুন্দর মানে অনুপম।

এ জগতে যেকোনো শুভকর্মে, কল্যাণকর্মে প্রেম-প্রীতিতে এই ‘কল্পনা’র বিরাট ভূমিকা। আমরা ভিখারি দেখি, কিন্তু ভিখারি চিনি না। যদিওবা চিনি, মোটেও জানি না। আমি আমাকে দিয়ে ভিখারি কে চিনি, ভিখারি হয়ে ভিখারি কে জানিনা। ভিখারি কে জানতে চাই কল্পনা। আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি। মহৎ প্রেমের কাছে নিজেকে তুচ্ছ করার সাধনা। নইলে আমার ‘আমি’ অন্ধকূপে হেদিয়ে মরে। সহানুভূতির বদলে, সহমর্মিতার বদলে উল্লাসী জল্লাদ হয়ে মারি ও মরি, কিন্তু জীবন মেলে না।

গরিবের দুঃখ বুঝতে লেখাপড়া জানা অসংখ্য মানুষের আজ বড়োই নিস্পৃহতা। এখানে কল্পনার দীনতা আছেই‌। কিন্তু কল্পনা যে ধরা দিচ্ছে না তার কারণ কেবল ব্যক্তির স্বভাবে নেই। আছে পুঁজি-পূজক মধ্যবিত্তের চেনা কমপ্লেক্স। সে নিজের দুর্দশার জন্য সফ্ট টার্গেট খোঁজে। নিজের ক্ষোভ, বিরক্তি, জ্বালা-যন্ত্রণা তার ঘাড়েই চাপাতে চায়,- যেখানে থেকে প্রত্যাঘাতের আশু সম্ভাবনা নেই। ধনীকে সে আঘাত করতে ভয় পায়। ধনী কে সে শুধু পছন্দ করে না। মধ্যবিত্তের একটা বড়ো অংশ গোপনে ধনী হতে চায়। যে অনৈতিকতার পথ মাড়িয়ে তা চটজলদি হওয়া সম্ভব তাঁর সবটুকু ঝুঁকি সে নিতে পারেনা। আবার নিজে খেয়ে পরে গান গেয়ে বাঁচার সহজ আনন্দের সন্ধানও তার অধরা থাকে। সেখানেও কল্পনা- শক্তির অপ্রতুলতা। সহজ কে দেখতে না পাবার অভিশাপ। সহজ বাঁচার আনন্দও কল্পনার হাত ধরে আসে। না মিললেই হতাশা। যে হতাশার শুরু এবং শেষ নিজের প্রতি অসম্মানে। এরাই অন্যকে অসম্মান করে প্রতিশোধ নেবার ব্যর্থ চেষ্টা করে। এ-ই তাদের বুলডোজারের পক্ষে নিয়ে যায়। গুঁড়িয়ে দেয়া গরিবের ঝুপড়ির পক্ষে নয়। গুঁড়িয়ে দেবার উল্লাস তার হতশ্বাস মনে আহ্লাদ আনে। তবে তা বড়ো সাময়িক। শক্তির আস্ফালন ক্ষমতার দম্ভের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন তাকে সুস্থ থাকতে দেয় না। অস্থির করে তোলে মুহুর্মুহু। এই যে কাঁচা যুক্তি, মানবতার থেকে যোজন দূরের কড়াপাকের একটেরে আইনের হয়ে সওয়াল, সজ্ঞানে এসব করলে অবসাদ আসবে বৈকি! ক্ষমতার পক্ষে থেকে, আপাত সুখে থেকে, ঝুঁকিহীন থেকেও তার ভেতরে ভেতরে ক্লান্তির ঘুন পাকে। ক্ষমতার কাছে বারবার মার খাওয়া, তৎসত্ত্বেও স্বাধীনতার দাবিতে যারা মৃত্যুর মুখেও অনড়;– তাদের প্রতি লোভ হয় এদের, এই  নিজের কাছে হেরে যাওয়া মিডলক্লাস দের। লোভী চোখে ফ্যালফ্যালিয়ে সাধারণ অথচ ঋজু  মানুষ গুলোকে দেখতে গিয়ে ক্ষমতার তাবেদারীতে মেলা মুকুট খসে পড়ে ওদের। তবে এসবের মধ্যেও কল্পনার একটা ভূমিকা আছে বৈকি! সেটুকুও যাদের নেই, তাদের নিয়ে পরে কখনো লেখা যাবে ক্ষণ!

পানু পাল : জনজাগরণের নৃত্য ও নাট্য - মধুমিতা পাল পর্ব ৭

মধুমিতা পাল image

পানু পাল: জনজাগরণের নৃত্য ও নাট্য

মধুমিতা পাল

(আগের পর্বের পর)

এবার আমি আসি ওঁর সিনেমার জগতে।

একদিন হঠাৎ শোভা সেন-এর মাধ্যমে খবর পেলাম, নিমাই ঘোষ খুঁজছেন আমাকে। কেন? ‘ছিন্নমূল’ সিনেমার জন্য। দ্রুত ঘটে যাচ্ছে ঘটনাগুলো। অভিনয় করলাম ‘ছিন্নমূল’ সিনেমাতে।

এরপর আমার ডাক পড়েছিল টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে। রাজেন তরফদার ডেকে পাঠালেন সিনেমার জন্য, সিনেমার নাম ‘নাগপাশ’।

টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে এসে দেখা গেল পরিচালক আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ‘নাগপাশ’ ছবিতে একটি চাষির ভূমিকায় অভিনয় করতে হবে। রাজেনবাবুর সঙ্গে কথা হয়েছিল অক্টোবর মাসের গোড়ার দিকে। নভেম্বর থেকেই কাজ শুরু হবে। অনেকদিন বাদে – আশা তো ছেড়েই দিয়েছিলাম যে জানুয়ারি মাস চলে এসেছে ছবিটা বোধহয় আর হবেনা। হঠাৎ করে আরেকদিন ডেকে পাঠালেন বেলা পাঁচটায়। স্টুডিওতে পৌঁছ‌লাম হাতে আহ্বানপত্র ধরিয়ে দিলেন কর্মাধ্যক্ষ। কারণ রাজেনবাবু তখনও আসেননি। ফার্স্ট ফেব্রুয়ারিতে গোসাবায় হাজিরা দিতে হবে শুটিংয়ের জন্য। বাংলা এবং বেশ কিছু ভুল ইংরেজিতে ওই কয়েকটি নির্দেশ দেওয়া তবু ইংরেজিতে লেখা চাই। মনে মনে হাসলাম এবং কলম বের করে ভুল শব্দগুলো নিজেই ঠিক করে নিলাম। প্রায় ছয়টার পর রাজেনবাবু এলেন, আমাকে দেখে মৃদু হেসে বললেন, এসে গেছেন। পরে মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে জানালেন আর কিন্তু দাড়ি কাটতে পারবেন না। কিছু টুকটাক জিনিস বললেন। এই ছবিতে আমার সহধর্মিণীর চরিত্রে ছিলেন শ্রীমতী গীতা সেন, মৃণাল সেনের স্ত্রী।

আরেকটি ছবিতে কাজ করেছিলাম ‘নাগরিক ফটো কেক’।

পানু পাল লিখছেন শহরতলির কথা। বেলঘড়িয়াতে যখন তিনি চলে আসেন ৫৩ সালে, তিনি স্থানীয় উৎসাহী ছেলেমেয়েদের নিয়ে তৈরি করলেন আইপিটিএ শাখা। মঞ্চস্থ হল ‘বিসর্জন’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। পদ্মা নদীর মাঝি তিনি নিজে নাট্যরূপ দিলেন। এর প্রথম অভিনয় হয়েছিল মিনার্ভা থিয়েটারে যার লাইট করেছিলেন বিখ্যাত তাপস সেন। পরবর্তীকালে ওই নাটক বেলঘড়িয়াতেও মঞ্চস্থ হয়েছিল। মিনার্ভাতে নাটক দেখে উৎপল দত্ত বলেছিলেন, মঞ্চের মধ্যে এই রকম নদী কীভাবে তৈরি করলেন?

