


গৌরাঙ্গ দণ্ডপাট
সম্পাদক
- Phone:+1 (859)00000
- Email:info@example.com


পার্থ হালদার
সম্পাদনা সহযোগী
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


সোময়েত্রী চ্যাটার্জি
প্রচ্ছদ
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


পল্লব মিশ্র
প্রচ্ছদ অলংকরণ
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


সুচরিতা রায়
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


পূর্ণতা নন্দী
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


মৌলিকা সাজোয়াল
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com


অয়ন্তিকা নাথ
অন্যান্য কাজে
- Phone:+1 (859) 254-6589
- Email:info@example.com
কর্তৃক
৮৬, সুবোধ গার্ডেন, বাঁশদ্রোণী, কলকাতা: ৭০০০৭০ থেকে প্রকাশিত।
- যোগাযোগ : ৯৬৪৭৪৭৯২৫৬
৮৩৩৫০৩১৯৩৪ (কথা /হোয়াটসঅ্যাপ)
৮৭৭৭৪২৪৯২৮ (কথা)
- Email : bhaan.kolkata@gmail.com
Reg. No: S/2L/28241 548
সূচিপত্র
।। সম্পাদকের কথা ।।
স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসবে আরো নানা কিছুর মতো শিল্পচর্চায় পরাধীনতার মহোৎসব শুরু হয়েছে। কিন্তু মুশকিল হল, পরাধীনতা কে পরাধীনতা না বলে উল্টে ‘স্বাধীনতা’ বলে ডাকা এই সময়ের নতুন ট্রেন্ড।এই হচ্ছে একবিংশের কড়া পাকের পরাধীনতা। যেখানে পরাধীনরা রাদ্দিন তাধিন তাধ্ধিন তালে ‘আমরা স্বাধীন’ ‘আমরা কত স্বাধীন’ বলে চ্যাচাচ্ছে। যারা এদের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে সেই সব প্রভুদের খুশি করতেই পরাধীনদের ‘স্বাধীন’ ‘স্বাধীন’ বলে চিৎকার। পরাধীনতার প্রধান শর্ত প্রকাশ্যে নিজেকে ‘স্বাধীন’ বলে উল্লসিত দেখানো। মন দিয়ে শোনার কান যাদের আছে তারা বুঝবেন সে উল্লাসে কতটা গ্লানি মিশে আছে! কতটা সস্তা আর ক্লিন্ন হয়ে আছে ওদের মন। আত্মসম্মান বেচে দেওয়া শিল্পীর ভাগ্যি, সকলে এতো তলিয়ে শোনে না!
শোষিত যখন উঁচু তলার ঝকমকিতে বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়, নিজের অসহায়ত্ব জেনে ন্যুব্জ হয়, হেজিমোনাইজড হয়, কুঁকড়ে থাকে; -তখন তার পরাধীনতার বোধ তীব্র হতে পারে না। সামাজিক আগ্রাসন, অর্থনৈতিক দুর্দশা, সাংস্কৃতিক হীনমন্যতা তাদের নির্ভরের রাজনীতির কাছে নিয়ে যায়। ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি গদগদ চিত্তে সমর্পণ, ক্ষমতাবান রাজনৈতিক প্রভুদের প্রতিও একই সমান্তরালে ধাবিত হয়। কিন্তু যারা বুঝতে পারেন ক্ষমতার কলাকৌশল, কীভাবে নিজেকে অমর করতে চেয়ে মারণ রোগ ছড়াচ্ছে বিকৃত ক্ষমতাখেকোরা, কীভাবে ঘৃণার বিষকে ‘আদর্শ’ করে বিষিয়ে দেওয়া হচ্ছে দেশ-কাল-সমাজ ও সংস্কৃতি, – সে-ই তারাই জেনে না জানার ভাণ করতে করতে বাঁচেন। শেকল কে মুক্তির বেড়ি নাম নিয়ে জড়ান, শেখানো বুলিকে নিজের উচ্চারণ বলে নিজেকে ঠকান, অপরকে জানাতে চান তিনি কত সাধু, তিনি কত স্বাধীন। কিছুটা অস্বস্তি কাটাতে মাঝে মাঝে তাদের একটু আধটু নির্বিষ ফোঁস-ফাঁস করেন বটে। তা দেখে ঢোঁড়া সাপে হাসে। কেননা শেষত তারা সমঝোতাপন্থীও থাকেন না। অনুগত চাকরবৃত্তি করে ‘বিশেষ’ হয়ে ওঠার ভাণ করেন। বিশেষ পদের উচ্চাসনে আসীন, অথবায পদপ্রার্থী দেউলিয়া মনের নুয়ে পড়া মানুষ সব। উচ্চাভিলাসী মধ্যবিত্তের এ-ই পরাধীনতার মহোৎসব দেখে যাদের গা গোলায়, তাদেরও নিজেদের শাসনে রাখা দরকার। কেননা লোভ,লালসা, আর ক্ষমতার আস্ফালন এর ঝোঁক অথবা রোগগুলি দরজা জানালা দিয়ে ঢোকে না, মানুষেরই বাসনার বৃক্ষমূলে তার জন্ম।
মানুষের স্বাধীন সত্তাটির কথা শিল্প মনে করিয়ে দেয়। শিল্পী তার ধারক-বাহক। এখন প্রশ্ন হল, কেন এবং কীভাবে স্বাধীন শিল্প ও শিল্পী বিষয়টি ক্রমশ উধাও হয়ে যাচ্ছে আমাদের চেনা পরিসর থেকে। ক্ষমতার চাটুকারিতা আর স্বাধীন শিল্পচর্চা সোনার পাথর বাটি একথা জেনেও আমরা সেইসব চাটুকারদের শিল্পী পদবাচ্য ভেবে ইতিহাসে নিজেদের ধ্যাষ্টামো কে লিপিবদ্ধ করে রাখছি। আত্মপ্রবঞ্চনা করছি। ঝলমলে চকচকে বিজ্ঞাপন দেখে উত্তেজিত হচ্ছি। উত্তেজনা কে ভাবছি শিল্পচেতনা। এই ভ্রম থেকে, ছল থেকে, এবং কল থেকে আশু মুক্তির সম্ভাবনা দেখছি না।
শিল্পীদের রাজনৈতিক চেতনা থাকবে,থাকা দরকার, সে চেতনা শেষ পর্যন্ত দল বল ছল কে তোয়াক্কা না করে সুন্দরে পৌঁছবে, আনন্দে থিতু হতে চাইবে। অসহায় দুর্দশাগ্রস্তদের পাশে থাকবে, প্রতিবাদী না হতে পারলেও, সহমর্মি হবে। বিভাজনের পক্ষে, অসাম্যের পক্ষে, দারিদ্র্যের পক্ষে, হিংসার পক্ষে, দাঙ্গার পক্ষে, বলপ্রয়োগের পক্ষ নিয়ে পৃথিবীতে কখনও মহৎ সাহিত্য, শিল্প রচিত হতে পারবে না। ফলে শিল্পীর মনোজগত যদি অসূয়া, সাম্প্রদায়িকতা, ঘৃণার বিষে জর্জরিত থাকে, তবে কতদূর পর্যন্ত সে শিল্পী হতে পারে?
পুজিতন্ত্র শপিং কমপ্লেক্সের চকমকানো শিল্পের মধ্যে গুঁজে দিয়ে কালচার ইন্ড্রাস্ট্রি তৈরি করেছে। বাজারী করে দেওয়ার সেটি ছিল সংগঠিত উদ্যোগ। এতে যে সত্য সত্যই শিল্প ও শিল্পীর বারোটা বাজাল— তা আজ প্রমানিত। মেগা নাইট না ঘটাতে পারলে হাজার প্রতিভা সত্ত্বেও তুমি পাতি লোকাল-আর্টিষ্ট। শিল্পের জগতে, বিশেষত মেইনস্ট্রিম সিনেমার জগতে আসতে শুরু করল পাল পাল ননসেন্সরা। রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ নিয়ে যে অনেক লড়াই , যে লড়াইয়ের গভীরে ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত হওয়া যে শিল্পীর নিয়তি, তার সম্পর্কে সম্পূর্ণত অজ্ঞতা রেখে গড়ে উঠল একের পর এক শিল্প-মহল। নব্বই দশকের বিশ্বায়নের পাগলা-হাওয়ায় এরা ঝাড়ে বংশে বৃদ্ধি পেতে লাগলেন। বাজারে তাই বেচব যেখানে আমার বেশি প্রফিট, তা যদি হিংসা হয়, দাঙ্গা হয়, বিকৃত কাম হয়, বিকৃত ইতিহাস হয় – তার কোনো দায় নেব না। এই সব শিল্পের ব্যবসদার, দালাল, এবং বিকৃত রুচির ভাঁড়ে জাগতিক বিনোদন কম্পিত হতে লাগল। অবস্থা এমন মানসিক বেশ্যাবৃত্তিতে পৌঁছে গেল, ক্ষমতায় যে আসবে আমি তার সেবাদাসী হব। এই মানসিক স্তরের অসংখ্য মাতব্বর আমাদের মেইন স্ট্রিম সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রক হলে অপসংস্কৃতির ছায়া লম্বা হবে না তো কি সোনা ফলবে?
পরাধীনতার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠল শুধু জনগণ নয় সামগ্রিকভাবে শিল্পী সমাজও। বা যে শিল্পী সমাজ কে শিল্পী বলে মনে হল, তারা মূলত বাজার অর্থনীতির এবং ক্ষমতাবান সরকারের হাতের পুতুল। ঘুমন্ত আড়ষ্ট জনসমাজ কে জাগানোর বদলে শিল্পীরাই ঘুমপাড়ানি গান গাইলেন। গাইলেন সচেতন সহৃদয় মানবতাবাদীদের ভাগানোর গান। শিল্প বলতে তারা বুঝলেন, কতগুলো কলা-কৌশল ঘটিত বিনোদন, অভ্যাসে তাকে সূক্ষ্ম করা যায়, অর্থে তাকে জনপ্রিয় করে তোলা সম্ভব। শিল্প যে মূলত শৃঙ্খল মোচন করে তার সময়ের মুক্তির কাজ করবে – একথা শৃঙ্খলাবদ্ধ ( মূলত শৃঙ্খলে বন্দি) শিল্পীর মাথায় আর দেখা দিল না। সে প্রথমত বুঝল, রাষ্ট্র কী চায়? সে তার সেবাদাসীর ভূমিকায় নিজেকে সমর্পণ করে শিল্পের খোল টুকু জড়িয়ে শিল্পীর ভাণ টুকু নিয়ে বেঁচে থাকল। রাষ্ট্রের পতিরা এইসব নুয়ে পড়া পতিত শিল্পীদের পতিত-পাবন হলেন। যে সব আবর্জনা প্রচারিত হলে ধোলাই হওয়া মগজ বিকৃত ক্ষমতাবানদের ঈশ্বর জ্ঞানে পূজা করবে, সেই প্রচারণ কে শিল্প এবং তার প্রচারকদের শিল্পী বলে মর্যাদা দিলেন বিগ বসরা। একটা ভয়ঙ্কর নেক্সাস তৈরি হল রাজনৈতিক ক্ষমতা, বেনিয়া তন্ত্রের সঙ্গে শিল্পের। ফলে শিল্প আর শিল্প না থেকে শিল্প-টিল্প, শিল্পী আর শিল্পী না থেকে শিল্পী-টিপ্লী হয়ে গেল। যে লালসার ট্যাবলেটে ক্ষমতা মধ্যবিত্তের প্রগতিশীলতাকে প্রতিমুহূর্তে থামিয়ে সমঝোতার পক্ষে নিয়ে আসে, শিল্পীদের ক্ষেত্রে সে-ই একই ওষুধে কাজ হল। অথচ শিল্পীর উচিত প্রতিনিয়ত নিজের শ্রেণি স্বার্থের সীমানা কে নিজেই পর্যুদস্ত করা। এটা শিল্পী হবার মহড়া। মানুষ কে আনন্দ উড়োজাহাজ ও দিতে পারে, ভাঁড় ও দিতে পারে। শিল্পী যন্ত্র নন, ভাঁড়াও নন। প্রকৃত শিল্পী ভাঁড় সেজেও ভাঁড়ামির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন। চাটুকার সেজে বিরোধিতা করেন চাটুকারিতার। মানব জীবনের যা কিছু হীন দাসত্ব তার বিরুদ্ধে আওয়াজ ওঠানো তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। অথচ শিল্পীদের অবস্থান ও নীরবতায় আমরা বুঝি, বিবেক-মৃত সাজানো কিছু গায়ক নায়ক কে আমরা শিল্পী বলে ভুল ঠাওরাচ্ছি। যে মানুষটি প্রতিনিয়ত শারীরিক ভাবে, আর্থিক ভাবে, বস্তুগত ভাবে ভেঙে পড়তে পড়তে, মুচড়ে যেতে যেতেও আত্মসম্মানের গল্প বলেন না, তিনি আর যাই হোন শিল্পী না।
আজকের সিনেমায় জীবনের উত্তাপ নেই। বাস্তবের স্বরূপ সন্ধান নেই। মানবতার ক্রন্দন নেই, গরিবের লড়াই নেই, শোষনের ফাঁদে ক্লিষ্ট জনতার উচ্চারণ নেই, আছে কতগুলো বানানো ছদ্মবেশ। ইতিহাস থেকে, সময় থেকে অনেক দূরে তার সাজানো পরিপাটি খেলাঘর। সেখানে নাকি খাঁটি বিনোদন তৈরি হয়। এমন খাঁটি যা হতভাগ্য মানুষের কাজের কাজে লাগে না, নেশার কাজে লাগে। অথবা সে ইতিহাস ঐতিহ্য এবং সমকালের অর্থান্তর ঘটায় প্রভু কূলের স্বার্থে। যে শিল্প চর্চা তেমন অর্থকড়ি ছাড়াও চালানো সম্ভব, সেখানেও পচন অব্যাহত। বড়দের মতো সরাসরি সমর্পণ না করলেই ক্ষমতার প্রিয় হবার জন্য সে বিষয়ে-প্রকাশে ইতিহাসে, পুরাণে, তন্ত্র কাহিনী, সহজ হাস্যরস এবং ফিলগুড মার্কা এমন সব থিমে বিচরণ করে যে, তাদের এই সতর্কতা দেখে মধ্যবিত্ত জনতার চাকরি হারানোর ভয়ের কথাই মনে আসে।
তবে কী এই ভয়ঙ্কর দাসত্বের বাজারে, শিল্প পণ্যের আসরে শিল্পী বলে কেউ নেই? তা কখনো হয় না। শিল্পী আছে। যেহেতু মানুষ এখনো বেঁচে আছে। সেই প্রকৃত সন্ন্যাসী শিল্পীদের খুঁজে নেওয়া আমাদের কাজ। বাজারের কোলাহলে তাদের তেমন দেখা মেলে না। দূরে যে বাঁশি কাঁদছে, যে সারেঙ্গি ফুঁসছে, যে মানুষটি শত প্রলোভন কে লাথি মেরে খিদে পেটে ন্যুব্জ দেহে মগজ ও হৃদয় কে টানটান করে ঋত্বিক হয়ে আছেন, আমদের উচিত তাদের খুঁজে বার করা, তাদের মন্দিরে ধ্যান করা, শেষ পর্যন্ত পরাধীনতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে তুলতে অকুতোভয় সৈনিকের মতো যে মানুষ কলম চালাচ্ছেন, ক্যামেরা তাক করছেন, তুলিতে আঁচড় কাটছেন, মঞ্চে সৎ হয়ে অতল কে স্পর্শ করাচ্ছেন সেই প্রকৃত শিল্পী। স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসবে আদতে নব্য পরাধীনতার বীভৎস উদযাপনে মেরুদন্ড ও আত্মসম্মান পুনরুদ্ধারে সাহসী অগ্রগামী অবিচল মানুষটি আমার শিল্পী, তার সৃষ্টিই আমার শিল্প!