স্বামীহত্যার প্রতিশোধ নেবে এই চার ‘কুইন’ - অজন্তা সিনহা

অজন্তা সিনহা image

স্বামীহত্যার প্রতিশোধ নেবে এই চার ‘কুইন’

অজন্তা সিনহা

ওটিটি হলো আজকের অতি জনপ্রিয় বিনোদন প্ল্যাটফর্ম। সবার হাতেই মুঠোফোন। আর স্পর্শ করলেই ওয়েব দুনিয়ার রামধনু রঙ চোখের সামনে। ওয়েব সিরিজ, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি, তথ্যচিত্র–আয়োজনের শেষ নেই। এই বিভাগে তারই তত্ত্বতালাশ প্রতি মাসে একবার। লিখছেন অজন্তা সিনহা

স্বামীহত্যার প্রতিশোধ নেবে এই চার ‘কুইন’

magazine 69 th photos
ছোট পর্দা, বড় পর্দা, ওয়েব সিরিজ, রাজনীতির ময়দান ইত্যাদি নানা ক্ষেত্র প্রদক্ষিণ করে আরও একবার ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ফিরলেন মিমি চক্রবর্তী। আর ফিরলেন বেশ রাজকীয়ভাবেই। নাহ, সিরিজের নাম ‘কুইন‘ বলে এমনটা বলছি, এটা ভাববেন না। আদতে এক জবরদস্ত কাহিনির হাত ধরে ওয়েবপর্দায় প্রত্যাবর্তন ঘটেছে মিমির, সেটাই আসল কথা। আর তাঁর মতো শক্তিশালী অভিনেত্রী যে এর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করবেন, সেকথাও জোর দিয়েই বলা যায়। গত ১২ জুন থেকে হইচই ওটিটিতে শুরু হয়েছে নির্ঝর মিত্র পরিচালিত ‘কুইন‘। বলতে দ্বিধা নেই, এই বাংলা থ্রিলারের গল্প পল্লবিত আক্ষরিক অর্থেই এক ব্যতিক্রমী ভাবনার মোড়কে। সবার আগে তাই গল্পটাই বলা যাক।

গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে চারজন বিধবা নারী–মীরা (মিমি), সাবিত্রী, ঝুমা ও পলি। নিজেদের স্বামীদের নির্মম হত্যার পেছনের সত্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে তারা দারুণ এক ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়। আর এই ষড়যন্ত্র শুধুমাত্র তাদের ব্যক্তিগত প্রতিশোধের গল্প হয়ে থাকে না–ক্ষমতা, দুর্নীতি, মানবপাচার ও রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত এক গভীর অন্ধকারকে সামনে নিয়ে আসে। ঘটনার সূত্রপাত উত্তরবঙ্গের ধনী ও সমৃদ্ধ সরকার পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠানে। আনন্দ, আড়ম্বর আর উৎসবের আবহে হঠাৎ করেই নেমে আসে মৃত্যুর ছায়া। সশস্ত্র আততায়ীরা আচমকা ঝড়ের গতিতে অনুষ্ঠানে হামলা চালায়। মুহূর্তের মধ্যেই রক্তে ভেসে যায় আসর। সরকার পরিবারের প্রধান এবং তার তিন ছেলে–পরিবারের সমস্ত পুরুষ সদস্যকে পরিকল্পিতভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়।

বলা বাহুল্য, এটি কোনো সাধারণ হামলা ছিল না–এটা ছিল অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় সাজানো এক নিখুঁত হত্যাযজ্ঞ। পরিবারের পুরুষদের মৃত্যুর পর পেছনে থেকে যায় চারজন নারী–মীরা, সাবিত্রী, ঝুমা এবং পলি। মুহূর্তের মধ্যে তারা হারায় স্বামী, পরিবার, নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক জীবন। শোক, আতঙ্ক ও অসহায়তার মধ্যেই তারা ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে বহুদিনের এক ভয়ংকর গোপন সত্য। সেই সত্যের কেন্দ্রে রয়েছে নীলমণি মিশ্র–উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী, প্রভাবশালী এবং ভীতিকর এক ব্যক্তিত্ব। বাইরে থেকে লোকটি সমাজসেবী ও রাজনৈতিকভাবে সম্মানিত হলেও, মুখোশের আড়ালে সে গড়ে তুলেছে এক বিশাল মানবপাচার সাম্রাজ্য। নীলমণির ক্ষমতা, অর্থ, রাজনীতি ও অপরাধের জাল এতটাই শক্তিশালী যে তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারও নেই।

সরকার পরিবারের পুরুষেরা গোপনে তাঁর সাম্রাজ্য ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। ধীরে ধীরে তারা নীলমণির অপরাধচক্রের ভিতর থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করছিল এবং তার সাম্রাজ্যের ভিত নড়িয়ে দিচ্ছিল। আর সেই কারণেই তাদের খুন করা হল! তবে, হত্যাকারীরা এটা ভুলে গিয়েছিল–তারা শুধু চারজন বিধবাকে রেখে যায়নি, রেখে গিয়েছিল চারটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। প্রথমদিকে শোকই ছিল তাদের একমাত্র সঙ্গী। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শোক রূপ নিতে শুরু করে প্রতিশোধে। তারা বুঝতে পারে, নীরবে কাঁদলে কেউ ন্যায় বিচার দেবে না। তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয়, আর কান্না নয়–এবার হিসাব মেটানোর পালা।

magazine 69 th photos
চার নারী একত্রিত হয়ে শুরু করে প্রতিশোধের খেলা। যারা ট্রিগার টেনেছিল, যারা টাকা নিয়েছিল, যারা আদেশ দিয়েছিল–প্রত্যেককে খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়ার শপথ নেয় তারা। ধীরে ধীরে তারা শুধু প্রতিশোধপরায়ণ নারী নয়, বরং হয়ে ওঠে কৌশলী যোদ্ধা। এই লড়াইয়ের কেন্দ্রে উঠে আসে মীরা। গর্ভবতী হওয়া সত্ত্বেও তার মনোবল এক মুহূর্তের জন্যও দুর্বল হয় না। বরং সন্তানকে পৃথিবীতে আনার আগেই সে ঠিক করে, এই পৃথিবীকে রক্তপিপাসু দানবদের হাত থেকে মুক্ত করতেই হবে। মীরা হয়ে ওঠে প্রতিশোধ অভিযানের মূল পরিকল্পনাকারী। ঠান্ডা মাথায়, প্রগাঢ় বুদ্ধির সঙ্গে সে এই বিপজ্জনক খেলায় নেতৃত্ব দেয়। কিন্তু তাদের সামনে যে শত্রু, সে শুধুই একজন অপরাধী নয়–সে একটি সাম্রাজ্য। নীলমণি মিশ্রের এই সাম্রাজ্যে ফাটল ধরাতে পারবে কী এই চার ‘কুইন’–এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য দেখতেই হবে এই সিরিজ। প্রথম সিজন দেখুন ৮টি পর্বে।

মীরার চরিত্রটি অত্যন্ত আবেগঘন, জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট। শোকাহত, ভেঙে পড়া এক নারীর ভিতর থেকে কীভাবে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় অদম্য রাগ, প্রতিরোধ এবং নির্মম প্রতিশোধস্পৃহা–সেই রূপান্তরই এই চরিত্রের মূল আকর্ষণ। একদিকে মাতৃত্বের কোমলতা, অন্যদিকে প্রতিহিংসার আগুন–এই দুই বিপরীত অনুভূতির সংঘর্ষ মীরাকে করে তুলেছে অসাধারণ গভীর ও শক্তিশালী এক চরিত্র। মিমির অভিনয়ে মীরার জীবন্ত হয়ে ওঠা নিঃসন্দেহে ওয়েব দর্শকের জন্য নতুন এক অভিজ্ঞতা হতে চলেছে। সিরিজের গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন নির্ঝর মিত্র, শায়ক রায় এবং নীলাঞ্জন চক্রবর্তী। চিত্রগ্রহণ করেছেন প্রসেনজিৎ চৌধুরী। সম্পাদনার দায়িত্বে রয়েছেন শুভজিৎ সিংহ। সংগীত পরিচালনা করেছেন মৈনাক মজুমদার। মিমি ছাড়াও অভিনয় করেছেন বৈশাখী মার্জিত, পায়েল দে, দেবযানী সিংহ, দুর্বার শর্মা, জয়দীপ মুখার্জি, অর্ণ মুখোপাধ্যায়, সুব্রত সেনগুপ্ত, শায়ক রায়, কৌশিক চট্টোপাধ্যায়, দেবাঞ্জন মিত্র, যুধাজিৎ সরকার এবং রাহুল দেব বোস প্রমুখ শক্তিশালী অভিনেতা।

দারিও ফো – বিপ্লবী বিদূষক- ড. কুন্তল মুখোপাধ্যায়

কুন্তল মুখোপাধ্যায় image  

দারিও ফো – বিপ্লবী বিদূষক

ড. কুন্তল মুখোপাধ্যায়

১৯৭০ সাল, স্কুল ছেড়ে সবে কলেজে ঢুকেছি। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে বঙ্গ সাহিত্য সমিতি, আর ইংরেজি সাহিত্য সমিতি নামে দুটি সভা ছিল। আমরা বঙ্গ সাহিত্য সমিতির সদস্য, আর রুস্তম ভারুচারা ইংরেজি সাহিত্য সমিতির সদস্য। প্রত্যেক বুধবার সকাল ৮:৪৫ এ কলেজের ঘরে এই সভা বসত। আমাদের সঙ্গে থাকতেন ধীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, আর ইংরেজি সাহিত্য সমিতির সভায় থাকতেন পুরুষোত্তম লাল বা এন. বিশ্বনাথন্‌। যেদিন আমাদের সভায় অবনীন্দ্রনাথের বাগেশ্বরী শিল্পমালা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, সেদিনই নাকি ওদের সভায় দারিও লুইজি এঞ্জেলো ফো’র নাট্যধারা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সঞ্জয়দা, তন্ময়দার সূত্রে সেই প্রথম আমার দারিও ফো’র নাম শোনা। তার আগে স্কুল জীবনের শেষ দিকে অশোক মুখোপাধ্যায় – বিভাস চক্রবর্তীর সূত্রে ব্রেখট, পিরানদোল্লা, চেকভ এঁদের নাট্য ভাবনার কথা অল্প বিস্তর জেনেছি। ১৯৭০ সালে দিমিত্রি শোস্তাকোভিচ বিশ্ব নাট্য দিবসের বাণী দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “জীবনের অর্থ ও শিল্পীর লক্ষ হচ্ছে মানুষকে আনন্দ যোগানো, তার আত্মিক সমৃদ্ধি ঘটানো এবং তার ভেতরে উচ্চতর আবেগ জাগিয়ে তোলা”। সেটাও শুনেছি জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গসূত্রে। কিন্তু এই প্রথম শুনলাম দারিও ফো’র কথা – তাঁর কথায় নাট্য সংস্কৃতির মূল কাজ হলো শ্রমজীবী মানুষের রাজনৈতিক লড়াই এর হাতিয়ার হয়ে ওঠা। দারিও ফো’র নাটকের মূল ভিত্তি হলো রাজনীতি। তিনি বিশ্বাস করতেন ক্ষমতা যখন অন্যায় করে, তখন তাঁকে আক্রমণ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো হাসি। তাই নাট্যকার দারিও ফো’র মূল পরিচয় হয়ে উঠেছিল বিপ্লবী বিদূষক বা ‘REVOLUTIONARY JESTER’।

দারিও লুইজি এঞ্জেলো ফো’র জন্ম ২৪ শে মার্চ, ১৯২৬। ইতালির ছোট্ট শহর লেক মাগজোরের সান জানোতে। তাঁর বাবা (ফেলিস ফো) ছিলেন স্টেশন মাষ্টার, আর মা পিনা (রোটা ফো)। বাবার বদলির চাকরী সূত্রে দারিও ফো’কেও ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হয়েছে। ফেলিস ছিলেন সমাজতন্ত্রী এবং একজন অ্যামেচার থিয়েটার অভিনেতা। দারিও ফো’র মা ছিলেন কৃষক পরিবারের মেয়ে (১৯৭৮ সালে ল্যান্ড অফ ফ্রগস্ এর লেখিকা); দারিও তাঁর দাদামশাই (মা’র বাবা) এর কাছ থেকে গল্প বলা শিখেছিলেন। পারিবারিক সূত্রেই দারিও ফো হয়ে উঠেছিলেন বস্তুবাদে বিশ্বাসী।

১৯৪২ সালে তিনি মিলানে ব্রেরা একাডেমীতে পড়াশোনার জন্য যুক্ত হন এবং ঐ সময়ই ১৬ বছরে বয়সে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে মুসোলিনীর ইতালির পক্ষে বাধ্যতামূলকভাবে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তাঁর উপর চাপ আসে। এই সময়ই তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে লোকজনের মনোযোগ আকর্ষণের বাইরে থাকতে চাইতেন। কারণ তিনি ও তাঁর পরিবার ফ্যাসি বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। দারিও ফো ও তাঁর বাবা সেই সময়ের উদ্বাস্তু ও মিত্র শক্তির সেনাদের গোপনে, লোম্বার্ড কৃষকের ছদ্মবেশে সুইৎজারল্যান্ডে আশ্রয় নিতে সাহায্য করতেন। এমনকি ইহুদি বিজ্ঞানীদের ও তাঁরা সুইৎজারল্যান্ডে আশ্রয় নিতে সহায়তা করেছেন। যুদ্ধ যখন প্রায় শেষের দিকে তখন দারিও ফো একাধিক্রমে নৌ সেনার অ্যান্টি এয়ারক্রাফট্‌ ডিভিশন, প্যারাশ্যুট ডিভিশনে যোগ দেন এবং মোনজা ক্যাম্পে মুসোলিনীর মুখোমুখি হন। শেষ অবধি মিথ্যা নথির সাহায্যে সামরিক ক্যাম্প থেকে পলায়ন করেন। এই সময়ই রেজিস্ট্যান্ট মুভমেন্টের কাজে তিনি প্রভুত গ্রামাঞ্চলে ঘোরেন। তবে তাঁর প্রদত্ত নথি ফ্যাসিস্ট ও কম্যুনিস্ট – উভয় বাহিনীর কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। যাইহোক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে তিনি আবার ব্রেরা অ্যাকাডেমিতে ফিরে আসেন এবং মিলানের পলিটেকনিক কলেজ থেকে আর্কিটেক্‌চারিয়াল পড়াশোনা শুরু করেন। তিনি রোমান আর্কিটেক্‌চারের বিষয়ে গবেষণায় লিপ্ত হন। কিন্তু মূল পরিক্ষার আগেই পড়াশোনা ত্যাগ করেন। তাঁর নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়। ডাক্তার তাঁকে পরামর্শ দেন সেই বিষয়ে লিপ্ত হতে যাতে তিনি আনন্দ পান। তিনি ছবি আঁকতে শুরু করেন এবং “পিক্কোলি টেআর্টি” বা ছোট থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। যেখানে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বানানো এক ব্যক্তির দীর্ঘ একক বক্তব্য বলতে শুরু করেন। দারিও নিম্ন শ্রেণির বিরুদ্ধে শোষণ ও অত্যাচারের প্রতিক্রিয়ায় তিনি নিম্নশ্রেণির কথ্য ভাষাকে তাঁর নাটকে জায়গা দিলেন। থিয়েটারকে তিনি পিছিয়ে পরা মানুষের রাজনৈতিক হাতিয়ার করে গড়ে তুলতে চাইলেন। তাঁর মতে শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থে জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও থিয়েটারকে হয়ে উঠতে হবে রাজনৈতিক লড়াই এর হাতিয়ার।

১৯৫০ সালে দারিও ফো ফ্রাঙ্কো প্যারেন্টি-র সঙ্গে ভ্যারাইটি শো’য়ে অংশগ্রহণ করেন, বেতার শিল্পীদের সঙ্গে নিয়ে এই কাজে ১৯৫৪ সাল অবধি চলেছে এর মধ্যেই ১৯৫১ সালে ইতালির জাতীয় বেতার সংস্থায় দারিও ফো কে আমন্ত্রণ জানানো হয় তাঁর একক অভিনয়ের জন্য, যেখানে তিনি পুত্তর থিং এই শিরোনামে ১৮ টি মনোলগ্ অভিনয় করেন। শেক্সপিয়ারের নাটক হ্যামলেট, রোমিও জুলিয়েট, ওথেলো তিনি একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপিত করেন। হ্যামলেটে নাম সর্বস্ব রাজাকে হত্যা করা হয় যাতে হ্যামলেট তাঁর মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারে। ওফেলিয়া হ্যামলেটের কাকার ট্রান্সমিস্ট্রেস, হোরাসিও হ্যামলেট এর বাবা সেজে আসে যখন হ্যামলেট মদের নেশায় থাকে। ওথেলার অ্যালবিনো, স্যাডেস্টিক জুলিয়েট রোমিও কে নিজের বাগানে বন্দী করে রাখে। এই ধরনের ছোট ছোট নাট্যাংশ প্রদর্শনের পর ১৯৫২ সালে আমেরিকার কালো মানুষদের ওপরে একটি ছোট নাটিকা উপস্থাপিত করেন। এই পর্বে ক্রমে ক্রমে ইতালিয়ান কম্যুনিস্ট পার্টির পরিচালিত পত্রিকা সাময়িকির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্টতা বাড়ে। মিলানের পিকাসো থিয়েটারেও তিনি জড়িয়ে পড়েন। “দি মুন ইজ অ্যা লাইট বাল্ব” এই সময়ের বিখ্যাত নাট্য সংগীত, যা ফো-এর লাইফটাইম ফেভারিট ছিল।