গেছি বারবার - ময়ূরী মিত্র - অন্তিম পর্ব

গেছি বারবার
ময়ূরী মিত্র
অন্তিম পর্ব…
১৬. জগতপথ
বাবা চলে যাওয়ার কয়েকদিন পরে। সন্ধেবেলায় কথাবার্তা হচ্ছিল দুর্গাসুন্দরীর সঙ্গে। এককড়া দুধ জ্বাল দিতে দিতে দুর্গাসুন্দরী তাঁর জন্মভূমির গল্প করেছিলেন। উদ্বিগ্ন চোখে বারবার ওভেনের দিকে তাকাচ্ছিলাম। ঘন দুধ থেকে চমৎকার গন্ধ ছেড়েছে। এইসময়ই দুধ লেগে যেতে পারে। তাহলেই দুর্গাসুন্দরীর হাতের পায়েস খাওয়া হবে না বাড়ি ভর্তি অতিথি অভ্যাগতর। দুর্গাসুন্দরী অবশ্য আমার চোখ খেয়াল করলেন না। দুধের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন। কাঠের হাতায় সর লেগে যাচ্ছে। ফুটন্ত দুধের ধোঁয়া মাখছে রাঁধুনির কালো চোখ। সে চোখে গাভীসন্তানের নরম ভাব। কালো মণিতে ঢালা রোদ। এতদিনের আলাপে এই প্রথমবার দুর্গামোহিনী আমার কাছে গ্রামের নাম উচ্চারণ করলেন। এ উচ্চারণ পুরাকালের ঋষিগৃহে সামগান !
দুধ নিয়ে ভেব না। সাজানো রান্নাঘর ফেলে যাদের ভিনদেশে আসতে হয়েছে তারা ঠিক বুঝতে পারে কড়ার দুধ কখন পুড়বে ..পুকুর কখন শুকনো হবে !
–গ্যাস সিম করতে করতে দুর্গাসুন্দরী বললে। গোবিন্দভোগ চাল ভিজে গামছায় মুছে খবরের কাগজে ঢাললেন! ঘি মাখাবেন চালে। পায়েসের দুধে ঘি মাখা চাল ফেলতে আগে দেখিনি। তবে দুর্গা সুন্দরী স্বতন্ত্র। বৈষ্ণব সন্তান। বৈষ্ণবদের নিরামিষ ও মিষ্টান্ন রান্নার হাত খুব মিঠা – বরিশালের করপা গাঁয়ের মেয়ের এ দাবী ন্যায্য।
–কী কী ? কী নাম বললে তোমার গাঁয়ের।
–করপা। করপা। ওই যে গো ! যে গাঁয়ে শেতলা মায়ের মেলা খুব বিখ্যাত গো !
– শীতলার গাঁয়ে তুমি বৈষ্ণব !
— দিদি গাঁয়ের নাম করপা। করপায় দুয়ের দ্বন্দ্ব টের পাওয়া যায় না। এ গাঁয়ে শেতলার মেলায় শ শ লোককে বিনে পয়সায় সকালের চা , রাতের দুধ কলা রুটি খাওয়ানো হয়। আবার আমার নমশুদ্দুর নবাবা ভালোবেসে চৈতন্যকে নিয়েছিল! মাঘী পূর্ণিমায় আমাদের বাড়ি শত গরীব খেত। বৈষ্ণবরা স্বপাক নিরামিষ। অন্য ধারার নমশুদ্দুররা ইলিশ ৷ আমাদের গাঁয়ের ছদিকে নদী। নদীর মেলায় জ্যান্ত ইলিশের সঙ্গে খেলতাম গো দিদি। রোদ উঠলে ইলিশ মরত আর মা ভাজত। ভাজা ইলিশ হাঁড়ি করে ঝোলানো হত। এত ইলিশ গরিবের পেটে সয়। ভাজা ইলিশে পোকা ধরে যেত পচা ইলিশ নদীতে ছুঁড়ে ফেলত মা। ওখানেই তো ….
আমি চুপ। দুর্গার মন উপড়ে আনব।
কী দুর্গা ? ওখানেই তো …কী !
গ্যাস নিভল। দুর্গাসুন্দরী পায়েসের ওপর ঘিয়ে ভাজা কাজু কিশমিশ সাজাচ্ছেন। দুটো কাজু আর ছটা কিশমিশ মিলে একটা পদ্ম হয়ে যাচ্ছে। দুধসায়রে পদ্ম! বোষ্টুমীর গায়ে ঘিয়ের গন্ধ। করপার মেয়ে এবার খোয়া ক্ষীর গুঁড়ো করবেন।
— পায়স যখন পূর্ণ শীতল হবে খোয়া গুঁড়ো তখন ছড়াতে হয় ! বুঝলে দিদি !
বৈষ্ণবীর কথা কেটে বললাম —
গরম পায়েসে খোয়া দিলে কী হয় ?
-তাপে কঠিন গলে যায়।
— তাতেই তো ভালো দুর্গা !
–উঁহু ! যা কঠিন তাকে কঠিন রাখতে হয়। নাহলে
কঠিনের ধর্ম নষ্ট হয়।
ধর্ম কী বোষ্টুমী ?
কর্ম।
কেমন কর্ম ?
পুণ্যকর্ম।
না যদি করি ?
পাপ হবে।
মাঝামাঝি কিছু নেই বোষ্টুমি ?