এই সময়েই দারিও ফো অভিনয় সূত্রে ফ্রাঙ্কা রামার সঙ্গে পরিচিত হন। এবং ১৯৫৪ সালের ২৪ জুন তাঁর ও ফ্রাঙ্কা রামার বিবাহ হয়। ১৯৫৫ সালে দারিও ফো ও ফ্রাঙ্কা রামার পুত্র সন্তান জ্যাকোপো জন্ম গ্রহণ করেন (৩১/০৩/১৯৫৫)। আর্থিক কারণে ড্রিটি ১ (স্ট্যান্ডআপ) নাট্য দলটি ভেঙ্গে গেলে দারিও ফো পরিবার নিয়ে রোমে আসেন এবং চলচ্চিত্রে চিত্রনাট্য লেখার কাজ শুরু করেন। রোমে এসে দারিও ফো রবার্টো রোজেল্লিনি, ইনগ্রিড বার্গম্যানদের সঙ্গে পরিচিত হন। চলচ্চিত্রে চিত্রনাট্য লেখার কাজটির সঙ্গে সঙ্গে তিনি আরলেচিনা থিয়েটারে ছোট ছোট ব্যঙ্গ/কৌতুক নাটিকায়ও অভিনয় শুরু করেন। চলচ্চিত্র চিত্রনাট্য লেখা তাঁর খুব পছন্দের ছিল, পরবর্তীকালে তিনি বলেছিলেন,

“Working on screenplays gave me on apprenticeship as a playwright and I was able to transfer the lessons of the new technical means to theatre.”

এই সময়েই ফো এবং রামা যৌথভাবে একটি থিয়েটার কোম্পানি খুললেন। ফো নাটক রচনা পরিচালনা মঞ্চ ও পোষাক পরিকল্পনা এবং অভিনয় এর দিকটি দেখতেন আর রামা পুরো থিয়েটার প্রশাসন পরিচালনা করতেন। ১৯৫৯ সালে তাঁরা ৩টি পূর্ণাঙ্গ নাটক প্রযোজনা করেন অডিওন থিয়েটারে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলে। ইতালির বাইরে যুগোস্লাভিয়া, পোল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, সুইডেন এবং স্পেনেও দারিও ফো’র নাটক ছড়িয়ে পড়ল।

১৯৬২ সালে ফো “ক্যানজোনিসিমা” নামে রেডিওতে একধরনের ভ্যারাইটি শো লেখা ও পরিচালনা শুরু করলেন। সেখানে ব্যাঙ্গ কৌতুক সংগীত ও অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি শ্রমজীবী মানুষের জীবনের ছবি আঁকলেন। একটি নাটকে তিনি দেখালেন যে এক মোটা রমনী তাঁর ভাইপোর কারখানায় (ক্যানড্ মিট্‌ ফ্যাক্টরি) ভাইপোর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে একটা মেশিনের মধ্যে পরে গিয়ে নিজেই মাংসের কিমায় পরিণত হন। ভাইপো তাঁকে ক্যানে বন্দি করে বাড়িতে রেখে দেয় এবং বন্ধুদের দেখায়। ফো’র এই ধরনের নাট্যকর্মগুলি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে ফাঙ্কা রাম লক্ষ্য করেছেন এগুলির সম্প্রচারের সময় শহরের রাস্তা ফাঁকা হয়ে যেত। কোনো ট্যাক্সি পাওয়া যেত না। এই শো-এর অষ্টম এপিসোডে শ্রমিকদের ভয়াবহ দুর্দশা চিত্রিত করার কারণে দারিও ফো ও ফাঙ্কা রামার ওপর রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা নেমে আসে। এরপরে ফো এবং রামা মিলানের অডিওন থিয়েটারে ফিরে আসেন। সেখানে কলম্বাসের ইমেজে তৈরী করেন, ইসাবেলা, থ্রি সেলিং শিপস্‌ এন্ড এ কমন ম্যান। এই নাটকে ফো ইতালিয়ান বুদ্ধিজীবী যারা মধ্য বামপন্থী এবং সমাজ তান্ত্রিক সেই সরকারকে আক্রমণ করেন। রোমে যেভাবে ফো এবং রামা আক্রান্ত হয়েছিল, তাদের গায়ে কাদা ছোঁড়া হয়েছিল, ঠিক তেমনটিই এখানে শুরু হলো; ফো নাটকের একটি প্রস্তাবনা সংযোযন করলেন। “যোহান পাদান এবং আমেরিকা আবিষ্কার” এরপর ১৯৬৭ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, লী হার্ভে ওসওয়াল্ড এবং কেনেডির হত্যাকাণ্ড এর প্রসঙ্গে ফো ইতালির মেইন স্ট্রিম থিয়েটারে আলোড়ন তুললেন তাঁর “থ্রো দি লেডি আউট” নাটকে। অ্যামেরিকান সমালোচক রিচার্ড সগলিউক্তো এই নাটকটিকে মার্কিন পুঁজিবাদের বিপক্ষে বলে আখ্যা দেন, মার্কিন সরকার দারিও ফো’র আমেরিকায় প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলো। ১৯৬৮ সালে ফো এবং রামা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে “ন্যওভা সিনা অ্যাসোসিয়েশান” নামে যৌথ পরিচালনা ভিত্তিক একটি নাট্য সংগঠন তৈরী করেন। সেখানে “গ্রান্ড প্যান্টোমাইমউইথ ফ্ল্যাগস্‌ এন্ড স্মল এন্ড মিড্‌ল সাইজ পাপেটস্‌” নিয়ে প্যান্টোমাইম সহযোগে নাটক নির্মান করেন। সেখানে দেখানো হয় শ্রমিকেরা জানে ৩০০ শব্দ, আর মালিকেরা জানে ১০০০ শব্দ তাই তাঁরা বস্‌। “মিস্ত্রি বুফো” এই সময়ই তৈরী। ১৯৭০ সালে দারিও ফো এবং ফ্রাঙ্কা রামা তাদের নতুন (তৃতীয়) থিয়েটারের দল তৈরী করেন। “ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর” ১৯৭০সালে জর্ডানের রাজা হুসেন বিন তালালের বাহিনী এবং ফাতাহ্ ও পপুলার ফ্রন্ট ফর দি লিবারেশন অফ প্যালেস্টাইনের মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী এক মাস সংগ্রাম চলেছিল, তাঁকে উপলক্ষ করে ফো প্রযোজনা করলেন “আই উড রাদার ডাই টুনাইট, ইফ আই হ্যাড টু থিঙ্ক ইত হ্যাড অল বিন ইনভেইন”। এবং সেই বছরই ডিসেম্বর মাসে, দারিও ফো রচনা, পরিচালনা ও অভিনয় করলেন তাঁর বহু চর্চিত নাটক “এক্সিডেন্টাল ডেথ অফ্‌ অ্যান অ্যানার্কিস্ট”, যাকে সমালোচকেরা আখ্যাত করলেন এক অদ্ভুত বিয়োগান্তক কৌতুক নাট্য রূপে। নাটকটি নিয়ে তিনি সারা ইতালি ভ্রমণ করলেন। এই পর্বেই তিনি আর একটি নাট্য প্রস্তুত করেন, “ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড। অল টুগেদার নাও, ওপ্‌স্‌ ইজনট দ্যাট দি বস?” প্যালেস্টাইনের ঘটনা নিয়ে ১৯৭২ সালে লিখলেন ফেদাইন। “ ১৯৭৩ সালে প্রযোজিত হোল “দি পিপলস্‌ ওয়ার ইন চিলি”। এই নাটকটি নিয়েও ফো গোটা ইটালি  ঘুরেছেন, দর্শকদের উৎসাহ লক্ষ করেছেন এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন। ১৯৪৮ সালে মিলানে শ্রমিক বস্তির কাছে একটি পরিত্যক্ত বাজারকে পরিষ্কার করে নিয়ে “পালজিনা লিবার্টি” নামে নাট্যক্ষেত্র প্রস্তুত করেন। সেখানে তিনি নাটক অভিনয় শুরু করেন। স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও আদালতের এই নাট্য অভিনয় প্রচেষ্টাকে বন্ধ করার অভিপ্রায় ব্যর্থ হয়, ফো মঞ্চস্থ করেন, “পোটা এন্ড বেলি – আগেইনস্ট দি অথোরিটিজ”। এর পরই মঞ্চস্থ হয় দারিও ফো’র বিখ্যাত প্রযোজনা “কান্ট পে? ও’ন্ট পে” (১৯৭৪), ১৯৭৫ সালে ফো মঞ্চস্ত করেন, ফানফানি কিডন্যাপড্‌” মনোলগ, এবং একটি “দি টেল অফ এ টাইগার” প্রযোজিত হয় ১৯৭৮ এ।