আছে প্রেম। সেও এক পুণ্য। ওই গামছাটা দাও। তো দিদি। স্টিলের বাটিগুলোতে জল লেগে। ভালো করে মুছে পায়েস তুলতে হবে। বাহ বাটিগুলো কেমন এক সাইজের ! দেখন সুন্দর – খাদ্যও সম।
বৈষ্ণব রসরাস্ত্র পড়ে দুর্গাসুন্দরীর জিভ বেশ ধারালো। ছোট্ট হাতা পায়সে ডুবিয়েছেন।
২
…দুর্গা একটু টেস্ট করি। দাও না দুচামচ!
…আগে অতিথ …তারপর।
…নইলে ?
….কৃষ্ণের নীল শরীরে দুঃখ জমবে। সে বড় প্রেমিক
মানুষ –ফিক করে হাসলেন করপার মেয়ে।
…আছছা খাব না আগে। তবে বল সেদিন ওখানে কী …?
…নদীতে বর দেখলাম। রূপ সনাতন।
…ছাই। আসল নাম বলবে না ?
…দরকার কী ! কৃষ্ণের সন্তান।
…কৃষ্ণের সন্তান নৌকো থেকে চুমু ছুঁড়ল ?
….বারো বছরের মেয়ে তখন। গেছি নদীতে পোকা লাগা ইলিশ ফেলতে। ধাড়ি ছেলে নৌকো থেকে হাসছে আর বলছে -একটু দাঁড়িয়ে যাও। পচা ইলিশ জলে গিয়ে ফের জ্যান্ত হয়ে তোমার কোলে লাফাবে। তিনবছরের মাথায় ধাড়ির ছেলে আমার পেটে। তখন একছরের মাসিক হয়ে গেছে। পেটে ব্যথা উঠল। চাষের ক্ষেত থেকে বাপ ভাই দৌড়ে এসে দেখে -আমি হাগার মতো বসে। রক্তমাখা বড় সন্তান করপার মাটি ছুঁল। আর করপার চাঁদ সে রক্তে জোছনা দিল।
হাতার পায়েস শুকিয়ে আঁট। দুর্গাসুন্দরী সম্বিত হারিয়েছেন। বাগানে রাতচরারা ডাক দিচ্ছে। আমার কিশমিশ চুরি করতে ইচ্ছে করছে না।
….দুর্গা …
…উ!
…ও দুর্গা।
…বল।
…তারপর?
…সে রাতে আমি শেতলা হলাম। আঁতুরঘরে বর এসে নতুন শঙ্খবালা পড়িয়ে দিল। জানো দিদি, অনেক বছর আগে করপা গাঁয়ে শাঁখারীরা নৌকো নিয়ে আসত। বউরা নদীর ধারে বসেই শাঁখা পলা পরত। তো একবার একটা বাচ্চা মেয়ে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে শাঁখা পলার জন্য খুব কাঁদতে লাগল। দলের মধ্যে সবচেয়ে বুড়ো শাঁখারী তার বানানো সেরা শাঁখা পলা মেয়েটার হাতে পরিয়ে দিল। তার শাঁখায় হাতী সিংহ মোগল মিনার কত কী খোদাই! রাতের বেলায় নৌকো ভর্তি আলোয় বুড়ো দেখল পালে ময়ূরের পাখা লাগিয়ে দিয়েছে কেউ! শেতলা গো শেতলা। শাঁখা পলা পরে এত খুশি যে শাঁখারীর নৌকোটাকে ময়ূরপঙ্খী বানিয়ে দিল।
….আর তোমার শাঁখারী কী করল ?
….আমার হাত বুকে নিয়ে বলল -চ দুর্গা ভারতে চ।
৩
.. বললে আর চলে এলে ?
…বাবা কাঁদল। মা কাঁদল। মেজো ভাই বাছুর খোঁজার মতো করে আমার বনবাদারে ছোটাল।
বললে – বোন ধরা দে। তোকে বুকে বন্দী করি। বোনাই যাক। তুই থাক। এ বছর শীতে টিনে রস ফুটিয়ে আরো দুরকম গুড় বেশি বানাব। ছেলের মুখে দিবি। ছেলে কৃষ্ণবুলি বলবে। কূলমানে নয়, ভালোবেসে সে ছেলে বৈষ্ণব হবে। করপায় এক বৈষ্ণব বেশি হবে। দু-দশ মানুষের আরো কখানা পাত পড়বে। থেকে যা বোন।
…তবু চলে এলে ? ইচ্ছে করে ভিখিরী হলে?
…সব হারালে বৈষ্ণব মহাধনী। আর অলঙ্কার সঙ্গে নিয়েই তো এলাম। ধাড়ি ..ধাড়ি আমার প্রেমফল।
…এপারে এসে?
…কৃষ্ণের ঘর সর্বত্র। চৈতন্য সবার আঙিনায়। বারাসাতে ঘর বেঁধে মনে করলাম এ আমার বৃন্দাবন।
…ধাড়ি?
…আমায় ফলন্ত করল। পেটে ছোট এল। সংসার বড় হল। চলে না। বর বলল -বউ তুই দুটোকে নিয়ে এপারে কদিন একা থাক। আমি ছয়দিকের নদী পেরিয়ে দেশের জমিগুলো বেচে মাকে নিয়ে আসি।এপারে কৃষ্ণের সংসারে দেবকীও থাকবে।
প্রশ্ন ফুরিয়ে আসছিল আমার। পায়েসের গন্ধ কম হচ্ছে। ঠাণ্ডা বাসের তীব্রতা কমায় নাকি রে বৈষ্ণবী? দেখি দেখি এবার তীব্রতার ধর্ম বল! দেখি কেমন পারিস!