১৯৭৫ সালে নোবেল পুরুস্কারের জন্য তাঁর নাম প্রস্তাবিত হয়েছিল, ফো মন্তব্য করেছিলেন – “নোবেল বিজিনেস ইজ এ রিয়েল কমেডি”; যদিও ১৯৯৭ সালে তিনি সত্যিই নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালে তিনি লেখেন মাদারস্‌ মারিজুয়ান ইজ দি বেস্ট … ১৯৭৭ সালে ইতালির রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ফো আবার ইতালির বেতারে ডাক পান। তবে প্রথম নয়, দ্বিতীয় চ্যানেলে, যেখানে সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষতা গুরুত্ব পেত। এই বছরই টেলিভিশনের জন্য তিনি “লেটস্‌ টক অ্যাবাউট উইমেন” প্রযোজনা করেন। এছাড়াও “ফেক মাদার” এবং ইউরিপিদিস কে অবলম্বন করে “মেদেয়া” নাট্য প্রযোজনা প্রস্তুত করেন।

১৯৮০ সালে অ্যামেরিকান সরকার তাদের দেশে ইতালিয়ান থিয়েটার উৎসবে দারিও ফো এবং ফ্রাঙ্কা রামার নাটক নিষিদ্ধ করেন ও ফো আর রামার ভ্রমণও বন্ধ করেন। ঠিক এই ঘটনায় ঘটেছিল ব্রের্টল্ট ব্রেখট, চার্লি চ্যাপলিন এবং গ্রেব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কোজের সঙ্গেও, ১৯৮১ সালে ১৬ বছর বিতারিত থাকার পর অডিওন থিয়েটারে ফো এবং রামা “ট্রামপেট এন্ড রাসবেরী” নাটক মঞ্চস্থ করলেন। ১৯৮৩ সালে ফো এবং রামার আমেরিকা ভ্রমণ আবার বাতিল হয়। তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রেগান একজন অভিনেতা হয়েও এই ব্যপারে ইতিবাচক কোনো ভূমিকা দেখাননি। দারিও ফো মিলানে সাংবাদিক সম্মেলন করে বললেন, “আমি এবং আমার স্ত্রী ইতালির নাগরিক, যদি সন্ত্রাসবাদীদের সহায়তা করেও থাকি তবে ইতালির সরকার আমাদের সাজা দেবে। কিন্তু ইতালির বিচার বিভাগ আমাদের শাস্তি দেয়নি, এমনকি সন্ত্রাসবাদকে আমরা সমর্থন করেছি এমন অভিযোগও করেনি। এখন অ্যামেরিকান প্রশাসন আমাদের সন্ত্রাসবাদীদের সহায়তা করি; এর মানে হয় ইতালির বিচারকরা তাদের কাজ করছেন না অথবা তাঁরাও আমাদের কুকর্মের সঙ্গে জড়িত।” এরপর ১৯৮৪ থেকে ২০১৬ অবধি দারিও ফো “এলিজাবেথ, অলমোস্ট বাই চান্স এ উইমেন (১৯৮৪), দি ট্রিক্স্‌ অফ ট্রেড (১৯৮৫), অ্যাবডাক্টিং ফ্রানসেস্কো (১৯৮৬), দি ফার্স্ট মিরাকেল ইফ দি ইনফ্যান্ট যেশাস (১৯৮৭), লেটার ফ্রম চাইনা (১৯৮৯), দি স্টোরি অফ ঘু (১৯৮৯), দি ওয়ান্টেড ম্যান (১৯৮৯-অনঅভিনীত), দি পোপ অ্যান্ড দি উইচ (১৯৮৯), হাশ উই আর ফলিং (১৯৯০), সেভেন্থ কম্যান্ডান্টস – স্টিল অ্যা বিট লেস নং ২ (১৯৯২), মাম্মি, দি সন্স কিউলটোস (১৯৯৩), সেক্স? থ্যাংকস, ডোন্ট মাইন্ড ইফ আই ডু (১৯৯৪), লিওনার্দো (১৯৯৫), দি ডেভিল উইথ বুবস্‌ (১৯৯৭), দি টু হেডেড এন্যামলি (২০০৩), ফ্রান্সিস দি হোলি জোকার (২০০৯) দি পোপস্‌ ডটার – (নভেল) (২০১৪), দেয়ার ইস অ্যা ম্যাড কিং ইন ডেনমার্ক (২০১৫), জিপসি রেস (২০১৬), নাটক গুলি লিখেছেন। ১৯৯৫ সালে দারিও ফো’র একটা স্ট্রোক হয়, কিন্তু তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন। এর মধ্যে দি ডেভিল উইথ বুবস্‌ কে ফো নিজেই ম্যাকিয়াভেলিয়ান কমেডি বলেছেন। ২০০৪ এ ইতালির একজন সেনেটর ফো’র বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ আনেন। ফো মন্তব্য করে, “আমি বিগত ৪০ বছর ধরে ব্যাঙ্গ কৌতুক করে চলেছি, এমন অভিযোগ ভয়ংকর রকমের অস্বাভাবিক”। ২০১৬ সালে তাঁর মৃত্যুর আগে অবধি তিনি সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ধ্বংস এ তিনি সরব হয়েছিলেন। সমাজ, রাষ্ট্র ও সংস্কৃতির ভূমিকা কে সজীব, প্রাণবন্ত এবং শোষণহীন করার স্বপ্ন দেখেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। ১৯৯৭ সালে তিনি নোবেল পুরষ্কার পান। এছাড়াও প্রেমিও এডুয়ার্ডো পুরষ্কার (১৯৮৬), ওবে এ্যওয়ার্ড (স্ত্রীর সঙ্গে যুগ্ম (১৯৮৬)। অর্ডার অফ সেন্ট আগাথা (২০০১) পুরষ্কার পেয়েছেন।