বৈষ্ণবী শীতলাপুত্রী ততোধিক নম্র :
দেবকী দেবকী পুত্র দুইই সেবার সেদেশে মরে গিয়েছিল। ভাসুর কাতরে বলেছিল – দুর্গা ছেলেদুটো নিয়ে আমার ভাইয়ের ফেলে যাওয়া ঘরটায় ফের প্রাণ দে। আমি যাইনি। স্বামী রেখে গেলেন এদেশে। স্বামীর জমি বেচা টাকা আজো ভাসুর ঘরে পড়ে। জমি। টাকা কৃষ্ণবুলি বলে না। যে দেশে কৃষ্ণ মরেছে সে স্বদেশ নয়।
বৈষ্ণবী বাটিগুলো ফ্রিজে তুলছেন। শীতলের পর বরফ। পদার্থধর্ম। কাল অনেক অতিথি পরমান্ন খাবে।
সমাপ্ত।
আন্তন চেকভ (১৮৬০-১৯০৪)- ড. কুন্তল মুখোপাধ্যায়
আন্তন চেকভ (১৮৬০-১৯০৪)
ড. কুন্তল মুখোপাধ্যায়
রূঢ় বাস্তবতা, দীর্ঘশ্বাস এবং মানুষের অন্তহীন আত্মিক একাকীত্বের এক অনন্য রূপকার হলেন আন্তন চেকভ। তিনি ছিলেন একজন রুশ চিকিৎসক, ছোটগল্পকার এবং নাট্যকার। মূলত একজন ছোটগল্পকার হিসেবেই সাহিত্যের অঙ্গনে তাঁর পদক্ষেপ। চিকিৎসক হিসেবেও তিনি অধিকাংশ রোগীর বিনাপয়সায় চিকিৎসা করতেন। ১৮৯৬ সালে তাঁর ৩৬ বছর বয়সে তিনি প্রথম প্রতিষ্ঠিত নাট্যকার রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। ব্যক্তির বিরামহীন চৈতন্যপ্রসূত অভিজ্ঞতা এবং সনাতন গল্প কাঠামোর ভীতিঘটিত পরম অবস্থাকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়েই নাট্যকার চেকভের উদ্ভব। তাঁর ভাবনায় একজন শিল্পীর ভূমিকা হল প্রশ্নকারীর, প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব তার নেই। তুর্গেনিভ, গনচারভ, সের্ভান্তেস, শোপেনহাওয়ারের রচনা তাঁকে প্রথম জীবনে খুবই প্রভাবিত করেছিল। ছাত্র জীবনের (পিতার কঠোর শাসন ও মাতার মমতা) এক অর্ধ অপ্রসন্নতাবোধ ও অর্ধ পরিহাসমূলক ভাব চেকভের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। ১৮৮৭ সালে কোর্শ নামে এক থিয়েটার ব্যবস্থাপকের অনুরোধে চেকভ ইভানভ নামে একটি নাটক রচনা করেন, যদিও তার মঞ্চস্থকরণের অভিজ্ঞতা ছিল চেকভের কাছে বিরক্তিকর। চিকিৎসক বৃত্তির কারণেই তিনি রুশ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসতে পেরেছিলেন। কৃষকদের অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও অভিজাত শ্রেণির লোকেদের শারীরিক অশুচিতা এবং নিদারুন বিরক্তিকর বেঁচে থাকা এই বৈপরীত্যতাই রূপ নিয়েছে তাঁর নাটকে। মেলিসোভোর ফলবাগানে তাঁর বাড়িতে চেকভ দ্য সিগাল নাটকটি লেখা শুরু করেন; ১৮৯৬ সালের ১৬ অক্টোবর পিটার্সবার্গের আলেক্সান্তিনস্কি থিয়েটারে দ্য সিগাল নাটকটির প্রথম প্রদর্শনী হয়। প্রথম অভিনয়ের অভিজ্ঞতা ছিল খুবই হতাশজনক। কিন্তু সমসাময়িক নাট্যব্যক্তিত্ব দানচেন্কোর উৎসাহে এই নাটকটিই কনস্তান্তিন স্তানিসলাভস্কির পরিচালনায় মস্কো আর্ট থিয়েটারে ১৮৯৮ সালে মঞ্চস্থ হলে তা ব্যাপক প্রশংসিত হয়। ন্যাচারালস্টিক অ্যাক্ট ,মঞ্চভাবনা এবং অভিনয়ের জন্য নাটকটি খুবই প্রশংসিত হয়। চেকভের নাট্যে বর্ণিত পরিবেশ পরিস্থিতিকে অনেকে ‘এ্যাটমসফেরিক রিয়েলিজম’ আখ্যা দেন। তাঁর নাটকের চরিত্ররা যে আবহাওয়ায় বাস করে তিনি তারই সার্থক রূপকার। নাট্যের চরিত্রাবলির সামাজিক অবস্থানই শুধু নয়, তাদের যে আসবাব, তৈজস, স্থাপত্য, নিসর্গ তাদের ঘিরে থাকে, যে আশা-নিরাশা-বিষাদ-ক্লান্তির মানস পরিমণ্ডলে তারা বিচরণ করে চেকভ তারই চিত্র নির্মাণে যত্নবান । তাই ঘটনার চাইতে মুড তাঁর নাটকে বেশি গুরুত্ব পায়। ১৮৯৭ সালে আঙ্কেল ভানিয়া , ১৯০১ সালে থ্রি সিস্টার্স, ১৯০৪ সালে দি চেরি অর্চার্ড নাটকগুলিই চেকভকে নাট্যকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। এছাড়াও তিনি ১৮৮৪ সালে ডেভিলস্ অন দি হাই রোড, ১৮৮৮ সালে দি বেয়ার, ১৮৮৮ সালে দি প্রপোজাল, ১৮৮৯ সালে দি আনউইলিং ট্রাজেডিয়ান, ১৮৮৯ সালেই টাটায়ানা রেনিপা, ১৮৯০ সালে দি ওয়েডিং, ১৮৯২ সালে দি অ্যানিভার্সারি প্রভৃতি একাঙ্ক/ছোট নাটকও রচনা করেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৮৮৬ সালে তিনি অন দি হার্মফুলনেস অফ টোব্যাকো নামে একটি মনোলগও রচনা করেন। চেকভের নাটকে বাইরের জমজমাট ঘটনার চেয়ে চরিত্রের অন্তরের অবদমিত হতাশা, অলস দীর্ঘশ্বাস বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর নাটকগুলিকে তাই মেলোড্রামা বা ট্রাজেডির ধাঁচে ফেলা যায় না, বরং অনেকেই এগুলিকে মঞ্চের কবিতা বলেছেন। বাহ্যিক কোলাহল ও অভ্যন্তরীণ শূণ্যতার দ্বন্দ্বই চেকভের নাটকের মূল ভাবনা। হাসি-কান্নার অন্তরালে অদ্ভুত এক নিঃসঙ্গতা ।
দি সিগ্যাল শিল্প, সৃষ্টিশীলতা এবং অপূর্ণ প্রেমের ত্রিমুখী সম্পর্কের এক মনস্তাত্ত্বিক চিত্রায়ন। কনস্ট্যান্টিনের আত্মহনন শিল্পীর অহংকার এবং অপূর্ণ প্রাপ্তির বেদনাকে সামনে নিয়ে আসে। ১৮৮৭ সালের লিখিত ইভানভ নাটকটির সম্প্রসারণ ঘটিয়ে চেখভ রচনা করেন আঙ্কেল ভানিয়া। এক জীবনে যা কিছু অর্জন করার কথা ছিল তার পুরোটাই অর্থহীন বলে মনে হওয়ার বেদনাদায়ক উপলব্ধি এই নাটক। ভানিয়া ও সোনিয়ার কর্মহীন ক্লান্ত জীবন এবং নিষ্ফল আক্ষেপ নাটকটিকে এক অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। থ্রি সিস্টার্স নাটকের কাহিনি প্রোভিন্সিয়াল শহরে আটকে পড়া তিন বোন ওলগা, মাশা এবং ইরিনার মস্কোয় ফিরে যাওয়ার স্বপ্নের বৃত্তান্ত বিষয়। তিন বোনের স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত অধরাই রয়ে যায়। এই নাটকটি সময়ের নিষ্ঠুর স্রোতে ভেসে যাওয়া এবং নিভন্ত আশার এক মর্মস্পর্শী আখ্যান দলিল। দ্য চেরি অর্চার্ড চেকভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক। অভিজাত শ্রেণির পতনের প্রতীক হিসেবে এখানে একটি চেরি বাগান নিলামে ওঠে। পুরোনো দিনের রোমান্টিকতা এবং নতুন উদীয়মান পুঁজিবাদী শক্তির দ্বন্দ্ব এই নাটকের মূল সুর। লিয়ুবভ বা রানেভস্কায়ার মতো চরিত্রেরা নিজেদের অতীত ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চায়, অথচ নির্মম বর্তমান তাদের গ্রাস করে। রানেভস্কায়ার কাছে চেরি অর্চার্ডটি/ বাগানটি শুধু যে পারিবারিক ঐতিহ্য গৌরবের প্রতীক তা নয়, বাগানটি তার নিষ্পাপ শৈশবের অনাবিল আনন্দের সঙ্গে জড়িত । ওই চেরি অর্চার্ড ছাড়া তার জীবনের কোনো অর্থ হয় না। কিন্তু অবস্থার পরিণতিতে সেই ‘বিচ্যুত স্বর্গ’ নিষ্পাপ আনন্দের উদ্যান থেকে তাকে বিদায় নিতে হয়। সবাই চলে যায়, পড়ে থাকে নিঃসঙ্গ শৈশবের স্মৃতি। কলকাতায় অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনা ও অভিনয়ে নান্দীকারের এই প্রযোজনাটি কলকাতায় চেকভকে সুপরিচিত করে তোলে।
চেকভের নাটককে রাশিয়ায় ও ইউরোপে প্রশংসিত করার মূল কারিগর স্তানিসলাভস্কি। কিন্তু নাটকের ব্যাখ্যা বা ইন্টারপ্রিটেশন নিয়ে চেকভ ও স্তানিসলাভস্কির মতান্তর নাট্যের ইতিহাসে এক বিশিষ্ট অধ্যায়। চেকভ যেখানে তাঁর নাটকগুলিকে সোশ্যাল কমেডিজ বলেছেন, স্তানিসলাভস্কি সেখানে মুমূর্ষ জীবনের বিশেষ ভাব বা মুডকে গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন, মূল সংলাপের অন্তরালে লুকোনো দীর্ঘশ্বাস, প্লটের অভ্যন্তরে সাবপ্লটকে খুঁজতে চেয়েছেন। চেকভ চেয়েছিলেন তাঁর নাটকগুলো যেন বাস্তব জীবনের সহজ, স্বাভাবিক ও অন্তর্মুখী রূপ ধারণ করে, যেখানে বাহ্যিক কর্মের চেয়ে অভ্যন্তরীণ অনুভূতি এবং নীরবতার গুরুত্ব বেশি। অন্যদিকে স্তানিসলাভস্কি ছিলেন মনস্তত্ত্বমূলক বাস্তববাদের প্রবক্তা, যিনি নাটকের প্রতিটি চরিত্রে সূক্ষ্ম খুঁটিনাটি, অতিবাস্তব পরিবেশ এবং দৃশ্যমান উপাদানের উপর জোর দিতেন। চেকভের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ইম্প্রেশনিস্টিক – যেখানে ছায়া আলো ও নীরবতার মধ্যে দিয়ে জীবনের ছবি ফুটে উঠবে। আর স্তানিসলাভস্কির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অধিকতর নৈর্ব্যক্তিক ও সুনির্দিষ্ট, বাস্তবের অনুকরণ, নিখুঁত অনুকরণই ছিল মূল লক্ষ্য। এই বিরোধ ও দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও চেকভের নাটকগুলির স্তানিসলাভস্কির নাট্যায়ন মস্কো আর্ট থিয়েটারের মাধ্যমে বিশ্বনাট্যে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে।
বিশিষ্ট পরিচালক রাজা সেনের স্মৃতিচারণায় - মৈনাক সেনগুপ্ত

বিশিষ্ট পরিচালক রাজা সেনের স্মৃতিচারণায়
মৈনাক সেনগুপ্ত
শম্ভু মিত্র, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, মৃণাল সেন, মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের সাহচর্য পেয়েছিলেন রাজা সেন। জোছন দস্তিদারের কাছে হাতে কলমে শেখার সুযোগ। হয়ত সেই কারণেই মঞ্চের মায়া কাটিয়ে উঠতে পারেন নি রাজাদা। তাঁর সব ছবির চিত্রনাট্যকারই থিয়েটারের মানুষ। তাঁর ছবির অভিনেতাদের তালিকায় একবার ফিরে চোখ বোলান – সেখানেও স্টেজের প্রতি শ্রদ্ধা। এবং সাহিত্যের প্রতি আনুগত্য। সুবর্ণলতা, আদর্শ হিন্দু হোটেল থেকে শুরু করে শেষ সম্পূর্ণ স্ক্রিপ্ট – সোনাই ছিল একটি নদীর নাম – পর্যন্ত রাজা সেন বাঙালিকে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন বাঙালির সাহিত্যের ঐতিহ্যের মুখোমুখি। কিছু কিছু শব্দের সঠিক বঙ্গার্থ হয় না। Passionate এর বাংলা কেউ জানেন আপনারা? অভিধানের মানে? আমি জানতাম। রাজাদাকে দেখার দরুণ।
বিশ্বাস করতেন – শিল্প একটা মায়া। যে একবার মায়ার ডোরে বাঁধা পড়েছে , তার আর মুক্তি নেই। রাজাদার কাছে শিখেছিলাম স্রষ্টা বা শিল্পীই ঈশ্বর। বেমানান ছিলেন। সদ্য সাক্ষরকে শিক্ষিত করার চেষ্টা করতেন। ছাত্র হিসেবে আমার চেয়ে বড় সাক্ষী নেই সম্ভবত। পাঁচটি ছবির চিত্রনাট্যের কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। দুটি মুক্তি পেয়েছিল। আমি মুক্ত হয়েছিলাম। আমার মতোই অতীন্দ্র, শুভাশিস, কান্তিরঞ্জন বা এমন অনেকেই।
রূপসী বাংলায় ইন্দিরা ধারাবাহিকে – সিরিয়ালে অমন ক্যামেরার ব্যবহার! লোকটা আসলে সারাজীবন অনেকাংশে ছাত্র আর বেশ খানিকটা শিক্ষক হয়ে রয়ে গেছিলেন। নিজেকে এই বেনিয়া সময়ের উপযোগী করে তুলতে পারেন নি। তিন তিনবার জাতীয় পুরস্কার জয়ী নির্দেশকের প্রযোজক পেতে অসুবিধে হয় কেন? যে-কোনো নাট্য প্রযোজনার দর্শক আসনে বসা রাজা সেন আসলে কোনোদিনই হিসেবী বা বেহিসেবী কোনোটাই হয়ে উঠতে পারেননি। সম্ভাব্য প্রযোজককে আগাম বুঝিয়ে দিতেন হয়ত বা ক্ষতির খতিয়ান। নিজে স্বচ্ছ ছিলেন। অস্বচ্ছতা অপছন্দ করতেন। চাইলেই নিজেকে ramp-এ তুলে নিজেকে বিপণনযোগ্য করে তুলতে পারতেন। তাঁর আদর্শে উচ্চারণ উচ্চকিত ছিল না, কিন্তু শিকড়ে স্থিত ছিল – হয়ত তাঁর শিক্ষকদের কারণে।