* * *

দারিও ফো’র জীবন ও নাট্যচর্চার সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর, আমাদের জানাতে ইচ্ছে করে কোন মতাদর্শ ও ভাবাদর্শের দ্বারা তিনি প্রভাবিত। তাঁকে যে বিপ্লবী বিদূষক বলা হয়, এর উৎস লুকিয়ে আছে ইতালির জনপ্রিয় থিয়েটার “কমেডি দ্য লার্ত” এর মাঝে এই থিয়েটার মেলার মাঠে বাজারে, উৎসবে, সাধারণ মানুষের একেবারে নিজস্ব আমোদের থিয়েটার। এই থিয়েটারের প্রয়োজনীয় যাবতীয় সরঞ্জাম শিল্পীরা নিজেরাই বহন করতেন। আর অভিনয় কালে তাদের গাড়িটা (অনেকটা ঠেলা গাড়ীর মত) হয়ে উঠত অস্থায়ী মঞ্চ। প্রহসন-কৌতুক, ধর্মীয় চটুল বিষয় যেমন – গৃহস্থালির ঝগড়া স্ত্রীর অন্য প্রণয়, কোনো বিশেষ আচার অনুষ্ঠানকে নিয়ে কৌতুক এই সবই গুরুত্ব পেত এই থিয়েটারে। এই থিয়েটার ছিল এক ধরনের “ইম্প্রোভাইজেড্‌ কমেডি”। শিশু ও কিশোর বয়সে দেখা এই নাট্য চলন দারিও ফো কে প্রভাবিত করেছিল। তিনি নিজে অবশ্য মলিয়ের এবং রুজান্ট কে তাঁর নাট্যধারার পূর্বসুরী বলেছেন। তবে দারিও ফো’র থিয়েটার কার্যত তাঁর রাজনীতি, ধর্ম, ইতিহাস এবং সংস্কৃতি বিষয়ে বিতর্ক মূলক ধারণার ফসল। থিয়েটারের মাধ্যমে দারিও ফো নিম্নশ্রেণির সুবিধা বঞ্চিত অবহেলিত মানুষদের উপর শোষন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, অবহেলিত মানুষদের মুখের ভাষায় এবং হাসির মাধ্যমে। তাঁর থিয়েটার ছিল নিপীড়িত শ্রেণির রাজনৈতিক শিক্ষার অন্যতম অস্ত্র। তবে ফো’র জনপ্রিয় সংস্কৃতির এই মৌল ধারনা যা একান্তই অবহেলিত শ্রেণির পক্ষে শানিত অস্ত্র তাঁর উৎসমুখ ধরা আছে গ্রামশ্চির আধিপত্যবাদ বা হেজিমনির ধারণার অভ্যন্তরে। গ্রামশ্চি প্রভুত্ব ও অধীনতা সম্পর্কে সাধারণ চরিত্রটির সন্ধান করেছেন প্রধানত সংস্কৃতি ও ভাবাদর্শের ক্ষেত্রগুলিতে। বলশেভিক বিপ্লবের ছকের বাইরে গিয়ে গ্রামশ্চি বলেছিলেন বুর্জোয়া শাসনশ্রেণি কেবল শাসকতন্ত্রে তার প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করেনা, সৃষ্টি করে এক সার্বিক সামাজিক কর্তৃত্ব বা “হেজিমনি”। কেবল রাষ্ট্রীয় শক্তিকে অবলম্বন করে এই সার্বিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়না। সংস্কৃতি ও ভাবাদর্শের জগতে এক আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে “হেজিমনিক” বুর্জোয়া শ্রেণি তার শাসনের নৈতিক ভিত্তি হিসাবে নিম্ন ও শ্রমিক শ্রেণির কাছ থেকে সামাজিক সম্মতিও আদায় করে নেয়। দারিও ফো এই মতবাদের শরিক হয়ে সংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতির ব্যপক অভ্যাস ও চর্চার মধ্য দিয়ে সামাজিক রাজনৈতিক অপশাসনের অবসান চেয়েছেন। কোনো ব্যক্তি শাসক বা দলের পরিবর্তন নয়। দৈনন্দিন জীবনে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠী গত ভাবে সংস্কৃতির ভাবাদর্শের পরিবর্তন, যা সমাজ পরিবর্তনের সহায়ক হবে। ফো তাই, লো কালচারাল ফর্ম, অলিখিত তাৎক্ষণিকতা (ইম্প্রোভাইজেশন) কে তার নাটকের ডিজাইন বা ফর্ম ভেবেছেন। শাসক শ্রেণি যে পদ্ধতিতে শাসিতের সম্মতি আদায় করে তাকে পরিহাস কৌতুকের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করে তোলা। পুঁজিবাদের অসাড়তা বোঝাতে যেমন চার্লি চ্যাপলিনের ‘মডার্ন টাইমস’। ফো প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার মুখোশ খুলে দিয়েছেন, যাতে বোঝা যায় তাদের জনগণের অধিকার রক্ষার কাজ ও প্রতিশ্রুতি আসলে ভান। আর্ট ইজ ফর আর্ট, নট ফর মার্ট এন্ড আর্ট ফর্ম্যাট মিন্স ইট ইজ ফর মারকেট নট ফর দা  পিপল। (চায়নি টুঙ্গল শারি ও হ্যাডি সুবাগো)। এই ভাবনায় জড়িত হয়ে কান পে, ওন্ট পে,  অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ অফ এন এনাকিস্ট, দ্য ট্রিকস অফ দ্য ট্রেডস নাট্যাভিনয়। জন প্যাডাম এন্ড দ্য ডিসকোভারি অফ দি আমেরিকা- সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী উপনিবেশিকতা বিরোধী এই নাটকে তিনি মানব প্রকৃতির এমন রূপ দেখান যেখানে ক্ষমতার জন্য মানবিকতাকে বিসর্জন দেওয়া হয়। দি স্টোরি অফ দি টাইগার নাটো ইতালির লেফট বামপন্থীদের প্রান্তিক প্রতিনিধিত্বের কথা বলা হয়েছে। ফো, বিশ্বাস করতেন মানবিকতায় যেন তেন প্রকারণে উপায়ে ক্ষমতা দখলকারী কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রান্তিক মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় তিনি তার নাটকের মাধ্যমে সরব হয়েছেন। টাইগার এখানে ইতিবাচক আত্মনিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনার সমার্থক। তিনি শুধু শাসক শ্রেণিকে দোষারোপ করেননি, ইতালির লেফটেরও সমালোচনা করেছেন। কেন তারা প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলছেন না। শুধু মাত্র ক্ষমতা দখলের প্রতি সংবেদনশীল থাকছেন। দারিও ফো’র থিয়েটার যে সমসাময়িক সামাজিক, রাজনৈতিক, সমস্যা নিয়ে ভাবিত এ কথা মেনে শুধুমাত্র রাজনৈতিক, এমন  আখ্যা দিলে দারিও ফো’র নাটকের পোয়েন্টিক্স, কাব্যরসকে উপেক্ষা করা হবে। দারিও ফো জানতেন মানুষের চিন্তা ভাবনা আচরণ সবকিছুই সংস্কৃতির শর্তাধীন আর সংস্কৃতি ক্ষমতাকে চিহ্নিত করে এবং ক্ষমতার সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করে। নিজেকে সাধারণ মানুষ মানুষের প্রতিনিধি মুখপাত্র ভেবে তিনি তাদের কারণেই নাটক করেছেন। দীর্ঘকাল ধরে প্রান্তিক মানুষেরা যে অন্যায়ের শিকার তার প্রতিকার চেয়েছেন। তার নাটক দিয়ে একটা “কাউন্টার হেজিমনিক ডিসকোর্স” তৈরি করতে চেয়েছেন। তিনি সমাজ বদলের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু জানতেন এবং মানতেন, মতাদর্শের ক্ষমতা ছাড়া তা সম্ভব নয়। প্রান্তিক মানুষের ভালো মন্দ অন্যের ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপর নির্ভর শীল থাকবে না। তাদের নিজেদেরও উপলব্ধি করতে হবে। ফো’র এই বিপ্লবী বাম রাজনীতিতে বিশ্বাস তাকে প্রান্তিক মানুষদের কারণে পক্ষ নিতে সহায়ক হয়েছিল, আর এটাই তার সংস্কৃতির রাজনীতি। তার রাজনৈতিক মতাদর্শ তার নাটকের মুখ্য বিষয় ছিল, মানুষকে ক্ষমতা ও রাজনীতি বিষয়ে সচেতন করা।

প্রান্তিক মানুষের মর্যাদা তাদের স্বতন্ত্রতা যে ধর্মীয় ভন্ডামির দ্বারা আক্রান্ত, সেটা উপলব্ধি করেই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যঙ্গ করেছেন। তার প্রতিবাদী থিয়েটারের মূল ভিত্তি তাই নৈতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক স্বার্থ রোহিত প্রান্তিক মানুষের কারণে।

“গিলারি” -র অনুসরণে প্রচলিত সভ্যতার তুলনায় কম কথা বলে প্রান্তিক মানুষদের পরিভাষায় কিচমিচ শব্দে ও শারীরিক ভঙ্গিমায় তিনি নাট্যাভ্যাস উপস্থাপিত করেছেন। দারিও ফো’র থিয়েটার রাজনীতি ধর্ম ইতিহাস সংস্কৃতি যা আমাদের সামাজিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অবশ্যম্ভাবী সেই সব বিষয়ের এক বিতর্কিত আখ্যান। “সোসাইটিজ আর ওয়াইজ উইথ দি উইসডোম অফ দেয়ার রিপ্রেজেন্টেটিভস অর স্টুপিড উইথ দেয়ার স্টুপিডিটি”- এই উইসডোম-বিজ্ঞতা আর স্টুপিডিটি – মূর্খতার মধ্যেই দারিও ফো’র নাট্যযাপন।