অনেক অনেক সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছি রাজাদার সঙ্গে। তাঁর শিল্পকৃতি মূল্যায়নের যোগ্যতা আমার নেই আর সে সব খতিয়ান আজকের আন্তর্জালে চাইলেই কেউ খুঁজে নিতে পারেন। কিন্তু যে মানুষটিকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না – তাঁর নাম রাজা সেন। একজন আনখশির স্বপ্নাবলম্বী মানুষ। আপনি ছাত্র তৈরি করার চেষ্টা করে এসেছিলেন, আমরা যোগ্য শিষ্য হয়ে উঠতে পারি নি কেবল। প্রণাম নেবেন কমরেড।
জননী: এক অন্য মাতৃত্বের নাট্যাখ্যান - সায়ন ভট্টাচার্য
জননী: এক অন্য মাতৃত্বের নাট্যাখ্যান
সায়ন ভট্টাচার্য
বড় রুদ্ধশ্বাস একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে পথ হাঁটছে সাধারণ মানুষ। প্রত্যেকেই চাইছে এমন কিছুর পরশ যার স্পর্শে তার মনের মধ্যে চাপা হিমবাহের যেন গলন হয়। চারপাশের বিকট উল্লাস, চিৎকার থেকে সরে একে অপরের মানবিক স্পর্শে একান্ত উষ্ণতার ওম খুঁজে নিতে তাঁর মন আজ ব্যাকুল। বিশাল বড় মঞ্চের চেয়ে তাই ছোট্ট ঘর বা কৃষ্ণকক্ষের আঁধারে আলো খুঁজে নিতে চাইছে আজকের থিয়েটার। সুগম পার্ক রঙ্গায়ণ-এর নতুন প্রযোজনা ‘জননী’র মঞ্চায়নের ভাবনায় উঠে আসে— “ছোট স্পেসের কথা মাথায় রেখে, যেখানে দর্শক ও অভিনেতৃবর্গ একই সমতলে। তা কোনও হলঘর বা ব্ল্যাকবক্স থিয়েটার, যেমনই হোক। কারণ এই আখ্যানের সুরটি বাঁধা খাদে। হয়তো এ নাট্যরূপ ‘নাটকীয়’ অর্থে নাটকও, নয় যৌথ গল্পকথন মাত্র।” বাংলা থিয়েটারের দর্শক ও দর্শন কতখানি সাবালক হয়েছে সেই বিচারে না গিয়ে বরং বৈজয়ন্ত চক্রবর্তীর এই ভাবনাবীজটা নিয়ে ভাবা যাক, যেখানে তিনি একটি ইন্টিমেট স্পেসকে ব্যবহার করার পিছনে দর্শক সংখ্যার চেয়ে দর্শকের অনুভূতি ও ভাবনা নিয়ে পরীক্ষা করতে চাইছেন। একটু নজর দিলে দেখতে পাবো ‘জননী’ বিমল করের ছোটগল্প, আর ইন্টিমেট স্পেসও যেন থিয়েটারের জন্য ‘ছোটগল্প’ নির্মাণ করার জায়গা। তবে ছোটগল্প বহরে ছোট হলেও তার আবেদন যেমন সুদূরপ্রসারী তেমনি কৃষ্ণকক্ষের ব্যবহারকে ঠিক মতো জানলে সেই থিয়েটারের আবেদন বড় তীক্ষ্ণভাবে দর্শক মনে প্রভাব বিস্তার করে। আবার ‘জননী’ গল্পের মা-বাবা আর পাঁচ ভাই বোনের ঋজু সাংসারিক জীবনের আবহাওয়া ইন্টিমেট মঞ্চের দর্শনকে আরো সুস্পষ্ট করে।
বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের এক একটা আবেগ তার নৈতিকতার সূচক হয়ে দাঁড়ায়। যার মধ্যে অন্যতম মাতৃভক্তি। মাতৃভক্তি অর্থে মায়ের কথাকে মেনে চলা, তাঁর সমস্ত ভাবনাকে মান্যতা দেওয়া। সমাজতাত্ত্বিক আরভিন গফম্যান (১৯২২-‘৮২) সমাজ ও সামাজিক জীবনকে যেমন নাট্যনির্মাণের সঙ্গে তুলনা করেছেন, তেমনভাবেই বলা যায় নাটকীয় সংকটের মতো সন্তানদের বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বোধের সঙ্গে মায়ের চিন্তা বা বোধের দ্বন্দ্ব তৈরি হয় প্রতিটা আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায়। জীবনের নাটকেও টাইম এবং স্পেস বার বার বদল হয় বলে একরৈখিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিপদের সম্ভাবনা তৈরি হয়। ফলাফল খারাপ হলেও আমরা সমাজে মেনে নিই— কিংবা মানিয়ে নিই।
নাটক শুরু হয় পাঁচ ভাই বোনের ব্যক্তিগত শোকের স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে। জীবনের অনেকটা পথ হেঁটে এসে মানুষ যখন শোকের হিসেব নিকেশ করে তখন ‘মোহ-কালিমা’ মুক্ত হয়ে ‘পূণ্যকিরণ’ ছুঁয়ে যায় মনের বারান্দায়।
নাটকের মূল পথরেখা আঁকে পঞ্চম শোক, যখন ছোট বলে, “এই মাসের গোড়ায় মা চলে গেল।… তবে যাবার আগে দেখে গেল তার হাতের পাঁচ আঙুলই একে অন্যের পাশে আছে।” বাগানে মাটির বিছানা শেষবারের জন্য প্রস্তুত করা হয়, যাতে এই বেদির মধ্যে দিয়েই মাকে কাছে রাখা যায়, কৃষ্ণকক্ষের আবহাওয়ায় যে আলোর পথ তৈরি হয়েছে যেন তা নির্দেশ করছে মায়ের অনন্ত যাত্রার রেখাচিত্র। সেই বেদীর পাশে ঘিরে বসে পাঁচ ভাই বোন। সরোদের সুর যখন আর্দ্র হয়ে উঠতে চাইছিল চোখের জলে, তখনই আসে নতুন আরেক বাঁক। বড়দা প্রশ্ন করেন, “আমরা মা-র জন্য কে কী দিতে পারি?” সেখান থেকে সবাই মীমাংসায় পৌঁছায়, “মাকে যদি সেই মনের জিনিসগুলো দিই আমরা, যা এখানে দিতে পারিনি, যা মায়ের কাজে লাগবে, সত্যিই কাজে লাগবে।” এখানে যেন আলব্যের কাম্যুর ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’ উপন্যাসের মেয়রসল্টের উচ্চারণ করা দুটো মনের কথা ভাবনায় আসে, “Maman died today, Or yesterday may be, I don’t know.” ‘Mother’-এর জায়গায় ‘Maman’ ব্যবহার করে কাম্যু যেমন করে সামাজিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করেছেন, এই নাটকে ঠিক বিপরীতভাবে প্রতিটি ছেলে-মেয়ে তার মায়ের জন্য ফিরিয়ে দিতে চেয়েছেন সেই অনুভূতি। সেই বিশ্বাস, যা তাদের মা সামাজিক কাঠামোয় অটল থেকে জোর করে তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। মেনে নিতে পারেননি ছেলেমেয়েদের নিজস্ব অবস্থান। সেই শোক নিয়েই তাঁর পরলোকগমন। কিন্তু একজনের শোক অপর জনের উপরেও যে সমান প্রযোজ্য – এমনটাই মনে করেন প্রতিটি ছেলে মেয়ে। যেমন :
“বড়দি: না হয় কঠিনই ছিল। তাতে কী! সংসারে এমন মানুষ ছিল যে আমায় বিয়ে করত।
মা-র সাহস হল না। একদিন আমি মা-কে বলেছিলাম, রোগ, নোংরামি, কষ্ট সব সহ্য করি
তাতে তোমার আপত্তি নেই, আপত্তি শুধুসুখের ব্যবস্থা করতে। মা খুব অসন্তুষ্ট হয়েছিল,
বলেছিল…
মা : এ-বাড়ির মর্যাদা নষ্ট হোক, এমন কিছু আমি করতে দেব না।
বড়দি: মা মর্যাদা চাইত, আমি সাহস চাইতাম। কিন্তু মানুষের মতো মানুষের সেই সাহস আমি মা-কে দিতে পারিনি। মা যেন সেই সাহস পায়।”
স্মরণকালে মানুষ সব সময় মনে করার চেষ্টা করেন যিনি চলে গেলেন তাঁর রেখে যাওয়া ভালো কাজ। কিন্তু ভালোয় মন্দে মেশানো যে মানুষ সেই মন্দগুলো শুনতে বড়ই দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে থাকে মানব। এই দ্বন্দ্বকে অতিক্রম করতে প্রয়োজন হয় সমালোচনার সুচারু ইতিবাচক পরিস্থিতি। এই দিক থেকে নির্দেশক বৈজয়ন্ত চক্রবর্তীর ভাবনাগুলো একবার দেখে নেওয়া যাক,”‘জননী’ করার প্রথম কারণ হলো এই গল্পটা আমার ভীষণ প্রিয়, বহুদিন থেকে, এবং যখনই গল্পটা পড়েছি আমার মনে হয়েছে এটি প্রায় নাটকের উপযোগী করেই লেখা হয়েছে। দ্বিতীয় কারণ হল, ‘জননী’তে মাকে যে চেহারায় পেশ করা হয়েছে তা আমাদের গতানুগতিক ধারণার থেকে আলাদা। কারণ আমরা সব সময় মাকে এবং মাতৃত্বকে একটা ভীষণ মহৎ, ভীষণ মহান ভাবে দেখে থাকি। আরো বেশি করা হয় কোনো মৃত্যুর পরে, শোকের সময়। এখানে ঠিক তার উল্টো পথে চলা হয়েছে। আর সেটা হয়েছে খুব একটা স্তিমিত স্বরে। একটা লো কী-তে। তৃতীয় কারণ হলো আমার ভীষণ ইন্টিমেট স্পেসে অন্যভাবে নাটক করার ইচ্ছে ছিল এবং এই নাটকটা তার উপযুক্ত। আর চতুর্থ কারণ হচ্ছে এই নাটকে কোনো গল্প নেই, মূলত অনুভবের কথা। এটা যে কোনো নাটকেই করা খুব কঠিন, খুব চ্যালেঞ্জিং— সেই অনুভবটাকে শুধু দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তার জন্য খুব নিচু স্বরের এক ধরনের অভিনয়ের দরকার হয়, সেটাও আমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং।”
পাঁচ ছেলেমেয়ে আর মায়ের সম্পর্কের মধ্যে লেখা জটিল সামাজিকতার স্মৃতি কত অনায়াসে প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয় সমালোচনায় ভীত সন্ত্রস্ত আজকের সমাজকে। মায়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সমস্ত জড়তা, যা স্মৃতির আলোয় জ্বলে উঠলো সেখানে আর কালোর স্থান থাকল না। আত্মসমালোচনাহীন পৃথিবীতে (বিশেষ করে আমাদের পশ্চিমবাংলায়) ‘জননী’র মতো নাটক যেন একটা দৃষ্টান্ত, কত ইতিবাচক ভাবেও নেতির বিনির্মাণ করা যায়। থিয়েটারের দায়িত্ব সমাজকে সমালোচনার মধ্যে দিয়ে দেখার পরিসর বৃদ্ধি করা। ঘর হল রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম সংস্করণ। পারিবারিক রাজনীতির প্রতি অন্ধ আনুগত্যই পরবর্তী বিরাট বড় দেশীয় সমস্যার পরিস্থিতিতে এনে ফেলে। মানুষ তখনও মেনে নেন, কিংবা মানিয়ে নেন। পরিবার মানে মা-বাবার একচ্ছত্র অভিজ্ঞতার শাসন নয়। পরিবারের মধ্যেও চাই সামাজিক চুক্তির এক নান্দনিক জল বাতাস। কৃষ্ণকক্ষের পরিসীমায় যারা নিবিড়ভাবে সেই পাঁচ সন্তানের সঙ্গে হৃদয়ের কথা চালাচালি করলেন তাদের সবার মন থেকেই যেন সামাজিক জড়তার অদৃশ্য মাকড়সার জাল এক ঝটকায় ছিঁড়ে দিল অন্তরঙ্গ এই নাট্য।
বিশিষ্ট শিল্পী পঙ্কজ মুন্সীর স্মৃতিচারণায় - উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়

বিশিষ্ট শিল্পী পঙ্কজ মুন্সীর স্মৃতিচারণায়
উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়
পঙ্কজদার কথা আমাকে লিখতে হবে তার মৃত্যুর পরে। কী লিখবো? মানুষটা কে নিয়ে? না তাঁর কাজ নিয়ে? একজন পবিত্র মানুষ – মোহিত দা বলতেন। নিজে অসূয়াহীন। আর পঙ্কজ দা’কে কেউ হিংসা করেনি কোনো দিন। বামপন্থী এই নাট্যকর্মীকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করেন ব্রাত্য বসু। তাই তিনি অনেক উপরের স্তরের মানুষ। এত স্নেহ আর সম্মান আমাকে দিয়েছেন তার কূল নেই। যখন উনি একজন প্রতিষ্ঠিত পরিচালক তখন আমার সঙ্গে আলাপ মোহিতদার সূত্রে। আমার একটি নাটক অন্তরাল পড়তে গেলাম দলের ঘরে। সেই শুরু। তারপর স্বপ্ন উজান অন্য ভুবন লুল্লু। অন্তরাল থেকে আমাকে একেবারে সামনের সারিতে নিয়ে গেলো। পঙ্কজ মুন্সীর ওই নিরাবরণ নির্মল বিন্যাস না হলে অন্তরাল একটি অতুলন নির্মাণ হয়ে উঠতো না।
গান ছিল ওনার এক শক্তি। সংগীত নির্ভর নাটকে স্বাভাবিক ফুর্তি। তোতারাম নাটকে অভিনয় ভোলা যায় না। মানময়ী গার্লস স্কুল-এর প্রযোজনা হিট।
পুরো স্ক্রিপ্ট টা নিজেই আবার লিখতেন। একটা প্রোডাকশন স্ক্রিপ্ট। পাশে পাশে সব নির্দেশ লেখা। আর মুক্তোর মতো হাতের লেখা। কোনোদিন আমার লেখাকে কেটে দেন নি। কিছু জোড়েন নি। শান্তভাবে রিহার্সাল করতেন। জীবনের পাতায় এক গভীর বেদনা। পুত্র হারানোর কষ্ট বুকে চেপে তিনি কাজ করে গেছেন। আমার জীবনের এক শিক্ষক। এক আলোকবর্তিকা।