 

দারিও ফো’র নাট্যকর্ম

১৯৫৮ – কর্পস ফর সেল

১৯৫৮ – দি ভার্চুয়াস বার্গলার

১৯৫৯ – আর্চএঞ্জেল ডোন্ট প্লে পিনাবল।

১৯৬০ – হি হ্যাভ টু পিস্তলস উইথ হোয়াইট এন্ড ব্ল্যাক আইজ

১৯৬১ – হি হু স্টীলস্ এ ফুট ইজ লাকী ইন লাভ

১৯৬৩ – ইসাবেলা, থ্রি টল শিপস্ এন্ড এ কমন ম্যান।

১৯৬৭ – থ্রো দি লেডী আউট।

১৯৬৮ – গ্র্যান্ড প্যান্টোমাইম উইথ ফ্যাগস এন্ড স্মল মিডল সাইজ পাশেটম

পরিচিতি – ডেথ এন্ড রেজারেকশন অফ্ এ পাপেট।

১৯৬৯ – মিস্টার বুফো।

১৯৬৯ – দি ওয়ার্কার নোজ ৩০০ ওয়ার্ভস, দি বস নোজ ১০০০ ওয়াডর্স দ্যাটস্ হোয়াই হি ইজ দি বস্।

১৯৭০ – আই উড্ রাদার ডাই টু নাইট ইফ আই হ্যাভ্ টু থিংক ইট হ্যাভ অল বিন ইন ভেইন।

১৯৭০ – এ্যাকসিডেন্টাল ডেথ অফ্ এ্যান এ্যানার্কিস্ট।

১৯৭১ – ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড অল টুগেদার নাও? উপস্ নজ ইট দ্যাট দি বস্।

১৯৭২ – ফেদিয়াল।

১৯৭৩ – দি পিপলস্ ওয়ার ইন চিলি।

১৯৭৪ – পোর্তা এন্ড বেলি এগেইনস্ট দি অথরিটিজ।

১৯৭৫ – ফানফানি কিডন্যাপড্

১৯৭৬ – মাদারস্ মারিজুয়ানা ইজ বেস্ট

১৯৭৭ – লেটস্ টক এ্যাবাউট উইমেন; ওয়েকিং আপ, অল হাউস; বেড এন্ড চার্চ; এ্য উওম্যান এলোন; ফ্রেক মাদার; দি সেম ওল্ড স্টোরি; মেদেয়া, দি প্রেগনান্ট ম্যান।

১৯৭৮ – দি টেল অফ্ এ টাইগার।

১৯৮১ – ট্রাম্পেটস্ এন্ড রাক্সবেরিজ।

১৯৮২ – টুমরোজ নিউজ টুডে।

১৯৮৩ – দি ওপেন কাপল, দি রেপ; দি ক্যান্ডল স্টিক মেকার।

১৯৮৪ – এলিজাবেথ; অলমোস্ট বাইচান্স এ উইম্যান

১৯৮৫ – দি ট্রিকস অফ্ দি ট্রেড

১৯৮৬ – এ্যাবডাক্টিং ডায়ানা

১৯৮৭ – দি ফাস্ট মিরাকেলস্ অফ দি ইনফ্যান্ট জোশাস।

১৯৮৯ – লেটার ফ্রম চায়না; দি স্টোরী অফ কিউ।

দি ওয়ান্টেড ম্যান; দি পোপ এন্ড দি উইচ।

১৯৯০ – হাশ, উই আর ফলিং

১৯৯২ – যোহান পাদান এন্ড দি ডিসকভারী অফ দি আমেরিকাজ।

১৯৯৩ – মাম্মী! দি স্যানস্ কিউলোটেস।

১৯৯৪ – সেক্স? থ্যাংকস, ডোন্ট মাইন্ড ইফ আই ডু।

১৯৯৫ – লিওনার্দো; দিফ্লাইট, দি কাউন্ট এন্ড দি এমরস্।

১৯৯৭ – দি ডেভিলস্ উইথ বুবস

২০০২ – মাই ফাস্ট সেভেন ইয়ারস প্লাসএফিউমোর।

২০০৩ – দি টু হেডেড এনামালি

২০০৯ – ফ্রান্সিস দি হোলি জেস্টার।

২০১৪ – দি পোপস্ ডটার (উপন্যাস)

২০১৫ – দেয়ার ইজ এ ম্যাড কিং ইন ডেনমার্ক

২০১৬ – জিপ্সি রেস

অন্যান্য নাট্য রচনা (যার তারিখ পাওয়া যায়নি)

এ্যালিস ইন ওয়ান্ডার ল্যান্ড, হাউজ পেন্টারস হ্যাভ নো মেমারি, মার্কোল্ফা, দি ইয়েল উওম্যান, ফ্যাসিজম ১৯২২, দি টিউমান্ট অফ বলগনা, দি বাটার ফ্লাই মাউস, দি ওপেরা অফ্ গুফোজ, দি বার্থ অফ্ দি জাংলার, ওয়ান ওয়াজ ন্যুড এন্ড ওয়ান ওয়োর টেলস্।

সম্মান ও পুরস্কার প্রাপ্তি

১৯৮১ – সোনিং প্রাইজ (কোপেন হেগেন বিশ্ববিদ্যালয়)

১৯৮৫ – প্রিমিও এডুয়ার্ড এ্যাওয়ার্ড

১৯৮৬ – ওবি এওয়ার্ড (নিউইয়র্ক – ফ্রাঙ্কা রামারমাথে যৌথ)

১৯৮৭ – এগো ডলসি প্রাইজ

১৯৯৭ – নোবেল প্রাইজ (সাহিত্যে)

২০০১ – সাম্মানিক ডক্টরেট (ড্রীজে বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রাসেলস্)

২০০২ – অর্ডার অফ সেন্ট অগাথা (রিপাবলিক অফ্ সান মারিনো)

সহায়িকা গ্রন্থ

টনি মিচেল – দারিও ফো পিপলস্ কোর্ট জস্টার (মেযুইন)

আন্তোনিও স্কুভেরি – দারিও ফো – (লক্সিনংটন বুকস্)

গেছি বারবার - ময়ূরী মিত্র পর্ব ১২

ময়ূরী মিত্র  image

গেছি বারবার

ময়ূরী মিত্র

১২. কাঁকড়াগাদ পাহাড় পথ

একবার উত্তরাখণ্ডের কাঁকড়াগাদে পাখি দেখতে গিয়েছি। যেখানে রয়েছি তার সামনে মন্দাকিনী। উল্টোদিকে ফের পাহাড়। সে পাহাড়ের ওপরে আবার বসতি। মাত্র দু চারঘর থাকে। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে দেখতাম উল্টোদিকের পাহাড়ে গুনেগুনে চারটি আলো। নিকষ আঁধারে চার পিদিম। কী যে রহস্যজগত মনে। কেন জানি না, রহস্যের এ এক আজব বৈশিষ্ট্য। কেন সে আসে তা সে নিজেও জানে না।

ঘরের আলো নিভিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে গুছিয়ে বসতাম। তারপর আলো চারটে দেখে যেতাম। মন্দা নদীর স্রোতের আওয়াজে চার বাতি কাঁপছে মনে হতো। এতদূর থেকে শুধু ঘর বোঝা যায়। নিবাসী অচেনা থাকে।

একদিন বিকেল থাকতে গেলাম পাহাড়ে। এঁকেবেঁকে সিঁড়ি উঠে গেছে একদম চারঘরের উঠোনে। এতো সুন্দর সিঁড়ি কেমন করে হল জিজ্ঞেস করাতে বসতির প্রধান মা বললেন, “আমাদের একটাই পথ মানুষের কাছে পৌঁছনোর। আমরাই পাথর কেটে বানিয়েছি। না বানালে ছেলেপিলে স্কুল যেতে পারবে না। আমি ডিমের ঝুড়ি নিয়ে নামতে পারব না। মরার খাটই বা যাবে কী করে।”

অস্ফুট স্বরে বলেছিলাম, “এতো সুন্দর পাহাড়ে থাকেন, সামনে নদী, এতো পাখি…”

বুড়ি মা খানিক চুপ করে রইলেন. তাঁর বউমা জল আর পিঠে দিয়ে গেছেন। চার গেরস্তের প্রধান পোষ্য মোরগ ডেকে চলেছে। এক অপূর্ব বিকেল। এত অপূর্ব যে সূর্যের চলে যাওয়াটাও মহান লাগছিল । সেই নিস্তব্ধতা আর সেই মোরগগুলোর সরব ডাক দুইই ভেঙে দিল আচমকা বৃষ্টি। বুড়ি মায়ের কথা ভাসছিল বৃষ্টিতে…

“এ অঞ্চলের পাহাড়ে হঠাৎ ভীষণ জোরে বৃষ্টি হয়। কাজকর্ম বন্ধ হয়। তখন নিজের ঘর মৃত্যুপুরী লাগে। বর্ষায় কতবার যে মৃত্যুর অনুভব হয়। মনে হয়, মরে গেলে ঠিকঠাক পৌঁছতে পারব তো অনেক মানুষের শ্মশানে! নাকি জীবনে যেমন সবার থেকে বিচ্ছিন্ন চারঘর হয়ে রয়েছি মরণকালেও চারঘরের শ্মশানে থেকে যাব? পাহাড়ের ওপর ঘর গড়েছি বলে শ্মশানও গড়ব এ হবে না বাপু। সবার মাঝে মরব। অনেক মানুষ যেন আমার ঠাণ্ডা শরীরটাকে ঘিরে রাখে।”

কথার মাঝেই বৃষ্টি থেমে এসেছিল। মেঘের ছায়াটুকু শুধু  ঘুরছিল। সে ছায়া বুড়ির মুখের কোনোখানে নেই। সে মুখে এক অপার্থিব উত্তাপ। এতক্ষণ যেন কোন মহাবাঁচার গল্প বলছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে গাছের ওপর কালো টিয়া তার বাচ্চাদের জন্য দানা নিয়ে এল। লাল লাল চোখে বাচ্চগুলো মায়ের মুখ থেকে দানা নিচ্ছে। তেমনই দুই লাল চোখে মা সন্তানের খাওয়া দেখছে। সূর্য পশ্চিমে গেলেও দুটো লাল চোখ চার গেরস্থালিতে আলোর অভাব রাখেনি।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে শিবনাথ শাস্ত্রীর মুকুলে পড়া দুটো পাখির একটি গল্প মনে পড়েছিল। কতবার পড়েছিলাম গল্পটা। দুটো পাখি মালিকের খাঁচায় বদ্ধ থেকে প্রথমে কাঁদতে। কাঁদতে কাঁদতে পরস্পরকে ভালোবাসল। ভালোবাসা তুঙ্গে। তখন জুড়িপাখি মরে গেল। মালিক নতুন পাখি এনে দিলেন। প্রেমিক পাখি নতুন সাথিকে দেখলই না। একদিন ভোরে মালিক দেখলেন একটি চাকতি আয়নায় বেঁচে থাকা পাখি নিজেকে দেখছে আর প্রতিবিম্বের ঠোঁটে চুমু খেয়ে যাচ্ছে।

শিবনাথ এখানে গল্প শেষ করেছেন। আমি তার পরের শুরু করে দিলাম। কোনো এক ভোরে সূর্য দেখল পাখি মরে পড়ে আছে আয়নার সামনে। বসন্তভোরের দামাল বাতাসে আয়নাটা কাঁপছে। কাঁপার শব্দ উঠছে। ঠুং। গাইছে, সে  গাইছে – মৃত কায়া দেখে। (…ক্রমশ)

অনীক দত্ত - অভিষ্যন্দা লাহিড়ী দেব

magazine writer 69th magazine editions

অনীক দত্ত

অভিষ্যন্দা লাহিড়ী দেব

সাংবাদিক জীবনে প্রিমিয়ার শো দেখার অভ্যাস ছিল। তেমনই এক শোতে দেখতে গিয়েছিলাম ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’। দু’ঘণ্টার সলিড এন্টারটেইনমেন্ট। বেশ ভালো। পরিচালক ভদ্রলোককে চিনতাম না। বিজ্ঞাপন জগতের বন্ধুরা বলেছিল ‘বিগ শট’। পরে আলাপ হয়েছিল অনীক দত্তের সঙ্গে।

তাঁর মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে চাই না। সে চর্বিত চর্বণ তো চারিদিকে চলছে। তাঁর শিল্প নিয়ে কথা বলাই ভালো। সত্যজিৎ রায়ের ভক্ত ছিলেন। এতগুলো বছরে ছবির সংখ্যা মোটে সাত। একবার বলেছিলেন, ‘প্রথম ছবি হিট বলে আমাকে কেউকেটা ভাবার কোনো কারণ নেই। আমি সিনেমা বিশেষ বুঝি না, শুধু ভালোবাসি।’

তবু একটা কথা বলতেই হয়, বাংলা চলচ্চিত্র জগতে যাঁরা নিজস্ব ভাষা, স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি এবং তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গের মাধ্যমে আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছেন, তাঁদের মধ্যে পরিচালক অনীক দত্ত অন্যতম। তিনি এমন একজন নির্মাতা, যিনি বিনোদন ও চিন্তার খোরাককে এক সুতোয় গেঁথে দর্শকদের সামনে প্লেটে করে সাজিয়ে দেন। তাঁর চলচ্চিত্রে যেমন হাসি রয়েছে, তেমনই রয়েছে সমাজ পর্যবেক্ষণ, এবং মানুষের মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ।

২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ চলচ্চিত্র তাঁকে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এই ছবির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে একটি চলচ্চিত্র একই সঙ্গে বিনোদনমূলক, বুদ্ধিদীপ্ত এবং সামাজিকভাবে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। ছবিটির ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনা, সংলাপের অভিনবত্ব এবং ইতিহাস ও বর্তমান সময়কে মিলিয়ে দেখার প্রচেষ্টা দর্শকদের গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আজও এই চলচ্চিত্র বাংলা সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়।
এরপর তিনি ‘অশ্চর্য প্রদীপ’, ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ এবং ‘অপরাজিত’-এর মতো ছবি বানিয়েছেন। বিশেষ করে ‘অপরাজিত’ ছবিটি আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রশংসিত হয়েছে। এই ছবিতে তিনি তাঁর গুরু সত্যজিৎ রায়-এর সৃষ্টিশীল যাত্রার গল্প বলেছেন। তবে তিনি শুধুমাত্র জীবনীচিত্র নির্মাণ করেননি, বরং এক শিল্পীর সংগ্রাম, স্বপ্ন ও আত্মনিবেদনের গল্প অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছেন।
অনীক দত্তের চলচ্চিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত হাস্যরস। তিনি কখনও সরাসরি উপদেশ দেন না; বরং গল্প, চরিত্র ও পরিস্থিতির মাধ্যমে দর্শকদের ভাবতে শেখান। তাঁর কাজ আমাদের সমাজের নানা অসঙ্গতি, কৃত্রিমতা এবং মূল্যবোধের পরিবর্তনকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে সাহায্য করে। তাঁর সংলাপগুলি যেমন স্মরণীয়, তেমনই তাঁর চরিত্রগুলি বাস্তব জীবনের খুব কাছাকাছি।

বর্তমান সময়ে যখন অনেক চলচ্চিত্র শুধুমাত্র বাণিজ্যিক সাফল্যের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন অনীক দত্ত নিজের সৃজনশীল সততা বজায় রেখে কাজ করে চলেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে ভালো গল্প, গভীর চিন্তা এবং শিল্পসম্মত উপস্থাপনার মাধ্যমে দর্শকদের হৃদয় জয় করা সম্ভব।
একজন পরিচালক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হল বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ। তাঁর ছবিতে কলকাতার আবহ, বাঙালির জীবনযাপন, সাহিত্যচর্চা এবং সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ফলে তাঁর চলচ্চিত্র শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সময়ের দলিল হিসেবেও মূল্যবান।

এমন অনেক পরিচালক আছেন, যাঁরা একটিমাত্র ছবি করেও চিরজীবী হয়েছেন। অনীক দত্তের কাজ কতটা উচ্চস্তরের ছিল সে বিচারের চেষ্টা না করে, বরং বলা যাক, ‘আপনি থাকছেন স্যার!’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *